logo
আপডেট : ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ২১:৩৭
আরো জীবন
মোস্তফা গাছি
আধা চাঁদের মতো বাঁকা একটি লেক। সাভারের লোকপ্রশাসন কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) সামনে। নিম, সেগুন, মেহগনি আর নারিকেলসহ অনেক গাছ তার পারে। এর মধ্যে খেজুরগাছ আছে শ খানেক। প্রতি শীতে খেজুরগাছ কাটা হয়। এবার অনুমতি পেয়েছে মোস্তফা মোল্লা। সুযোগটা সে পেল পর পর দুবার। কথা বলতে গিয়েছিলেন মাসুম সায়ীদ

মোস্তফা গাছি

তখন বিকেল। মোস্তফার গাছ কাটা আর হাঁড়ি বাঁধার সময়। লেকের ধারে গলায় দড়ি বাঁধা কয়েকটি শুকনো মাটির হাঁড়ি। দেখে বুঝলাম, সে আছে কাছেপিঠেই। একটু পরে দেখাও মিলল। হাঁড়ি বেঁধে নেমে আসছে গাছ থেকে। তিন-চার দিন ধরে রোদে শুকিয়েছে গাছগুলো। গাছের আগের কাটা জায়গাটা রোদে শুকিয়ে চটা ধরে গেছে। শুকনা জায়গাটার ছাল হালকা করে চেঁছে দিলেই আবার শুরু হয় ফোঁটায় ফোঁটায় রস ঝরা। তখন বাঁধতে হয় হাঁড়ি। প্রতিদিন করতে হয় এ কাজ পালা করে। সন্ধ্যার মুখে শেষ হলো হাঁড়ি বাঁধা। সেই দুপুরের পর থেকে শুরু। কেটেছে প্রায় ২৫-৩০টি গাছ। গাছ কাটা কষ্টের কাজ হলেও আয় হয় ভালোই। এক কেজি রসের দাম এখন ৬০ টাকা আর এক হাঁড়ি ৩০০ টাকা। বিক্রির জন্য তার যেতে হয় না কোথাও। লোকেরা এসে নিয়ে যায় গাছের তলা থেকেই।

সাজসরঞ্জাম

কোমর থেকে পাট দিয়ে পাকানো শক্ত মোটা কাছিটা খুলতে খুলতে বলল, এটা ‘ধড়া’। এটা দিয়ে গাছি গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখে নিজেকে। গাছ কাটার সময় শরীরের ভর ধরে রাখে এটাই। ‘এবার এই যে দেখুন পাউরি।’ দেড়হাতি একটা পাকা বাঁশের লাঠির এক মাথায় বাঁধা সাত-আট হাত লম্বা মোটা দড়িটার নামই পাউরি। গাছের সঙ্গে লাঠিটা বেঁধে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়। তারপর দেখালেন নলচে। রস গাছ থেকে হাঁড়িতে পড়ার জন্য চিকন বাঁশ ফালা করে বানানো হয় নলচে। নলচে গাছের সঙ্গে গেড়ে দেওয়ার জন্য দরকার হয় ভারী একখণ্ড কাঠ। এর নাম ‘খাইটা’ (মুগুর)। এর কাজ হাতুড়ির মতো। আরো আছে ছেনি। কাঠের হাতলওয়ালা ধারালো ছেনি দেড় হাত লম্বা হয়। এটা দিয়েই গাছ কাটা হয়। ছেনি, নলচে আর খাইটা নিয়ে গাছে ওঠার জন্য বাঁশ দিয়ে বানানো হয় লম্বা চোঙার মতো একটা ঝুড়ি। এর নাম ‘ঠুঙ্গি’। ঠুঙ্গি বাঁধা থাকে কোমরে। তার পাশে বাঁধা থাকে গাছের ডাল দিয়ে বানানো একটি আঁকশি। রসের হাঁড়ি ঝোলানোর জন্য। এত সব জিনিসপত্রের ভারে দড়িদড়া যেন কোমরে কেটে বসে না যায়, এ জন্য পাটের চট বা ছালা ভাঁজ করে দেওয়া হয় পেছনে।

 

মোস্তফার শৈশব-কৈশোর

সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নামল। লেকের জলে গাছের ছায়া আর গাছ এখন একাকার। সেই প্রায়ান্ধকারে মোস্তফা খুলল তার অতীতের খাতা—ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে তার জন্ম। সাল আর দিনক্ষণ মনে নেই। তবে প্রায় ৪০ বছর আগের কথা। বাবা মুসলিম মোল্লা। মা সুরুজজান। ১০-১২ বিঘা জমি ছিল বাবার। থাকত ঢাকায়। রিকশার গ্যারেজ ছিল তার। ‘মাইনসে ঢাকা শহর থিকা ট্যাহা পাঠায় দেশে, আর বাবায় দেশে থিকা জমি বেইচা ট্যাহা আনত ঢাকায়।’ জমি ফুরিয়ে বিঘা দুইয়ে নামে। মোস্তফা তখন কিশোর।

 

গাছ কাটায় হাতেখড়ি

স্কুলের চিন্তা মাথায় আসার আগেই তার মাথায় ঢুকে পড়ে রোজগারের চিন্তা। প্রতিবেশী এক চাচা ছিল গাছি। সে শীতের সময় খেজুরগাছ কাটত। মোস্তফা লেগে থাকত তার সঙ্গে। এটা-ওটা এগিয়ে দিত। রসের হাঁড়ি দিত বয়ে। বিনিময়ে খেতে পেত রস। একবার সেই চাচা নবাবগঞ্জের যান্ত্রাইলে গেল গাছ কাটতে। মোস্তফাকে নিয়ে গেল রস নামানোর কাজে। তিন মাসের বেতন এক হাজার টাকা। সঙ্গে থাকা-খাওয়া। মোস্তফা সুযোগটা কাজে লাগাল পুরোপুরি। শিখে ফেলল গাছ কাটা, যত্ন-আত্তিসহ টুকিটাকি সব।

 

গাছি মোস্তফা

পরের বছর নিজেই শুরু করল গাছ কাটা। নবাবগঞ্জের যান্ত্রাইলের পাশের গ্রাম জালাল চরের মিয়াপাড়ায়। সঙ্গে নিয়ে গেল বাবাকে। বাবা তত দিনে শহর ছেড়ে থিতু হয়েছে গ্রামে। রিকশা ছেড়ে ধরেছে কৃষিকাজ। বাবার কাজ রান্নাবান্না করা। আর রসের হাঁড়ি ধুয়ে রোদে শুকানো। ১০০টা গাছ কাটা হয়েছিল সেবার। ৫০টা করে দুই পালায়। ৫০টা রস নামত। আর ৫০টা শুকাত। আধা-আধি ভাগ মালিকের সঙ্গে। তখন চার-পাঁচ টাকা কেজি, ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে বিক্রি হতো রস। সেটা ১৯৯৪ সালের কথা। মনে আছে চার-পাঁচটা গাছ মরে গিয়েছিল মোস্তফার হাতে কাটার দোষে।

 

বছরের অন্য সময়

অগ্রহায়ণ, পৌষ আর মাঘ—এই তিন মাস খেজুর রসের মৌসুম। গাছ ছাঁটা শুরু হয় কার্তিকের শেষ সপ্তাহে। ওদিকে বড়জোর ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহের কয়েক দিন। বাকি সময়টা তো বসে থাকার উপায় নেই। আর বসে থাকার পাত্রও নয় মোস্তফা। এই সময়টায় সে চলে আসত সাভারে। মসলা দিয়ে সিদ্ধ ডাবলি বিক্রি করত বিলাস সিনেমা হলের সামনে—ওয়াপদা রোডের মাথায়। আর থাকত চাপাইনের তালতলা এলাকায়। তালতলায় ছিল অনেক তালগাছ। এই গাছের নামেই হয়েছে জায়গার নাম। তালগাছ থেকেও রস হয়। মোস্তফা সেই চাচার কাছেই শিখেছে তালগাছ কাটাও। তালের রস নামে গরমে। খেজুরের মৌসুমের ঠিক উল্টো—চৈত্র থেকে আষাঢ় পর্যন্ত। তালের রসের চাহিদা পুরান ঢাকায় বেশি। বাঁধা কাস্টমার। সাভার থেকে বোতলে করে নিয়ে দিয়ে আসতে আর কতক্ষণ!

 

মোস্তফা অনেক কাজের কাজি

বিলাস সিনেমা হলের সামনে আরো একজন ওস্তাদ পেয়ে যায় মোস্তফা। মোস্তফা তাঁর কাছে পুরি বানাতে শেখে। একসময় শিঙাড়া বানাতেও শিখে ফেলে। তারপর শেখে সমুচা বানানো। চটপটিও বানাতে পারে। ১৯৯৬ সালে ওয়াপদা রোডে সাভার মডেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হলে সিনেমা হল ছেড়ে পুরি বিক্রি শুরু করে মডেল কলেজের সামনে। ২০০৫ সালে মডেল কলেজ ওয়াপদা রোড থেকে চলে যায় শাহীবাগে তাদের নিজেস্ব ক্যাম্পাসে। তাতে মোস্তফার সুবিধাই হয়। কলেজের খুব কাছেই তালতলা।

 

 

 

মোস্তফার পরিবার

মোস্তফার স্ত্রী লিপি। তাদের এক মেয়ে, দুই ছেলে। পড়ালেখা করে সবাই। মেয়ে বড়। এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এক ছেলে ক্লাস সেভেনে, অন্যজন প্রাইমারিতে। লিপিও কর্মঠ। সব কিছুতেই সমান সহযোগিতা করে। গাছ কাটার কাজে মোস্তফা যখন ব্যস্ত থাকে, তখন সেই সামলায় হোটেল। গ্রামে বেশ খানিকটা জমিও হয়েছে মোস্তফার।  

 

মোস্তফার স্বপ্ন

মোস্তফা নিজে পড়তে পারেনি। কিন্তু ছেলে-মেয়েদের সে পড়াশোনা করাবে। মোস্তফার স্বপ্ন—তার ছেলে-মেয়েরা একদিন পড়ালেখা শিখে মানুষ হবে, সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকবে সমাজে।

     ছবি : লেখক        

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com