kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

রোহিঙ্গা শিবিরে ডিপথেরিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা

সরকারি ল্যাবের পরীক্ষায় 'নেগেটিভ' কিন্তু বেসরকারি ল্যাবে 'পজিটিভ'

আজ থেকে টিকা কর্মসূচি

কক্সবাজার প্রতিনিধি   

১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:৫৫



সরকারি ল্যাবের পরীক্ষায় 'নেগেটিভ' কিন্তু বেসরকারি ল্যাবে 'পজিটিভ'

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে 'ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়া' নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। ডিপথেরিয়ার খবরে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের গঠন করা মেডিক্যাল টিমের সদস্যরা সরেজমিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা বলেছেন, রোগটি নিয়ে যেভাবে 'আতঙ্ক' সৃষ্টি করা হয়েছে বাস্তবে পরিস্থিতি সে রকম নয়। তবে কয়েকজন রোহিঙ্গাকে 'ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী'র মতো বলে মনে করা হচ্ছে। তবু এটা শতভাগ নিশ্চিত নয় যে তারা ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত।

কক্সবাজারের স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিত্সক ও কর্মকর্তারা জানান, একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সর্দি-কাশি ও গলাব্যথা নিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের 'ডিপথেরিয়া' আক্রান্ত সন্দেহে ভর্তি করা হচ্ছে। ওই  স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন গলগণ্ড (গলাফোলা) রোগীকেও ডিপথেরিয়া রোগী সন্দেহ করে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারের মেডিক্যাল টিমের সদস্যরা বলছেন, ঠাণ্ডাজনিত রোগ তথা সর্দি-কাশি, গলাব্যথা মানেই ডিপথেরিয়া নয়।

কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের মতো আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবে (পরীক্ষাগার) একে একে ১৫ জন আক্রান্ত রোহিঙ্গার আলামত পরীক্ষা করে 'ডিপথেরিয়া জীবাণু নেগেটিভ' বলা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালের ল্যাবে একই পরীক্ষায় দুজনের রিপোর্টে 'ডিপথেরিয়া জীবাণু পজিটিভ' বলা হয়েছে।

এর পরও সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে তিন দিন ধরে তিনটি মেডিক্যাল টিম রোহিঙ্গা শিবিরে আক্রান্তদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। কিন্তু তারা ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হতে পারছে না।

এ বিষয়ে কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাস্তবে অসুস্থ রোহিঙ্গাদের মধ্যে কয়েকজনকে ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এখনো আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারিনি আক্রান্তরা আসলেই ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত রোগী কি না। আক্রান্তদের অনেকেরই লক্ষণ কেবল ডিপথেরিয়ার মতো সন্দেহ করা হচ্ছে।'

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, কমপক্ষে তিন দশক আগেই বাংলাদেশ থেকে ডিপথেরিয়া নির্মূল হয়েছে। তবু কদাচিৎ এ রোগে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে তাতে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। কারণ সরকার এ ব্যাপারে অত্যন্ত সজাগ রয়েছে।

ডা. আবদুস সালাম বলেন, 'যেহেতু বাংলাদেশের মতো মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো টিকা কার্যক্রম চালু নেই, তাই রোহিঙ্গারা ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হতেই পারে। এ কারণে স্বাস্থ্য বিভাগ আজ মঙ্গলবার থেকে দুই বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের ডিপথেরিয়া প্রতিরোধক টিকা দেওয়ার কর্মসূচি শুরু করছে। ১৪ ডিসেম্বর থেকে ৭-১৫ বছর বয়সী রোহিঙ্গা শিশুদের আরো একটি প্রতিরোধক টিকা দেওয়ার কর্মসূচিও শুরু হবে। এই টিকা একসঙ্গে ছয়টি রোগ প্রতিরোধ করবে।'

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, 'রোহিঙ্গা শিবিরে কয়েকজন ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে অবহিত করেছি।' তিনি জানান, ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গাকে শনাক্তও করা হয়েছে।

অন্যদিকে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নিকারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে জানান, এ পর্যন্ত ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ৯ জন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে আক্রান্ত হয়েছে আরো ৪৪০ জন। তিনি বলেন, 'আমি আক্রান্ত রোহিঙ্গাদের সেবা প্রদানকারী আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা এমএসএফের কর্মকর্তাসহ অন্যদের সঙ্গে আলাপ করেই এসব জানিয়েছি।'

জানা যায়, রোহিঙ্গা শিবিরে ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত সংক্রান্ত খবর পেয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ গত শনিবার কক্সবাজার আসেন। তিনি সরেজমিনে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে গতকাল ফিরে গেছেন ঢাকায়। তিনি রোহিঙ্গা শিবিরে ডিপথেরিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি মেডিক্যাল টিম গঠন করেন। টিমের ছয় সদস্যের নেতৃত্ব দেন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. পু চ নু।

ডা. পু চ নু কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আমরা উখিয়ার বালুখালী এমএসএফ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া সন্দেহভাজন ডিপথেরিয়ার রোগীদের পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখেছি। কেবল সর্দি, কাশি ও জ্বর নিয়ে যারাই এসেছে তাদের সবাইকেই সেখানে 'সন্দেহভাজন ডিপথেরিয়ার রোগী' হিসেবে ভর্তি করা হয়েছে।" তিনি জানান, এসব রোগীর মধ্যে শুধু একজনকে তাঁর কাছে সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তিনি বলেন, 'ডিসেম্বর মাসে সাধারণত ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে থাকে। ঠাণ্ডাজনিত রোগ মানেই শুধু ডিপথেরিয়া মনে করারও কোনো কারণ নেই।' তবে রোহিঙ্গাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

ডিপথেরিয়ায় ৯ জনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও তাদের সাতজন হাসপাতালে এবং দুজন বাসায় মারা গেছে। ডা. পু চ নু প্রশ্ন তোলেন, যে দুজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে বাসায় তারা যে ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত ছিল তা কিভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল?
ডিপথেরিয়াসহ সংক্রামক রোগ (ট্রপিক্যাল মেডিসিন) নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রিধারী কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহজাহান অভিযোগ করে বলেন, 'ডিপথেরিয়ায় নিশ্চিত না হয়ে বিশ্বব্যাপী 'আতঙ্ক' সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার।' তিনি জানান, তাঁরা যখন রোহিঙ্গা শিবিরে যান তখন কয়েকজন স্থানীয় তরুণ ব্যাপক আকারে ডিপথেরিয়া ছড়িয়ে পড়ার কথা চিৎকার দিয়ে বলছিল। মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, তিনি পরে জানতে পেরেছেন এসব তরুণ বর্তমান সরকারবিরোধী কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী এবং তারা শিবিরের বেসরকারি সংস্থায় (এনজিও) কর্মরত।

তবে পরীক্ষায় সরকারি হাসপাতাল ও বেসরকারি হাসপাতলে বিপরীত ফল পাওয়ার বিষয়ে মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, 'পরীক্ষার সময় অনেক জীবাণুর সমাহার থাকলে অ্যালবার্ট স্টেইন পরীক্ষায় পজিটিভ রিপোর্ট আসে বটে, তবে তা হয়ে থাকে ফলস পজিটিভ।' স্কয়ার হাসপাতালের পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া দুই ডিপথেরিয়া রোহিঙ্গা রোগীকে সশরীরে দেখার সুযোগ হয়নি বলে জানান এই চিকিৎসক।

তিনি জানান, ডিপথেরিয়া একটি সংক্রামক ব্যাধি। মানুষের হঁাচি ও কাশির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। জ্বর, সর্দি, কাশির সঙ্গে গলাও ফুলে যায়। সেই সঙ্গে কণ্ঠনালি বা গলদেশের ভেতরে সাদা রঙের সরের মতো দেখা যায়। সেই সঙ্গে খাওয়াদাওয়া করতে রোগীর কষ্ট হয়। খেতে গেলে খাবার গলার পরিবর্তে নাক দিয়ে উঠে আসার শঙ্কাও থাকে এ সময়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগ দীর্ঘদিন আগেই এ দেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হওয়া রোগটির ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন রয়েছে। এ কারণেই সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ টিকা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানান তিনি। 


মন্তব্য