logo
আপডেট : ২ জানুয়ারি, ২০১৮ ২২:০৪
স্মৃতির শহর
আপনি কি সত্যিই স্বাধীন, নিজেকে আগে প্রশ্ন করুন
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
খ্যাতিমান সংগীত ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যিক

আপনি কি সত্যিই স্বাধীন, নিজেকে আগে প্রশ্ন করুন

ছবি : মঞ্জুরুল করিম

কলকাতা থেকে আমরা ঢাকায় আসি ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে। আমার বয়স তখন ১০। ছিলাম নারিন্দায় ৭৭ ঋষিকেশ দাস লেনে। বাড়ির সামনেই ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট ছিল। বড় ভাই সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল, বোন কণ্ঠশিল্পী ফেরদৌসী রহমান ও আমি খেলতাম। পেছনে ছিল দোলাইখাল। সেই খালটা ছিল তখন উত্তাল সমুদ্রের মতো। ঘণ্টায় পাঁচ টাকা ছিল নৌকাভাড়া। সন্ধ্যাবেলায় প্রায়ই মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নৌকা ভ্রমণে বের হতাম। অপূর্ব সুন্দর ছিল সেই স্মৃতির শহর। নতুন ঢাকায় ছিল কৃঞ্চচূড়া আর মেহগনি এভিনিউ। দুই দিকে কৃঞ্চচূড়া, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে রাস্তা। আমি পৃথিবীর বহু দেশে গেছি। কিন্তু এত সুন্দর দৃশ্য দেখিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল বিরাট বিরাট শিশু ও অর্জুনগাছ। তার মধ্য দিয়ে আমরা যেতাম। আর ছিল পুকুর। পুকুরের পাড়ে বসে আমি গান গাইতাম। চারদিকে ছিল সবুজের সমারোহ। সেন্ট গ্রেগরিজের ছাত্র ছিলাম। সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১৩তম স্থান অধিকার করেছি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হয়েছি।

কলকাতায় যিনি ছিলেন ধনী, ঢাকায় এসে হলেন খড়িওয়ালা! ছিল লাকড়ি ও কেরোসিনের চুলা। গ্যাসের চুলা ছিল না। আমি নিজেই কাঠ কিনেছি। দুই টাকা ছয় আনায় এক মণ কাঠ। তখন ঢাকায় সাংস্কৃতিক জীবন বলতে কিছুই ছিল না। বাবা আব্বাসউদ্দীন ছিলেন সে সময়কার একজন স্বনামধন্য শিল্পী। তাঁর প্রতিদিন চার-পাঁচটা অনুষ্ঠান থাকত। সেই লোক ঢাকায় এসে পড়ে গেলেন একেবারে অথৈ সাগরে। সেখানে কোনো সাহিত্যসভা নেই। গান-বাজনা নেই। আবৃত্তি নেই। বসন্ত উৎসব বলে একটা উৎসব শুরু করা হলো। সেটা হলো পাতলা খাঁর গলিতে। যেখানে আমরা পরে চলে এসেছিলাম। আমাদের পরবর্তী সময়ে পুরানা পল্টনের বাড়িতেই প্রথম পহেলা বৈশাখের সূচনা হয়েছিল। সেখানে বেগম সুফিয়া কামাল, ড. কুদরাত-এ-খুদা, আবু জাফর শামসুদ্দীনসহ অনেকেই ছিলেন। বাড়ির নাম ছিল হীরামন মঞ্জিল। সেটা এখন আর নেই। নাট্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনাও হয়েছিল আমাদের এই বাড়িতে। তুলসী লাহিড়ীর লেখা নাটকে অভিনয় করেছিলাম বাবা ও আমি। সেখানে ঢুলির অভিনয় করতে গিয়ে আমি ঢোল বাজিয়েছি কৌতুক অভিনেতা সাইফুদ্দিনের সঙ্গে। আমার চাচা ছিলেন স্বনামধন্য আবদুল করিম। ঢাকার অধিবাসীরা উর্দু ও হিন্দি উভয় ভাষায়ই কথা বলত। আমি উর্দু, আরবি, ফারসি লিখতে ও পড়তে জানি। যা আমার প্রথম বই ‘মোহাম্মদের নাম’সহ আরো অনেক বই লিখতে সহায়তা করেছে। বর্তমানে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যান্ড আব্বাসউদ্দীন রিসার্চ অ্যান্ড স্টাডি সেন্টার, ইনডিপেনডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কাজ করছি। পরহেজগারী ও সুফি ঘরানার ছবক পেয়েছি পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে। ভোরবেলা আব্বার সুললিত কণ্ঠে নামাজের ধ্বনি শুনে আমাদের ঘুম ভাঙত। বৃহস্পতিবার রাতে হালকায়ে জিকির হতো। নারিন্দার পীর সাহেবের ওইখানে বড় জিকিরের মাহফিল হতো। তখনকার হাক্কানি পীররা কোনো টাকা-পয়সা নিতেন না। ভবিষ্যদ্বাণী করতেন না। এখনো সেটা চালু আছে। সে সময়ে ঢাকার হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করার মতো। সে সময়কার প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ‘উই অয়্যার দ্য অনলি হিন্দু লাভিং মুসলিম ইন দ্য হোল ওয়ার্ল্ড’।

একজন নাগরিক হিসেবে বর্তমান ঢাকায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রাণ ভরে বিশুদ্ধ বায়ু সেবন করা। নিঃশ্বাস নেওয়া। বাড়ি বাড়ি মানুষ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এমন অনেক অসুখ যার নামও আমরা এর আগে শুনিনি। বর্তমান গুলশানের বাসা থেকে রিসার্চ সেন্টারে পড়াতে যেতে সর্বোচ্চ পাঁচ-সাত মিনিট লাগার কথা। অথচ কখনো কখনো দেড় ঘণ্টায়ও পৌঁছতে পারি না। নগরপিতা আনিসুল হক এই সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে নিজেই মৃৃত্যুমুখী হলেন। নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানে বয়োজ্যেষ্ঠ গুণী মানুষদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু গুণী মানুষরা অগ্রাহ্য। দোলাইখাল এখন নিশ্চিহ্ন। এটা ছিল জলপথে বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে ঢাকা শহরের প্রধান সংযোগ। ঢাকার প্রাণভোমরা। খাল না হলে শহর নিঃশ্বাস নিতে পারে না। শহরের নিঃশ্বাস হলো পুকুর। শহরের নিঃশ্বাস হলো খাল-বিল। অথচ সব খাল-বিল ভরাট হয়ে গেছে। দখল হয়ে গেছে। এ রকম একটা সময়ে হাতিরঝিলে লেক তৈরির আইডিয়াটা নিঃসন্দেহে চমৎকার। কিন্তু বিষাক্ত পানির মধ্যে লেক হয়ে কী করবে? সব বর্জ্য ওইখানে গিয়ে পড়ছে। সেখানে তো বসাই যায় না। এটা কী ধরনের পরিকল্পনা? পানি হতে হবে এমন, যেখানে ওজু করা যাবে। যে কারণে বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা করেও সেখানে এখন ট্যুরিস্টদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। এখনকার তরুণ-তরুণীদের বেশির ভাগই কোনো বিষয়ে পরিপূর্ণ মনোনিবেশ করে না। দেখা হলে হয়তো বলল, আপনার বইটা অনেক ভালো লেগেছে। কোন অংশটা ভালো লেগেছে এমন প্রশ্নের জবাবে বলবে, প্রচ্ছদটা না চমৎকার হয়েছে। অনুষ্ঠানে গান শুনে এসে বলবে, গানের অনুষ্ঠানটা না দুর্দান্ত ছিল। কী গান শুনেছ জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে, গায়িকার শাড়িটা না একদম ব্যতিক্রমী!

শহরের বড় অংশজুড়ে অবস্থান করছে ক্যান্টনমেন্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বড় সরকারি অফিসগুলো ঢাকা থেকে স্থানান্তর করতে হবে। এমনকি সচিবালয়কেও ঢাকার বাইরে নিয়ে যেতে হবে। কলকাতায় তারা তাই করেছে। এটা খুব কঠিন কাজ নয়। একটা নির্বাহী আদেশেই তা সম্ভব। কলকাতার মতো একটা ঘিঞ্জি-নোংরা শহরকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চমৎকার শহরে পরিণত করেছেন। তারা অসংখ্য উড়াল সেতু করেছে। আমাদের দু-তিনটি তৈরি করেই বড় বড় সাইনবোর্ড! এই পায়খানাটি উদ্বোধন করবেন অমুক! ছিঃ ছিঃ, একটা পায়খানা উদ্বোধন করা কি মেয়রের কাজ? আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে দুর্নীতি। ভাই, ভাইকে মারছে। স্ত্রী, স্বামীকে মারার ষড়যন্ত্র করছে। ভারতীয় বিভিন্ন চ্যানেল দেখে, বাড়িতে বাড়িতে এই ষড়যন্ত্র শিখছে। আমাদের রয়েছে শ্রেষ্ঠ ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালি গানসমৃদ্ধ চ্যানেল এবং ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক। অথচ এই চ্যানেলগুলো, গানগুলো তারা প্রচারের অনুমতি দেয় না। অন্যদিকে আমরা কি তাদের চ্যানেলগুলোর প্রচার বন্ধ রাখতে পেরেছি? আমাদের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদের লেখা ভারতে প্রমোট করা হয় না। অথচ আমরা অবলীলায় তাদের পত্রিকা ও সাহিত্যিকদের প্রমোট করি। এভাবে আমরা আমাদের নিজেদেরই জব্দ করছি। পুরো বিশ্বে আমরা পতাকা উড়ানোর রেকর্ড স্থাপন করছি। ফ্ল্যাগ তো প্রথমে মনে। আপনি কি সত্যিই স্বাধীন, নিজেকে আগে প্রশ্ন করুন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সত্যিকার দেশপ্রেমিক। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে এ ধরনের মানুষের আর দেখা মিলেনি। এখন আমার প্রত্যেক বন্ধু ‘এজেন্ট অব ইন্ডিয়ান বিজনেস’। আগে ছিল ‘এজেন্ট অব পাকিস্তানি বিজনেস’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিউজিক ডিপার্টমেন্ট হয়েছে। ভারত সরকার তা প্রতিষ্ঠা করতে সহযোগিতা করেছে। সেখানে আব্বাসউদ্দীন, আব্দুল আলীম, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু, ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর কোনো ছবি নেই! আমরা আগে মানুষ হই, বাঙালি হই। সত্যিকারার্থে স্বাধীন হই। তারপর না হয়, বড় বড় পতাকা উড়াব।

 

গ্রন্থনা : হোসাইন মোহাম্মদ জাকি

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com