kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

রোহিঙ্গা তরুণী পাচারকালে দুই 'মাওলানা' ধরা, পরে জেল

এক ক্যাম্পেই রাতে ৫১ ত্রাণদাতা!

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০২:৪৭



রোহিঙ্গা তরুণী পাচারকালে দুই 'মাওলানা' ধরা, পরে জেল

ত্রাণ বিতরণের নামে রোহিঙ্গা শিবিরে গিয়ে তরুণীদের পাচার করার চেষ্টা চলছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যার দিকে শিবির থেকে পাচারকালে সেনা চেকপোস্টে হাতেনাতে ধরা পড়েন এক রোহিঙ্গা তরুণীসহ দুই 'মাওলানা'।

আটক দুই ব্যক্তিকে কারাদণ্ড ও মেয়েটিকে তাঁর বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। এরপর শুক্রবার রাতে উখিয়া থানা পুলিশ কুতুপালং শিবিরে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে দেখে, বহু জেলার বহিরাগত ব্যক্তিরা নির্দেশ লঙ্ঘন করে সন্ধ্যার পরও অবস্থান করছে।

উখিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাকসুদ আলম কালের কণ্ঠকে জানান, অভিযানে শুধু কুতুপালং শিবির থেকেই দেশের ২১ জেলার ৫১ জন বাসিন্দাকে আটক করা হয়। তারা সবাই রোহিঙ্গাদের ত্রাণ বিতরণের নামে শিবিরে প্রবেশ করে। সন্ধ্যা ৫টার পর রোহিঙ্গা শিবিরে প্রবেশ করা নিষদ্ধি; এর পরও তারা রাতে রহস্যজনকভাবে শিবিরে ঢুকে ঘোরাঘুরি করছিল। আটক ব্যক্তিদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাদের অনেকেই নিজেদের আলেম বলে পরিচয় দেয়।

এদিকে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের উখিয়া ডিগ্রি কলেজসংলগ্ন সেনা চেকপোস্টে আটক দুই 'আলেম' ও এক তরুণীকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা উখিয়া থানার পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পুলিশ থানায় এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোহিঙ্গা তরুণীকে ছেড়ে দিলেও ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক হওয়া দুই ব্যক্তিকে সাত মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন।

দণ্ডিতরা হলেন সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানার জামালনগর এলাকার আবু বক্কর ছিদ্দিকের ছেলে মুফতি মাওলানা রফিকুল ইসলাম (৩৭) ও খুলনা জেলার পাইকগাছা থানার বেতবুনিয়া এলাকার ফাতেউল সরদারের ছেলে মাওলানা মো. হারুন অর রশিদ (৩৬)। ২০ বছর বয়সী মেয়েটিকে বালুখালী ১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর বাবার জিন্মায় দেওয়া হয়েছে।

সূত্র মতে, জিজ্ঞাসাবাদে রফিকুল ইসলাম নিজেকে সাতক্ষীরা জেলার জামালনগর এলাকার একটি মসজিদের ইমাম ও  পদবি 'মুফতি' দাবি করে বলেছেন, তিনি সকালে বালুখালী ক্যাম্পে ঢোকেন এবং ত্রাণ বিতরণ করেন। তিনি এই রোহিঙ্গা মেয়েকে ভালো পাত্র দেখে বিয়ে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসছিলেন; আর আটক হারুন অর রশিদ হলেন রফিকুল ইসলামের সহযোগী। তবে রোহিঙ্গা তরুণিটিকে জানিয়েছেন, তাঁকে রফিকুল ইসলাম নিজেই বিয়ে করবেন বলে কথা দিয়ে শিবির থেকে বাইরে নিয়ে আসেন।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক উখিয়া সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট একেরামুল ছিদ্দিক বলেন, অভিযুক্তদের দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৮৬০-এর ১৮৮ ও ২৯১ ধারায় অভিযুক্ত করে সাত মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময় যুবতী রোহিঙ্গা নারীকে তাঁর বাবা জাহেদ হোসেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. এ কে এম ইকবাল হোসেন বলেন, 'আটক মাওলানাদের সম্পর্কে আমি তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি তাঁরা দুজনই বিবাহিত। রোহিঙ্গা তরুণীটিকে ফুসলিয়ে কক্সবাজার শহরের হোটেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ' তিনি জানান, ইতিমধ্যে এ রকম নারীসহ মানবপাচারকারী ও মাদকপাচারকারীসহ নানা অপরাধে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে শাসি্ত দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ জানায়, বিভিন্ন এনজিওর ছদ্মাবরণে এসব লোকজন রোহিঙ্গা শিবিরে ঢুকে পড়ে। তারা রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দেওয়ার সময় কৌশলে মোবাইল নম্বর দিয়ে থাকে। পরে মোবাইল ফোনে ফুসলিয়ে বের করে তাদের পাচার করা হয়। পুলিশ আরো জানায়, নানা কেৌশলেই শিবির থেকে পাচার করা হচ্ছে তরুণীদের।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক বলেন, 'রোহিঙ্গা শিবিরে এসব 'ধান্ধাবাজ ত্রাণদাতা'দের উপদ্রব এত ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে যে আমরা তাদের সামাল দিতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছি। ' তিনি জানান, দেশের নানা প্রান্ত থেকেই এ রকম 'ধান্ধাবাজ' ব্যক্তিরা নানা সংগঠনের নাম ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের সেবার নামে আসছে। বাস্তবে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, প্রকৃত ত্রাণদাতাদের চাইতে রোহিঙ্গা নারীর সন্ধানে আসা লোকের সংখ্যাই বেশি। জেলা প্রশাসক বলেন, এর আগেও ত্রাণ দেওয়ার নামে শিবিরে ঢুকে নানা অপকর্মে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৮৬ জনকে আটক করা হয়েছিল। তাদের বেশির ভাগ নিজেদের আলেম পরিচয় দিয়েছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক।

এদিকে কোনো রোহিঙ্গা নারী যাতে শিবির থেকে বেরিয়ে দেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে সে জন্য এখনই রোহিঙ্গা শিবিরে কঠোর নজরদারি করা দরকার বলে মনে করছে স্থানীয় লোকজন। কারণ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা নারীর দেহে এইচআইভি-এইডস ধরা পড়েছে।


মন্তব্য