kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

সব কেড়ে নিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হলো যাত্রী

সীতাকুণ্ডে গণপরিবহনে চালক-সহকারীর ছদ্মবেশী ছিনতাইচক্রের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

২৭ এপ্রিল, ২০১৮ ০৮:৫১



সব কেড়ে নিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হলো যাত্রী

সীতাকুণ্ডে গণপরিবহনের চালক-সহকারী ছদ্মবেশে ছিনতাইয়ে জড়িত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ছবি : কালের কণ্ঠ

সীতাকুণ্ডে গণপরিবহনের চালক-সহকারীর ছদ্মবেশী ছিনতাইচক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা চট্টগ্রাম-সীতাকুণ্ড রুটে যাত্রীবাহী বাসে সুযোগ বুঝে ছিনতাই-ডাকাতি করে। এমনকি এরা নারীযাত্রীকে ধর্ষণও করে বলে স্বীকার করেছে পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে।

বুধবার রাতে নোয়াখালী থেকে আসা এক স্কুলশিক্ষার্থীর কাছ থেকে টাকা-মোবাইল ফোনসহ সঙ্গে থাকা সব কেড়ে নিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হয়। উপস্থিত জনতা ওই দৃশ্য দেখে ধাওয়া দিয়ে ধরে গণপিটুনি দিয়ে বাসচালককে পুলিশে দিয়েছে। পরে তার স্বীকারোক্তি মতে অন্য সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আহত যাত্রীকে সীতাকুণ্ড সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, বুধবার সন্ধ্যায় নোয়াখালীর মাধবপুর গোপালপুর আলী হায়দার উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মো. ইলিয়াছ হোসেন ইমন (১৭) জরুরি প্রয়োজনে ২০ হাজার টাকা নিয়ে চাচার কর্মস্থল সীতাকুণ্ডের ছোটকুমিরা গুলআহমদ জুট মিলে আসছিল বাসে। কিন্তু জায়গা চিনতে না পেরে ভুল করে সে চট্টগ্রাম নগরের অলংকার চলে যায়। পরে খোঁজ নিয়ে কুমিরায় আসার উদ্দেশ্যে অলংকার ভাটিয়ারীর ৪ নম্বর সার্ভিসের বাসে উঠে পড়ে। কিন্তু বাসটি ছিল প্রায় ফাঁকা। রাত সাড়ে ১০টার দিকে বাসটি ভাটিয়ারীর বানুরবাজার অতিক্রম করার সময় হঠাৎ চালক ইব্রাহিম রূপ বদল ফেলে। সে ও তার সহকারী মিলে ইমনের মুখ বেঁধে সঙ্গে থাকা ২০ হাজার টাকা, মোবাইলসহ সর্বস্ব লুটে নেয়। শুধু তাই নয়, এক পর্যায়ে ইমনকে বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেওয়া হয়। ওই দৃশ্য দেখে ফেলে স্থানীয় কিছু মানুষ। তাঁরা ধাওয়া করে বাসটি ধরে ফেলে চালককে পিটুনি দিলেও পালিয়ে যায় সহকারী। পরে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থাকা ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়িতে খবর দেওয়া হলে ফাঁড়ির ইনচার্জ টিআই রফিক আহমেদ মজুমদার, সার্জেন্ট মো. সাইফুল আলম সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে আহত স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। আর চালক ইব্রাহিমকে আটক করে পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যান। চালকবেশী ডাকাত ইব্রাহিম (১৮) নোয়াখালীর ধর্মপুর গ্রামের বাসিন্দা।

ঘটনার শিকার ইলিয়াছ হোসেন ইমন সাংবাদিকদের জানায়, সে নোয়াখালী থেকে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় আসছিল। তার চাচা জরুরি প্রয়োজনে বাড়ি থেকে ২০ হাজার টাকা আনতে বলেন। সেই টাকা ও মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন জিনিস সঙ্গে ছিল তার। কিন্তু বাসে কুমিরা না নেমে ভুলে চট্টগ্রামের অলংকার চলে যায় সে। পরে পুনরায় কুমিরায় ফেরার সময় বানুরবাজারে তার বাসচালক ও সহকারী টাকা, মোবাইল, জামা-কাপড়সহ সর্বস্ব কেড়ে দিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয়। এতে গুরুতর জখম হয় সে।

ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সীতাকুণ্ড ট্রাফিক বিভাগের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. রফিক আহমেদ মজুমদার জানান, ঘটনার পর ফাঁড়িতে এনে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে তার অন্য সঙ্গীদের নাম প্রকাশ করে এবং এ ধরনের আরো অনেক ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। পরে সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করেন সার্জেন্ট মো. সাইফুল আলম। অভিযানে মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই ও ধর্ষণের মতো ঘটনায় জড়িত চক্রের আরো সাত সদস্য গ্রেপ্তার হয়। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলো কুমিল্লা নাঙ্গলকোর্ট এলাকার বাসিন্দা গাড়িচালক আরিফুর ইসলাম (২০) ও কুমিল্লা নাঙ্গলকোর্ট এলাকার গাড়িচালক মো. মহিম (২১) ও বিভিন্ন গাড়ির সহকারী ভোলার মনপুরা থানার মো. আল আমিন (১৬), মিরসরাই ঠাকুরদিঘি এলাকার সামসুল হক আরমান (১৭), নোয়াখালী সেনবাগের হেলপার রাকিব (১৮), কুমিল্লার দেবিদ্বারের মাসুম (১৪) ও চট্টগ্রাম আকবরশাহ থানা এলাকার রবিউল হোসেন (১৪)। আটককৃতরা সবাই চট্টগ্রাম থেকে সীতাকুণ্ড চলাচলকারী ৪, ৭ ও ১১ নম্বর লাইনের লোকাল পরিবহনের চালক ও সহকারী হিসেবে বেশ নিয়ে নির্জনতার সুযোগে যাত্রীদের সর্বনাশ করছে। যানবাহনে ছিনতাই ও সুযোগ বুঝে নারীদের ধর্ষণ করতেও পিছুপা হয় না এ চক্রের সদস্যরা। তবে বেশির ভাগ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। ফলে তারা বেঁচে যায়। আটকের পর তারা এ ধরনের বহু ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে।

অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট মো. সাইফুল আলম বলেন, ‘একটি ছাত্রকে একা পেয়ে ওরা তার টাকা, মোবাইলসহ সর্বস্ব লুটে নেওয়ার পর প্রমাণ লোপ করতে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। কতটা অমানুষ হলে তারা এমন করতে পারে! এ খবরের প্রেক্ষিতে এসব ঘটনায় জড়িত ৮ জন চালক ও হেলপারকে গ্রেপ্তার করেছি আমরা।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাস থেকে পড়ে ছাত্রটির মুখের একপাশ পুরোপুরি থেঁতলে গেছে। তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিয়ে মামলার প্রয়োজনে সীতাকুণ্ড থানায় পাঠানো হয়েছে। সেখানে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হবে।’

সীতাকুণ্ড থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. আনোয়ার হোসেন বৃহস্পতিবার বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। মামলা দায়ের শেষে গ্রেপ্তারকৃত আট আসামিকে কোর্ট হাজতে পাঠানো হবে।’



মন্তব্য