|
|
রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদশরীফ আতিক-উজ-জামান
'প্রতিবাদ' শব্দটির আভিধানিক অর্থ_কোনো উক্তি খণ্ডনের জন্য প্রত্যুক্তি, আপত্তি জ্ঞাপন বা বিরুদ্ধ উক্তি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শব্দটির ব্যঞ্জনা আরো গভীর। কারণ, শুধু কথিত উক্তির বিরুদ্ধাচরণই প্রতিবাদ নয়, বরং সামষ্টিক স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ড, সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের বিরুদ্ধাচরণ করাটাও প্রতিবাদের মধ্যে পড়ে। আর তার ভাষা শুধু মুখের না হয়ে শারীরিকও হতে পারে। তবে প্রতিবাদ সোচ্চার বা মোলায়েম যা-ই হোক না কেন, মূল বিষয় হলো, সেই প্রতিবাদ সৎ কি না। অনেক প্রতিবাদের পেছনে মতলববাজি থাকে, থাকে ব্যক্তিগত লাভালাভের বিষয় কিংবা দুই পক্ষকেই খুশি করার প্রচেষ্টা। সেই প্রতিবাদ পরিশেষে তামাশা বা প্রহসনে পরিণত হয়। বস্তুত প্রতিবাদ ব্যক্তিগত-সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনাচরণেরই একটি অংশ। এই বাইরে কেউ নন। তবে 'ঝামেলা এড়িয়ে চলতে' যাঁরা পছন্দ করেন, তাঁদের প্রতিবাদী সত্তা নির্জীব হতে হতে একসময় মৃত্যুবরণ করে। মানুষ-সমাজ-রাষ্ট্র-জগতের প্রতি দায়বদ্ধতা মানুষকে প্রতিবাদী হতে শেখায়। এই দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয় সচেতনতা থেকে, একটি সুন্দর দেশ-কাল-সমাজের স্বপ্ন থেকে। আর প্রতিটি সৃষ্টিশীল মানুষই সেই স্বপ্ন দেখেন। সামাজিক-রাজনৈতিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও সেই সুন্দরের স্বপ্ন থেকেই উৎসারিত। রবীন্দ্রনাথের মতো একজন বিশ্বমানব তার ব্যতিক্রম হবেন কী করে? তাই তো আমরা দেখতে পাই, তিনি তাঁর সুদীর্ঘ জীবনে সামাজিক-রাজনৈতিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে অজস্রবার প্রতিবাদমুখর হয়েছেন। বিভিন্নভাবে_পত্রিকার পাতায় বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সরাসরি পত্র দিয়ে, সেই বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে কিংবা তাঁর সৃষ্টিশীল সাহিত্যের ভেতর দিয়ে তিনি এই প্রতিবাদ করেছেন। এই সীমিত পরিসরে প্রতিটি প্রতিবাদের বিস্তারিত প্রেক্ষাপট হয়তো বর্ণনা করা সম্ভব হবে না, শুধু ঘটনাগুলো উল্লেখ করে যাওয়া ছাড়া।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কুড়িজন বন্ধুসহ রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৮ বছর আগে। আর কবির জন্মের দুই মাস পর ব্রাহ্মরীতি অনুযায়ী তাঁর ভগি্ন সুকুমারীর বিয়ে হয়। ১৮৭৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অপৌত্তলিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন হয়, তিনি গায়ত্রীমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শশধর তর্ক চূড়ামনি, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখের তীব্র বিরোধ ছিল। ১৮৮৪ সালে তাঁরা হিন্দুধর্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলে কতিপয় আজগুবি মতামত অর্ধশিক্ষিত লোকদের বুঝিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সমাজপ্রচলিত সমুদয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কার বিজ্ঞানসম্মত। বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ অজ্ঞেয়বাদী কোঁতের কল্যাণধর্মকে হিন্দুধর্মের আদর্শ বলে প্রচার করলে রবীন্দ্রনাথ তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। শুধু তা-ই নয়, সাময়িকপত্রের আসরে এ নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর প্রচুর কথা কাটাকাটি হয়। বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন_'রবীন্দ্রবাবু প্রতিভাশালী সুশিক্ষিত সুলেখক মহৎস্বভাব এবং বিশেষ প্রীতি, যত্ন এবং প্রশংসার পাত্র। বিশেষত তিনি তরুণবয়স্ক। যদি দুই-একটি কথা বেশি বলিয়া থাকেন, তাহা নীরবে শুনাই আমার কর্তব্য। তবে যে কয় পাতা লিখিলাম, তাহার কারণ রবির পিছনে এক বড় ছায়া দেখিতেছি।' এই ছায়া আর কিছু নয়, আদি ব্রাহ্মসমাজ।
ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে হিন্দুসমাজের দ্বন্দ্বের অনেক কারণ ছিল। প্রচলিত প্রথার অনেক কিছুই ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছিল। যেমন, ব্রাহ্মসমাজ নারীশিক্ষার পক্ষে ছিল, আর হিন্দুসমাজের সংরক্ষকরা আট বছরে গৌরীদানের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ 'হিন্দু বিবাহ' নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে মেয়েদের বাল্যবিবাহের বিপক্ষে এবং নারীশিক্ষার পক্ষে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন।
১৮৯০ সালের ঘটনা। বড় লাটের অফিসে কর্মরত স্বল্পসংখ্যক চাকরিজীবীর অধিকাংশই ইংরেজ। সেখানে ভারতীয়দের সংখ্যা বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। এ ছাড়া সরকারি উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগের ঔচিত্য নিয়েও ইংরেজ মহলে রীতিমতো গবেষণা চলছিল। ভারত সরকারের এই নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, 'মন্ত্রী-অভিষেক'। ১৮৯০ সালের ১৫ মে তিনি এমারেল্ড থিয়েটারে নিজের লেখা প্রবন্ধ পাঠ করে এলেন। তিনি লিখলেন : 'গবর্মেন্টের দ্বারা মন্ত্রী নিয়োগ অপেক্ষা সাধারণ লোকের দ্বারা মন্ত্রী অভিষেক অনেক কারণে আমাদের নিকট প্রার্থনীয় মনে হয়।' স্পষ্টতই এখানে গণতন্ত্রের সুর ধ্বনিত হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে।
সিপাহি বিদ্রোহের পর প্রথম 'ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট' পাস হয় ১৮৬১ সালে। এর প্রায় ৩০ বছর পর ১৮৯২ সালে ভারতীয় ব্যবস্থা পরিষদের নয়া আইন সংশোধিত হয়। ভারতীয় রাজনীতিকদের দাবি ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের। সেসব তো পূরণ হলোই না, বরং তার ওপর পরিষদের কয়েকটি আসনের জন্য সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা-নীতি খুব সুনিপুণভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের প্রবেশের ওপর অনেক বাধা আরোপ করা হলো। শিলিং ও টাকার মানের মধ্যে কারচুপির কারণে ভারতীয়দের প্রচুর ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিল। রবীন্দ্রনাথ তখন 'ইংরেজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধ লিখে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। তিনি লিখলেন : 'য়ূরোপের নীতি কেবল য়ূরোপের জন্য। ভারতবর্ষীয়েরা এতই স্বতন্ত্র জাতি যে, সভ্যনীতি তাহাদের পক্ষে উপযোগী নহে।' এখানে শ্লেষ ও কটাক্ষ দুর্লক্ষ নয়।
বাংলা ভাষার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে রাজনীতি ছিল উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের মধ্যে আবদ্ধ। সভার সবকিছুই হতো ইংরেজিতে। ১৮৯৭ সালে নাটোরে কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মিলনীর বার্ষিক অধিবেশন। সেই সম্মেলনের সভাপতি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভিসের লোক। তিনি তাঁর ভাষণ যথানিয়মে ইংরেজিতে লিখেছিলেন। তরুণ রবীন্দ্রনাথ আরো কয়েকজন যুবক মিলে সভার সব কাজ বাংলায় পরিচালনার জন্য জোর দাবি তুলতে লাগলেন। কবি লিখেছেন : 'জগদীন্দ্রনাথের সাথে চক্রান্ত করে সভায় বাংলা ভাষা প্রবর্তন করার চেষ্টা যখন করি, তখন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (ড ঈ ইধহবৎলবব কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি) মহাশয় প্রভৃতি তৎসাময়িক রাষ্ট্রনেতারা আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে কঠোর বিদ্রূপ করেছিলেন।' কিন্তু তাতে তিনি বিন্দুমাত্র দমেননি। ঠিক করেছিলেন, স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ দিতে উঠে তিনি তাঁর মনের ঝাল ঝাড়বেন। কিন্তু আকস্মিক ভূমিকম্প সেই আয়োজন নষ্ট করে দেয়। বাংলা ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে তিনি সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। শিক্ষার প্রসার সংক্রান্ত এক আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেন : 'বঙ্গবিদ্যালয়ে দেশ ছাইয়া গিয়াছে, সেই সমুদয় শিক্ষা বাংলায় ব্যাপ্ত হইয়া পড়ুক। ইংরেজিতে শিক্ষা কখনোই দেশের সর্বত্র ছড়াইতে পারিবে না।' ২২ বছর বয়সের কথা তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রচার করেছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়েছিল। দেশচ্ছেদ প্রস্তাবের কিছু পূর্বে শিক্ষা প্রসারের অজুহাতে ইংরেজ সরকার বঙ্গদেশে ভাষা বিচ্ছেদের এক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন_পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ভাগ করে স্থানীয় কথ্য ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করে বিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো। এর প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন 'সফলতার সদুপায়'। শাসকদের অভিপ্রায় যেহেতু ছিল বঙ্গচ্ছেদ, সেহেতু ভাষা বিচ্ছেদের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল। এরপর ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে যে কমিশন গঠিত হয়েছিল, তার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার মাইকেল স্যাডলার। তিনি শান্তি নিকেতনও ঘুরে যান। শিক্ষা সম্পর্কে কবির মতামত জানতে চাইলে তিনি কমিশনের কাছে তাঁর মতামত লিখিতভাবে তুলে ধরেন : 'ইংরেজি ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষারূপে খুব ভালো করে শেখাতে হবে। কিন্তু স্কুল-কলেজ-য়ূনিভার্সিটি পর্যন্ত মাতৃভাষার আধারে সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখানো দরকার।'
দেশের রাজনীতি ঝোরালো হয়ে উঠল; সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বাড়তে লাগল। ব্রিটিশ সরকার ভারত রক্ষা আইন জারি করে প্রায় ১২০০ বাঙালি যুবককে আটক করল। হোমরুল লীগের স্থপতি অ্যানি বেসান্ট স্বরাজ লাভের আন্দোলন শুরু করলে মাদ্রাজ সরকার তাঁকে নজরবন্দি করলেন ১৯১৭ সালের ১৬ জুন। সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বেসান্টের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দিলেন রবীন্দ্রনাথ। 'কর্তার ইচ্ছায় কর্ম' শিরোনামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন।
১৯১৮ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত হলো ভারতের নতুন শাসনতন্ত্রের খসড়া। এই পরিকল্পনা প্রকাশের সঙ্গে প্রকাশিত হলো সিডিশন কমিটির প্রতিবেদন বা রাওলাট কমিটির রিপোর্ট। এতে গত কয়েক বছর ধরে চলে আসা বিপ্লব দমনে করণীয় বিষয় নিয়ে সুপারিশ ছিল। এই সুপারিশের ওপর সরকারি বিল এলো এবং ১৯১৯ সালে ১৩ এপ্রিল নববর্ষের দিনে জালিয়ানওয়ালাবাগে ঘটে গেল নৃশংস হত্যাকাণ্ড। কিন্তু দেড় মাস কেটে গেলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করল না। রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতন থেকে কলকাতায় এলেন। খ্যাতনামা নেতাদের দ্বারে দ্বারে গেলেন প্রতিবাদ করার দাবি নিয়ে। কিন্তু কেউ রাজি হলেন না। এমনকি রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়ও না। এরপর ২৯ মে ভাইসরয় চেমসফোর্ডকে উদ্দেশ করে লিখিত পত্রে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চার বছর আগে প্রদত্ত 'স্যার' উপাধি পরিত্যাগ করলেন। এরপর বালিকা রানুকে এক পত্রে লিখলেন,'...আমি বলেছি, বুকের মধ্যে অনেক ব্যথা জমে উঠেছিল, তারই ভার আমার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছে_তাই ঐ ভারের উপরে আমার উপাধির ভার আর বহন করতে পারছি নে।'
১৯২০-২১ সালে কবি বিদেশে থাকাকালে গান্ধীজীর ডাকে প্রথম অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এভাবে অসহযোগিতা করলে নাকি এক বছরের মধ্যেই স্বরাজ লাভ সম্ভব হবে। কবি দেশে ফিরে দেখলেন, শান্তি নিকেতনেও অসহযোগ আন্দোলনের একটা তোড়জোড় চলছে। যারা কস্মিনকালেও রাজনীতির ধারেকাছে ছিলেন না, সেসব শিক্ষক-ছাত্ররাই গান্ধীর আহ্বানে এক বছরের জন্য শিক্ষালয় বয়কট করার কথা ভাবছেন। রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজীর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। ১৯২১ সালের ১৫ আগস্ট ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে 'শিক্ষার মিলন' নামের একটি প্রবন্ধ লিখে গান্ধীজীর এই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করতে চাইলেন। কিন্তু স্বরাজ লাভের চিন্তায় উন্মত্ত ভারতের মানুষ তাঁর সেই কথায় কর্ণপাত করল না। তখন কবি আবার 'সত্যের আহ্বান' লিখলেন। সরাসরিই গান্ধীজীর পথকে বেঠিক বলে উল্লেখ করলেন। চরকা কাটা আর অসহযোগিতা করা নবযুগের সত্যের আহ্বান হতে পারে না। লিখলেন, 'স্বরাজ গড়ে তোলবার তত্ত্ব বহুবিস্তৃত, তার প্রণালী দুঃসাধ্য এবং কালসাধ্য। তথ্যানুসন্ধান ও বিচারবুদ্ধি চাই। তাতে যাঁরা অর্থশাস্ত্রবিৎ তাঁদের ভাবতে হবে, যন্ত্রতত্ত্ববিৎ তাঁদের খাটতে হবে, শিক্ষাতত্ত্ববিৎ রাষ্ট্রতত্ত্ববিৎ সকলকে ধ্যানে ও কর্মে লাগতে হবে_অর্থাৎ দেশের অন্তঃকরণকে সকল দিক দিয়ে পূর্ণ উদ্যমে জাগাতে হবে।' একটি জাতীয় পরিকল্পনার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
কলকাতায় ১৯২৫ সালে হঠাৎ করেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধে গেল মসজিদের সামনে বাজনা বাজানো নিয়ে। বিদেশি সরকার এ ব্যাপারে নিরপেক্ষতার ভান করে আর ক্লাবে বসে ভারতীয়দের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিণতি নিয়ে হাসি-তামাশা করে। এই দাঙ্গায় আতঙ্কগ্রস্ত মানুষদের দেখে কবি এক পত্রে লিখলেন : 'এই মোহমুগ্ধ ধর্মবিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভালো।... আজ মিছে ধর্মকে পুড়িয়ে ফেলে ভারত যদি খাঁটি ধর্ম, খাঁটি নাস্তিকতা পায়, তবে ভারত সত্যই নবজীবন লাভ করবে।' এর কয়েকদিন বাদে কবি তাঁর ধর্মমোহ কবিতাটিতে লিখেছেন_
ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।
১৯৩১ সালে ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ খবর পেলেন, লবণ আইন অমান্য করে গান্ধীজী ডান্ডি যাত্রা করেছেন। সরকারও পাল্টা গ্রেপ্তার অভিযান চালাল। এক মাসের মধ্যে গান্ধী ও নেহেরুসহ অনেক নেতাকে আটক করল। গান্ধীর সঙ্গে কবির যতই মতবিরোধ হোক না কেন, বাইরে কখনোই তিনি তা প্রকাশ করতেন না। এ ঘটনার প্রতিবাদে তিনি বিলেতের 'গার্ডিয়ান' ও 'স্পেকটেটর' পত্রিকায় পত্র লিখে তাঁর অহিংসার তত্ত্বই ব্যাখ্যা করলেন; এবং দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানালেন, তারা যেন বীরের ন্যায় আপনার ধর্ম রক্ষা করে এবং অত্যাচারের প্রতিবাদে কোনো অনাচার না করে।
১৯৩২ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডন গোলটেবিল বৈঠক থেকে ফেরার পর গান্ধীকে আবার গ্রেপ্তার করে পুনার জেরবাদা কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ডকে তারবার্তা পাঠিয়ে এর প্রতিবাদ জানালেন : 'মহাত্মাজীর গ্রেপ্তারের পর ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা আর কী করে ভারতীয়দের কাছ থেকে সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা আশা করতে পারেন।' অনেকের ধারণা, রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'মানী' কবিতাটি বড় লাটের উদ্দেশ্যে লিখে থাকবেন_
উচ্চপ্রাচীরে রুদ্ধ তোমার ক্ষুদ্র ভুবনখানি,
হে মানী, হে অভিমানী।
মন্দিরবাসী দেবতার মতো সম্মান শৃঙ্খলে
বন্দী রয়েছ পূজার আসনতলে।
সাধারণজন-পরশ এড়ায়ে নিজেরে পৃথক করি
আছ দিনরাত গৌরবগুরু কঠিন মূর্তি ধরি।
সবার সেখানে ঠাঁই
বিপুল তোমার মর্যাদা নিয়ে সেথায় প্রবেশ নাই।
অনেক উপাধি তব
মানুষ উপাধি হারায়েছ শুধু
সে ক্ষতি কাহারে কব।
বস্তুত রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদী সত্তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় কতখানি নিবিড়, সে বিষয়ে আমার নিজেরই যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 'গুরুদেব' হিসেবে সম্বোধন করে তাঁকে দেবতাসম যে উচ্চাসনে বসানো হয়েছে, অবশ্যই তিনি সেটার যোগ্য। কিন্তু সেই মর্যাদা কখনো তাঁকে মোহগ্রস্ত করতে পারেনি। তাহলে অনেক কিছুকেই তিনি 'একান্ত রাজনৈতিক বা অন্য বিষয়' বলে এড়িয়ে যেতে পারতেন; যেমন গেছেন অনেকেই। জনপ্রিয়তা বা ইমেজ ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে নিশ্চুপ থাকতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। যখনই প্র্রয়োজন হয়েছে, তাঁর লেখনির অমিত শক্তি সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় রাজনৈতিক অপশক্তি বা সামাজিক অনাচারকে আঘাত করেছে। তাতে সব সময় তিনি জয়ী হয়েছেন এমন নয়, তবে তাতে তাঁর চারিত্রিক সততা, দঢ়তা ও দেশপ্রেমের প্রমাণ মিলেছে।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কুড়িজন বন্ধুসহ রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের কাছে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন ১৮৪৩ সালে, অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৮ বছর আগে। আর কবির জন্মের দুই মাস পর ব্রাহ্মরীতি অনুযায়ী তাঁর ভগি্ন সুকুমারীর বিয়ে হয়। ১৮৭৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অপৌত্তলিক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন হয়, তিনি গায়ত্রীমন্ত্রে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এই ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শশধর তর্ক চূড়ামনি, চন্দ্রনাথ বসু প্রমুখের তীব্র বিরোধ ছিল। ১৮৮৪ সালে তাঁরা হিন্দুধর্মের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা বলে কতিপয় আজগুবি মতামত অর্ধশিক্ষিত লোকদের বুঝিয়েছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সমাজপ্রচলিত সমুদয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কার বিজ্ঞানসম্মত। বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ অজ্ঞেয়বাদী কোঁতের কল্যাণধর্মকে হিন্দুধর্মের আদর্শ বলে প্রচার করলে রবীন্দ্রনাথ তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। শুধু তা-ই নয়, সাময়িকপত্রের আসরে এ নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর প্রচুর কথা কাটাকাটি হয়। বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন_'রবীন্দ্রবাবু প্রতিভাশালী সুশিক্ষিত সুলেখক মহৎস্বভাব এবং বিশেষ প্রীতি, যত্ন এবং প্রশংসার পাত্র। বিশেষত তিনি তরুণবয়স্ক। যদি দুই-একটি কথা বেশি বলিয়া থাকেন, তাহা নীরবে শুনাই আমার কর্তব্য। তবে যে কয় পাতা লিখিলাম, তাহার কারণ রবির পিছনে এক বড় ছায়া দেখিতেছি।' এই ছায়া আর কিছু নয়, আদি ব্রাহ্মসমাজ।
ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে হিন্দুসমাজের দ্বন্দ্বের অনেক কারণ ছিল। প্রচলিত প্রথার অনেক কিছুই ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবে পাল্টে যাচ্ছিল। যেমন, ব্রাহ্মসমাজ নারীশিক্ষার পক্ষে ছিল, আর হিন্দুসমাজের সংরক্ষকরা আট বছরে গৌরীদানের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ 'হিন্দু বিবাহ' নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে মেয়েদের বাল্যবিবাহের বিপক্ষে এবং নারীশিক্ষার পক্ষে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেন।
১৮৯০ সালের ঘটনা। বড় লাটের অফিসে কর্মরত স্বল্পসংখ্যক চাকরিজীবীর অধিকাংশই ইংরেজ। সেখানে ভারতীয়দের সংখ্যা বাড়ানো যায় কি না, তা নিয়ে ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে দ্বিধা ছিল। এ ছাড়া সরকারি উচ্চপদে ভারতীয়দের নিয়োগের ঔচিত্য নিয়েও ইংরেজ মহলে রীতিমতো গবেষণা চলছিল। ভারত সরকারের এই নীতির প্রতিবাদ জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, 'মন্ত্রী-অভিষেক'। ১৮৯০ সালের ১৫ মে তিনি এমারেল্ড থিয়েটারে নিজের লেখা প্রবন্ধ পাঠ করে এলেন। তিনি লিখলেন : 'গবর্মেন্টের দ্বারা মন্ত্রী নিয়োগ অপেক্ষা সাধারণ লোকের দ্বারা মন্ত্রী অভিষেক অনেক কারণে আমাদের নিকট প্রার্থনীয় মনে হয়।' স্পষ্টতই এখানে গণতন্ত্রের সুর ধ্বনিত হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে।
সিপাহি বিদ্রোহের পর প্রথম 'ভারতীয় কাউন্সিল অ্যাক্ট' পাস হয় ১৮৬১ সালে। এর প্রায় ৩০ বছর পর ১৮৯২ সালে ভারতীয় ব্যবস্থা পরিষদের নয়া আইন সংশোধিত হয়। ভারতীয় রাজনীতিকদের দাবি ছিল প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের। সেসব তো পূরণ হলোই না, বরং তার ওপর পরিষদের কয়েকটি আসনের জন্য সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারা-নীতি খুব সুনিপুণভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সরকারি চাকরিতে ভারতীয়দের প্রবেশের ওপর অনেক বাধা আরোপ করা হলো। শিলিং ও টাকার মানের মধ্যে কারচুপির কারণে ভারতীয়দের প্রচুর ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিল। রবীন্দ্রনাথ তখন 'ইংরেজ ও ভারতবাসী' প্রবন্ধ লিখে তীব্র প্রতিবাদ জানালেন। তিনি লিখলেন : 'য়ূরোপের নীতি কেবল য়ূরোপের জন্য। ভারতবর্ষীয়েরা এতই স্বতন্ত্র জাতি যে, সভ্যনীতি তাহাদের পক্ষে উপযোগী নহে।' এখানে শ্লেষ ও কটাক্ষ দুর্লক্ষ নয়।
বাংলা ভাষার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে রাজনীতি ছিল উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সমাজের মধ্যে আবদ্ধ। সভার সবকিছুই হতো ইংরেজিতে। ১৮৯৭ সালে নাটোরে কংগ্রেসের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মিলনীর বার্ষিক অধিবেশন। সেই সম্মেলনের সভাপতি সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভিসের লোক। তিনি তাঁর ভাষণ যথানিয়মে ইংরেজিতে লিখেছিলেন। তরুণ রবীন্দ্রনাথ আরো কয়েকজন যুবক মিলে সভার সব কাজ বাংলায় পরিচালনার জন্য জোর দাবি তুলতে লাগলেন। কবি লিখেছেন : 'জগদীন্দ্রনাথের সাথে চক্রান্ত করে সভায় বাংলা ভাষা প্রবর্তন করার চেষ্টা যখন করি, তখন উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (ড ঈ ইধহবৎলবব কংগ্রেসের প্রথম সভাপতি) মহাশয় প্রভৃতি তৎসাময়িক রাষ্ট্রনেতারা আমার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে কঠোর বিদ্রূপ করেছিলেন।' কিন্তু তাতে তিনি বিন্দুমাত্র দমেননি। ঠিক করেছিলেন, স্বেচ্ছাসেবকদের ধন্যবাদ দিতে উঠে তিনি তাঁর মনের ঝাল ঝাড়বেন। কিন্তু আকস্মিক ভূমিকম্প সেই আয়োজন নষ্ট করে দেয়। বাংলা ভাষায় শিক্ষাদানের ব্যাপারে তিনি সব সময়ই সোচ্চার ছিলেন। শিক্ষার প্রসার সংক্রান্ত এক আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখেন : 'বঙ্গবিদ্যালয়ে দেশ ছাইয়া গিয়াছে, সেই সমুদয় শিক্ষা বাংলায় ব্যাপ্ত হইয়া পড়ুক। ইংরেজিতে শিক্ষা কখনোই দেশের সর্বত্র ছড়াইতে পারিবে না।' ২২ বছর বয়সের কথা তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত প্রচার করেছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশ বিভক্ত হয়েছিল। দেশচ্ছেদ প্রস্তাবের কিছু পূর্বে শিক্ষা প্রসারের অজুহাতে ইংরেজ সরকার বঙ্গদেশে ভাষা বিচ্ছেদের এক প্রস্তাব পেশ করেছিলেন_পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ভাগ করে স্থানীয় কথ্য ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করে বিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো। এর প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন 'সফলতার সদুপায়'। শাসকদের অভিপ্রায় যেহেতু ছিল বঙ্গচ্ছেদ, সেহেতু ভাষা বিচ্ছেদের প্রসঙ্গ চাপা পড়ে গেল। এরপর ১৯১৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে যে কমিশন গঠিত হয়েছিল, তার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার মাইকেল স্যাডলার। তিনি শান্তি নিকেতনও ঘুরে যান। শিক্ষা সম্পর্কে কবির মতামত জানতে চাইলে তিনি কমিশনের কাছে তাঁর মতামত লিখিতভাবে তুলে ধরেন : 'ইংরেজি ভাষাকে দ্বিতীয় ভাষারূপে খুব ভালো করে শেখাতে হবে। কিন্তু স্কুল-কলেজ-য়ূনিভার্সিটি পর্যন্ত মাতৃভাষার আধারে সমস্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান শেখানো দরকার।'
দেশের রাজনীতি ঝোরালো হয়ে উঠল; সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বাড়তে লাগল। ব্রিটিশ সরকার ভারত রক্ষা আইন জারি করে প্রায় ১২০০ বাঙালি যুবককে আটক করল। হোমরুল লীগের স্থপতি অ্যানি বেসান্ট স্বরাজ লাভের আন্দোলন শুরু করলে মাদ্রাজ সরকার তাঁকে নজরবন্দি করলেন ১৯১৭ সালের ১৬ জুন। সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বেসান্টের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে পত্রিকায় বিবৃতি দিলেন রবীন্দ্রনাথ। 'কর্তার ইচ্ছায় কর্ম' শিরোনামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন।
১৯১৮ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত হলো ভারতের নতুন শাসনতন্ত্রের খসড়া। এই পরিকল্পনা প্রকাশের সঙ্গে প্রকাশিত হলো সিডিশন কমিটির প্রতিবেদন বা রাওলাট কমিটির রিপোর্ট। এতে গত কয়েক বছর ধরে চলে আসা বিপ্লব দমনে করণীয় বিষয় নিয়ে সুপারিশ ছিল। এই সুপারিশের ওপর সরকারি বিল এলো এবং ১৯১৯ সালে ১৩ এপ্রিল নববর্ষের দিনে জালিয়ানওয়ালাবাগে ঘটে গেল নৃশংস হত্যাকাণ্ড। কিন্তু দেড় মাস কেটে গেলেও কেউ কোনো প্রতিবাদ করল না। রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতন থেকে কলকাতায় এলেন। খ্যাতনামা নেতাদের দ্বারে দ্বারে গেলেন প্রতিবাদ করার দাবি নিয়ে। কিন্তু কেউ রাজি হলেন না। এমনকি রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়ও না। এরপর ২৯ মে ভাইসরয় চেমসফোর্ডকে উদ্দেশ করে লিখিত পত্রে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চার বছর আগে প্রদত্ত 'স্যার' উপাধি পরিত্যাগ করলেন। এরপর বালিকা রানুকে এক পত্রে লিখলেন,'...আমি বলেছি, বুকের মধ্যে অনেক ব্যথা জমে উঠেছিল, তারই ভার আমার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছে_তাই ঐ ভারের উপরে আমার উপাধির ভার আর বহন করতে পারছি নে।'
১৯২০-২১ সালে কবি বিদেশে থাকাকালে গান্ধীজীর ডাকে প্রথম অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। এভাবে অসহযোগিতা করলে নাকি এক বছরের মধ্যেই স্বরাজ লাভ সম্ভব হবে। কবি দেশে ফিরে দেখলেন, শান্তি নিকেতনেও অসহযোগ আন্দোলনের একটা তোড়জোড় চলছে। যারা কস্মিনকালেও রাজনীতির ধারেকাছে ছিলেন না, সেসব শিক্ষক-ছাত্ররাই গান্ধীর আহ্বানে এক বছরের জন্য শিক্ষালয় বয়কট করার কথা ভাবছেন। রবীন্দ্রনাথ গান্ধীজীর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। ১৯২১ সালের ১৫ আগস্ট ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে 'শিক্ষার মিলন' নামের একটি প্রবন্ধ লিখে গান্ধীজীর এই সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করতে চাইলেন। কিন্তু স্বরাজ লাভের চিন্তায় উন্মত্ত ভারতের মানুষ তাঁর সেই কথায় কর্ণপাত করল না। তখন কবি আবার 'সত্যের আহ্বান' লিখলেন। সরাসরিই গান্ধীজীর পথকে বেঠিক বলে উল্লেখ করলেন। চরকা কাটা আর অসহযোগিতা করা নবযুগের সত্যের আহ্বান হতে পারে না। লিখলেন, 'স্বরাজ গড়ে তোলবার তত্ত্ব বহুবিস্তৃত, তার প্রণালী দুঃসাধ্য এবং কালসাধ্য। তথ্যানুসন্ধান ও বিচারবুদ্ধি চাই। তাতে যাঁরা অর্থশাস্ত্রবিৎ তাঁদের ভাবতে হবে, যন্ত্রতত্ত্ববিৎ তাঁদের খাটতে হবে, শিক্ষাতত্ত্ববিৎ রাষ্ট্রতত্ত্ববিৎ সকলকে ধ্যানে ও কর্মে লাগতে হবে_অর্থাৎ দেশের অন্তঃকরণকে সকল দিক দিয়ে পূর্ণ উদ্যমে জাগাতে হবে।' একটি জাতীয় পরিকল্পনার ওপর তিনি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
কলকাতায় ১৯২৫ সালে হঠাৎ করেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা বেঁধে গেল মসজিদের সামনে বাজনা বাজানো নিয়ে। বিদেশি সরকার এ ব্যাপারে নিরপেক্ষতার ভান করে আর ক্লাবে বসে ভারতীয়দের স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিণতি নিয়ে হাসি-তামাশা করে। এই দাঙ্গায় আতঙ্কগ্রস্ত মানুষদের দেখে কবি এক পত্রে লিখলেন : 'এই মোহমুগ্ধ ধর্মবিভীষিকার চেয়ে সোজাসুজি নাস্তিকতা অনেক ভালো।... আজ মিছে ধর্মকে পুড়িয়ে ফেলে ভারত যদি খাঁটি ধর্ম, খাঁটি নাস্তিকতা পায়, তবে ভারত সত্যই নবজীবন লাভ করবে।' এর কয়েকদিন বাদে কবি তাঁর ধর্মমোহ কবিতাটিতে লিখেছেন_
ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,
ধার্মিকতার করে না আড়ম্বর।
১৯৩১ সালে ইংল্যান্ডে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথ খবর পেলেন, লবণ আইন অমান্য করে গান্ধীজী ডান্ডি যাত্রা করেছেন। সরকারও পাল্টা গ্রেপ্তার অভিযান চালাল। এক মাসের মধ্যে গান্ধী ও নেহেরুসহ অনেক নেতাকে আটক করল। গান্ধীর সঙ্গে কবির যতই মতবিরোধ হোক না কেন, বাইরে কখনোই তিনি তা প্রকাশ করতেন না। এ ঘটনার প্রতিবাদে তিনি বিলেতের 'গার্ডিয়ান' ও 'স্পেকটেটর' পত্রিকায় পত্র লিখে তাঁর অহিংসার তত্ত্বই ব্যাখ্যা করলেন; এবং দেশের মানুষের প্রতি আহ্বান জানালেন, তারা যেন বীরের ন্যায় আপনার ধর্ম রক্ষা করে এবং অত্যাচারের প্রতিবাদে কোনো অনাচার না করে।
১৯৩২ সালের ৪ জানুয়ারি লন্ডন গোলটেবিল বৈঠক থেকে ফেরার পর গান্ধীকে আবার গ্রেপ্তার করে পুনার জেরবাদা কারাগারে অন্তরীণ রাখা হয়। রবীন্দ্রনাথ তখন লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী রামসে ম্যাকডোনাল্ডকে তারবার্তা পাঠিয়ে এর প্রতিবাদ জানালেন : 'মহাত্মাজীর গ্রেপ্তারের পর ব্রিটিশ প্রতিনিধিরা আর কী করে ভারতীয়দের কাছ থেকে সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের সম্ভাবনা আশা করতে পারেন।' অনেকের ধারণা, রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'মানী' কবিতাটি বড় লাটের উদ্দেশ্যে লিখে থাকবেন_
উচ্চপ্রাচীরে রুদ্ধ তোমার ক্ষুদ্র ভুবনখানি,
হে মানী, হে অভিমানী।
মন্দিরবাসী দেবতার মতো সম্মান শৃঙ্খলে
বন্দী রয়েছ পূজার আসনতলে।
সাধারণজন-পরশ এড়ায়ে নিজেরে পৃথক করি
আছ দিনরাত গৌরবগুরু কঠিন মূর্তি ধরি।
সবার সেখানে ঠাঁই
বিপুল তোমার মর্যাদা নিয়ে সেথায় প্রবেশ নাই।
অনেক উপাধি তব
মানুষ উপাধি হারায়েছ শুধু
সে ক্ষতি কাহারে কব।
বস্তুত রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদী সত্তার সঙ্গে আমাদের পরিচয় কতখানি নিবিড়, সে বিষয়ে আমার নিজেরই যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। 'গুরুদেব' হিসেবে সম্বোধন করে তাঁকে দেবতাসম যে উচ্চাসনে বসানো হয়েছে, অবশ্যই তিনি সেটার যোগ্য। কিন্তু সেই মর্যাদা কখনো তাঁকে মোহগ্রস্ত করতে পারেনি। তাহলে অনেক কিছুকেই তিনি 'একান্ত রাজনৈতিক বা অন্য বিষয়' বলে এড়িয়ে যেতে পারতেন; যেমন গেছেন অনেকেই। জনপ্রিয়তা বা ইমেজ ক্ষুণ্ন হওয়ার ভয়ে নিশ্চুপ থাকতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। যখনই প্র্রয়োজন হয়েছে, তাঁর লেখনির অমিত শক্তি সাম্রাজ্যবাদ, দেশীয় রাজনৈতিক অপশক্তি বা সামাজিক অনাচারকে আঘাত করেছে। তাতে সব সময় তিনি জয়ী হয়েছেন এমন নয়, তবে তাতে তাঁর চারিত্রিক সততা, দঢ়তা ও দেশপ্রেমের প্রমাণ মিলেছে।
সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন, উপদেষ্টা সম্পাদক : অমিত হাবিব, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com








