logo
আপডেট : ৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ২১:৫৬
স্মরণ
সাহসী একটি নাম বেগম মমতাজ হোসেন

সাহসী একটি নাম বেগম মমতাজ হোসেন

১৯৮৬ সালে বিটিভিতে বেগম মমতাজ হোসেনের সঙ্গে খ ম হারূন

১৯৮৫। বিটিভির জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’ সবে শেষ হয়েছে। মামুন ভাই (আবদুল্লাহ্ আল মামুন) ডেকে একটা পাণ্ডুলিপি হাতে দিলেন। একটি ধারাবাহিকের প্রস্তাব—ইমদাদুল হক মিলনের ‘নায়ক’। প্রস্তুতি পর্ব শুরু করতে যাব, এমন সময় খালেদা ফাহমী আপা খবর দিলেন। তিনি তখন পরিচালক (অনুষ্ঠান), আর মামুন ভাই নাটক বিভাগের প্রধান। দুজনই আমাকে অনেক স্নেহ করতেন। খালেদা আপার রুমে গেলে তিনি ‘সকাল সন্ধ্যা’র নাট্যকার বেগম মমতাজ হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। খালেদা আপা বললেন, ‘তোমাকে বেগম মমতাজ হোসেনের একটি ধারাবাহিক করতে হবে। এই নাও স্ক্রিপ্ট।’ নাড়াচাড়া করে দেখলাম, নাম ‘শুকতারা’। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। এরই মধ্যে ইমদাদুল হক মিলনের সঙ্গে স্ক্রিপ্ট নিয়ে বসেছি একাধিকবার। খালেদা আপাকে বললাম। তিনি মামুন ভাইকে ফোন দিয়ে ‘নায়ক’-এর দায়িত্ব অন্য কাউকে দিতে বললেন এবং আমাকে ‘শুকতারা’ প্রযোজনার দায়িত্ব দিতে বললেন। জানালেন, এই ধারাবাহিকটি একজন মুক্তিযাদ্ধা প্রযোজককেই নির্মাণ করতে হবে। এভাবেই বেগম মমতাজ হোসেনের সঙ্গে আমার পরিচয়।

মমতাজ আপার সঙ্গে সেই সময় থেকে আলাপ হলেও তিনি আমার সম্পর্কে জানতেন, আমিও জানতাম। আমার স্ত্রী জেবু ছিল তাঁর ছাত্রী, যখন তিনি আজিমপুর অগ্রণী স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে অনেক আগে থেকেই তিনি বিটিভির সঙ্গে জড়িত। ‘সকাল সন্ধ্যা’র মাধ্যমে নাট্যকার হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি অনেক বেড়ে যায়। এরপর ‘শুকতারা’। ধারাবাহিকটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির ওপর, তাই এই নামকরণ। তিনি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের শুকতারার সঙ্গে তুলনা করতেন। আমি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেক কাজ করেছি এবং এ বিষয়ে কাজ করতে চাই, তাই ‘শুকতারা’ নির্মাণে যথেষ্ট শ্রম দিয়েছি। শিল্পী ও কলাকুশলীদের কাছ থেকেও প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছি। কারণ অবশ্যই মমতাজ আপা। তিনি সবাইকে পারিবারিক আবহে সংগঠিত করতে পেরেছিলেন।

ধারাবাহিকটি যখন প্রচারিত হয়, সময়টি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের অনুকূলে ছিল না। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কৌশলে আমরা কাজটি করতে থাকি। ‘শুকতারা’র প্রধান নারী চরিত্রের নাম হাসিনা। বেগম মমতাজ হোসেন নিজেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতাজ আপার আন্তরিকতা ছিল, আর যোগাযোগ তো ছিলই। এরশাদের সামরিক শাসনামলে এত কঠিন একটা চ্যালেঞ্জ তিনি হাতে নেন। হাসিনা চরিত্রে অভিনয় করতেন রওশন আরা হুসেন। শুনেছি ওই চরিত্রের জন্য যে শাড়ি নির্বাচন করতেন, তা সরবরাহের উৎস শুধু মমতাজ আপা জানতেন, পরে আমি জেনেছি অন্যভাবে।

একজন আর্মি অফিসার ‘শুকতারা’ প্রিভিউ করতেন সামরিক নির্দেশে। ক্যাপ্টেন সাহেবের সঙ্গে আমার বেশ সখ্য হয়। ‘শুকতারা’ নির্মাণ শেষে একসময় তিনি বিটিভি থেকে অন্যত্র পোস্টিং নিয়ে চলে যান। তখন আমাকে ডেকে বলেন, “হারূন ভাই, আমি ইচ্ছা করলে নাটকটি বন্ধ করে দিতে পারতাম। হাসিনা নামটি আপনারা কেন ব্যবহার করেছেন আমি জানি। জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’র অনেক কিছুই নাটকে এনেছেন। সব জেনেও চুপ করে থাকতাম। কারণ আমি আপনাদের সাহসিকতায় মুগ্ধ।’ জানি না এই ভদ্রলোক এখন কোথায় আছেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়টা সব সময় টিভি দর্শকদেরও খুব কাছে টানত। এখানে একটা আবেগের ব্যাপার আছে। ফলে ধারাবাহিকটি যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২৬ পর্বের এই ধারাবাহিকের প্রতি পর্ব এক ঘণ্টার, ৬০ থেকে ৬২ মিনিটের মধ্যে।

বেগম মমতাজ হোসেনের সঙ্গে তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যোগাযোগ ছিল। কোথাও দেখা হলে হাত ধরে কাছে নিয়ে বসাতেন। পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করতেন। নানা উপদেশ-পরামর্শ দিতেন। তাঁর মনে কষ্ট ছিল অনেক। শেষ জীবনে অনেকটা একা হয়ে পড়েছিলেন। ৫০ বছর বয়সে তাঁর একমাত্র ভাই মুক্তিযোদ্ধা-চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবির যখন (২০ জানুয়ারি ১৯৮৯) নগরবাড়ী ঘাটে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলেন, তখন মমতাজ আপা কতটা ভেঙে পড়েছিলেন তা দেখেছি। আলমগীর কবিরের কাছে চলচ্চিত্র নির্মাণে দীক্ষা নিয়েছিল মমতাজ আপার একমাত্র সন্তান খালিদ মাহমুদ মিঠু। চারুকলায় ডিগ্রি নিয়ে সে যোগ দিয়েছিল বিটিভিতে, চিত্রগ্রাহক হিসেবে। বেশিদিন সে বিটিভিতে ছিল না। চিত্রগ্রাহক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও চিত্রশিল্পী হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছিল। ‘গহীনে শব্দ’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা পরিচালকের জাতীয় পুরস্কারও পায়। ২০১৬ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ধানমণ্ডিতে এক দুর্ঘটনায় মারা যায় মিঠু, মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টের। মমতাজ আপাও মেনে নিতে পারেননি। মিঠুর মৃত্যুর পর মমতাজ আপা শুধু মনের দিক থেকেই নয়, শারীরিক দিক থেকেও ভেঙে পড়েন। অবশেষে ৭৭ বছর বয়সে তিনি চিরশান্তির দেশে পাড়ি জমান ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭। একজন সাহসী মানুষ চিরবিদায় নিলেন আমাদের কাছ থেকে।

 

খ ম হারূন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com