logo
আপডেট : ৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:১২
বিচারকদের চাকরি বিধিমালা আপিল বিভাগে গৃহীত
‘সরকার সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া কিছুই করতে পারবে না’

‘সরকার সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া কিছুই করতে পারবে না’

সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করাকে প্রাধান্য দিয়ে জারি করা নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালার গেজেট গ্রহণ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ গতকাল বুধবার গেজেট গ্রহণ করে আদেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা নিয়ে ২০১৬ সালে আপিল বিভাগের দেওয়া পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।

আদালত বলেছেন, প্রতিটি পদক্ষেপেই সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান রাখা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া সরকারের কিছুই করার নেই। সোজা কথা, সুপ্রিম কোর্ট ছাড়া কিছুই করতে পারবে না সরকার।

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতের আদেশের পর সাংবাদিকদের বলেন, আপিল বিভাগ সন্তুষ্ট হয়ে গেজেট গ্রহণ করেছেন। এর মধ্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল তার অবসান হলো। আজ (বুধবার) থেকেই এই বিধিমালা কার্যকর হবে।

মাহবুবে আলম বলেন, বিধিমালায় নিম্ন আদালতের বিচারকদের ব্যাপারে অনুসন্ধান, তদন্ত, শাস্তি প্রদান, আপিল এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান রাখা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রপতি বা আইন মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে কোনো বিষয়ে অমিল দেখা দিলে সুপ্রিম কোর্টের মতামতই প্রাধান্য পাবে। অনেকেই কলাম লিখছেন বা টক শোতে বলছেন যে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা খর্ব হয়েছে। তাঁদের এই ধারণা ভুল।

অপরপক্ষের (হাইকোর্টে রিট আবেদনকারী নিম্ন আদালতের বিচারক মাসদার হোসেন) আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ যদি মন্ত্রণালয় হয় তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়। মন্ত্রণালয় যদি হাইকোর্টের অধীনে থাকত তাহলে সঠিক হতো। তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সালের আদি সংবিধানে ছিল অধস্তন আদালত থাকবে হাইকোর্টের অধীন। আমাদের ধারণা ছিল, আমরা আদি সংবিধানে ফিরে যেতে পারব। কিন্তু তা হলো না। আপিল বিভাগ বিধিমালাকে অনুমোদন দিয়ে দিলেন। তিনি বলেন, এই গেজেটের কিছু কিছু জায়গা চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ ও রিট আবেদন করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট আজ গেজেট গ্রহণ করায় সে সুযোগ আর থাকল না।’

গতকাল বুধবার শুনানির শুরুতেই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আদালত চাকরিসংক্রান্ত শৃঙ্খলার বিধিমালা গেজেট আকারে জারির নির্দেশ দিয়েছিলেন। গত ১১ ডিসেম্বর সেটা জারি করা হয়েছে। আমাদের আরো একটি আবেদন আছে। ২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট এই আদালত যে আদেশ দিয়েছিলেন সেখানে ১১৬ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ ছিল। সেটা প্রত্যাহার চাচ্ছি।

এ সময় আদালত বলেন, সেটা করা যাবে। আগে গেজেটের বিধিগুলো পড়ুন। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বিধিমালা পড়তে গেলে মাসদার হোসেন মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম ডায়াসে দাঁড়ান। তিনি বলেন, ‘বিধিমালা চ্যালেঞ্জ করে রিভিউ আবেদন করব। এ বিষয়ে আমার একটি লিখিত বক্তব্য রয়েছে। সেটা দেখুন। সেটা নিষ্পত্তি করুন।’ তিনি বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী রুলস তৈরি করবেন হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করবেন রাষ্ট্রপতি। এরপর গেজেট জারি হবে।’

আদালত বলেন, মাসদার হোসেন মামলায়ই আপিল বিভাগ রুলস তৈরি করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী এর আগেও রুলস তৈরি হয়েছে। গেজেট জারি হয়েছে। এ সময় ব্যারিস্টার আমীর বলেন, এই গেজেট নিয়ে কথা বলতে চাই। জবাবে আদালত বলেন, ‘অবশ্যই বলবেন। রুলসে কী আছে দেখতে চাই। অন্য কোনো কিছু থাকলে তা তো যেকোনো সময় পরিবর্তন করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বলা হচ্ছে, আমরা সব দিয়ে দিয়েছি। কোথায় সব দিয়ে দিয়েছি তা দেখান। গণমাধ্যমে উল্টোপাল্টা লেখা হচ্ছে।’

এরপর আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে গেজেট থেকে বিভিন্ন ধারা পড়তে বলেন। আদালতের কথামতো অ্যাটর্নি জেনারেল বিভিন্ন ধারা পড়তে থাকেন। সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ করার কথা আসামাত্র আদালত আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার বিধান করা হয়েছে।

একপর্যায়ে আদালত বলেন—দেখুন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জায়গায় সুপ্রিম কোর্টের নাম ঢুকিয়েছি। আগে সুপ্রিম কোর্টের নাম ছিল না। সবখানে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া অনুসন্ধান করা যাবে না। সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া সরকার কিছুই করতে পারবে না। অথচ পত্রিকায় লেখা হচ্ছে সুপ্রিম কোর্ট সব দিয়ে দিয়েছেন।

বিধিমালার ২৯ নম্বর ধারা পড়ার সময় আদালত বলেন, ‘এটা তো আরো মারাত্মক। ২৯ নম্বর ধারা দেখুন। সেখানে বলা আছে, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে সে ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ প্রাধান্য পাবে। দুঃখ হলো, কেউ পড়ে না। এই ধারা না পড়েই আন্দাজে মন্তব্য করে। আমরা পাঁচজন (আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি) বসলাম। আমরা কি এতই বোকা? আমরা কি নবিশ বিচারক? আমরা নাকি সব শেষ করে দিয়েছি।’ আদালত বলেন, ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনো প্রস্তাব দিলেও সুপ্রিম কোর্ট পরামর্শ না দিলে তারা কিছু করতে পারবে না। কোনো কিছু করতে হলে আমাদের (সুপ্রিম কোর্ট) পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে অবশ্যই সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নিতে হবে।’

এ সময় ব্যারিস্টার এম আমীর বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট গেজেট গ্রহণ করার পর আমার আর কিছুই বলার থাকে না।’ তখন আদালত তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, গেল গেল। সব গেল। কিন্তু দেখুন, আমরা সব দেইনি। সবই রেখে দিয়েছি।’

এরপর আদালত আদেশ দেন। আদেশে বলেন, ‘২০১৬ সালের ২৮ আগস্ট এই আদালত শৃঙ্খলাবিধি তৈরি করার নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অনুমোদনসাপেক্ষে সরকার শৃঙ্খলা বিধিমালার গেজেট জারি করেছে। এই গেজেট আমরা পড়েছি। বিধিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রাধান্য বজায় রাখা হয়েছে। আমরা এই বিধিমালা গ্রহণ করছি। যেহেতু গেজেট গৃহীত হলো, তাই ২০১৬ সালের ২৮ আগস্টের আদেশে দেওয়া পর্যবেক্ষণ অকার্যকর হয়ে গেল। এ কারণে ওই পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহার করা হলো। বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হলো। আর মাসদার হোসেন মামলা চলমান থাকবে।’

আপিল বিভাগ ১৯৯৯ সালের ২ ডিসেম্বর মাসদার হোসেন মামলায় ১২ দফা নির্দেশনা দিয়ে রায় দেন। ওই রায়ের আলোকে নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা ছিল। সরকার গত ১১ ডিসেম্বর ওই বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করে।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com