logo
আপডেট : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০২:০৯
ডাম্পিং গ্রাউন্ড নেই বর্জ্য নিয়ে ভোগান্তি

ডাম্পিং গ্রাউন্ড নেই বর্জ্য নিয়ে ভোগান্তি

ডাম্পিং গ্রাউন্ড না থাকায় নারায়ণগঞ্জ মহানগরের বাসা বাড়ির বর্জ্য এভাবেই সড়কের পাশে ফেলা হয়। এর ফলে আশপাশের বাসিন্দারা দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

নারায়ণগঞ্জ মহানগরে বাসা-বাড়ির বর্জ্য নিয়ে বাসিন্দাদের ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নিয়োজিত বর্জ্য অপসারণকর্মীরা প্রতিদিন ময়লা না নেওয়া এ ভোগান্তির কারণ। যদিও সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের দাবি, বাসাবাড়ির বর্জ্য অপসারণের জন্য বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাই বর্জ্য অপসারণ করে থাকে।

মাঠপর্যায়ের বর্জ্য অপসারণের কাজে নিয়োজিতকর্মীদের দাবি, পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় সঠিকভাবে সব বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, বর্জ্য অপসারণের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা নির্ধারিত টাকার অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে কোনো সমন্বয় করতে পারছে না সিটি করপোরেশন।

অন্যদিকে অপসারিত বর্জ্য ফেলার জন্য সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নানা জায়গায়। ফলে ওই এলাকার বাসিন্দা ও পথচারীদের দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (শহর, বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ) মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এর মধ্যে মূল শহরের লোক সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। শহরের প্রতিটি বাসা থেকে গৃহস্থালী বর্জ্য অপসারণে সিটি করপোরেশন কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে এইড বাংলাদেশ, অঙ্কুর, কল্যাণী। প্রতিদিন শহরের বাসাবাড়িতে বর্জ্য উত্পাদিত হয় অন্তত ৩০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন ৩০০ ভ্যানগাড়ির মাধ্যমে শহরের এসব বর্জ্য অপসারণ করা হয়।

বাসিন্দারা বলছেন, এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা প্রতিদিন বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য আনতে যান না। জমে থাকা বর্জ্যের কারণে বাসা ও আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়ায়। তবে মাস শেষে ঠিকই বিল আনতে হাজির হয় কর্মীরা। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিলের পরিবর্তে অতিরিক্ত টাকা দাবি করে তারা। সেটা দিতে গৃহকর্তারা অস্বীকার করলে বর্জ্য অপসারণ বন্ধ করে দেয় পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।

সরেজমিনে শহর ঘুরে জানা গেছে, শহরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গলাচিপা এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ি থেকে চার দিন ধরে বর্জ্য অপসারণ না করায় ভোগান্তিতে পড়ে ওই সব বাড়ির লোকজন। বাসার বাইরে বর্জ্য ফেলারও কোনো সুব্যবস্থা নেই। বাধ্য হয়ে বাসায় তা জমিয়ে রাখতে হচ্ছে। শুধু ১৩ নম্বর ওয়ার্ডই নয়, শহরের ১২, ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডেও একই অবস্থা।

বাসিন্দারা জানায়, একদিন বর্জ্য নিয়ে গেলে পরদিন আর আসে না কর্মীরা।

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রবিবার দুপুরে ময়লা নিয়ে গেছে। গত দুদিন ধরে আর আসছে না। বাসায় বর্জ্য জমে থাকায় দুর্গন্ধ বের হচ্ছে।’

আমলাপাড়া এলাকার সুজিত সাহা বলেন, ‘ময়লা ঠিকভাবে প্রতিদিন নেয় না। একদিন ময়লা নিয়ে গেলে পরের দিন আর আসে না। এভাবে মাসের ১৫ দিনও ঠিকভাবে নেয় না। মাস শেষ হয়ে গেলে যখন বিল নেওয়ার সময় হয় তখন কয়েক দিন ঠিক ময়লা নেয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদিন ময়লা না নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলতে গেলে আরো এক সপ্তাহ কর্মীদের খুঁজে পাওয়া যায় না। আশপাশের বাড়ির ময়লা নেয়, কিন্তু এ বাসায় আসবে না।’

১২ নম্বর ওয়ার্ডের চাষাঢ়া বাগে জান্নাত মহল্লার গৃহবধূ শারমীন জানান, ময়লা নেওয়ার কর্মীরা সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন আসেন না। এতে করে কয়েক দিনের ময়লা জমে বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। তিনি জানান, বাসা থেকে বর্জ্য নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতি মাসে ৭০ টাকা করে নেওয়া হয়। কোনো কোনো বাড়ি থেকে ১০০ টাকাও নেওয়া হয়।

শারমীন বলেন, ‘টাকা দিয়েও আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাই না।’

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা আলমগীর হিরণ বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কর্মীরা বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করেন না। ওয়ার্ডভিত্তিক কিছু এনজিওকে ময়লা নেওয়ার ইজারা দেওয়া হয়েছে। তারাই মূলত কর্মী নিয়োগ দিয়ে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে থাকে। কোনো এলাকায় ঠিকভাবে ময়লা সংগ্রহ না করলে এ বিষয়ে স্থানীয় কাউন্সিলরকে অভিযোগ দেবে, তিনিই সব ব্যবস্থা নেবেন। মূলত প্রতি ওয়ার্ডের কাউন্সিলররাই এর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন।’

১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট ডাম্পিং এলাকা না থাকায় ময়লা অপসারণ ও ফেলতে বিশেষ অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে। অতিরিক্ত বিল আদায়ের বিষয়ে তিনি আরো বলেন, এ ব্যাপারে তিনি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।

 

নগরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সেখানে ময়লা জমে স্তূপ হয়ে আছে। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। ময়লা গড়িয়ে রাস্তায় এসে পড়ছে। ভেকু দিয়ে স্তূপ সমান করা হচ্ছে। সেখানে বাসাবাড়ি থেকে আনা ময়লা ফেলছে ১৫-২০টি ভ্যানগাড়ি।

শহরের ডন চেম্বার থেকে বর্জ্য অপসারণে নিয়োজিত কর্মী মো. মুসা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি প্রায় ১০০টি বাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করি। ক্ষেত্রভেদে সেখান থেকে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বিল আদায় করি।’ সপ্তাহের দুই-এক দিন ময়লা সংগ্রহ না করার কথা তিনি স্বীকার করেন।

চাষাঢ়া উকিলপাড়ায় বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারী মোজাম্মেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গাড়িপ্রতি এনজিও সংগঠন এইড বাংলাদেশকে তিন হাজার টাকা দিই। এ ছাড়া জালকুড়ি এলাকার শাহিনকে প্রতি মাসে গাড়িপ্রতি ৩০০ টাকা করে দিতে হয়।’

জানা গেছে, জালকুড়ি এলাকায় শুধু সিটি করপোরেশনের ময়লাই ফেলা হয় না, সেখানে ফতুল্লার কুতুবপুর, এনায়েতনগর ও ফতুল্লা ইউনিয়নের বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে আনা ময়লাও ফেলা হচ্ছে। ওই এলাকার বাসিন্দাদেরও বর্জ্য সংগ্রহের জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টাকা দিতে হচ্ছে।

কুতুবপুর ইউনিয়নের পেয়ারাবাগানে বর্জ্য অপসারণের কাজে নিয়োজিত আমিনুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখানে ময়লা ফেলতে গিয়ে আমাদের অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়। উত্তেজিত এলাকাবাসী কোনো কোনো সময় আমাদের গাড়ি ভেঙে ফেলে। হুমকি দেওয়া হয়, যাতে ময়লা না ফেলা হয়।’

জালকুড়ি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চা বিক্রেতা মো. হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, গত তিন বছর ধরে এখানে ময়লা ফেলে এলাকার পরিবেশকে দূষিত করে দেওয়া হয়েছে। দুর্গন্ধে এখানে অবস্থান করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।

এ ব্যাপারে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ইস্রাফিল প্রধানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে জালকুড়ি এলাকার কার্যালয়ে গেলে তাঁর সহকারী মো. রনি কালের কণ্ঠকে জানান, কাউন্সিলর চিকিত্সার জন্য ভারত গেছেন।

তবে জালকুড়ি এলাকার শাহিন, যিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন, তিনি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

এইড বাংলাদেশ নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মো. আরিফুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ময়লা অপসারণ কাজে ইনভেস্ট করেছি। গাড়িগুলো আমরা তৈরি করে দিয়েছি। সেখানে আমরা মাসে গাড়িপ্রতি এক হাজার ২০০ টাকা করে নিই।’

কর্মীদের অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার ব্যাপারে আরিফুজ্জামান বলেন, ‘এটা আমাদের জানা নেই।’ তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট ডাম্পিং গ্রাউন্ড না থাকায় ময়লা ফেলতে বিশেষ অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে।

 

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com