kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

চট্টগ্রামে আদনান হত্যাকাণ্ড

কিশোরদের উচ্ছৃঙ্খলতা পুলিশের নজর এড়িয়ে গেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০২:৩৬



কিশোরদের উচ্ছৃঙ্খলতা পুলিশের নজর এড়িয়ে গেছে

চট্টগ্রামে অনেক পরিবারের কিশোর ও তরুণ বয়সী সন্তানরা 'সশস্ত্র' আড্ডায় জড়িয়ে পড়লেও বিষয়টি এত দিন পুলিশের নজর এড়িয়ে গেছে। পুলিশ এত দিন তাদের বিষয়ে 'উদাসীন' ছিল। তল্লাশির আওতায় আনা হয়নি তাদের। এই সুযোগে বিরোধ হলেই অস্ত্র প্রদর্শন ও ব্যবহার করছে কিশোররা।

সর্বশেষ গত ১৬ জানুয়ারি নগরীর কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র আদনান ইসফারকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার সময় কিশোর এবং সদ্য কিশোর উত্তীর্ণদের কাছে পিস্তলও দেখা গেছে। খুনের ঘটনায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধার করা গেলেও পিস্তলটি এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

এর আগে গত বছরের ৩০ আগস্ট ডবলমুরিং থানা এলাকায় কিশোর টিপু সোলতান, বাদশা ও মো. পিয়াসের ছুরিকাঘাতে আরিফ হোসেন নামের এক রাজমিস্ত্রির মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর ছিনতাইয়ের ঘটনায় নগর পুলিশ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আট শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা সবাই ছিল কিশোর। নগরবাসীর জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কিশোরদের এই উচ্ছৃঙ্খল আড্ডাবাজি। তারা কথায় কথায় ধাওয়াধাওয়ি করছে, লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর হামলে পড়ছে।
সর্বশেষ কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী আদনান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিষয়গুলো আলোচনায় উঠে এসেছে।

আদনান হত্যার অন্যতম আসামি মঈন খান চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে গত শুক্রবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মঈন জানায়, তাদের আড্ডার সময় তার সহযোগী সাব্বিরকে অস্ত্রটি দিয়েছিল এনাম নামের একজন। আদনানকে যে ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে, সেটি একটি দোকান থেকে সংগ্রহ করা হয় ঘটনার সময়। কিন্তু পুলিশ জেনেছে, তারা আড্ডা দিত 'মেজ্জান হাইলে আইয়ু্যন' নামের একটি রেস্টুরেন্টে। এই রেস্টুরেন্ট যে ভবনের নিচতলায় সেই ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে ছাত্রলীগ নামধারী তিন সন্ত্রাসী থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই কিশোরদের কথিত 'বড় ভাই'দের নামে থানায় মামলা ছিল। কিন্তু পুলিশ তাদের গ্রপ্তোরে বরাবরই অনীহা দেখিয়ে এসেছে।

পুলিশ জেনেছে, ওই রেস্টুরেন্ট ও আশপাশের এলাকায় কিশোরের দল আড্ডা দেয়। তাদের কাছে ছুরি, এমনকি পিস্তলও থাকে। এ তথ্য আসামিদের স্বীকারোক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে। অথচ পাশেই গণি বেকারীর মোড়ে প্রায়ই পুলিশ থাকে এবং সাধারণ মানুষকে তল্লাশি করে। কিন্তু কিশোরদের গ্রুপগুলো তল্লাশি থেকে রেহাই পেয়ে আসছিল। কিশোরদের সশস্ত্র আড্ডার নেপথ্যে সরকারদলীয় রাজনৈতিকরা জড়িত বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। আদনান হত্যায় জড়িতদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বলছে, 'বড়ভাইয়েরা' তাদের অস্ত্র সরবরাহ করেছে। আওয়ামী লীগের তিনজন নেতা চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজি মুহাম্মদ মহসিন কলেজ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় আছেন। তাঁদের এই চষ্টোর পক্ষগুলো স্কুলছাত্রদেরও দলে ভেড়াচ্ছে। ফলে কিশোরদের হাতে অস্ত্র চলে আসছে।

পারিবারিক বন্ধনে শৈথিল্য
আদনান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশ এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রপ্তোর করেছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরো তিন-চারজনের নাম এসেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের পারিবারিক তথ্য বিশ্লেষণ করে নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কিশোর আসামিদের পারিবারিক বন্ধন শিথিল, পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের ওপর যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে না। এ কারণেই রাতে আড্ডা কিংবা রক্তারক্তিকাণ্ডে জড়াচ্ছে কিশোররা।' পুলিশ জেনেছে, মঈনের বাবা-চাচারা প্রবাসী। দুই ভাই ও এক বোনের সংসারে মঈন বড়। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া মঈন এইচএসসি পরীক্ষার্থী। পুলিশ মনে করছে, বাবা প্রবাসে থাকায় মঈন আড্ডায় মনোযোগী হয়েছে। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র আবদুল্লাহ আল সাঈদের বাবা আব্দুস সাত্তার একসময় ব্যবসা করলেও এখন অবসরে। মা গৃহিণী। পাঁচতলা ভবনের ভাড়ার টাকায় সংসার চলে তাদের। বাবা সাঈদের দেখাশোনা কম করতেন। মুনতাসির মুস্তফার বাবা চন্দনাইশে ব্যবসা করেন। মায়ের সঙ্গে শহরের বাসায় থাকেন মুনতাসির। মা সন্তানকে পুরোটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলেন না। অস্ত্র প্রদর্শনকারী সাব্বিরের বাবা মো. ওসমান এখন বেকার। মা গৃহিণী। পারিবারিক আয় নেই। মেয়ে ও মেয়ের জামাইদের সহযোগিতায় সংসার করে। সাব্বিরের দুই বোন। সে সবার বড়। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে সে বখে গেছে।

আবার নিহত আদনানের বিষয়ে মঈন আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছে, ঘটনার দিন ভিকটিম আদনান তার সহযোগীদের নিয়ে আইডিয়াল স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পেটাচ্ছিল। এই খবর শুনেই তারা ঘটনাস্থলে দৌড়ে গিয়েছিল। আসামি ও ভিকটিম-সবার তথ্য বিশে্লষণ করে উপকমিশনার মোস্তাইন হোসেন বলেন, 'একজন প্রকৌশলীর সন্তান যাদের সঙ্গে মেলামেশা করার কথা কিংবা যে আচরণ করার কথা, সেটা ভিকটিমের (আদনান) মধ্যে অনুপস্থিত ছিল।'

সাধারণ সময়ে পুলিশ গণি বেকারী, চট্টগ্রাম কলেজ, মহসিন কলেজসহ আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষকে যেভাবে তল্লাশি করে, আশপাশের সশস্ত্র আড্ডাবাজদের কেন করে না-এ প্রশ্নের জবাবে মোস্তাইন হোসেন বলেন, 'এসব কিশোর যে অস্ত্র নিয়ে আড্ডা দেয়, এটা আগে প্রকাশ পায়নি। তারা ছাত্র। খেলাধুলা করে, মাঠের আশপাশে আড্ডা দেয়। এখন দেখা যাচ্ছে, খেলার মাঠ হোক আর সড়কের ধারের আড্ডা হোক, সেখানে কেউ কেউ অস্ত্র রাখে। তাই এখন থেকে চকবাজার কিংবা কোতোয়ালি থানা এলাকার সব আড্ডাস্থলে পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাবে।'



মন্তব্য