logo
আপডেট : ৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ২৩:৫৮
শঙ্কাহীন প্রাণ, দৃপ্ত পদযাত্রা...
সাইফুর রহমান সোহাগ

শঙ্কাহীন প্রাণ, দৃপ্ত পদযাত্রা...

বহু প্রজন্মের হাত ধরে বহু ক্রোশ হেঁটে আজ প্রতিষ্ঠার ৭০তম বছরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি থেকে সুদীর্ঘ এই পথচলায় ছাত্রলীগ রেখেছে সীমার মধ্যে অসীম ত্যাগ ও শ্রমের স্বাক্ষর। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সাম্যের সংকল্পে সমর্পিত সংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ উজ্জ্বল সত্যের উন্মুক্ত আলোয় উদ্ভাসিত ছাত্রসংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগই অকুণ্ঠিত স্বরে সত্যের জয়গান গাইতে জানে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুপ্রাজ্ঞ রাজনীতির সুদূরপ্রসারী রূপকল্প। বাঙালির অধিকার আদায় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে কার্যকর তরুণ শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ জন্মলগ্ন থেকে বিনিসুতায় সাফল্যের মালা গেঁথেছে। ছাত্রলীগ মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করেছে। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ছাত্রলীগের কর্মীদের পরিশ্রমই ভোটের ব্যবধান বাড়িয়ে বিজয় নিশ্চিত করেছে। ১৯৬২ সালে শরিফ কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্বার শিক্ষা আন্দোলন ও গণজোয়ার তৈরি করে ছাত্রলীগ। সেই আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনের মাত্রা ও শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি করে। সামরিক জান্তা আইয়ুব খানের কাছে ছাত্রলীগ ছিল রাজপথের এক টর্নেডোর নাম।

স্বাধীন বাংলাদেশের যে বীজ রোপণ করা হয়েছিল ১৯৫২ সালে, সেই বীজ মাটি ফুঁড়ে দৃশ্যমান হয় ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে তাঁর প্রণীত ছয় দফার মাধ্যমে। সেই সময় এই ছয় দফাই হয়ে ওঠে ছাত্রলীগের অলিখিত ঘোষণাপত্র। ছয় দফা বাস্তবায়ন করতে ও দেশবাসীকে ছয় দফা সম্পর্কে অবহিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ।

পাকিস্তানের আইয়ুবীয় নীলনকশা আগরতলা মামলায় গ্রেপ্তার বঙ্গবন্ধুর নিঃর্শত মুক্তির দাবিতে ছাত্রলীগ রাজপথে থেকেই জাতির পিতার কারামুক্তি নিশ্চিত করেছে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছাত্রলীগের কপালে আরেকটি রাজটিকা। ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের গণবিস্ফোরণের দিন ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। তিলে তিলে একটি জাতিকে তার সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর অগ্নিঝরা গণ-অভ্যুত্থানের দিন। ঢাকা শহর সেদিন পরিণত হয় শুধুই মিছিলের নগরীতে। 

১৯৬৯ সালের উত্তাল গণ-আন্দোলনে যে গণবিস্ফোরণ ঘটে, তাতে ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতাসীন হন। এরপর মার্শাল ল, রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর বিধি-নিষেধ—সব কিছু উপেক্ষা করে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ ঘরোয়াভাবে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে এবং সুসংগঠিত হতে থাকে। ফলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যেমন নিরঙ্কুশ বিজয় হয়, ঠিক তেমনি ছাত্রলীগের অনেক নেতা জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

এরপর অধিকার আদায়ের চূড়ান্ত সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় সমগ্র বাঙালি জাতিকে। ৩০ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে মুক্তির যে মহাকাব্য রচিত হয় একাত্তরে, সেখানে ছাত্রলীগের ১৭ হাজার নেতাকর্মীর বুকের তাজা রক্ত ও প্রাণ আছে। সেই অমিত প্রাণচঞ্চল ছাত্রলীগ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়ে সংগঠনের প্রত্যেক কর্মী। বিছিন্নভাবে প্রতিবাদ করতে থাকে সারা দেশে আর প্রহর গুনতে থাকে বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরসূরি শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার দেশে ফেরার দিনটির জন্য। হায়েনাদের মুখে জাতির পিতার পবিত্র রক্তের দাগ তখনো আছে, হায়েনারা অপেক্ষা করছে বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার জন্য। শ্বাপদসংকুল বাংলাদেশে নেত্রী যখন ফিরলেন তখন প্রাণ ফিরে পেল ছাত্রলীগ। শেখ হাসিনার ভ্যানগার্ড হিসেবে সব সময় কর্তব্যরত থাকে ছাত্রলীগ। শুরু হলো প্রিয় নেত্রীর নেতৃত্বে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সংগ্রাম, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই, ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। এর মধ্যেই বন্যার্ত মানুষের জন্য কাজ করা এবং সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ করতে হয়েছে ছাত্রলীগকে। সব অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার মাধ্যমে মূলত একাত্তরের পরে সাধারণ জনগণ আরেকটি বিজয়ের স্বাদ পায়। এই বিজয়ের গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশের জনগণ, এই বিজয়ের গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পাঁচ বছর পর এই ছাত্রলীগকেই চরম মূল্য দিতে হয়েছে বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে। অত্যাচার আর নির্যাতনের খড়্গ নেমে আসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ওপর। তবে জেল-জুলুম আর গুম করে বিএনপি-জামায়াত বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে দুর্বল করতে পারেনি। দেশরত্ন শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতাকর্মী শরীরের শেষ রক্তবিন্দুটুকুও যে দিতে পারে, তার প্রমাণিত স্বাক্ষর ছাত্রলীগ রেখেছে ওয়ান-ইলেভেনে। সব চড়াই-উতরাই পার হয়ে আওয়ামী লীগ যখন দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মানবতাবিরোধী অপরাধী তথা যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে রাজপথে থেকেছে শত শত দিন ও রাত। পাশাপাশি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামায়াতের আগুনসন্ত্রাস ও দেশব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ছাত্রলীগ রাজপথে থেকে মোকাবেলা করেছে।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শিক্ষাবান্ধব ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের শিক্ষাবান্ধব ভূমিকার কারণেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রলীগের জনপ্রিয়তা ঈর্ষণীয়। 

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ মানবতার ফেরিওয়ালা হিসেবে যুগ যুগ ধরে কাজ করছে। বিগত কয়েক বছর যে কয়টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে, প্রতিটি বিপর্যয়ের পরেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের রোহিঙ্গা সংকটেও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ত্রাণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম বিশ্ব গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।

আমাদের সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন আমাদের উন্নয়নের পথে যাত্রা অব্যাহত রাখার নির্বাচন। সুতরাং বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে ক্যারিসমেটিক সংগঠক হিসেবে তরুণ শেখ মুজিবের কর্মকাণ্ডকে অনুসরণ করতে হবে। তরুণ শেখ মুজিব যেকোনো কর্মকাণ্ডে ব্যাপক জনসমর্থন পেতেন। এর পেছনের কারণ হচ্ছে তাঁর আচরণ, তাঁর কাজ, তাঁর সততা। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকেও তাই নিজ এলাকায় ও শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে আচরণ, কাজ ও সততার মাধ্যমে প্রিয় হতে হবে। ছাত্রলীগের প্রত্যেক সদস্যকে বঙ্গবন্ধুকে জীবনের আদর্শ মেনে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে—রাজনীতি করব মানুষের স্বার্থে, আদর্শের স্বার্থে। মনে মনে বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে নিজ এলাকায় এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন তার কারণেই ছাত্রলীগ শুধু নয়, আওয়ামী লীগও তার এলাকায় মানুষের মন জয় করতে পারে। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সারা দেশে নিজ নিজ এলাকায় বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবনে তাঁর নিজ এলাকায় যেভাবে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, সেভাবে রাজনীতি করছে বলেই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রলীগের শতভাগ নেতাকর্মী জাতির পিতার কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারা দেশে কাজ করছে এবং করবে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বর্তমান প্রজন্ম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেনি। তবে বর্তমান প্রজন্ম পেয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে। ছাত্রলীগকে তিনি বঙ্গবন্ধুর মতো করেই আদর করেন, স্নেহ করেন, প্রেরণা দেন, সাহস জোগান, দিকনির্দেশনা দেন। প্রিয় নেত্রীর মধ্যেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগ খুঁজে পায় জাতির পিতার সব গুণ।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণকল্পে এবং বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়তে সদাপ্রস্তুত। জাতির পিতার নিজ হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ তাঁর সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও নির্দেশনায় এগিয়ে চলেছে নির্ভয়ে নিশ্চিত গন্তব্যে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সবাইকে জানাই ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মুজিবীয় শুভেচ্ছা।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় হোক দেশরত্ন শেখ হাসিনার।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com