kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

চট্টগ্রামে জঙ্গিবাদ ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছে কিশোররা

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০৪:০৯



চট্টগ্রামে জঙ্গিবাদ ও হত্যাকাণ্ডে জড়াচ্ছে কিশোররা

চট্টগ্রামে জঙ্গিবাদ, খুনসহ নানা অপরাধে জড়াচ্ছে কিশোররা। এদের মধ্যে অনেকে স্কুলের গণ্ডি পার না হতেই জড়াচ্ছে জঙ্গিবাদে। আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, খেলাধুলা বা রাজনৈতিক কারণে বিরোধে জড়িয়ে হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে। পাশাপাশি সমানতালে চলছে ইভ টিজিং।

গত মঙ্গলবার দুপুরে নগরের জামালখান এলাকায় ছুরিকাঘাতে মারা যায় কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষর্থী আদনান ইসফাত (১৫)। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বন্ধুদের বিরোধ, নাকি অন্য কোনো কারণ, এ নিয়ে এখনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়নি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কিশোররা জড়িত থাকতে পারে বলে পুলিশ ধারণা করছে। 

আদনান হত্যার কয়েক দিন আগে জামালখান চেরাগীর মোড় এলাকায় এক দল কিশোর দেশি অস্ত্র নিয়ে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া করে। নগরের চেরাগীর মোড়, লিচুবাগান, এম এ আজিজ স্টেডিয়াম, চকবাজার প্যারেড মাঠ, মহসিন কলেজের মাঠ এলাকা, গণি বেকারি, পলো গ্রাউন্ড এলাকা, সিআরবি, জিইসির মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোররা গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেয়। এদের বেশির ভাগই ছাত্র। লেখাপড়ার সময় তারা ঘরের বাইরে আড্ডায় সময় পার করে। পাশাপাশি ধনাঢ্য পরিবারের কিছু কিশোর প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল রেসিং করে। এতে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। গত ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে চন্দনপুরা এলাকায় দুটি মোটরসাইকেল রেসিংয়ে অংশ নিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হয় আরোহীরা। 

গত বছরের ১০ অক্টোবর নগরের চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন মো. নজরুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি। সাধারণ ডায়েরির তথ্য অনুযায়ী, তাঁর সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে মো. নাসিফ উল ইসলাম (১৬) ওই দিন ঘর থেকে বের হয়ে আর বাসায় ফেরেনি। আত্মীয়-স্বজনের বাসায় খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। 
সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে নাসিফকে উদ্ধার করতে গিয়ে নগর পুলিশ জানতে পারে, নাসিফ নব্য জেএমবির সঙ্গে যোগ দিয়েছে। এই সূত্র ধরে ১ জানুয়ারি রাতে নগরের সদরঘাট এলাকা থেকে ১০টি গ্রেনেডসহ দুই জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা আশফাকুর রহমান (২২) ও মো. রকিবুল হাসান জনি (১৯) পুলিশকে জানায়, তারা নগরের সদরঘাট থানায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটাতে জড়ো হয়েছিল। 

২০১৬ সালের ১ আগস্ট পতেঙ্গা থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের মধ্যে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার হায়দারনাশি এলাকার মো. ইসমাইলের ছেলে মহিউদ্দিন ছিল কিশোর। এই ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয় ২০১৭ সালের শুরুতে। সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবতাফ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালতে বয়স পরীক্ষার পর মহিউদ্দিনের বয়স ১৬-১৭ বছর বলে মতামত দেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। এরপর কিশোর মহিউদ্দিনের বিচারের জন্য আলাদা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বর্তমানে এই মামলা বিচারাধীন আছে।’ 

নগর পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ দেড়-দুই বছর আগেও কিশোর অপরাধ ও ইভ টিজিং দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিত। রাতে অলিগলি কিংবা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের আড্ডা দেখলেই পুলিশ তাদের লেখাপড়ার সময়ে আড্ডা দেওয়ার কারণ জানতে চাইত। কখনো কখনো অভিভাবকদের ডেকে সন্তানদের আড্ডা দেওয়ার বিষয়টি অবহিত করত। এতে অনেক কিশোর সন্ধ্যার পর আড্ডা কমিয়ে লেখাপড়ার জন্য ঘরমুখো থাকত। পাশাপাশি কোনো শিক্ষার্থী পথেঘাটে ইভ টিজিংয়ের শিকার হলে একটি বিশেষ কোড নম্বর ব্যবহার করে নগর পুলিশকে খুদে বার্তা পাঠাতে পারত। যে মোবাইল নম্বর থেকে খুদে বার্তা যেত, সেই নম্বরে পুলিশ কর্মকর্তারাই যোগাযোগ করতেন এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। 

বর্তমানে নগর পুলিশের এমন কোনো কার্যক্রম দৃশ্যমান নেই। ইভ টিজিং বন্ধে এখন আর নগর পুলিশের কাছে কেউ খুদে বার্তা পাঠায় না। আবার গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দেওয়া কিশোরদেরও পুলিশ দেখে না। এসব কারণে কিশোর অপরাধ বাড়ছে বলে মনে করেন পুলিশের অপরাধ বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তারা। 

নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিশোর অপরাধ হচ্ছে। এটা অস্বীকারের কিছু নেই। এসব বন্ধে পারিবারিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। সব সমস্যার সমাধান পুলিশ দিয়ে সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘সন্তান পড়ার সময় বাইরে কেন যাবে, তার জবাব পরিবারকে আগে নিতে হবে।’



মন্তব্য