kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

চট্টগ্রাম নগরে গণপরিবহন ধর্মঘট, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

প্রশাসনের নীরব ভূমিকা পক্ষে-বিপক্ষের নেতৃত্বে যুবলীগ-আ. লীগ নেতা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৩:২৭



চট্টগ্রাম নগরে গণপরিবহন ধর্মঘট, অবর্ণনীয় দুর্ভোগ

নগরের অক্সিজেন এলাকায় তিন দিকের সড়কে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল বহু মানুষ। কিন্তু গণপরিবহনের দেখা নেই। প্রায় এক ঘণ্টা পর পেট্রল পাম্পের সামনের সড়কে একটি হিউম্যান হলার (মিনিবাস) আসার পর হুড়োহুড়ি পড়ে যায়, কার আগে কে ওঠে। ধস্তাধস্তি করে আট-দশজন উঠতে পারল। বাকিদের আবার অপেক্ষার পালা।

কিছুক্ষণ পর মুরাদপুর থেকে অক্সিজেন আসে সিটি সার্ভিসের একটি বাস। ওই বাসেও একই অবস্থা। কয়েকজন ঠেলাঠেলি করে উঠতে পারল।

এ সময় আমজাদ হোসেন নামের একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আমরা যাব কিভাবে? তারা কি জন্য গণপরিবহন ধর্মঘট ডেকেছে তাও জানি না। বাস না পেয়ে এক ঘণ্টা আতুরার ডিপো এলাকায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। সেখান থেকে রিকশায় এখানে (অক্সিজেন) আসতে অন্য সময় ২০ টাকা নিলেও আজকে নিয়েছে ৪০ টাকা।

এখান থেকে তো নন্দীরহাট রিকশায় যেতে পারব না। অনেক টাকা নেবে। আধাঘণ্টা ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। গাড়ি পাচ্ছি না। '

চট্টগ্রাম নগরে ট্রাফিক পুলিশের হয়রানি বন্ধ, অনুমোদন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করাসহ ১১ দফা দাবিতে গতকাল রবিবার অনির্দষ্টিকালের গণপরিবহন ধর্মঘট শুরু করেছে মালিকদের একাংশ। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন গণপরিবহন মালিক সংগ্রাম পরিষদ সকাল ৬টায় ধর্মঘট শুরু করে। তবে পরিবহন মালিকদের আরেকটি অংশ যানবাহন বের করেছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্মঘট আহ্বানকারীরা রাস্তায় পিকেটিং শুরু করে। তারা বিভিন্ন স্থানে যানবাহন চলাচলে বাধা দেয়। কয়েকটি এলাকায় গাড়ি ভাঙচুরও করে তারা। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ অন্তত ২৫ জন পরিবহন মালিক ও শ্রমিককে আটক করেছে বলে ধর্মঘট আহ্বানকারীরা দাবি করেছে।

নগরের পলিটেকনিক্যাল মোড়ে প্রধান সড়কের দুই পাশে ৩৫-৪০ যাত্রী গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছে। সকাল সোয়া ১১টার দিকে জসিম উদ্দিন নামের এক দোকানদার কালের কণ্ঠকে বলেন, 'আধাঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। এর মধ্যে তিনটি অটোটেম্পো এসেছিল। ভিড়ের কারণে উঠতে পারিনি। এখন হেঁটে যাচ্ছি দুই নম্বর গেটের দিকে। সেখান থেকে বারিক বিল্ডিং যাব। গাড়ি না পেলে আবার পলিটেকনিক্যাল হেঁটে আসতে হবে। '

দিবাকর বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি বলেন, 'আমি বাসে করে জিইসি মোড়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু অক্সিজেন থেকে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে বাসে উঠলেও বাসটি শেরশাহ এলাকায় আটকে দিয়েছে কয়েক যুবক (ধর্মঘট আহ্বানকারী)। সেখান থেকে বেবি সুপারমার্কেট পর্যন্ত রিকশায় আসি ৩০ টাকা দিয়ে। '

এদিকে দুপুর পেৌনে ১২টায় বেবি সুপারমার্কেট এলাকা থেকে দুই নম্বর গেট পর্যন্ত নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের বাঁ পাশে দেখা যায় তীব্র যানজট। সেখানে বেশির ভাগই রিকশা ও ব্যক্তিগত যানবাহন। যানজটের কারণে অনেককে হেঁটে যেতে দেখা যায়।

এ ছাড়া দিনভর নগরের বহদ্দারহাট, বাদুরতলা, চকবাজার, কাজীর দেউড়ি, আগ্রাবাদ, নিউ মার্কেট, কোতোয়ালি, টাইগারপাস, জিওসি, ওয়াসা, দেওয়ানহাট, বারিক বিল্ডিং, মুরাদপুর, কাপ্তাই রাস্তার মোড়সহ আশপাশে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মোড়ে মোড়ে অনেক যাত্রী দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু গণপরিবহনসহ প্রয়োজনীয় যানবাহন রাস্তায় না থাকায় যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছে। বিশেষ করে সকালে মানুষ বেশি দুর্ভোগে পড়ে। ওই সময় রাস্তায় গাড়ি ছিল কম। বিকেল থেকে মানুষের দুর্ভোগ আরো বেড়ে গেছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন গণপরিবহন মালিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও মেট্রোপলিটন সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, '১১ দফা দাবি  বাস্তবায়নের জন্য আমরা প্রশাসনকে আলটিমেটাম দিয়েছিলাম। গত শনিবার এর সময়সীমা শেষ হলেও একটি দাবিও মানা না হওয়ায় আমরা বাধ্য হয়ে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আজকে (গতকাল) থেকে নগরে অনির্দষ্টিকালের জন্য গণপরিবহন ধর্মঘট শুরু করেছি। আমাদের ধর্মঘটে অটোরিকশা ও অটোটেম্পো মালিক সংগঠনগুলো একাত্মতা ঘোষণা করেছে। '

বেলায়েত হোসেন বলেন, 'বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলার, টেম্পোসহ সব ধরনের গণপরিবহন ধর্মঘটের আওতায় রয়েছে। আমাদের পরিষদের অধীনে এক হাজার ৬০০ বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলার আছে। এর মধ্যে ৬০০ বাস রয়েছে। এর বাইরে কয়েক হাজার অটোরিকশা, টেম্পো রয়েছে ধর্মঘটে। কিছু গাড়ি চলাচলের জন্য একটি পক্ষ আমাদের শ্রমিকদের বাধ্য করছে। ধর্মঘট চলাকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে আমাদের ২৫-৩০ জনকে পুলিশ আটক করেছে। এ ব্যাপারে আমরা এখন বৈঠকে বসেছি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্ষন্ত ধর্মঘট চলবে। '

গণপরিবহন ধর্মঘটের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছেন চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ ও তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন মালিক গ্রুপের নেতারা। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন গণপরিবহন মালিক সংগ্রাম পরিষদের ধর্মঘট প্রত্যাখ্যান করে গাড়ি চলাচল অব্যাহত রেখেছে বলে একাধিক মালিক নেতা জানান।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানকে ঘিরে অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গাড়ি চালানোর কথা জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, 'অযৌক্তিকভাবে তারা অনির্দিষ্টকালের গণপরিবহন ধর্মঘট করছে। এতে আমরা নেই। নগরে আমাদের নিয়ন্ত্রাধীন পরিবহন সংগঠনের গাড়ি বেশি। গাড়ি চলাচল করায় বিভিন্ন স্থানে আমাদের ১৩টি যানবাহন ভাঙচুর করেছে। আমরা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছে। '

মঞ্জু আরো বলেন, 'আজকে (গতকাল) সন্ধ্যায় আমাদের আন্দরকিল্লা কার্যালয়ে বৈঠক করেছি। সদ্ধিান্ত হয়েছে নগরবাসী যাতে দুর্ভোগে না পড়ে তার জন্য আরো বেশি করে গাড়ি চালানোর। তাদের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট সফল হবে না। তারা যাতে ধর্মঘটের নামে রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর করতে না পারে এবং সাধারণ যানবাহন চলাচলে বাধা দিতে না পারে সে লক্ষ্যে আমরা প্রশাসনের সহযোগিতা চেয়েছি। '

ধর্মঘট ডাকা মেট্রোপলিটন গণপরিবহন মালিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও মেট্রোপলিটন সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল নগর যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। অন্যদিকে ধর্মঘটের বিপক্ষের মালিক সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু।

এ ছাড়া ধর্মঘটের বিপক্ষে থাকা চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব হলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি আবুল কালাম আজাদ।

ধর্মঘটের পক্ষ-বিপক্ষের দুই সংগঠনেই সরকারি দল ও এর সহযোগী সংগঠনের আরো একাধিক নেতা রয়েছেন।

এদিকে অনির্দিষ্টকালের গণপরিবহন ধর্মঘটে নগরে কোনো প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (যানবাহন) দেবদাস ভট্টাচার্য। গতকাল রাতে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, 'সকালে গাড়ি একটু কম ছিল। তবে এরপর থেকে গাড়ি চলাচল স্বাভাবিক ছিল। ভোরে আমাদের পুলিশ ফোর্স না থাকায় বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করেছিল ধর্মঘট পালনকারীরা। যাত্রীরা যাতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। যানবাহন চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না। ' ধর্মঘটী কয়েকজন পরিবহন মালিক ও শ্রমিককে আটকের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

গতরাত ৯টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় ধমর্ঘট আহ্বানকারী সংগঠন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন গণপরিবহন মালিক সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বৈঠক করছিলেন। সংগঠনের কার্যালয়ে বৈঠকে থাকা পরিষদের আহ্বায়ক বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, 'এখনো বৈঠক চলছে। দাবি না মানা পর্যন্ত নগরে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট চলবে। এখন পর্যন্ত খবর এসেছে আমাদের ১৮ জনকে পুলিশ আটক করেছে। এর মধ্যে গোলাম কিবরিয়া নামে একজন মালিকও আছে। '


মন্তব্য