kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তিতে আলোচনাসভা

পাহাড় অশান্ত হওয়ার হুঁশিয়ারি সন্তু লারমার

বিশেষ প্রতিনিধি   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৩:১৮



পাহাড় অশান্ত হওয়ার হুঁশিয়ারি সন্তু লারমার

ফাইল ছবি

শান্তিচুক্তি পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্যাঞ্চল আবারও অশান্ত হতে পারে বলে সরকারকে হুঁশিয়ারি করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে গত শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে ডেইলি স্টার ভবনে এক আলোচনাসভায় তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। জনসংহতি সমিতি এই আলোচনাসভার আয়োজন করে।

সভার সূচনা বক্তব্যে সন্তু লারমা বলেন, 'পার্বত্য চুক্তির পর ২০ বছরেও এর মেৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হতে পারেনি। সামগ্রিক পরিস্থিতি নানা ক্ষেত্রে, নানা দিক থেকে অশান্ত হয়ে উঠতে পারে। আমরা এক অন্ধকার বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আছি। কী হবে তা জানি না। '

সন্তু লারমা আরো বলেন, 'এ অঞ্চলে ইসলামীকরণের যে বাস্তবতা বিরাজমান সেটা মেনে নিলে আমাদের সর্বস্বান্ত হতে হবে। আমরা সেটা মেনে নিতে পারি না, মানব না। পাহাড়ে আগুন জ্বলছে, জ্বলবে। সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে।

'

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক ও বর্তমান প্রতিমন্ত্রীদের সমালোচনা করে সন্তু লারমা বলেন, 'আমি তাঁদের কথা বলছি না। সাধারণ জুম্ম জনগণের কথা বলছি। আমাদের অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। সশস্ত্র শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষাতেই জবাব দেওয়া হবে। '

সন্তু লারমা বলেন, চুক্তির দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও করফারেন্সে যা বলেছেন তার অনেক বিষয় বাস্তবতাবিবর্জিত। চুক্তি অনুসারে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, সেনা প্রত্যাহার, জুম্মদের শিক্ষা সংস্কৃতি রক্ষায় সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ কারণে পার্বত্যবাসীর জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই।

আলোচনাসভায় সভাপতিত্ব করেন ঐক্য ন্যাপের সভাপতি পঙ্কজ ভট্টাচার্য এবং সঞ্চালনায় ছিলেন জনসংহতি সমিতির সদস্য দীপায়ন খীসা। সভায় অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি, বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, লেখক ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি নুরুর রহমান সেলিম, বাসদের প্রেসিডিয়াম সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রুবায়েত ফেরদেৌস, সাপ্তাহিক সম্পাদক গোলাম মতুর্জা, অধ্যাপক সৌরভ শিকদার প্রমুখ। সভায় জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক শক্তিপদ ত্রিপুরাও উপস্থিত ছিলেন।

সভায় বেশির ভাগ আলোচক পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য শানি্তচুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন। তবে ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এ চুক্তির কতগুলো শর্ত পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন।

সভায় রাশেদ খান মেনন পুনর্বাসন করা বাঙালিদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এটি চুক্তির কোথাও বলা হয়েছে কি না তা সন্তু লারমার কাছে জানতে চান। তখন সন্তু লারমা জানান যে তা বলা হয়নি।

রাশেদ খান মেনন বলেন, তিনি পার্বত্য এলাকার ভূমি সমস্যার সমাধান নিয়ে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। চেয়ারম্যান জানিয়েছিলেন, বিধিমালার কথা বলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নেতারা আসছেন না।
ওই পর্যায়ে সন্তু লারমা বলেন, 'তিনি (ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান) মিথ্যে বলেছেন। '

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি গুরুতর। পাহাড়ি, বাঙালি সব জনগোষ্ঠীই উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টি নিয়ে।

অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, 'আমরা এবং তোমরা-এই বিভক্তি চলে এলে মানবাধিকার লঙ্ঘন শুরু হয়। সরকার এবং প্রশাসনকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে ভুল বোঝানো হচ্ছে। পার্বত্য চুক্তি সামরিক চুক্তি নয়। মনে রাখতে হবে, এটি রাজনৈতিক চুক্তি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে রাজনৈতিক দিকটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। অন্য দিকগুলো উঠে আসছে। তবে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি হয়ে গেলে অন্য বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি হতে বাধ্য। এর জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে কার্যকর অর্থবহ সংলাপ হতে হবে। '

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন চারটি 'ভ'-এর সমস্যা কাজ করছে। এগুলো হলো-ভূমি, ভোট, ভাত ও ভয়। অপারেশন উত্তরণে পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়নি। '

আবু সাঈদ খান বলেন, 'পার্বত্য চট্টগ্রামকে অন্ধকারে রেখে বাংলাদেশের উন্নয়ন হবে না। সেখানে যে অধিকার দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে তা বাংলাদেশের সব এলাকায় দিলেও ক্ষতি নেই। কারণ বিকেন্দ্রীকরণ গণতনে্ত্রর অন্যতম শর্ত। ' পাহাড়িদের 'জনজাতি' বলা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।

সোহরাব হাসান বলেন, 'পুরো বাংলাদেশেই নিপীড়ন, অত্যাচার চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে হয়তো একটু বেশি। '


মন্তব্য