logo
আপডেট : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:২৪
পুলিশ-সিআইডি ব্যর্থ পিবিআই সফল

পুলিশ-সিআইডি ব্যর্থ পিবিআই সফল

সাতকানিয়ার উত্তর ঢেমশা গ্রাম থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার হয়েছিল ২০১৪ সালের অক্টোবরে। লাশটি ছিল খুলনা জেলার বাসিন্দা শহীদুলের। তিনি টঙ্গী এলাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তাঁকে ডেকে চট্টগ্রামে এনে সাতকানিয়ায় নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

পরকীয়া প্রেমের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড হলেও সাতকানিয়া থানা পুলিশ ও সিআইডি (অপরাধ তদন্ত বিভাগ) প্রায় চার বছর তদন্ত করে ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে ব্যর্থ হয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অধিকতর তদন্ত করে মাত্র এক মাসের মধ্যে মামলার রহস্য উন্মোচন করেছে। এ ঘটনায় জড়িত নারী প্রীতি বণিক প্রকাশ নমিতা মুক্তা (৪৫) ও তাঁর ভাই রাজু বণিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পিবিআই চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, ‘গত ডিসেম্বর মাসে আদালত সাতকানিয়া থানার মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইয়ে পাঠান। এরপর তিন সপ্তাহের মধ্যেই মামলার রহস্য উন্মোচন করে আসামি প্রীতি বণিককে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। প্রীতি বণিক মঙ্গলবার চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়ন্তী রানী রায়ের আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে আদালত আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এছাড়া ঘটনায় জড়িত প্রীতি বণিকের ভাই রাজু বণিককে মঙ্গলবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার তিনিও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন।’

ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ডিসেম্বর মাসে আদালত থেকে একটি হত্যা মামলা অধিকতর তদন্তের জন্য পিবিআইয়ে আসে। এরপর মামলাটি তদন্তের জন্য পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। মামলাটি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় উপ-পরিদর্শক কামাল আব্বাস ও মাজেদুল হককে নিয়ে একটি তদন্ত দলও গঠন করে দেওয়া হয়। এ তদন্ত দল মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে খুনের রহস্য উম্মোচন করতে সক্ষম হয়েছে।’

শহীদুলকে হত্যার দায় স্বীকার করে আসামি প্রীতি বণিক আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানান, তাঁর গ্রামের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার চৌধুরীপাড়া এলাকায়। বর্তমানে তিনি ডবলমুরিং থানার মনসুরাবাদ নিরিবিলি আবাসিক এলাকার আমীন প্যালেসের দ্বিতীয় তলায় বাস করেন। তিনি বিবাহিতা এবং তিন সন্তানের জননী। তাঁর এক কন্যার বিয়ে হয়েছে। আপন বাবা-মা মারা যাওয়ার পর তিনি পালক বাবা-মায়ের কাছে বড় হয়েছিলেন। পালক বাবা নারায়ণ বণিকের বাড়ি সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া গ্রামে।

জবানবন্দিতে প্রীতি বণিক বলেন, ‘২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে শহীদুল নামের এক ব্যক্তি আমার মোবাইল ফোনে কল করে মুক্তাকে খুঁজেন। কিন্তু যুবককে চিনতে না পারায় মোবাইল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেই। এরপরও ওই যুবক মোবাইল ফোনে কথা বলে এবং কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করে। পরবর্তী কিছুদিনের মধ্যেই শহীদুলের সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। শহীদুল খুলনার ছেলে। তবে টঙ্গীর একটি কারখানায় চাকরি করত।’

কথোপকথনের এক পর্যায়ে শহীদুল চট্টগ্রামে চলে আসেন। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন প্রথম দফায় আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে গিয়ে আহত শহীদুলকে দেখেন প্রীতি বণিক। পরে শহীদুলকে খুলনা পাঠিয়ে দেন। শহীদুল দ্বিতীয় দফা চট্টগ্রামে আসে প্রীতি বণিকের সঙ্গে দেখা করতে। শেষবারও সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন শহীদুল। একাধিক চিকিৎসক ঘুরে শহীদুলকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান প্রীতি। এবারও চিকিৎসা শেষে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাঁকে।

প্রীতি বণিকের ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদুলের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর নিজের বিয়ে এবং সন্তানের কথা বলার পরও শহীদুল এসব বুঝতে চেষ্টা করেননি। এক পর্যায়ে প্রীতির মেয়ের দিকে কুনজর দেন শহীদুল। পরে প্রীতির স্বামীকে প্রেমের কথোপকথন করা রেকর্ডিং শুনিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন প্রীতি বণিক।

পরবর্তীতে প্রীতি বণিক তাঁর ভাই রাজু বণিকের সঙ্গে পরামর্শ করেন। শেষে শহীদুলকে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রামে ডেকে আনে। চট্টগ্রামে আনার পর তাঁকে নিয়ে প্রীতি ও রাজু চলে যান সাতকানিয়ার উত্তর ঢেমশা গ্রামে। গ্রামের নির্জন স্থানে একটি খালের পাড়ে নিয়ে লোহার রড দিয়ে শহীদুলকে আঘাত করেন রাজু বণিক। তখন শহীদুল তাঁকে মারধরের কারণ জানতে চান। এ পর্যায়ে প্রীতি বণিক তাঁর সঙ্গে যা হয়েছে, সব ভুলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু শহীদুল রাজি হননি। রাজু বণিক লোহার রড দিয়ে কয়েকটি আঘাত করলে শহীদুলের মৃত্যু হয়। পরে একটি খালের পাড়ে শহীদুলের লাশ রেখে রাতে চট্টগ্রামে চলে আসেন।

পিবিআই পরিদর্শক আবু জাফর মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘সাতকানিয়া থানা পুলিশ পরদিন লাশটি উদ্ধার করে। এরপর প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হয়। পরে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মাথায় আঘাতজনিত কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদন পাওয়ার পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সাতকানিয়া থানার উপপরিদর্শক মিনহাজ প্রীতি বণিকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কিন্তু উপপরিদর্শক মিনহাজ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। থানা পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর মামলাটি তদন্তের জন্য সিআইডির কাছে পাঠান আদালত। সিআইডিও পরপর তিন দফা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। শেষে পিবিআই মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে।

আবু জাফর মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘লাশের পাশে একটি ব্যাগ ছিল। সাতকানিয়া থানা পুলিশ ব্যাগটি উদ্ধার করে। সেখানে মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। ওই ফোনের কলতালিকার সূত্র ধরে প্রীতি বণিকের সন্ধান পায় পিবিআই।’

তিনি জানান, প্রীতি বণিক ঘটনাস্থলে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের স্থান শনাক্ত করেছেন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত লোহার রডটিও স্থানীয়দের মাধ্যমে তল্লাশি করে উদ্ধার করা হয়েছে।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com