logo
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:২০
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন
ক্ষুদ্রঋণ কমিয়ে আমানত বাড়াচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক

ক্ষুদ্রঋণ কমিয়ে আমানত বাড়াচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক

গ্রামের দরিদ্র নারীদের সদস্য করে তাদের কাছ থেকে আগের মতো সঞ্চয় সংগ্রহ করলেও তাদের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ কমিয়ে দিয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক। সদস্যদের সঞ্চয়ের টাকা বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে মেয়াদি আমানত হিসেবে রেখে সেখান থেকে পাওয়া সুদ দিয়ে আয় করছে ব্যাংকটি। তবে ঋণ বিতরণ করে যে পরিমাণ সুদ পাওয়া যায়, অন্য ব্যাংকে টাকা রেখে তার চেয়ে কম সুদ পাওয়ায় ব্যাংকটির মুনাফাও সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গ্রামীণ ব্যাংকের ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের স্থিতিভিত্তিক তথ্যের ওপর সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি করা পরিদর্শন প্রতিবেদনে এমন মূল্যায়ন করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ গত ২৮ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সেই সঙ্গে অন্য ব্যাংকে টাকা আমানত রেখে সুদ আয়ের বদলে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়াতে গ্রামীণ ব্যাংককে পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাম্মেল হক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে গ্রামীণ ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৮ হাজার ৯৮০ কোটি।

২০১৬ সালের আমানতের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের আমানত ১২ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা, অসদস্যদের আমানত সাত হাজার ৮৭ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালে সদস্যদের আমানত ছিল ১১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকা, অসদস্যদের সাত হাজার ৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ২০১৫ সালের তুলনায় পরের বছর অসদস্যদের আমানত সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা কমেছে।

অন্যদিকে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তিতে ব্যাংকটির মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকের কর্মচারীদের অগ্রিম নেওয়া ৫৫৮ কোটি টাকাও রয়েছে। ২০১৫ সালে কর্মচারীদের নেওয়া অগ্রিমসহ ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর গ্রামীণ ব্যাংকের মোট দায় বা সম্পদের পরিমাণ ২২ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ২১ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকার তুলনায় এক হাজার ১১৫ কোটি টাকা বেশি। দায়ের প্রধান খাত সংগৃহীত আমানত থেকে সৃষ্ট ১৯ হাজার ৯৮১ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ভিত্তি ধরে অন্যান্য ব্যাংকে গ্রামীণ ব্যাংকের জমা রাখা অর্থের পরিমাণ ৯ হাজার ৪০৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। আগের বছর এর পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। গ্রামীণ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকটিতে গ্রামের মানুষের সঞ্চয়ের পরিমাণ ২১ হাজার কোটি টাকা।

এ তথ্য উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘এতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, গ্রামীণ ব্যাংক সংগৃহীত আমানতের সিংহভাগ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য সদস্যদের মধ্যে ঋণ হিসেবে বিতরণ না করে ব্যাংকসহ অন্যান্য লাভজনক খাতে জমা রেখে লাভের পরিমাণ স্ফীত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।’

সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও আয় বাড়ানোর জন্য অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বল্প সুদে বিনিয়োগের পরিবর্তে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উৎপাদনশীল, নিরাপদ ও লাভজনক খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ করার জন্য গ্রামীণ ব্যাংককে পরামর্শ দেওয়ার কথা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মুনাফার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ কমিয়ে দেওয়ায় ২০১৪ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। পরের বছর তা আরো কমে দুই কোটি ৪৪ লাখে নেমে আসে। মুনাফা অনেক কমে যাওয়ায় ২০১৬ সালে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ কিছুটা বাড়ায় গ্রামীণ ব্যাংক। তখন মুনাফা বেড়ে ১৩৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা হয়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা এত বাড়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে ব্যাংকটির মোট আয় তিন হাজার ২১২ কোটি টাকা, ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। আয়কর রেয়াত সুবিধা পাওয়ার কারণে গ্রামীণ ব্যাংককে আয়কর খাতে কোনো অর্থ সংস্থান করতে হয়নি। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে নিট মুনাফার ওপর। ২০১৫ সালের তুলনায় পরের বছর ঋণ ও অগ্রিম খাতে ৩২০ কোটি টাকা কম সংস্থান রাখতে হয়েছে বিধায় ব্যাংকটির নিট মুনাফা দুই কোটি ৪৪ লাখ থেকে ১৩৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বেড়েছে।

গ্রামীণ ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ‘ব্যাংকটির পরিদর্শন ভিত্তি বছরে অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বল্প সুদে বিনিয়োগের পরিমাণ কমিয়ে ঋণ ও অগ্রিম খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে বিগত বছরের মুনাফা ২.৪৪ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৩৯.২৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে এ পরিমাণ মুনাফা ব্যাংকটির জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যাংক কর্তৃক সংগৃহীত আমানতের অর্থ অন্যান্য ব্যাংকে স্বল্প সুদে বিনিয়োগ বা গচ্ছিত না রেখে ঋণ ও অগ্রিম খাতে অধিক পরিমাণে বিনিয়োগ করা হলে ব্যাংকটির মুনাফা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে পরিদর্শন দল মনে করে।’

পরিদর্শনকালে ২০১৪ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মুনাফা ৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা থেকে কমে পরের বছর দুই কোটি ৪৪ লাখ টাকায় নেমে আসার কারণ গ্রামীণ ব্যাংকের কাছে জানতে চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। উত্তরে গ্রামীণ ব্যাংক বলেছে, ২০১৪-২০১৫ সালে দেশের বিশেষ আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অনিবার্য কারণবশত গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ও আদায় কার্যক্রমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়। ফলে ঋণ গ্রহীতারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বিতরণ করা ঋণের একটি অংশ অনিয়মিত ঋণে পরিণত হয়। এই অনিয়মিত ঋণের একটা অংশ কু-ঋণে পরিণত হওয়ায় তার বিপরীতে সংস্থান রাখার ফলে ২০১৫ সালে মুনাফার ওপর প্রভাব পড়ে। ২০১৪ সালে ঋণ ও অগ্রিমের বিপরীতে সংস্থানের পরিমাণ ছিল ৪৭৭ কোটি টাকা, যা পরের বছর বেড়ে ৫১৯ কোটি টাকা হয়েছে।

এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধিও মুনাফা কমার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে গ্রামীণ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, ২০১৫ সালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সরকার ঘোষিত নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করায় ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি বেড়েছে, মুনাফার পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০১৪ সালে গ্রামীণ ব্যাংক বেতন-ভাতা বাবদ ৬১৭ কোটি টাকা খরচ করেছে, পরের বছর তা বেড়ে হয়েছে ৭৫৭ কোটি টাকা। আর ২০১৫ সালের চেয়ে ২০১৬ সালে বেতন-ভাতায় খরচ বেড়েছে ৩৪৬ কোটি টাকা।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com