logo
আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০
বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবসানের আরেক ধাপ
আবদুল বাসেত মজুমদার

বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবসানের আরেক ধাপ

২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান হতে শুরু হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের বিচার আইন করে বন্ধ রাখা হয়েছিল। সেই আইন বিলুপ্ত করে জাতির জনক হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। স্বাধীনতার চার দশক পর দেশের শত্রু মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেটিও সফল। এখন দেশের দুর্নীতিবাজদের বিচারের পালা। সেই ধারাবাহিকতায় বিচার হবে। অপরাধী যত ক্ষমতাধরই হোক, বিচারের আওতায় আসতেই হবে।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণা করেছেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এ মামলার প্রধান আসামি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। মামলার অন্য আসামিরা সবাই প্রভাবশালী। কিন্তু গত দিনের রায়ের মাধ্যমে এটি প্রতিষ্ঠিত হলো যে ‘বি ইউ সো হাই, ল ইজ অ্যাভাব ইউ’ অর্থাৎ তুমি যত উঁচুই হও, আইন তোমার ওপরে। বাংলাদেশ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় আরেক ধাপ এগিয়ে গেল এই রায়ের মাধ্যমে। কারণ এই রায় এই বার্তা দিচ্ছে যে বাংলাদেশে কোনো বিচারহীনতার সংস্কৃতি থাকবে না, থাকতে পারে না।

এই মামলা প্রায় ১০ বছর আগে দায়ের হয়েছিল। ২৩৬ কার্যদিবসে মামলার বিচারকাজ পরিচালিত হয়, ২৮ দিন আত্মপক্ষ সমর্থন করে আসামিরা আদালতে তাঁদের বক্তব্য দেন, ১৬ কার্যদিবস মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। মামলায় অভিযুক্তরা যথাযথ সুযোগ ও সময় পেয়েছেন। আদালত সব কিছু বিবেচনা করে যা সঠিক, সেটিই রায় হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বিএনপি নেতারা তাঁদের বক্তব্যে রায়কে রাজনৈতিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলছেন। এই বক্তব্য একেবারেই কাম্য নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপি যদি সঠিকভাবে, সঠিক উপায়ে রাজনীতি করে, তাহলে জনগণ তাদের অবস্থা বিবেচনা করবে। আর যদি রায়কে কেন্দ্র করে কোনো উচ্ছৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরির অপচেষ্টা করে, তা জনগণ রুখে দেবে।

২০০৬ সালে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিএনপি পৌনঃপুনিকভাবে রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও বিভ্রান্তির জন্ম দিয়ে চলেছে। কথাটি আমার নয়। The Economist-এর কলামিস্ট টম ফেলিক্স জোয়েন্স ও অর্থনীতিবিদ ফরেস্ট কুকসন ২০১৬ সালের শুরুর দিকে East Asia Forum-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদন সিরিজের একাংশে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ রকম মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বলেন, বিএনপি একটি বিশৃঙ্খল দল। ২০০৬ সাল থেকে দলটি বিরোধী অবস্থানে আছে এবং দীর্ঘদিন হলো পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। দলটির নেতা দুর্বল এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত। দলটি বেহাল এবং বিভক্ত নেতৃত্ব ক্রমাগত ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে। বিএনপির ভুল সিদ্ধান্তের দৃষ্টান্ত হিসেবে ফেলিক্স ও কুকসন ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ না করার কথা বলেছেন।

ফেলিক্স-কুকসন বিএনপি রাজনীতির এই বেহালের জন্য তাদের নিজেদের সৃষ্ট পরস্পর সম্পর্কিত এক ত্রিমাত্রিক সমস্যাচক্রকে দায়ী করেছেন। প্রথমত, জিয়া তনয় এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তারেক রহমানের লন্ডনের নির্বাসিত জীবন ও তাঁর বিরুদ্ধে আনীত ফৌজদারি দণ্ডের ভার। তারেকের এই পরিস্থিতি বিএনপির কেন্দ্রীয় স্লোগানকে (জিয়া মোদের অতীত, খালেদা জিয়া মোদের বর্তমান, তারেক জিয়া মোদের ভবিষ্যৎ) জটিল করে তুলেছে। দ্বিতীয়ত, বিএনপি ভারতকে বোঝানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে যে বাংলাদেশের সেক্যুলার ঐতিহ্য তাদের শাসনামলেও অক্ষুণ্ন থাকবে। তৃতীয়ত, খালেদা জিয়া ও তাঁর নীতিনির্ধারক মহল জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে অস্বীকার করছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী এবং পাকিস্তান ও সৌদি সমর্থিত রক্ষণশীল ওয়াহাবি মতবাদের সমর্থক। এই ত্রিশঙ্কু অবস্থায় এবং প্রভাবশালী প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের সুবিধাজনক রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে কৌশলগত লড়াইয়ে বিএনপি কুলাতে পারছে না। দুই বিশেষজ্ঞের গবেষণায় বিএনপির অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

এখন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন কি না, এ নিয়ে কথা উঠেছে। সংবিধানে বলা আছে, নৈতিক স্খলনের জন্য কারো যদি দুই বছরের বেশি সাজা হয়, তাহলে তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের দুটি রায় আছে, তাতে বলা আছে, আপিল যতক্ষণ পর্যন্ত শেষ না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মামলা পূর্ণাঙ্গ স্থানে যায়নি, সে জন্য দণ্ডপ্রাপ্ত হলেও তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। আবার আরেকটি রায় আছে, তাতে পারবেন না। এখন খালেদা জিয়ার ব্যাপারে আপিল বিভাগ এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটা তাদের বিষয়।

তবে খালেদা জিয়ার মামলায় নিম্ন আদালতের রায় চূড়ান্ত রায় নয়। কারণ খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। ইচ্ছা করলে দুর্নীতি দমন কমিশনও আপিল করতে পারবে। আর ওই আপিল দায়ের হবে হাইকোর্টে। এমনকি আপিল বিভাগেও আপিল হতে পারে। ওই আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি শেষে রায় পেতে বেশ কিছু সময় লাগবে বলে আমার মনে হয়। ফলে এ পর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিকভাবে মাঠ গরম করার যৌক্তিকতা খুবই অল্প। এখন আদালত নিয়ে যে লাগামছাড়া কথাবার্তা বলা হয়, তাতে আদালতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। এটি মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়।

লেখক : বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com