logo
আপডেট : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:২০
এমপিওদৌড়ে শিক্ষার অবস্থান কোথায়
রেজানুর রহমান

এমপিওদৌড়ে শিক্ষার অবস্থান কোথায়

পাশাপাশি দুটি ছবি। একটিতে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা নতুন বছরে তাদের ক্লাসের নতুন বই পেয়ে মহা আনন্দে নাচছে, হৈ-হুল্লোড় করছে। অন্যটিতে মানুষ গড়ার কারিগর শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকরা রাজপথে শুয়ে আমরণ অনশন করছেন। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ অনশনরত শিক্ষকদের অনশন ভেঙে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যেতে বলেছেন। তবু শিক্ষকদের কেউ কেউ রাজপথে শুয়ে আছেন। তাঁরা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনশন ভাঙবেন না। আমার এই লেখা প্রকাশের দিন পর্যন্ত শিক্ষকদের অনশন অব্যাহত থাকবে কি না জানি না। প্রত্যাশা করি, অচিরেই যেন শিক্ষকদের অনশনসংক্রান্ত দুরবস্থার অবসান হয়। আর যদি এরই মধ্যে শিক্ষকরা অনশন ভঙ্গ করে থাকেন, তাহলে তো একটা দুশ্চিন্তা অন্তত দূর হলো। একটা দুশ্চিন্তার কথা বলা হলো। তার মানে দুশ্চিন্তা কিন্তু আরো আছে। তার আগে একটা বিষয়ে মোটামুটি পরিষ্কার ধারণা প্রয়োজন। শিক্ষা কি একটি পেশা? সহজ উত্তর—অবশ্যই এটি একটি পেশা। যদি তা-ই হয় তাহলে এ ক্ষেত্রে পেশাগত দায়বদ্ধতার বিষয়টিও তো জড়িত। পাশাপাশি আরেকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন ব্যক্তি তখনই তার পেশার প্রতি দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে, যখন তার সেই পেশায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত থাকে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই, অথচ সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা বলে সামাজিক সেবা চাইবেন—সেটা কী করে সম্ভব?

শিক্ষকদের যে অংশ আন্দোলনে নেমেছে তাঁরা নন-এমপিওধারী শিক্ষক-শিক্ষিকা। অর্থাৎ তাঁরা শিক্ষকতা চাকরির সেবার বিপরীতে সরকার থেকে কোনো অর্থ পান না। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাঁদের বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেছে। এমনও হয়েছে, অনেকে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে বিপুল অঙ্কের টাকা ঘুষ অথবা ডোনেশন দিয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগপত্র পেয়েছেন। বৈধ অথবা অবৈধ উপায়ে নিয়োগপ্রাপ্ত সব শিক্ষক-শিক্ষিকার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন একটাই—ভবিষ্যতে এমপিওভুক্তির সুযোগ পেলে দুর্দিন কেটে যাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাকে আশ্বাসও দেয়—এই তো, আগামী বছরই এমপিওভুক্তি হয়ে যাবে! এমপি কথা দিয়েছেন। মন্ত্রীও আশ্বাস দিয়েছেন...। আশ্বাস পেলেই তো বিশ্বাসের জন্ম নেয়। আর বিশ্বাসের সুতায় যখন শক্ত টান পড়ে, এই বুঝি সুতা ছিঁড়ে যাচ্ছে, তখনই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

দেশের নন-এমপিওধারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ক্ষেত্রে বোধ করি এমনটাই ঘটেছে। সে কারণে তাঁরা ঢাকায় এসে রাস্তায় আমরণ অনশন করতে বাধ্য হয়েছেন। ২ জানুয়ারি ২০১৮ যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন কালের কণ্ঠেই শিক্ষকদের অনশনসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের একটি বক্তব্য পড়লাম। তিনি বলেছেন, আমাদের দেশের শিক্ষকরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। তাঁদের জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বেতন-ভাতার জোগান দেওয়া হয় না। বিশেষ করে নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের বেশির ভাগই জীবনযাপনের জন্য অন্য কাজে ব্যস্ত হতে বাধ্য হন। তিনি আরো বলেছেন, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সমৃদ্ধ করা, সুশিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষার সুষ্ঠু বিকাশের জন্য এমপিওভুক্তি অত্যন্ত জরুরি। কারণ শিক্ষকদের জীবন অবহেলা ও কষ্টে কাটলে তাঁদের উৎসাহ ফুরিয়ে যাবে।

রওশন এরশাদের কথার সূত্র ধরেই আলোচনাটা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তিনি যথার্থই বলেছেন, শিক্ষকদের জীবন অবহেলা ও কষ্টে কাটলে তাঁদের উৎসাহ ফুরিয়ে যাবে। অথচ বাস্তবে সেটাই হচ্ছে। শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। কিন্তু এই কারিগরকে তো আর্থিক ক্ষেত্রে সচ্ছল রাখাও জরুরি। শিক্ষকতা করি, পকেটে পয়সা নেই, বাজার করতে পারিনি, পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ—এ ধরনের অস্থির মানুষ কী করে শিক্ষক হিসেবে সফল হবেন? এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের নন-এমপিওধারী শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বড় অংশ (কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমপিওধারী শিক্ষকরাও) শিক্ষকতা পেশার বাইরে অন্য কাজ করতে বাধ্য হয়। অনেকে ঠিকাদারি ব্যবসা করেন, অনেকে কোচিং সেন্টার চালান, কেউ কেউ বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। ব্যবসাও করেন অনেকে। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় মূল পেশার চেয়ে বাড়তি কাজেই অনেকের মনোযোগ থাকে বেশি। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রকৃত শিক্ষাসেবা পাচ্ছে না। আমার এক বন্ধরু কাছে প্রসঙ্গটি তুলতেই সে আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করে বসল, আচ্ছা ধরো, সরকার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কি আমাদের শিক্ষার মানের উন্নতি হবে? বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রাপ্ত সব শিক্ষক-শিক্ষিকাই কি প্রকৃত যোগ্যতাসম্পন্ন? বন্ধুর প্রশ্নের জবাব দিতে পারিনি। কারণ শিক্ষকদের যোগ্যতার এই প্রশ্নের সঠিক জবাব তো আমার কাছে নেই। তবে দুঃখজনক এবং অবশ্যই বিব্রতকর একটি স্মৃতি আছে আমার। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক্সকিউটিভ পদে নিয়োগের ভাইভা পরীক্ষায় প্রশ্নকর্তা হিসেবে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। অন্যদের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষকও এই পরীক্ষায় অংশ নেন। আমাদের মহান বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস সম্পর্কে ছোট্ট প্রশ্ন করে অবাক হয়েছি। একাধিক প্রতিযোগী ১৬ ডিসেম্বরকে বলেছেন স্বাধীনতা দিবস আর ২৬ মার্চকে বলেছেন বিজয় দিবস। শুনে খুবই বিব্রত হয়েছি। যদিও দেশের লাখ লাখ সম্মানিত শিক্ষক-শিক্ষিকার মেধার বিচারে এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা ঠিক হবে না। তবে ঘটনাটা একেবারেই ফেলে দেওয়ার মতো নয়। এ কথা এ জন্য বলছি যে শিক্ষক মানেই আমরা বুঝি সবজান্তা। তিনি হবেন সবার চেয়ে মেধাবী। আবার এ কথাও সত্য, মেধাবীদের যেকোনো পেশায় যুক্ত করতে চাইলে ‘মেধাবী’ বেতন-ভাতাও প্রয়োজন। ভালো বেতন না দিয়ে ভালো শিক্ষক আশা করাও তো যক্তিযুক্ত নয়। শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় যাঁরা জড়িত হন, তাঁদের উচিত পেশার মান-মর্যাদা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করা। আবার যাঁরা শিক্ষকদের নিয়োগ দেন, তাঁদেরও উচিত যোগ্য-মেধাবীদের খুঁজে বের করা। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিও কাজ করে বলে শোনা যায়। এমনও হয়—কোথাও চাকরি পাচ্ছে না, পাশের বেসরকারি স্কুল অথবা কলেজটিতে শিক্ষকের পদ খালি আছে, মন্ত্রী অথবা এমপির সুপারিশে সেখানে নিয়োগ পাওয়ার তদবির শুরু হয়। একসময় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর শুরু হয় এমপিওভুক্তির জন্য অপেক্ষা। এই লড়াইয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিক্ষার মান উন্নয়নের বিষয়টি ততটা গুরুত্ব পায় না।

শিক্ষাক্ষেত্রে এমপিওভুক্তির অস্থিরতা দূর হওয়া জরুরি। পাশাপাশি জরুরি প্রকৃত মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করা। যেকোনো পর্যায়েরই হোক, সম্মানিত শিক্ষক রাজপথে আমরণ অনশন করবেন—এ দৃশ্য মোটেই শোভন নয়। কারণ আজ আমরা যে যেখানেই থাকি না কেন, যা কিছু শিখেছি, তার পেছনে শিক্ষকদের অবদানই তো বেশি। কাজেই প্রকৃত শিক্ষকরা যাতে রাজপথে আর আন্দোলন না করেন, সে ব্যাপারে একটা যৌক্তিক সমাধান প্রয়োজন। নতুন বছরে সবার জন্য রইল শুভ কামনা।

লেখক : সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com