logo
আপডেট : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ১৬:৩৩
মাদকসহ নানামুখী সমস্যায় গেণ্ডারিয়াবাসী

মাদকসহ নানামুখী সমস্যায় গেণ্ডারিয়াবাসী

যথাযথ পদক্ষেপের অভাবে ক্রমেই বাড়ছে বস্তিকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও মাদক ব্যবসা

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গেণ্ডারিয়া একসময় রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ প্রসিদ্ধ এলাকা হিসেবে খ্যাত ছিল। এখানে অভিজাত জনগোষ্ঠী বাস করত বলে ব্রিটিশরা এর নাম দিয়েছিল ‘গ্র্যান্ড এরিয়া’! লোকমুখে ঘুরতে ঘুরতে তারই নাম হয়ে যায় ‘গেণ্ডারিয়া’। এরই মধ্যে ক্রাইম জোন হিসেবে যথেষ্ট পরিচিতি পেয়েছে গেণ্ডারিয়া রেলবস্তি এলাকা। পাশাপাশি রয়েছে অন্তহীন নানা সমস্যা আর ভোগান্তি। এখানকার রেললাইনসংলগ্ন বস্তি এলাকার কারণে বাড়ছে নানাবিধ অপরাধ। অনেকে অপরাধ করে এ বস্তিতে এসে গা-ঢাকা দিচ্ছেন। ফলে গেণ্ডারিয়ার রেলবস্তি এলাকাটি পরিণত হয়েছে অপরাধের স্বর্গরাজ্যে।

 

হাত বাড়ালেই মাদক

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এলাকাটিতে প্রায় ২০টির বেশি মাদকের স্পট রয়েছে। গেণ্ডারিয়ার রেলবস্তি এলাকায় গেলেই চোখে পড়ে রাস্তার দুই পাশে ও অলিগলিতে চলছে অবাধে মাদক বেচাকেনা। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় ইয়াবা ও গাঁজা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় দোকানদার বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী আর সেবনকারীদের যন্ত্রণায় মন চায় ব্যবসা ছেড়ে চলে যাই।’ গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনের সাবেক কুলি সদর উদ্দিন বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে মাসুদ (কালা মাসুদ) নামের এক ছেলেকে এই বস্তি এলাকা থেকে ইয়াবাসহ পুলিশ নিয়ে যায়। সে এখন জেলে আছে। এসব মাদকদ্রব্য সেবনকারী ও ব্যবসায়ীদের কারণে এলাকায় অপরাধ বাড়ছে। এ ছাড়া মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে এলাকায় এবং এলাকার বাইরেও তারা জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, গেণ্ডারিয়া ও জুরাইনে ইয়াবার সবচেয়ে বড় ডিলার রফিক আলী। সবাই চেনে চাচা রফিক হিসেবে। এ ছাড়া রয়েছে ইউসুফ, মারুফ, শাওন, নিলয়, শহিদুল, কালা আরিফ, বাবু, শামীম ও জাহাঙ্গীর মিয়া। অন্যদিকে এই এলাকা থেকেই কদমতলী থানার কাছাকাছি মোহাম্মদবাগ, রায়েরবাগ, দোলাইরপাড়, শ্যামপুর বালুর মাঠ, ডিপটি গলি, বিড়ি ফ্যাক্টরি, শনির আখড়া, দনিয়া নয়াপাড়া, নূরপুর, পাটেরবাগ, মুরাদপুর, কমিশনার রোড, জুরাইন, আলমবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ করা হয়। দীননাথ সেন রোডের বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, ‘এলাকার উঠতি বয়সের ছেলেরা দিন দিন মাদকাসক্ত হচ্ছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় আছেন অভিভাবকরা। কিন্তু মাদক ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকায় কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না।’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাধনা ঔষধালয়ের এক শ্রমিক বলেন, ‘পুলিশ অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ীদের ধরেও ছেড়ে দেয়। কারণ মাদক ব্যবসায়ী বা মাদকসেবীদের জেলহাজতে পাঠালে পুলিশের লোকসান। এর চেয়ে তাদের ধরে টাকা-পয়সা রেখে ছেড়ে দিলে পুলিশের লাভ। কারণ মাদক ব্যবসা বাড়লে পুলিশেরও ইনকাম বাড়বে।’ এ ছাড়া এলাকায় মাদকের পাশাপাশি বাড়ছে চুরি-ছিনতাই। সন্ধ্যা হলেই মেডিক্যাল রোড, ওয়াসা রোডসহ এলাকার কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুরাইনে এক নিরীহ ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে।



বিদ্যুৎ ও পানি সংকটে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী

গেণ্ডারিয়া এলাকায় ওয়াসার পানি পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার বলে জানালেন ডিআইটি প্লটের বাসিন্দা অলিয়ার রহমান। একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাঝেমধ্যে এমনও দিন যায়, যেদিন নিত্যব্যবহার্য কাজ করার মতো পানিটুকুও পাওয়া যায় না। এলেও পানি থাকে দুর্গন্ধযুক্ত। ফলে এই পানি ব্যবহার করা যায় না। দীননাথ সেন রোডের নাহিদুল কবীর বলেন, ‘বিষয়গুলো ওয়াসাকে একাধিকবার জানানো হয়েছে; কিন্তু তা সমাধানে কোনো উদ্যোগ তাদের চোখে পড়েনি। পানি সংকটের মতো বিদ্যুৎ সমস্যাও রয়েছে। এসব সমস্যায় প্রতিনিয়তই আমাদের ভুগতে হচ্ছে। কিন্তু তাতে কার কী আসে-যায়। সমস্যা থাকলেও সমাধানের কেউ নেই।’ সাধনা ঔষধালয়ের শ্রমিক অমিত রায় বলেন, ‘দিনভর সাত-আটবার আসা-যাওয়া করে বিদ্যুৎ। এর ফলে বাসাবাড়ির কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানের কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। এ ছাড়া সন্তানদের লেখাপড়ায়ও সমস্যা হচ্ছে।’

 

স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যা

সামান্য বৃষ্টিতে গেণ্ডারিয়া রেলবস্তি, দীননাথ সেন রোড, জুরাইন কাঁচাবাজারসহ এলাকার বেশির ভাগ রাস্তায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। জুরাইনের আড্ডিপট্টি, বাগানবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যা। এলাকা ঘুরে আরো দেখা যায়, বেশির ভাগ ড্রেনেজ লাইন বিভিন্ন প্রকার আবর্জনায় ভর্তি। ফলে অতিরিক্ত পানি সরে যেতে পারে না, এতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। গেণ্ডারিয়া রেলবস্তির সালাম মিয়া বলেন, ‘বৃষ্টি মৌসুমে মাত্র ১০ মিনিটের বৃষ্টি হলে রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব সমস্যা হচ্ছে।’

 

অবৈধ দখলের কবলে রেলের জমি

রেলওয়ে সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রেললাইনের দুই পাশের ১৭২ একর জমি দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। সায়েদাবাদ থেকে জুরাইন রেলগেট পর্যন্ত একবার অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও জায়গাগুলো দখলে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সেগুলোর বেশির ভাগই আবার বেদখল হয়ে স্থাপনা উঠেছে। এ ছাড়া রেললাইনের ওপর অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে কাঁচাবাজার। ঝুপড়িঘরের কারণে রেললাইনটি যেন ব্যবহৃত হচ্ছে নিজেদের বাড়ির উঠোনের মতো। প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব জমি দখল করে কোথাও মার্কেট, কোথাও বাজার আবার কোথাও বস্তি বানিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করছে। অনেক জায়গায় আবার রাজনৈতিক কার্যালয়ও আছে। বছরের পর বছর চলে গেলেও এসব জমি উদ্ধার করতে পারছে না রেলওয়ে। এলাকার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চাইলে গেণ্ডারিয়া থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে। এ ছাড়া আমাদের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ অনেক দিন আসে না।’

 

প্রশাসন যা বলল

গেণ্ডারিয়া রেলবস্তি শ্যামপুর থানা এলাকায় পড়েছে। বস্তি এলাকার অপরাধ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মমিনুর রহমান বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স। শতভাগ আন্তরিকভাবে কাজ করছে পুলিশ। আমাদের এলাকায় কয়েক দিন আগেও মাদকসহ কয়েকজনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। পুলিশের আন্তরিকতা ছিল বলেই তা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া রেলবস্তিতে যেন কোনো ধরনের অপরাধ না হতে পারে—এ জন্য আমাদের টহল পুলিশ আছে।’ এলাকার সার্বিক সমস্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার নাসির আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘এখানে বেশ কিছু সমস্যা আছে। যে সমস্যাগুলোর সমাধানের জন্য আমরা সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছি। মাদক সমস্যাটি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভালোভাবে দেখছে। ড্রেনেজ সমস্যাটি সমাধানের জন্য কাজ চলছে। আশা রাখি স্বল্পসময়ের মধ্যেই এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে।’

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com