ঢাকা, শুক্রবার ৪ মে ২০১২, ২১ বৈশাখ ১৪১৯, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৩৩
¦
« পূর্ববর্তী সংবাদ
প্রচ্ছদ রচনাবাঙালির দ্বিধা ও রবীন্দ্রনাথখোন্দকার আশরাফ হোসেন
বাঙালি জাতির নৃতাত্তি্বক বৈশিষ্ট্যের মধ্যেই এক ধরনের বৈপরীত্য আছে বলে মনে হয়। বিবিধতা বাঙালির স্বভাবগত; তার চেহারায়, চলনে-বলনে, ভাষিক আচরণে ও সোহবতে বাঙালি কখনো এক রকম নয়। একজন পাঞ্জাবিকে চেনা যায় তার আর্যনরগোষ্ঠীসুলভ উন্নতনাসা, গৌরবর্ণ ও দীর্ঘাঙ্গতার নিরিখে; একজন পাঠান স্বতঃপ্রমাণিত তার উচ্চম্মন্যতা ও জিগীষায়; ইউরোপীয় নর্ডিক জনগোষ্ঠীর রক্তের ভেতরকার লোলুপতা ও দার্ঢ্য শতসভ্যতার পালিশেও পুরোপুরি ঢাকা পড়েনি; অ্যাংলো-স্যাঙ্নদের স্বভাবগত স্বল্পবাকতা ভূমধ্যসাগরীয়দের উচ্ছল প্রগলভতা থেকে দর্শনীয়ভাবে পৃথক। কিন্তু বাঙালিকে এক শব্দে ধারণ করা মুশকিল; তাকে পিনচিহ্নিত করা সমাজবিজ্ঞানী-নৃতাত্তি্বকের নাইটমেয়ার। যেকোনো যুগ্মবৈপরীত্য (binary opposition) যথা উদার/অনুদার; উচ্চম্মন্য/হীনম্মন্য; বীর/কাপুরুষ; ক্ষুদ্রস্বার্থপর/ত্যাগী-আলট্রুয়িস্ট; সাগরসন্ধানী/ বিবরবাসী; দীর্ঘাঙ্গ/খর্বুটে; গৌরবর্ণ/কপিশ; প্রতিহিংসাপরায়ণ/ক্ষমাসুশীল; কুঁদুলে/নিরীহ; ধর্মপরায়ণ/ধর্মশীতল; সাম্প্রদায়িক/মানবতন্ত্রী_পুরোপুরি খেটে যায় বাঙালির বেলায়। বস্তুত বাঙালি কী নয় এবং কী, তার অনুসন্ধান একজন সন্ধিৎসুকে কানাওলার মতো ঘুরিয়ে মারতে পারে অনন্তকাল। বহু বৈপরীত্যের গোপন সংগমে তুষ্ট বাঙালির মন; তার বহু বছরের সাধনার ধনও যুগল-বৈপরীত্যের দ্বিমুখী টানাপড়েনে প্রায়ই টলটলায়মান হয়ে ওঠে।
বাঙালি হওয়াটা শুরুতে শ্লাঘার বস্তু ছিল না_এ রকম ইঙ্গিত নাকি বাঙালির আদিকাব্য চর্যাগীতিতে প্রাপ্য_'ভুসুকু তুই বঙালি ভইলি', এই উচ্চারণ আত্মপ্রশংসার নয়, অনুশোচনার। বস্তুত বাঙালিকে বাঙালি হয়ে ওঠার সংগ্রাম করতে হয়েছে নিরন্তর; তারও চেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে বাঙালি হয়ে থাকার; এবং এই দ্বিবিধ সংগ্রামেও বাঙালি হয়েছে দ্বিধাভক্ত, নিজের সঙ্গেই নিজে যুধ্যমান কখনো, কখনো পরাজিত নিজের কাছেই। সেই সংগ্রাম আজও যে চলছে, চারদিকে তাকালে তা টের পাই। বাতাসে ভেসে আসে এক অনতিভবিষ্যতের অজাত সম্ভাবনার আশঙ্কায় গীত এক ধরনের আগাম অনুশোচনা_বাঙালি না থাকার : 'একদিন বাঙালি ছিলাম রে'। বাঙালির যৌথ-নির্জ্ঞানে এই ভীতিটি চিরকালই ছিল বলে ধারণা করি। বাংলা ভাষার যে হাজার বছরের ইতিহাসের কথা বলা হয়, তার মধ্যে বাঙালির নিজস্ব পরিচয়-অনুসন্ধানের পর্বটা খুব দীর্ঘ মনে হয় না। ইংরেজের এ দেশে আগমন, কথিত বঙ্গীয় রেনেসাঁর আলোক-উদ্ভাস এবং ইংরেজি শিক্ষার বিস্তারের আগে বাঙালির আত্মপরিচয় সন্ধানটি তীব্র হয়ে ওঠেনি। কৌতুককর যে, ওই এক হাজার বছরের ইতিহাস বঙ্গে তুর্কি মুসলমানদের প্রবাদপ্রতিম ঝোড়ো-প্রবেশের প্রায় সমস্থানীয়। এর আগে ভারতীয় সমাজে বঙ্গীয় অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বাতন্ত্র্যসূচক তেমন কিছু ছিল না। জায়মান বাঙালি-কৌমে প্রথম দ্বিঘাত সমীকরণটি এনে দেয় হিন্দু-মুসলমান তথা তুর্কি-বঙ্গীয় এই যুগ্ম-বৈপরীত্যটি এবং এ দুই ভিন্ন সংস্কৃতির ডাবলপিস্টন-ঘূর্ণনে তুঙ্গ হয়ে ওঠে বাঙালি মানসের অভ্যন্তরীণ মন্থনপ্রক্রিয়া। সেই থেকে কি ভাষায় কি সাহিত্যে এক পরাক্রান্ত দ্বিমুখী উন্মন্থন চলছে এবং যেহেতু দ্বিঘাতবিরুদ্ধতাই প্রগতির চালিকা, বাঙালির মানস তীব্রগতিতে এগিয়েছে সামনের দিকে। বাঙালির সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের কালসন্ধি ওই দ্বাদশ শতক, যখন বখতিয়ারাশ্ব খুরের আঘাতে উড়িয়েছিল গৌড়ের পাটলবর্ণ ধূলি। সেই থেকে আবর্তিত বাঙালির দ্বৈরথমানসের চাকা; শিল্পসাহিত্যে, রাজনীতি-সংস্কৃতিতে সর্বত্র সে ছুরির ফলার মতো, শীর্ষে এক, ধারে দুই; 'হিন্দু না মুসলিম'_এই জিজ্ঞাসায় মোহ্যমান; শতবার মিলিত হতে গিয়েও রূপকথার রাজকন্যা-রাজকুমারের মতো শয্যায় বিদ্ধ তরবারির অলঙ্ঘনীয় বিরুদ্ধতায় বিহ্বল ও ব্যর্থ।
সুলতানি আমলে বিকশিত হয়েছে বাংলা ভাষা। তৎসম-তদ্ভব শব্দভাণ্ডারের সঙ্গে এসে মিশেছে তুর্কি-আরবি শব্দাবলি। বাঙালির প্রকাশক্ষমতা পেয়েছে পরিসর এবং 'যাবনী মিশাল' ভাষার উত্থানে সৃষ্ট হয়েছে এক ভাষিক দ্বৈরথ, যা আবার দ্বিধাভক্ত করেছে বাঙালি মানসকে। একদল নিজেদের ধর্মপরিচয়ের সূত্র ধরে আত্যন্তিক সংরক্ষণশীলতায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে_নদীয়ার নিমাইয়ের ঊর্ধ্ববাহু যতই সংকীর্তনে উৎক্ষিপ্ত হয়েছে, ততই তথাকথিত প্রেমের নদী সম্প্রদায়বিশেষের চোরাখালে প্রবেশ করে হয়েছে রুদ্ধগতি। অন্যদিকে অন্য দল বহুকাল পূর্বে ফেলে আসা ইরান-তুরানকে পিতৃভূমি ভেবে মশগুল হতে চেয়েছে খর্জুরবীথির স্বপ্নবিলাসে; প্রকাশের ভাষা হিসেবে অবলম্বন করতে চেয়েছে অবিমিশ্র বৈদেশিকী ভাষা। এদের লক্ষ্য করে মধ্যযুগের বাঙালি কবিকে উচ্চারণ করতে হয়েছে সেই অমর ধিক্কার; 'যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি'। বস্তুত রোমান দেবতা জেনাসের মতো বাঙালির দুটি মুখ এবং দুদিকে ফেরানো। রোম নগরীতে জেনাসের মন্দিরটি ছিল পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা; সেখানে দুটি দরজা, দুই দরজার মাঝখানে তাঁর মূর্তি। মূর্তিটির দুটি মুখ : একটি তরুণ, একটি বৃদ্ধ। বাঙালির দ্বিমুখ-মূর্তি কষ্টকল্পিত নয়। একান্তভাবে বাঙালির দেবী কালী; ডান হাতে তাঁর 'খৰ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কারহণ/দুই নয়নে স্নেহের রাশি, ললাট নিত্য অগি্নবরণ'। বাঙালি রবীন্দ্রনাথের দেশমাতৃকা-কল্পনা এই দ্বিধাকে মহিমান্বিত করলেও এর আয়রনিসঞ্জাত অর্থকে অস্বীকার করা যায় না। বাঙালি দ্রোহে উদ্দীপ্ত হয় তাড়াতাড়ি, বাঙালির মন সোডার বোতলের মতো_নিত্য উত্তেজনার বিষবাষ্পে ফেনায়িত হতে সময় নেয় না, আবার নেতিয়ে পড়ে খুব শিগগির; তখন তাকে দেখে মনে হয় না কিয়ৎকাল আগেই সে সাগরের চলোর্মিকে পায়ে বেঁধেছিল। চিকিৎসাবিজ্ঞানে মনোবিকলনের, সিজোফ্রেনিয়ার যে বর্ণনা, তার সঙ্গে মিলে যায় বাঙালির স্বভাব। হ্যামলেটের মতো 'to be or not to be that is the question'-এর দোলাচলে দোলায়িত হলেও পরক্ষণে তরবারি হাতে সে দাঁড়িয়ে যেতে পারে 'to oppose the sea of troubles.' ওথেলো যেমন বলেছিল, সে সহজে ঈর্ষান্বিত হওয়ার লোক নয়, কিন্তু একবার ওই আবেগ জাগ্রত হলে তা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়, পন্টিক সাগর থেকে প্রপন্টিক তথা হেলেস্পন্ট প্রণালির দিকে গর্জমান উত্তাল ঢেউ যেন। সিজোফ্রেনিয়ার রোগীর স্বভাবে দেখা যায় এমন দ্বিরাচার_এই মুহূর্তে সে উদ্দীপিত, কর্মমুখর, অগ্রণী ও অনিরুদ্ধ; পরমুহূর্তেই শ্লথ, নীরব, নিস্পন্দ ও হতাশ। বাঙালির ইতিহাসে তার সগৌরব উত্থান ও নির্বিঘ্ন পতনের ক্রমাবর্তন সে ধরনের ইঙ্গিত দেয় বলেই ধারণা করি।
বাঙালি ঐক্যের সাধনা করেছে বিভেদের সম্ভাবনা ও বাস্তবতাকে মান্য করেই। বাংলার আউল-বাউল-ফকিরদের সাধনা ছিল ভক্তি দিয়ে বিভক্তিকে নিরসন করার। তাদের আরাধ্য যে 'প্রভু নিরঞ্জন', তার ভেতরে মিলিয়ে যায় সকল বৈপরীত্য, ধর্ম-বর্ণ-শাস্ত্র-আচারের সকল ভেদ। বাউলের ভেদ-কথা এই অভেদতত্ত্বেরই মূলস্বরূপ। বাড়ির কাছে বসত করে যে পড়শি, তাকে সে দেখে না, কিন্তু অনুভব করে তার উপস্থিতি। 'সে আর লালন এক ঘরে রয়/তবু লক্ষ যোজন পারে' একটি আক্ষেপ, একটি স্বীকৃতি সেই মৌলিক প্যারাডঙ্রে। তবু খাঁচার ভেতরে পাখিটি তো নিত্য আসে যায়, সে কি আর অচিন থাকতে পারে? ভক্তির আন্দোলনে বাঙালি মিশিয়ে নিতে চেয়েছে তার অন্তর্গত বিভেদকে, কিন্তু কালে বোঝা গেছে সে সাধনা হয়েছে ব্যর্থ। তবু বাঙালি কখনো দুই জাতি ছিল না, কখনো হবে না দুই জাতি : সে দ্বিধাবিভক্ত জাতি, বহু অর্থে দ্বিধান্বিত জাতি, যদিও তার সংগ্রাম চলছে দ্বিধাহীন হওয়ার। ঐক্যবদ্ধ এবং দ্বিধাহীন বাঙালিত্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, নজরুল ইসলাম_রবীন্দ্রনাথও। শেষোক্তজন মিলিত ভারতবর্ষের মহামানবের সাগরতীরের ঊর্মিমুখরতার মধ্যে বাঙালির মিলিত কণ্ঠস্বরটি মেলাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেই রকম বিশাল ঐক্য অধরাই থেকে গেছে।

বাঙালির দ্বিধার অন্যতম প্রদর্শ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর জাতীয়তাবাদ-বিরোধিতা বিখ্যাত হয়ে আছে তাঁর নানা প্রবন্ধে ও ভাষণে। ন্যাশনালিজমকে তিনি চিহ্নিত করেছেন মানবতার শত্রু হিসেবে। তাঁর আদর্শবাদী মেটাফিজিঙ্ ও মানববাদী বৈশ্বিকতার সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ছিল প্রতিলোম-সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথ জাতির সংজ্ঞা দিয়েছিলেন এভাবে: 'The political and economic union of a people...in that aspect which a whole population assumes when organied for a mechanical purpose.' (Tagore' Nationalism 15). এই 'mechanical purpose' কথাটির অন্তর্নিহিত প্রায়োগিকতা ও ইহত্ব-ই সম্ভবত সব অধ্যাত্মবাদীর চক্ষুশূল : ধর্মপ্রচারক কিংবা আদর্শবাদী দার্শনিক, সবাই 'রাষ্ট্র' এবং জাতীয়তাবাদকে তাঁদের বিশ্ববোধক কল্পস্বর্গীয় চিন্তার শত্রু ভেবেছেন। স্মর্তব্য, ইসলাম বস্তুত রাষ্ট্রতন্ত্র ও ভৌগোলিক জাতীয়তাকে পরিত্যাজ্য ভাবে, যেমন ভেবেছেন নিটশে কিংবা রাসেলের মতো মানবজাতির স্বঘোষিত উদ্ধারকামীরা। রবীন্দ্রনাথও এঁদেরই দলে : তিনি স্বদেশের 'পায়ে ঠেকাই মাথা' গেয়েছেন এ কারণে যে, 'তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা'। নিটশের হুনবৎসধহহ অর্থাৎ অতিমানবের ধারণার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের 'ভালো ইংরেজ'-বন্দনার কিছুটা মিল দেখা যেতে পারে। নিটশে ভেবেছিলের 'ভালো ইউরোপীয়'-র কথা : তাঁর মতে ভালো ইউরোপীয় হবে এমন মানুষ যে আধুনিক জাতি-রাষ্ট্রের আত্মা-চেপে-ধরা আনুগত্যের দাবি থেকে ঊধর্ে্ব উঠে ভৌগোলিক সীমানাভেদী এক-ইউরোপীয় অস্তিত্বকে মূল্যবান মনে করবে। রবীন্দ্রনাথের কল্পনাও ছিল বিশ্বমানবের, যে তার স্থানীয়, দৈশিক ও ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও এক বহুবাচনিক বিশ্বনাগরিকতার অংশ হতে পারবে। 'মাথায় খাটো বহরে বড়ো' বাঙালির জন্য তাঁর বিশেষ আবেগতাড়িত ভালোবাসা ছিল না। কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথই বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ছিলেন স্বাজাত্যবাদী ন্যাশনালিস্ট। বাংলাভাগের কথা বেশ কিছুদিন আগে থেকে শোনা গেলেও প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত; আন্দোলন শুরু হওয়ার বৎসরাধিককাল পরে তিনি এতে যোগ দেন, কিন্তু তখনও তাঁর দ্বিধা দূর হয়নি। বাঙালির জাতীয়তাবাদী উচ্ছ্বাস দুদিনে প্রশমিত হয়ে যেতে পারে বলে তাঁর আশঙ্কা ছিল, তবে তিনি বোধ করেছিলেন যে, জাতি হিসেবে বাঙালির কিছু আইকনিক অভিজ্ঞান থাকা প্রয়োজন। সে জন্যই যোগ দেন স্বদেশি মেলায়, চালু করেন রাখীবন্ধনের রিচুয়্যাল। ২৫ আগস্ট ১৯০৫ কলকাতার টাউন হলে 'অবস্থা ও ব্যবস্থা' নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন তিনি। (পরে এটি বঙ্গদর্শনে মুদ্রিত হয়।) রবীন্দ্রনাথ একটি অশ্রুতপূর্ব প্রস্তাব করেন এখানে_বঙ্গভঙ্গ এবং তৎপরবর্তী স্বদেশি আন্দোলনে একাধিপত্য ছিল হিন্দু জনগণের, সেখানে রবীন্দ্রনাথ প্রস্তাব করলেন একটি জাতীয় সরকারের, যার অধিনায়ক থাকবে দুইজন : 'দেশের কর্মশক্তিকে একটি বিশেষ কর্তৃসভার মধ্যে বদ্ধ করিতে হইবে। অন্তত একজন হিন্দু ও একজন মুসলমানকে আমরা এই সভার অধিনায়ক করিব_তাঁহাদের নিকট নিজেকে সম্পূর্ণ অধীন, সম্পূর্ণ নত করিয়া রাখিব; তাঁহাদিগকে কর দান করিব; তাঁহাদের আদেশ পালন করিব; নির্বিচারে তাঁহাদের শাসন মানিয়া চলিব; তাঁহাদিগকে সম্মান করিয়া আমাদের দেশকে সম্মানিত করিব।' বলাবাহুল্য এ প্রস্তাব উপহসিত হয়েছিল। বাঙালির মিলনচিন্তায় ভৌগোলিক অখণ্ডতার চিন্তাই ছিল মহামহিম; সম্প্রদায়গত মিলনের চিন্তা প্রবল ছিল না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে দুই সম্প্রদায়ের ঐক্য নিয়ে ভাবিত ছিলেন, সে-সংবাদটি আমাদের তৃপ্ত করে। ১৯০৭ সালে পাবনা প্রাদেশিক সম্মিলনীতে দেওয়া সভাপতির ভাষণে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেছিলেন, 'এদিকে একটা প্রকাণ্ড বিচ্ছেদের খড়গ দেশের মাথার উপর ঝুলিতেছে। কত শত বৎসর হইয়া গেল, আমরা হিন্দু ও মুসলমান একই দেশমাতার দুই জানুর উপরে বসিয়া একই স্নেহ উপভোগ করিয়াছি, তথাপি আজও আমাদের মিলনে বিঘ্ন ঘটিতেছে। এই দুর্বলতার কারণ যত দিন আছে তত দিন আমাদের দেশের কোনো মহৎ আশাকে সম্পূর্ণ সফল করা সম্ভব হইবে না; আমাদের সব রাষ্ট্রীয় কর্তব্য পালনই পদে পদে দুরূহ হইতে থাকিবে।... যাহা হউক, হিন্দু ও মুসলমান, ভারতবর্ষের এই দুই প্রধানভাগকে এক রাষ্ট্রসম্মিলনের বাঁধিবার জন্য যে ত্যাগ, যে সহিষ্ণুতা, যে সতর্কতা ও আত্মদান আবশ্যক তাহা আমাদিগকে অবলম্বন করিতে হইবে। এই প্রকাণ্ড কর্মঋণই যখন আমাদের পক্ষে যখন যথেষ্ট তখন, দোহাই সুবুদ্ধির, দোহাই ধর্মের, প্রাণধর্মের নিয়মে দেশে যে নূতন নূতন দল উঠিবে তাহারা প্রত্যেকেই এক-একটি বিরোধরূপে উঠিয়া যেন দেশকে বহুভাগে বিদীর্ণ করিতে না থাকে; তাহারা যেন তরুকাণ্ডের উপর নব নব সতেজ শাখার মতো উঠিয়া দেশের রাষ্ট্রীয় চিত্তকে পরিণতিদান করিতে থাকে।' রবীন্দ্রনাথ 'এক রাষ্ট্রসম্মিলনী' বলতে বুঝিয়েছিলেন কংগ্রেসকে, আর 'নূতন নূতন দল' বলতে উগ্রপন্থী, সন্ত্রাসবাদীদের বিভিন্ন দলের কথা বুঝিয়েছিলেন। মুসলমানরা যে-ইতিমধ্যে (১৯০৬) মুসলিম লীগ নামক সম্প্রদায়গত দল গড়ে তুলে বঙ্গবিভাগের সপক্ষে আন্দোলন শুরু করেছে, রবীন্দ্রনাথ তাকে আমলে আনেননি। তিনি তখনও বাঙালির ঐক্য সম্পর্কে নিঃসন্দেহ, এমনকি উচ্ছ্বসিত : 'বাংলাকে যেমনি দুইখানা করিবার হুকুম হইল অমনি পূর্ব হইতে পশ্চিমে একটিমাত্র ধ্বনি জাগিয়া উঠিল_আমরা যে বাঙালি, আমরা যে এক! বাঙালি কখন যে বাঙালির এতই কাছে আসিয়া পড়িয়াছে, রক্তের নাড়ি কখন বাংলার সকল অঙ্গকেই এমন করিয়া এক চেতনার বন্ধনে বাঁধিয়া তুলিয়াছে, তাহা তো পূর্বে আমরা এমন স্পষ্ট করিয়া বুঝিতে পারি নাই।' বলাবাহুল্য 'এই বুঝিতে পারা'র মধ্যে যে প্রকাণ্ড একটি ফাঁকি ছিল, রবীন্দ্রনাথ তা তখন বুঝতে পারেননি, হিন্দু বাঙালিরাও সাতচলি্লশের আগে বুঝতে পারলেও স্বীকার করেননি। জোড়াতালির ঐক্য পঞ্চম জর্জের হাত দিয়ে দিলি্লর দরবারে সাধিত হলেও তা ছিল জোড়াতালিই। রবীন্দ্রনাথও সম্ভবত অনতিকালের মধ্যে ব্যাপারটি বুঝেছিলেন এবং রাজনীতি থেকে মনকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ সম্পর্কেও ছিলেন দ্বিধাগ্রস্ত : ইংরেজকে তিনি কেবলই উপনিবেশী শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে রাজী হননি। তাঁর কৈশোর-যৌবনের দুইবার ইংল্যান্ড ভ্রমণ, ঠাকুরবাড়িতে ইংরেজাদি ইউরোপীয়দের সাহচর্য, সর্বোপরি তাঁর বিশ্বপরিব্রাজক মন তাঁকে 'সংকীর্ণ' জাতীয়তাবাদের বিদেশি খেদাও আন্দোলনের শামিল হতে দেয়নি। বিদেশি পাদুকা ও বস্ত্র বিতাড়নে অবশ্য তাঁর অনুমতি ছিল। রবীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত 'বড়ো ইংরাজ' এবং 'ছোটো ইংরাজ' বিভেদায়ন এ পর্যায়ে স্মরণযোগ্য। সেইসঙ্গে তাঁর বাস্তববুদ্ধি ও কাঙালিপনার দ্বৈরথ: 'ইংরেজের যাহা-কিছু শ্রেষ্ঠ, ইংরেজ তাহা যে সম্পূর্ণভাবে ভারতবর্ষে প্রকাশ করিতে পারিতেছে না, সে জন্য আমরা দায়ী আছি। আমাদের দৈন্য ঘুচাইলে তবেই তাহাদেরও কৃপণতা ঘুচিবে। বাইবেলে লিখিত আছে, যাহার আছে তাহাকেই দেওয়া হইবে। সকল দিকেই আমাদিগকে শক্তিশালী হইতে হইবে, তবেই ইংরেজ যাহা দিতে আসিয়াছে, তাহা দিতে পারিবে। যত দিন তাহারা আমাদিগকে অবজ্ঞা করিবে, তত দিন ইংরেজের সঙ্গে আমাদের মিলন হইতে পারিবে না। আমরা রিক্তহস্তে তাহাদের দ্বারে দাঁড়াইলে বারবার ফিরিয়া আসিতে হইবে। ইংরেজের মধ্যে যাহা সকলের চেয়ে বড়ো এবং সকলের চেয়ে ভালো তাহা আরামে গ্রহণ করিবার নহে, তাহা আমাদিগকে জয় করিয়া লইতে হইবে। ইংরেজ যদি দয়া করিয়া আমাদের প্রতি ভালো হয়, তবে তাহা আমাদের পক্ষে ভালো হইবে না।' এই বক্তব্যের ভেতরে জাতীয়তাবাদীর তেজ নিরুদ্দিষ্ট; উপনিবেশী শক্তিকে ঘৃণা করার চিৎপ্রাখর্য নেই, আছে 'নইলে মোদের রাজার সনে মিলব কী শর্তে'_এ রকম অনুবেদনা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ঈশ্বরবোধক গানে যে-রাজার আগমন প্রতীক্ষা করেন তাঁর কুটীর-দ্বারে, অথবা স্বর্ণরথারূঢ় রাজার প্রসারিত হাতে তুলে দেন ভিক্ষালব্ধ শস্যকণা, যেটি স্বর্ণকণা হয়ে অচিরে ফিরে আসে তাঁর জীর্ণ ঝুলিতে, আর তিনি আক্ষেপ করেন 'আমি কেন দেইনি তারে সকল উজাড় করি'_এ রকম চিত্তবিভঙ্গই যেন উন্মোচিত হতে থাকে পাঠকের সামনে। বিদেশি শাসন-বিতাড়নে, অতএব, এবম্বিধ দ্বিচারিণী মনোভঙ্গি খুব সহায়ক হয়নি। স্বদেশি আন্দোলনের প্রথম ভাগে তিনি উদ্দীপনাময় গীতাদি রচনা করে জাতীয় আন্দোলনে ঘৃতাহুতি দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু অচিরেই তিনি সরে আসেন আন্দোলন থেকে; 'আত্মশক্তির' উদ্বোধনের মাধ্যমে মানুষকে আত্মনির্ভর করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কৃষির উন্নতির জন্য শ্রীনিকেতন স্থাপন, প্রজামঙ্গলের জন্য ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কাজে ব্যাপৃত হন। সাম্প্রতিক থিয়োরির ভাষায়, দেশোদ্ধারের গ্রান্ড ন্যারেটিভে বীতশ্রদ্ধ হয়ে নিরত হয়েছিলেন ক্ষুদ্র প্রকল্পনায়। রবীন্দ্রনাথের কাছে রাষ্ট্র ও সমাজ ছিল বিপরীতমুখী জিনিস। তাঁর মতে ইউরোপীয় দেশে স্টেট বড়, যার জন্য সেখানে পলিটিঙ্রে প্রাবল্য। ভারতীয় সভ্যতার মর্মস্থান তার সমাজের ভেতর প্রোথিত। তাই পলিটিক্যাল স্বাধীনতার জন্য ভারতবাসী যখন আন্দোলন করছে, রবীন্দ্রনাথ তখন বলছেন সমাজকে জাগ্রত করার কথা, সমাজের ধর্মব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার কথা। জাতিভেদ-নির্ভর, অচল ভারতীয় সমাজকে প্রবহমান রাখার প্রণোদনার ভেতর আর কিছু না হোক রবীন্দ্রমানসের দ্বিধা ও দোলাচলকে প্রত্যক্ষ করা যেতে পারে। কী একটি সূক্ষ্ম রক্ষণমানসতা উপনিবেশী শাসনকেও যেন সহনীয় করে নিতে উদগ্রীব। 'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলছেন : 'সাধারণের কল্যাণভার যেখানে পুঞ্জিত হয়, সেখানেই দেশের মর্মস্থান। সেইখানে আঘাত করিলেই সমস্ত দেশ সাংঘাতিকরূপে আহত হয়।... এইজন্য আমরা এতকাল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ করি নাই কিন্তু সামাজিক স্বাধীনতা সর্বতোভাবে বাঁচাইয়া আসিয়াছি। নিঃস্বকে ভিক্ষাদান হইতে সাধারণকে ধর্মশিক্ষাদান এ সমস্ত বিষয়েই বিলাতে স্টেটের উপর নির্ভর_আমাদের দেশে ইহা জনসাধারণের ধর্মব্যবস্থার উপরে প্রতিষ্ঠিত_এই জন্য ইংরেজ স্টেটকে বাঁচাইলেই বাঁচে, আমরা ধর্মব্যবস্থাকে বাঁচাইলেই বাঁচিয়া যাই।' রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করা যেন একটি গৌণ এমনকি অনাবশ্যক কর্ম। ১৯৩৯ সালে শ্রীনিকেতনে দেওয়া শেষ ভাষণে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ : I cannot take responsibility for the whole of India... If I can free only one or two villages from the bonds of ignorance and weakness, there will be built, on a ti scale, an ideal for the whole of India...Fulfil this ideal in a few villages only and I will say that these few villages ae my India. (RR 27 pp. 558) স্বদেশী আন্দোলন থেকে বিযুক্ত হওয়ার কারণে রবীন্দ্রনাথ ধিক্কার শুনেছিলেন অধিকাংশ বাঙালির। নীরদচন্দ্র চৌধুরীর ভাষায় : 'Tagore challenged all [the majority's] political, social, cultural, and religious superstitions, and was therefore regarded as an apostate. This gave to those who attacked him out of jealousy an appearance of respectability which otherwise they would not have had.' অধিকাংশ বাঙালি, অন্তত স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে, রবীন্দ্রনাথকে আপন মনে করেনি। নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর দল বেঁধে যাঁরা ট্রেনে করে বোলপুর গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য, তিক্ত রবীন্দ্রনাথ তাঁদের ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ব্যর্থ নমস্কারে। নোবেল-ঘটনার আগেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাঙালিসমাজের দূরান্বয় সম্পূর্ণ হয়েছিল তখন, যখন বঙ্গজননীর ছিন্নদেহ পুনর্যোজনাকারী পঞ্চম জর্জের সম্মানে রবীন্দ্রনাথ গান বাঁধেন 'জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা'। উপনিবেশবিরোধী চেতনা নয়, তথাকথিত বড় ও মহামহিম ইংরেজবন্দনা তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। নোবেল-প্রাপ্তিও সে দূরত্বকে সেতুসম্ভব করে তোলেনি; অন্তত তাঁর জীবৎকাল পর্যন্ত কবি তাঁর দ্বিধার পশ্চাদাভিঘাত সহ্য করেছিলেন। কৃষ্ণা দত্ত ও অ্যান্ড্রু রবিনসনের ভাষায় : "The Swadeshi Movement had fixed the pattern of Bengali response to Tagore for the rest of his life : encomia, escalating with his increasing years and honours, cheek by jowl with vituperation for not being 'one of us'. (150) বিশ্বকবি হতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ; বাঙালি জাতির অগ্রনায়ক কিংবা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অধিনায়ক হওয়ার কথা চিন্তা করেননি। রবীন্দ্রনাথ বাঙালির স্বাধীনতা-অভিকাঙ্ক্ষার নিকটাত্মীয় নন। ঊনিশ শ একাত্তরে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকলে বাঙালির একাংশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে অনুমোদন করতেন না বলেই আমার ধারণা।"
ইংরেজ ভারতবর্ষে এসেছিল কিছু দিতে, বাঙালি সেটি গ্রহণ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেনি, এই ব্যর্থতা বাঙালির বলে রবীন্দ্রনাথ যে আক্ষেপ করেছেন সেটি বেশ কৌতুককর, আজকের পোস্টকলোনিয়াল তত্ত্বের নিরিখে। 'পূর্ব ও পশ্চিম' প্রবন্ধটি রবীন্দ্রমানসের কূটচিহ্ন ধারণ করে আছে বলে আমার বিশ্বাস। ''ইংরেজের আহ্বান যে-পর্যন্ত আমরা গ্রহণ না করিব, তাহাদের সঙ্গে মিলন যে-পর্যন্ত সার্থক না হইবে, সে পর্যন্ত তাহাদিগকে বলপূর্বক বিদায় করিব, এমন শক্তি আমাদের নাই। যে-ভারতবর্ষ অতীতে অঙ্কুরিত হইয়া ভবিষ্যতের অভিমুখে উদভিন্ন হইয়া উঠিতেছে, ইংরেজ সেই ভারতের জন্য প্রেরিত হইয়া আসিয়াছে। সেই ভারতবর্ষ সমস্ত মানুষের ভারতবর্ষ_ আমরা সেই ভারতবর্ষ হইতে অসময়ে ইংরেজকে দূর করিব, আমাদের এমন কী অধিকার আছে।'' ফ্রানৎস ফানোঁ তাঁর Black Face White mask গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন উপনিবেশিতের মনস্তত্ত্ব : উপনিবেশিতের সর্বক্ষণের চেষ্টা থাকে প্রভুর মতো হওয়ার : শুধু পোশাকে-আশাকে নয়, চিন্তায় এবং মননে। কিন্তু তা সে হতে পারে না। তার কালো গাত্রবর্ণ তার শ্বেতমুখোশকে ফাটিয়ে বের হয়ে পড়ে প্রায়শ। প্রভুও কখনো তাকে মনে করে না নিজ পঙ্ক্তিভোজ্য। অতএব, অনিবার্যভাবে দাসের মনের অবচেতনে জমা হতে থাকে হীনমন্যতা, বিক্ষেপ ও অন্যতর চিত্তবিকার। মনোচিকিৎসক ফানোঁ ফ্রয়েডের ভাবনাকে মিশিয়ে ছিলেন তাঁর উপনিবেশিকতার তত্ত্বে। রবীন্দ্রনাথের কবিমানসে একজন প্রভুর অনড় উপস্থিতি এবং নিজেকে প্রেমিকার অন্তর্খোলসে অন্তরাল করে তাঁর যে আত্মনিবেদন_'তাই তোমার আনন্দ আমার পর, তুমি তাই এসেছ নিচে/আমায় নইলে ত্রিভুবনেশ্বর তোমার প্রেম হতো যে মিছে'_ এর সঙ্গে কি কোনো সাযুজ্য আছে তাঁর ইংরেজ বন্দনার? কোনো মনোবিকলন কি এর সঙ্গে যুক্ত? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য একজন বিশ্লেষকের অপেক্ষায় থাকা যেতে পারে। ইংরেজকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের এই দ্বিধার একটি সমান্তরাল দেখা যাবে আইরিশ কবি ডব্লু বি ইয়েটসের মধ্যে। ১৯১৬ সালের বিখ্যাত ইস্টার অভ্যুত্থানের পর আইরিশ বিপ্লবীদের যখন ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল তখনও ইংরেজভক্ত কিন্তু স্বদেশপ্রেমিক ইয়েটস ইংরেজদের ওপর আস্থা হারাননি। তিনি 'ইস্টার ১৯১৬' নামের কবিতায় আশা প্রকাশ করেছিলেন: ''Was it needless death after all?/For England may keep faith/For all that is done and said.'' (স্মর্তব্য যে, রবীন্দ্রনাথের মতো ইয়েটসেও ছিল নানাবিধ দ্বন্দ্বের সমীকরণ। রবীন্দ্রনাথের মতো ইয়েটসেরও সহজাত আকর্ষণ ছিল অভিজাততন্ত্রের প্রতি। তাঁর অভিভাবিকা লেডি গ্রেগরির জমিদারির কিয়দংশ সরকার অধিগ্রহণ করে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিলে আর্তচিৎকার করে উঠেছিলেন ইয়েটস; রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিবিধ প্রজারঞ্জক কর্মকাণ্ড এবং সাম্যমূলক চিন্তা সত্ত্বেও জমিদারি উচ্ছেদের প্রবল বিরোধী ছিলেন।)

উপনিবেশী ইংরেজ শাসকের সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টা ছিল বাঙালির দ্বিধাকে আত্মদ্বিখণ্ডনের দিকে নিয়ে যাওয়া, জেনাসের দুই মুখকে চিরকালের জন্য দুই দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। বাঙালি যখন আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের চিন্তা করেছে তখনই সামনে এসেছে সংখ্যাগুরু/সংখ্যালঘুর দ্বিঘাত-বৈপরীত্যটি, যা কালক্রমে ঘুলিয়ে তুলেছে সাম্প্রদায়িকতার পাঁক। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান পৃথকভাবে সন্ধান করেছে আত্মউন্নতির। কিন্তু যাঁরা ছিলেন প্রাজ্ঞ, যাঁরা ছিলেন বাঙালি জাতির মিলনসন্ধানী, তাঁরা মনে করিয়ে দিয়েছেন ঐক্যের কথা, কিন্তু সেও ওই ভেদরেখাকে ধরে নিয়েই: 'মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান'। কিন্তু বোঁটা ছিঁড়তে সময় লাগেনি; রবীন্দ্রনাথ-সমেত যে-বাঙালি অগ্রচিন্তকরা ১৯০৫ সালের বাংলার দ্বিভাজনকে বঙ্গজননীর দ্বিখণ্ডায়ন বলে কেঁদেকেটে অস্থির হয়েছিলেন, তাঁদেরই উত্তরসূরিরা ১৯৪৭-এ আইনসভায় বসে বঙ্গবিভাগের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। জন্ম নিয়েছে পাকিস্তান; শয্যায়-বিদ্ধ তরবারির দুই পাশে মিলনাকাঙ্ক্ষী বাঙালির দুই অর্ধাংশ; কিন্তু তাদের অব্যবহিত অতীতের দুঃখগুলো ছিল এমন পিছল, তাদের মিলতে দেয়নি আর কখনো। পুরো পাক-আমলে বাঙালি মুসলমানকে বোঝানো হয়েছে, তুমি বাঙালি নও, মুসলমান। আয়রনিটা হলো, বিভাগপূর্ব বঙ্গদেশেও হিন্দুরা মুসলমানকে বলেছে, তুমি মুসলমান, বাঙালি নও। তাই বাঙালি মুসলমানকে নিরন্তর সাধনা করতে হয়েছে বাঙালি হওয়ার এবং বাঙালি থাকার। পূর্ব পাকিস্তানে এই বাঙালিত্বের সংগ্রামটি অচিরে রূপ নিয়েছে ভাষার সংগ্রামে, কেননা বাংলাভাষাই বাঙালি-পরিচয়ের জীয়নকাঠি। বাঙালিত্বের পরিচয়কে আঁকড়ে ধরার জন্য এই ভূখণ্ডের মুসলমানরা সন্তানের নাম রেখেছে আদিত্য কবির কিংবা অর্পিতা শাহরিয়ার কিংবা মানসী মনসুর। (হিন্দু বাঙালিরা মুসলমানের কাছাকাছি আসার জন্য সন্তানের নাম রাখেনি শবনম চক্রবর্তী কিংবা ফিরোজ চট্টোপাধ্যায়।) একপর্যায়ে যখন আঘাত এসেছে বাঙালি সংস্কৃতির ওপর, আঁকড়ে ধরেছে কাণ্ডারি রবীন্দ্রনাথকে, তাঁর গানকে। চেতনায় লালন করেছে 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি'। আয়োজন করতে হয়েছে পহেলা বৈশাখ, বসন্ত উৎসবের মতো অসাম্প্রদায়িক মিলনানুষ্ঠানের। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের এই পরীক্ষা দিতে হয়নি: হিন্দুত্ব আর বাঙালিত্ব যেন স্বতঃসিদ্ধভাবে সমান্তরাল। কিন্তু পূর্ব বাংলার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বারবার বাঙালিত্বের পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তাই তার শহীদ মিনার, তাই তার একাত্তর, তাই অনিবার্য স্বপ্ন দেখা ধর্মবর্ণনির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ এক বাঙালি হওয়ার। এই স্বপ্নেরই বাস্তবায়ন স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু তবু দ্বিঘাতবিরুদ্ধতা যে নিরাকৃত হয়নি তার প্রমাণ তো আমরা পাচ্ছি নিত্যদিন। নতুন করে ফেনায়িত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ভেদচিন্তা। বাংলাভাষা নিয়ে বাঙালির দ্বিধা দুই বাংলাতেই প্রবল হয়েছে সাম্প্রতিক : পশ্চিমবঙ্গে শুনেছি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণী থেকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষা প্রবর্তন করে নাকি বাঙালিরা গর্ব করে বলছে, আরেকটি ভাষা-আন্দোলন সম্পন্ন করলাম। আমাদের এই দেশে আ-মরি বাংলা ভাষা গাইতে ভুল না করলেও জীবনে ও ধ্যানে মান্য করছি ইংরেজির একমেব স্বৈরাচার। বাঙালির দ্বিচারিতা এখন কপটতার রূপ নিয়েছে, ভাষায় যেমন, রাজনীতিতেও তেমনি, এমনকি ধর্মাচরণেও। পহেলা বৈশাখে উৎসব করি, আবার নিখাদ সাম্প্রদায়িক হিংসাতেও আমরা দড়। আমরা ধর্ম এবং জিরাফ দুটোকেই করেছি আমাদের যুগপৎ বাহন। হাজার বছরের বাঙালির মুখ এখন শুধু জেনাসের মতো দুদিকে ফেরানো নয়, সে মুখ কিম্ভূত ও কদাকার। নিজের দ্বিখণ্ডিত অস্তিত্বের সামনে নিথর হয়ে বসে আছে বিমূঢ় বাঙালি।
বাঙালি কি আর কখনো মিলতে পারবে? আবেগের ভাষিক প্রকাশে, কল্পনার কল্পস্বর্গে সে মিলন হয়তো সম্ভব, কিন্তু বাস্তব ভূগোলে, রাষ্ট্রকাঠামোর এককতায় বাঙালি আবার কখনো এক হতে পারবে এমন ভরসা কম। স্যার সিরিলের লাল পেন্সিলের দাগ জমাটবাঁধা সিমেন্ট থেকে পাথরে, পাথর থেকে অশ্মীভূত অমোঘতায় মাথা তুলেছে ক্রমাগত। গত ষাট বছরে বাঙালির দুই অর্ধ তাদের দ্বিধাভক্তিকে অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা বলে মেনে নিয়ে দূরে সরে গেছে। অচিরেই বাঙালির ঐক্যবদ্ধতার স্বপ্ন লোককথা ও মিথে রূপান্তরিত হবে : সীমান্তের দুই পারে একই ভাষায় আমরা অতীতের কথা স্মরণ করব, কিন্তু আমাদের জীবন-নদী বয়ে যাবে ভিন্ন ভিন্ন সাগরের সন্ধানে। বাঙালিত্বকে আমরা বাঁচানোর সংগ্রাম করব, দুই বাংলায় দুই ভিন্ন বৈরী আকাশের নিচে। পশ্চিমে সর্বব্যাপী হিন্দির আগ্রাসন, ভারতীয় রাষ্ট্রজীবনে বাঙালির ক্রমপ্রান্তিকায়নের বিরুদ্ধে সেখানকার বাঙালিরা সংগ্রাম করতে থাকবে, যদি তারা তা জরুরি মনে করে। আর এ পারে, স্বাধীন বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আমাদের লড়তে হবে ভিন্নতর দানবের সঙ্গে। মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা নানা ছদ্মবেশে এসে, নানা যুক্তির ধোঁয়াশায় ভুলিয়ে দিতে চাইবে আমাদের বাঙালিত্বকে এবং এটিও সত্য যে আমরা আমাদের বাঙালি সত্তা রক্ষার সংগ্রামে আঁকড়ে ধরব রবীন্দ্রনাথকেই। তাঁর বাণী, তাঁর গানই জোগাবে আত্মরক্ষার আয়ুধ যেমন, অগ্রসরণের অনঘ প্রেরণাও তেমনি।
« পূর্ববর্তী সংবাদ
Jobs in Bangladesh
আজকের পাঠকসংখ্যা
৮৩৬৮১৭
পুরোনো সংখ্যা
সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন, উপদেষ্টা সম্পাদক : অমিত হাবিব, ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com
free counters
Latest News Portal Food Recipe in Bangladesh jobs in Bangladesh