logo
আপডেট : ২ মে, ২০১৭ ২২:০৮
খুঁড়ে দেখা ইতিহাস
তুরাগ হাউস বোট থেকে বুড়িগঙ্গা ভাসমান হোটেল

তুরাগ হাউস বোট থেকে বুড়িগঙ্গা ভাসমান হোটেল

ভাসমান নৌকা দিয়ে বানানো ‘ফরিদপুর মুসলিম হোটেল’টির অবস্থান রাজধানী ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতে। মাত্র ৩০ টাকা হলেই কাটানো যাবে এক রাত। বুড়িগঙ্গা নদীর বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ১১০টি ভাসমান হোটেল ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেসব এখন হারিয়ে গেছে। ছবি : শেখ হাসান

১৯২৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে এসে উঠেছিলেন বুড়িগঙ্গার তুরাগ হাউস বোটে। স্বচ্ছসলিলা বুড়িগঙ্গার চেয়ে আর ভালো পরিবেশ পাননি নোবেল বিজয়ী বিশ্ববরেণ্য এই সাহিত্যিক। ঢাকা সফরের রাতগুলো কাটিয়েছিলেন তিনি নবাবদের ভাসমান হোটেলে। সেই রাজকীয় হাউস বোট না থাকলেও বুড়িগঙ্গায় রয়ে গেছে কিছু ভাসমান হোটেল। খেটে খাওয়া কিংবা স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ সেসব হোটেলে রাত যাপন করে। বর্তমানে তিন-চারটি ভাসমান নৌকায় ফরিদপুর মুসলিম হোটেল নামের এই হোটেল চললেও একসময় হিন্দু নামে বেশ কয়েকটি হোটেল চলত। মাত্র ৩০ টাকায় সেসব হোটেলে রাত যাপন করা যেত। আর এ খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর এটাকে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা হোটেল আখ্যায়িত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

গোলাম মোস্তফা মিয়া নামের এক ব্যক্তি বর্তমানে ভাসমান হোটেলটি চালাচ্ছেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে এটা করছেন। তাঁর এই ভাসমান হোটেলে বিছানা রয়েছে মোট ৪৮টি। সেখানে দিনভিত্তিক ছাড়াও মাসভিত্তিক সিট ভাড়া দেওয়া হয়। মূলত ব্যবসায়িক কাজে ঢাকায় আসা ব্যক্তিরা এখানে রাত কাটায়। অনেকে মাসের পর মাস এখানে থাকে। কারণ যে টাকা দিয়ে তিনটি বেনসন সিগারেট খাওয়া যায় না, সেই টাকায় একটি হোটেলে রাত যাপন করা যায়! এর চেয়ে সস্তা হোটেল পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এ ধরনের তথ্য ও ছবি দিয়ে একাধিক ফিচার ইংল্যান্ডভিত্তিক দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফ ও ডেইলি মেইলে ছাপা হলে বিষয়টি বিশ্ববাসীর দৃষ্টিগোচর হয়। তাদের লেখায় হোটেলটিকে বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা আবাসিক হোটেল আখ্যা দিয়ে বলা হয়, একটি চকোলেটের দামে ঢাকায় ভাসমান হোটেলে রাত যাপন করা যায়। এ সংবাদ প্রকাশের পর ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী নতুন করে আলোচনায় আসে। ঢাকা নিয়ে অনেক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সিম্পসন রোডের প্রবীণ ব্যবসায়ী ইন্দ্রনাথ চক্রবর্তী বলেন, ‘আমি ৫০ বছর ধরে বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী সদরঘাটে ব্যবসা করছি। আমার বাড়ি গৌরনদীর বাটাজোর গ্রামে। ব্যবসায়িক কাজে প্রায়ই ঢাকায় আসতে হতো। নৌকায় মালামাল নিয়ে সদরঘাট আসতাম। গয়নার নৌকা থেকে মাল খালাস হতে ১০ থেকে ১২ দিন সময় লেগে যেত। এ সময়টা আমি বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর ভাসমান হোটেলে থাকতাম। সেসব হোটেল হিন্দুরা চালাত বলে তার নাম ছিল হিন্দু। যেমন—আদর্শ হিন্দু হোটেল, লক্ষ্মী পাইস হিন্দু হোটেল, শরীয়তপুর হিন্দু হোটেল, নারায়ণগঞ্জ হিন্দু কেবিন প্রভৃতি। বুড়িগঙ্গা নদীর বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের ১১০টি ভাসমান হোটেল ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেসব হোটেল হারিয়ে গেছে। টিকে আছে মাত্র ফরিদপুর মুসলিম হোটেলটি।’

মুন্সীগঞ্জের কমলাঘাটের ব্যবসায়ী হরিপদ সাহা বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে বাবার সঙ্গে ঢাকায় এসে এক টাকা দিয়ে সেসব হোটেলে রাত যাপন করতাম। পরে সেটা বেড়ে দু-তিন টাকা হয়। সর্বশেষ পাঁচ টাকা ভাড়ায় সেখানে থেকেছি। তখন সেসব ভাসমান হোটেলে শুধু থাকাই যেত না, ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার টাকা ম্যানেজারের কাছে জমা রাখতেন। এমনকি মূল্যবান জিনিসপত্র, যেমন—সোনা-রুপাও গচ্ছিত রাখতেন। বাড়ি ফেরার সময় সেসব মূল্যবান জিনিস ও টাকা ফেরত দেওয়া হতো।

একসময় অনেক বিদেশি পর্যটক শখ করে এসব ভাসমান হোটেলে থাকত। এমনকি সেখানে খাওয়াদাওয়াও করত। নদীর জ্যান্ত মাছ ও নদীতীরবর্তী টাটকা শাক-সবজি দিয়ে এসব ভাসমান আবাসিক হোটেলে বিশেষ ধরনের ব্যঞ্জন রান্না করা হতো। ইলিশ মাছ ও দেশি মুরগির ঝোল তরকারি একবার খেলে অনেক দিন মনে থাকত। এসব যারা রান্না করত তাদের মামা বলে ডাকা হতো। বেশির ভাগ মামাই মেয়েলি আচরণ করত। কেউ কেউ হিজড়া স্বভাবের ছিল। তবে তাদের বেশ হাতযশ ছিল। বুড়িগঙ্গার পাশে বাকল্যান্ড বাঁধে কথা হয় কলেজপড়ুয়া ইমন আকবরের সঙ্গে। তিনি বুড়িগঙ্গায় ভাসমান হোটেল দেখতে এসে হতাশা প্রকাশ করে বললেন, ‘যেভাবে বুড়িগঙ্গা দূষণের শিকার হয়েছে তাতে সেখানে বাস করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পচা পানির দুর্গন্ধে ভাসমান হোটেল ব্যবসার পরিবেশ নেই বললেই চলে। এর পরও অল্প ভাড়ার কারণে সেখানে অনেকেই থাকতে আসে। অনেক পর্যটক এ ধরনের হোটেলের খোঁজ করে। এটা আশার কথা।’

ঐতিহাসিক তথ্য ঘেঁটে জানা যায়, একসময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা ঢাকায় এসে আবাসন সংকটে পড়ত। অনেকেই আর্থিক কারণে হোটেলে থাকতে পারত না। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে কিছু হিন্দু ব্যবসায়ী পিনিস নৌকাকে ভাসমান হোটেল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করে। প্রাথমিকভাবে সেটা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে বুড়িগঙ্গায় এ ধরনের হোটেলের একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত এই ধারা টিকে ছিল। একাত্তরের পর হিন্দু ব্যবসায়ীরা দল বেঁধে দেশ ত্যাগ করায় ভাসমান হোটেল ব্যবসায় ভাটা পড়ে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হাউস বোট থেকেই নৌকায় ভাসমান হোটেলের চিন্তা-ভাবনা আসে। অতীতে ভাগ্যকুলের কুণ্ডু জমিদার ও ঢাকার নবাবদের একাধিক রাজকীয় প্রমোদতরি বুড়িগঙ্গায় ভাসমান অবস্থায় থাকত। এসব প্রমোদতরি বিভিন্ন রাজকীয় অতিথি কিংবা রাষ্ট্রীয় সফরে ব্যবহৃত হতো। এর মধ্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ সালে ঢাকায় এসে কুণ্ডুদের প্রমোদতরি এবং ১৯২৬ সালে নবাবদের হাউস বোট ব্যবহার করেছিলেন। তা ছাড়া ব্রিটিশদের প্রমোদতরি মেরি এন্ডারসন পরে পাগলা ঘাটে ভাসমান রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কয়েক বছর আগে আগুনে ওই ঐতিহাসিক প্রমোদতরিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। উল্লেখ্য, ১৬০৮ সালে (মতান্তরে ১৬১০) সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করে তাঁর সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতীকে সেখানে পাঠান। চাঁদনী নামের একটি প্রমোদতরিতে করে তিনি দলবলসহ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নামেন। সেই স্থানটি পরে ইসলামপুর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর যেখানে চাঁদনী প্রমোদতরি রাখা হতো সেটার নামকরণ হয় চাঁদনীঘাট। এখনো চাঁদনীঘাট রয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে কোনো প্রমোদতরি নোঙর করে না।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com