logo
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০২
সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ
৮০০০ কোটি টাকার সৌদি অনুদান অনিশ্চিত

৮০০০ কোটি টাকার সৌদি অনুদান অনিশ্চিত

সারা দেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পে সৌদি আরবের যে ১০০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আট হাজার কোটি টাকা) অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল তা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে মসজিদ নির্মাণে অর্থায়নের জন্য দেশটির রয়্যাল কোর্টে (মন্ত্রিসভা) উপস্থাপন করা হলেও তাতে সাড়া মিলছে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সৌদি আরবের অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে নিয়মিত আলাপ হচ্ছে, চিঠি চালাচালি হচ্ছে। দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক কমিশনের (জেইসি) সভার তারিখও চূড়ান্ত হয়েছে। কিন্তু মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থের বিষয়টি উঠলে দেশটির কাছ থেকে সাড়া মিলছে না। এ অবস্থায় সরকার এখন নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এখন চলছে প্রকল্প সংশোধনের কাজ।

প্রকল্পটি নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে পুনরায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য পাঠাতে কাজ করছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। 

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব কাজী শফিকুল আযম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মসজিদ নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পটি অর্থায়ন করতে আমরা তাদের বলেছি। কিন্তু দেশটির পক্ষ থেকে টাকা ছাড় করার বিষয়ে কোনো সাড়া মিলছে না। এখন নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়া চলছে।’

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সারা দেশে অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা রেখে মসজিদ নির্মাণের প্রকল্পটি গত বছর ২৫ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। ‘প্রতি জেলা ও উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ শিরোনামের ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয় ৯ হাজার ৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সৌদি সরকারের অনুদান দেওয়ার কথা আট হাজার ১৬৯ কোটি টাকা। বাকি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জোগান দেওয়ার কথা। ২০২০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়। কিন্তু অর্থায়ন জটিলতা ও মসজিদ নির্মাণের স্থান চূড়ান্ত করতে দেরি হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় তৈরি হলো। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকল্পে ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি’ জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়ন চূড়ান্ত না করেই তা একনেক সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সৌদি সরকার আদৌ এই প্রকল্পে টাকা দেবে কি না তা নিশ্চিত না হয়ে তাড়াহুড়া করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে প্রকল্পটি। সৌদি সরকারের অনুদান অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ায় সরকারের নিজস্ব বাজেটের ওপর চাপ পড়বে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যাবে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌদি আরব সফরের সময় বাংলাদেশে মসজিদ নির্মাণে দেশটির অনুদান দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। অবশ্য ওই সময় দুই দেশের মধ্যে মসজিদ নির্মাণের বিষয়ে কোনো সমঝোতা স্মারক সই হয়নি। দেশটি শুধু মৌখিকভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু অনুদানের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পটি দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তবে ইআরডি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরের পর থেকে অর্থায়নের বিষয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করা হয়নি। ধর্ম মন্ত্রণালয় নিজেদের মতো করে টাকা আনার চেষ্টা করেছে। যখন তারা ব্যর্থ হয়েছে, তখন এসে ইআরডির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। দেশটিতে ক্ষমতার পালাবদলের কারণে আট হাজার কোটি টাকা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ল বলে অভিমত ইআরডি কর্মকর্তাদের।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমান অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সৌদি সরকার থেকে টাকা পাওয়ার বিষয়ে আমরা এখনো হাল ছাড়িনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করব। কিন্তু এ সময় আমরা নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট জেলা ও উপজেলার জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করে জেলা প্রশাসক থেকে মসজিদের স্থান কোথায় হবে সে বিষয়ে আমাদের কাছে প্রস্তাব এসেছে। আমরা মন্ত্রণালয় থেকে সরেজমিনে গিয়ে স্থানগুলো দেখছি। আশা করছি, শিগগিরই দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করতে পারব।’

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি সরকার অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। সেখানে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিচার হচ্ছে। আর্থিক দৈন্যও ফুটে উঠেছে। তবে সরকার তাদের অর্থায়নের দিকে তাকিয়ে থাকবে না। কারণ সারা দেশের মানুষ এরই মধ্যে জেনে গেছে, সরকার ৫৬০টি মডেল মসজিদ নির্মাণ করতে যাচ্ছে। সামনে নির্বাচন। তাই সরকার চাইছে কিছু কাজ জনগণের সামনে দৃশ্যমান করতে। সে কারণে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মসজিদের স্থান নির্বাচনের জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাফিজুর রহমানকে সভাপতি করে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে মাঠপর্যায়ে সরেজমিন পরিদর্শন শেষে দ্রুত জমির স্থান নির্বাচন বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। উপকমিটির এক সদস্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা কমপ্লেক্সের কাছাকাছি মডেল মসজিদ নির্মাণের কথা রয়েছে। সে আলোকে আমরা বেশির ভাগ স্থানে উপজেলার পাশে ৪০ শতাংশ নিষ্কণ্টক জমি পাচ্ছি। আবার কোথাও কোথাও ব্যক্তিগত দানের জমি পাচ্ছি, তবে সেটা উপজেলা পরিষদ থেকে বেশ দূরে। আশা করি সমস্যা হবে না।’

ধর্ম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি প্রসারের লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় একটি করে মডেল মসজিদ নির্মাণ করতে এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। মসজিদগুলো ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি মসজিদ হবে পাঁচ থেকে ছয়তলা। প্রতিটি মসজিদ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে গড়ে ১৫ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় মসজিদগুলোতে নারী-পুরুষের আলাদা অজু করা ও নামাজ পড়ার ব্যবস্থা থাকবে। থাকবে গ্রন্থাগার, সম্মেলন কক্ষ, গবেষণা কেন্দ্র, অতিথিশালা। বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণ সুবিধাও রাখা হচ্ছে। মৃতদেহ গোসল করানো, হজযাত্রী ও ইমামদের প্রশিক্ষণের সুবিধাও থাকবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, প্রস্তাবিত মসজিদগুলোর লাইব্রেরিতে প্রতিদিন ৩৪ হাজার পাঠক একসঙ্গে কোরআন ও ইসলামিক বই পড়তে পারবে। ইসলামিক বিষয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে মসজিদে। আড়াই হাজার দেশি-বিদেশি অতিথির আবাসন ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হবে মসজিদগুলোতে। হজ পালনের জন্য করা হবে ৫০ শতাংশ ডিজিটাল নিবন্ধনের ব্যবস্থাও। এসব মসজিদে আরো থাকবে ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com