logo
আপডেট : ৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:৫০
তরুণদের প্রতি অস্কারজয়ী নাফিস
বুদ্ধিমান হলেই চলবে না, কাজ করতে হবে

বুদ্ধিমান হলেই চলবে না, কাজ করতে হবে

নিজে অস্কার জয় করেছেন। বলেছেন, শ্রম, মনন আর সাহস মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অন্য রকম উচ্চতায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দুইবার অস্কারজয়ী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক  সফটওয়্যার প্রকৌশলী নাফিস বিন জাফর বলেছেন, বাংলাদেশেও হলিউডের মানের চলচ্চিত্র তৈরি সম্ভব, যদি কেউ সত্যিকার অর্থে চায়। এ জন্য গবেষণা, উন্নয়ন, বিনিয়োগ সবই দরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে তাঁকে নিয়ে আয়োজিত বিশেষ সেশন ‘ব্লোয়িং স্টাফ আপ’-এ নাফিস তরুণদের উদ্দেশে আরো বলেন, বুদ্ধিমান হলেই চলবে না, প্রচুর কাজ করতে হবে। ব্যতিক্রমধর্মী কোনো প্রস্তাব পেলে বাংলাদেশি ছবিতেও কাজ করবেন বলে জানান তিনি।

নাফিস অনুষ্ঠানে জানান, তাঁর পরিচালিত একটি সংগঠন ‘সি গ্রাফ’ বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করেছে। সংগঠনটি তরুণদেও অ্যানিমেশনের ওপর ধারণা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেবে। তরুণদের তিনি বলেন, ‘থিয়েটারে কাজ করুন। নাটকে কাজ করুন। প্রথমে ছোট গল্প তৈরি করুন। শট ফিল্ম বানান। প্রয়োজনে টিভিতে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন। কাজ করতে করতে বুঝতে পারবেন আপনার কোন কাজটা ভালো লাগে। একটা নাটক কিংবা ছবিতে শুধু ক্যারেক্টার ছাড়াও পেছনে অনেক কিছু থাকে। সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে। না হলে ভালো ফিল্মমেকার হওয়া যাবে না।’

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের (বিডিওএসএন) সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে আরো নাফিসের জন্ম চাই।’ নাফিস শুরুতেই তাঁর তৈরি করা কিছু ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তুলে ধরে বলেন, কোনো পরিচালক সিনেমার মধ্যে একটা ভবন ধ্বংস করতে চান, তিনি এই কাজের জন্য আমার কাছে আসেন। সতের বছরের বেশি আমি অ্যানিমেশন, ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট নিয়ে কাজ করছি।’

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অ্যানিমেশনের কাজের জন্য যেসব বিষয় জানা দরকার তা তুলে ধরে এই অস্কারজয়ী বলেন, ‘প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ (পাইথন, সি++, এসকিউএল, জাভাস্ক্রিপ্ট, স্কালা জাভা), ডাটাবেইস (ক্যাসেন্ড্রা, পোস্ট্রগ্রেস), সফটওয়্যার (মায়া, মারি, কাটানা, নুক, হুদিনি, অ্যামোল্ড) জানতে হবে।’ তবে এর কোনো নির্ধারিত শর্টকার্ট ফর্মুলা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো প্রোগ্রামিংয়ের সমন্বয়ে একটি অ্যানিমেটেড মুভি কিংবা ইফেক্ট তৈরি হয়।’ নাফিস আরো বলেন, অ্যানিমেশন ফিল্মে বিজ্ঞানের সর্বোত্তম ব্যবহার হয়। এখানে যেমন প্রাফিক্স লাগে, তেমনি লাগে গণিত, জ্যামিতি, ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস। এটা আসলে একটা গল্প বলার মতো। দৃশ্যকল্পগুলোকে সফটওয়্যারে সাজাতে হয়।

নিজের সম্পর্কে নাফিস বলেন, ‘আমি সবচেয়ে ব্রিলিয়ান্ট পার্সন তা সত্য নয়। আমার ইউনিক ট্যালেন্ট হচ্ছে—আমি আর্ট আর ম্যাথ মেশাতে পারি। এই স্কিলটাই আমার ইন্ডাস্ট্রি খুব ভ্যালু করে। এ কারণে অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। এটা অর্জন করতে আমাকে অনেক খাটতে হয়েছে। এর কোনো শর্টকার্ট উপায় নেই, গাইডলাইন নেই। এমনকি কোনো রেসিপিও নেই। শুধু এটাই বলব, বুদ্ধিমান হলেই হবে না, কাজ করতে হবে। প্রচুর কাজ করতে হবে।’ তিনি ভিআর (ভার্চুয়াল রিয়ালিটি) নিয়ে তরুণদের কাজ করতে পরামর্শ দেন। এ ক্ষেত্রে অনেক সুযোগ আছে বলে জানান তিনি।

নাফিস বলেন, হলিউড সিনেমায় আমি বেশ কিছু ফ্লুইড ইফেক্টের কাজ করেছি, যা শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালে ‘পিটার প্যান’ দিয়ে। পরবর্তী সময়ে ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান-৩’ সিনেমায় নতুন ধারার ফ্লুইড ইফেক্ট প্রয়োগ করি, যেটা এ ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করে। এটা তখন আমার মতো সুন্দর করে কেউ করতে পারেনি। কিন্তু পরে আমার এই কাজকে অনেকেই কপি (নকল) করা শুরু করে। তখন আমি আবার নতুন ধারার কাজ শুরু করি। ক্যালিফোর্নিয়া শহর ভেঙে পড়তে দেখা যাবে আমার কাজ করা সিনেমা ‘ডানটেস পিক’-এ।

প্রশ্নোত্তর পর্বে নাফিস অ্যানিমেশনে ক্যারিয়ার গড়তে শুরুতে শর্টফিল্ম, টিভি, থিয়েটারে কাজ করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘সিনেমায় ৫০০ মানুষ একসঙ্গে কাজ করে। আগে আর্টিস্টিক জব স্কিল দরকার। ছোট টিম দিয়ে আগে শুরু করেন। অথবা টেলিভিশন শো করেন। তাহলে বুঝবেন এর পেছনে কত কিছু আছে।’ বাংলাদেশের মতো ছোট বাজারেও বড় কাজের সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে নাফিস বলেন, ‘অনেক সুযোগ আছে, তবে একবারে শীর্ষে ওঠা সম্ভব নয়। এই দেশে হলিউডের মতো বড় ইন্ডাস্ট্রি নেই। তবে ছোট ছোট পদক্ষেপ নিয়ে বড়র দিকে এগিয়ে যেতে হবে।’ হলিউডে কাজ করার জন্য করণীয় কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার কম্পানি ডিজিটাল ডোমেইন যেভাবে কাজ শুরু করে, সেভাবেই করতে পারেন। আপনার আগের কাজ কেমন সেটা দেখাতে হবে। ভালো কাজ থাকলে কেউ না কেউ ডাকবে।’

নাফিস অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি তরুণদের সহায়তায় স্পেশাল ইন্টারেস্ট গ্রুপ অন কম্পিউটার গ্রাফিক্স বা সিগ্রাফের বাংলাদেশ চ্যাপ্টার শুরুর ঘোষণা দেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গতকালই সন্ধ্যায় এটি উদ্বোধন করা হয়েছে।

বাংলাদেশে হলিউডের মতো ছবি কেন হয় না—এমন এক প্রশ্নের জবাবে অসমাধান মেধার অধিকারী এই প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, ‘হয় না, কারণ আপনারা চান না। চাইলে অবশ্যই সম্ভব। এখানে প্রচুর গবেষণা ও উন্নয়ন, বিনিয়োগ দরকার। সরকারিভাবে আমেরিকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সিনেমা তৈরিতে নানা সুবিধা দেওয়া হয়। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার একজন শিক্ষক আমাকে ফান্ড জোগাড় করে দিয়ে সহায়তা করেন। এখানেও সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।’

বাংলাদেশ নিয়ে নিজের কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও দর্শকদের প্রশ্নের উত্তরে স্বীকার করেন নাফিস। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমি হলিউডকে চিনি, আমেরিকাকে চিনি। কিন্তু বাংলাদেশের এক্সপার্ট নই। তাই এখানে আমার পক্ষে ভালো করা সম্ভব নয়। কিন্তু কেউ যদি ভালো কোনো আইডিয়া নিয়ে আসে আমি কাজ করতে চাই।’ তিনি তরুণ ফিল্ম মেকারদের উদ্দেশ করে বলেন, ‘আগে কাজটিকে ভালোবাসতে হবে। এখানে সরকারও আপনাকে অনুদান দিতে পারে। যদি আপনার আইডিয়া ক্রিয়েটিভ হয়।’

নাফিস প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ২০০৭ সালে বিশ্বের সিনেমা জগতের সর্বোচ্চ পুরস্কার অস্কার জেতেন। হলিউডের ‘পাইরেটস অফ দ্য ক্যারিবিয়ান : অ্যাট ওয়ার্ল্ডস অ্যান্ড’ চলচ্চিত্রে ফ্লুইড অ্যানিমেশনের জন্য সায়েন্টিফিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল বিভাগে ডিজিটাল ডোমেইন নামে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস ডেভেলপার কম্পানির হয়ে দুই সহকর্মীর সঙ্গে নাফিস এ পুরস্কার জেতেন। এরপর ‘২০১২’ মুভিতে প্রথম ড্রপ ডেস্ট্রাকশন টুলকিট ব্যবহারের জন্য ‘একাডেমি অ্যাওয়ার্ড অব সায়েন্স-২০১৪’ পুরস্কার পান তিনি। এরপর ট্রান্সফরমারের প্রতিটি সিরিজ ও ২০১৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অগম্যান্ট’সহ ২০টিরও বেশি ছবিতে এটি ব্যবহার করা হয়েছে। নাফিসের জন্ম ১৯৭৮ সালের ৮ অক্টোবর, ঢাকায়। তার বাবার নাম জাফর বিন বাশার এবং মায়ের নাম নাফিসা। তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী ও পাপেট নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ারের ভাতিজা এবং প্রয়াত কবি ও লেখক গোলাম মোস্তফার নাতি।

শুরু ‘সিগ্রাফ ঢাকা’ : গতকাল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নাফিসের উপস্থিতিতেই এক অনুষ্ঠানে ‘সিগ্রাফ ঢাকা চ্যাপ্টার’ উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। মন্ত্রী এ সময় দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশ দ্রুত ডিজিটাল যুগে ভালোভাবে জায়গা করে নিচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি সারা বিশ্বের সামনে আমাদের তরুণদের দুয়ার খুলে দিয়েছে।’ নাফিস বলেন, তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন ও বিকাশে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। অনেকেই ভালো কাজ করছে।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন অগ্নিরথ স্টুডিওস-এর প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও জুবায়ের কাওলিন। আয়োজকরা জানান, সিগ্রাফ নিউ ইয়র্কভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এটি কম্পিউটার গ্রাফিকস এবং ইন্টার‌্যাক্টিভ টেকনিক নিয়ে কাজ করে। লস অ্যাঞ্জেলেস, লন্ডন, হংকং, ম্যানিলা, ব্যাংককসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরো সিগ্রাফ চ্যাপ্টার সক্রিয় রয়েছে।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com