kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

যথাযথ কাগজপত্রের অভাব

ভারতীয় ত্রাণসামগ্রী সাত মাস পড়ে আছে বন্দরে

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৩০ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৪:১৫



ভারতীয় ত্রাণসামগ্রী সাত মাস পড়ে আছে বন্দরে

ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’য় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ভারত সরকারের দেওয়া ত্রাণসামগ্রী ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছিল গত জুন মাসে। সেই ত্রাণসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে পৌঁছানো দূরে থাক, এখনো পড়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দর ইয়ার্ডেই। পণ্যগুলো ছাড় করার সঠিক কাগজপত্র না থাকায় সাত মাস ধরে কনটেইনারের মধ্যে বন্দর ইয়ার্ডে পড়ে আছে। এরই মধ্যে সেগুলোর মান ঠিক থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

বন্দরে পড়ে থাকা পণ্যের মধ্যে আছে ৪১ ধরনের ওষুধ, প্রাথমিক চিকিত্সা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি, স্যালাইন, ক্যানোলা ইত্যাদি। এ ছাড়া ৭০ ধরনের খাদ্যপণ্য, প্যাকেটজাত খাবার, স্যুপ, তাঁবু, কম্বল, বডি লোশন, মোমবাতি, টাওয়েল ও কাপড় রয়েছে। কিন্তু কী পরিমাণ রয়েছে তার সঠিক তথ্য নেই কারো কাছে। 

প্রাণভয়ে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য বিভিন্ন দেশের পাঠানো ত্রাণসামগ্রী বিমান ও জাহাজে করে চট্টগ্রাম আসার পর তাত্ক্ষণিকভাবে ছাড় করে দুর্গতদের মধ্যে বিতরণ হয়েছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় মোরায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য আসা ত্রাণসামগ্রী সাত মাসেও ছাড় পায়নি চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার কামরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ত্রাণপণ্যের জন্য শুল্ক-করমুক্ত থাকে বলে সেই পণ্যের আমরা ভ্যালু নির্ধারণ করি না। কিন্তু জাহাজের ইম্পোর্ট জেনারেল মেনিফেস্ট (আইজিএম), বিল অব এন্ট্রি জমার সময় চালানের বিএল, পণ্যের প্যাকিং লিস্ট বা বর্ণনা জমা দিতে হয়। এই চালানের ক্ষেত্রে সেগুলো ছিল না। এ জন্য নিয়ম অনুযায়ী এসব পণ্য ছাড়ের জন্য অনুমতি দিতে পারিনি।

জানা গেছে, গত ৩১ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানার পর জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ‘আইএনএস সুমিত্র’ ১ জুন চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে। চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টমস ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সেগুলো বন্দরেই আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেন। এরপর কনটেইনারে ভরে সিলগালা করে বন্দরের জিম্মায় ইয়ার্ডে রাখা হয় পণ্যগুলো।  

ত্রাণসামগ্রী গ্রহণের পর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দ্রুত ছাড় করে দুর্গত এলাকায় বিতরণের ব্যবস্থা নিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক গত ৫ জুন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালককে চিঠি দেন। এর ১৩ দিন পর গত ১৮ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় বন্দর থেকে পণ্য ছাড়ের জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট শাম্মী এজেন্সি লিমিটেডকে নিযুক্ত করে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চার মাস পর গত ১২ অক্টোবর এসব পণ্য ছাড়ের জন্য চট্টগ্রাম কাস্টমসে কাগজপত্র জমা দেয়। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী পণ্যের বিস্তারিত তালিকা এবং বিল অব লোডিং (বিএল) জমা দেয়নি। পণ্য ছাড়ের পর্যাপ্ত কাগজপত্র না থাকায় চট্টগ্রাম কাস্টমস সেই আবেদনে সাড়া দেয়নি। এ কারণে বন্দরেই পড়ে আছে এসব ত্রাণসামগ্রী।

পণ্য ছাড়ের আবেদন জমা দিতে চার মাস সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে শাম্মী এজেন্সির মালিক ফিরোজ আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি কাজ, তাই অধিদপ্তর থেকে কাগজপত্র দিচ্ছি দিচ্ছি করতেই এত সময় লাগল। পরে পর্যাপ্ত কাগজপত্র না পেয়েই শুধু সাদা কাগজে পণ্যের তালিকা দিয়েই কাস্টমসে পণ্য ছাড়ের আবেদন করি। কিন্তু যথাযথ কাগজপত্র না থাকায় কাস্টমস অনুমতি দেয়নি।

তিনি আরো বলেন, এত দিন পর গত বুধবার কাস্টমস নতুন করে একটি চিঠি দিয়ে বলেছে চালানটি খালাসের জন্য শিপিং এজেন্ট নিয়োগ করে বিএল জমা দিতে এবং এই পণ্য ত্রাণ ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হবে না এমন প্রত্যয়নপত্র দিতে। মন্ত্রণালয় প্রত্যয়নপত্র দিতে পারবে, কিন্তু বিএল কিভাবে জোগাড় হবে তা আমিও জানি না।

এসব ত্রাণ গ্রহণকারী চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারতীয় নৌবাহিনী থেকে কোনো ডকুমেন্ট ছাড়াই ত্রাণগুলো আমাদের কাছে দেওয়া হয়েছিল। পরে আমি নিজে ৬৪ ব্যাগ ত্রাণ ও অন্যান্য জিনিসের বর্ণনা একটি সাদা কাগজে লিখে তাদের স্বাক্ষর নিয়ে গ্রহণ করেছি। এর বাইরে কোনো ডকুমেন্ট ছিল না। পরে সেটি কনটেইনারে ভর্তি করে বন্দরে সিলগালা করে রাখা হয়েছে। এসব পণ্য ছাড়ের জন্য আমি একাধিকবার কাস্টমসে গিয়ে যোগাযোগ করলেও সাড়া মেলেনি।

সর্বশেষ চট্টগ্রাম কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার উত্তম বিশ্বাস এক চিঠি দিয়ে বলেছেন, এসব পণ্য গরিব-দুস্থদের জন্য বিনা মূল্যে বিতরণ করা হবে, বিক্রয় বা বাণিজ্যিক উদ্দেশে ব্যবহার হবে না—এমন ঘোষণা দিয়ে ত্রাণসচিবের প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএল জোগাড় করার জন্যও বলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে এগুলো ছাড় করতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আবুল কালাম আজাদ।

জানা গেছে, বিদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রচুর ত্রাণসামগ্রী চট্টগ্রাম এসেছে জাহাজে ও বিমানে। এর মধ্যে ভারতের ৭০০ টন ত্রাণও এসেছে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজে করে। গত সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছার পরদিন রোহিঙ্গাদের জন্য দেওয়া ভারতীয় ত্রাণসামগ্রী দ্রুত ছাড় করা গেলেও জুন মাসে আসা মোরাদুর্গতদের ত্রাণ ছাড় পায়নি চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে। এ বিষয়ে জানতে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জির সঙ্গে যোগাযোগ করেও তিনি ব্যস্ত থাকায় মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। 

বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য রাখার শেড ৪-এর পাশের খোলা চত্বরে কনটেইনারটি (নম্বর এইচজেসিইউ ২১৩৫৬০৪) রাখা আছে। কিন্তু এসব পণ্য ছয় মাস ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় মান সম্পর্কে কিছুই জানে না কোনো পক্ষ।


মন্তব্য