logo
আপডেট : ১৮ এপ্রিল, ২০১৭ ২১:৪৯
জৌলুশ হারাচ্ছে বাণিজ্যমেলা

জৌলুশ হারাচ্ছে বাণিজ্যমেলা

আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় মেলায় দর্শনার্থী কমছে বলে আয়োজকদের ধারণা। ছবি : রবি শংকর

... দর্শক কমছে প্রতিবছর। ২৫ বছর ধরে অনুষ্ঠিত মেলাটিতে ২০১৪ সালে রেকর্ডসংখ্যক ৩০ লাখ দর্শনার্থী প্রবেশ করেছিলেন। সেই সংখ্যা গত বছর কমে ২২ লাখে নেমেছে। এটি বেসরকারি উদ্যোগে দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যমেলা বলে আয়োজকদের দাবি ...

 

নগরীর পলোগ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা দিন দিন জৌলুশ হারাচ্ছে। অন্য বাণিজ্যমেলার তুলনায় বৈচিত্র্য না থাকায় প্রতিবছর দর্শক কমছে। ২৫ বছর ধরে আয়োজিত মেলাটিতে ২০১৪ সালে রেকর্ডসংখ্যক ৩০ লাখ দর্শনার্থী প্রবেশ করেছিলেন। সেই সংখ্যা গত বছর কমে ২২ লাখে নেমেছে। এটি বেসরকারি উদ্যোগে দেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যমেলা বলে আয়োজকদের দাবি।

কেন দর্শনার্থী কমছে?-জানতে চাইলে মেলা আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম চেম্বারের

সিনিয়র সহসভাপতি নুরুন নেওয়াজ সেলিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত নই। তবে মেলার সময় আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় এবং কাছাকাছি সময়ে একাধিক মেলা হওয়ার কারণে দর্শক কমতে পারে।’

ঢাকা বাণিজ্যমেলায় ৪৮টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও চট্টগ্রামে এদের অংশগ্রহণ নামমাত্র কেন?-কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমন্ত্রণ জানাই কিন্তু তাঁদের অনেকে আসেন না। কানেকটিভিটির কারণে হয়তো এটা হয়। আগামীতে আরো বেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে আমরা চেষ্টা চালাব।’

মেলার আয়োজক চট্টগ্রাম চেম্বারের হিসাবে, ২০১০ সালে বাণিজ্য মেলায় দর্শক ছিল ২০ লাখ। সেই সময় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল রেকর্ডসংখ্যক ৪০০টি। আর স্টল ও প্যাভিলিয়ন ছিল ৩৪০টি। ২০১১ সালে দর্শকসংখ্যা একটু বেড়ে ২০ লাখ ২০ হাজারে উন্নীত হয়। আর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে ৩০০ এবং স্টল ও প্যাভিলিয়ন সংখ্যা কমে হয়েছে ৩১০টি। ২০১২ সালে দর্শক একই থাকলেও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরো কমে ২৮০ তে পৌঁছায়। স্টল ও প্যাভিলিয়ন সংখ্যা কমে হয় ৩০০টি। ২০১৩ সালে দর্শক প্রবেশ একটু বেড়ে সাড়ে ২০ লাখ হলেও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্টল ও প্যাভিলিয়ন একই ছিল। ২০১৪ সালে দর্শক প্রবেশ হঠাৎ বেড়ে ৩০ লাখে উন্নীত হয়। আর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্টল ও প্যাভিলিয়নে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সর্বশেষ ২০১৬ সালে দর্শক কমে ২২ লাখে নামে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ও স্টল ও প্যাভিলিয়নের সংখ্যা ছিল ৩০০টি।

দর্শক কেন কমছে? এর উত্তরে জানা গেছে, বছরজুড়ে চট্টগ্রামে আয়োজিত হয় আরো তিনটি বাণিজ্যমেলা। এসব মেলার আয়োজক চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার, চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চিটাগাং কসমোপলিটন। এছাড়া বিজয়মেলা, এসএমই ফেয়ারসহ অনেক মেলা চলে বছরজুড়ে। সব কটি মেলার বৈশিষ্ট্য একই থাকায় ঘুরেফিরে একই প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিয়ে থাকে। এসব মেলায় অংশগ্রহণের জন্য এক ধরনের ব্যবসায়ী তৈরি হয়েছে, যাঁরা সব মেলায় একই পণ্য একই দামে বিক্রি করে থাকেন।

১৯ মার্চ মেলা শুরুর ২৭ দিন পর গত রবিবার প্রথমবারের মতো মেলায় আসেন জান্নাতুল মোস্তফা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে সব মেলায় ঘুরেফিরে একই পণ্য পাওয়া যায়, দামেও কোনো হেরফের নেই। তবে এই মেলায় একসাথে অনেক প্রতিষ্ঠান থাকায় একটু বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু তাতেও কোনো নতুনত্ব চোখে পড়ে না।’

মেলার একাধিক ব্যবসায়ী কালের কণ্ঠকে বলেন, বাণিজ্যমেলায় দর্শক কমে যাওয়ার পিছনে সময়টাও একটা ফ্যাক্টর। গত কয়েক বছর ধরে এই মেলা আয়োজনের সময় বৃষ্টি ও কালবৈশাখী চলে আসছে। এবারও সেটা হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা বেচাকেনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যাঁদের অনেকে পরবর্তীতে মেলায় আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

মেলায় থাইল্যান্ডের প্যাভিলিয়নে আগে অনেক বৈচিত্র্য ছিল। কিন্তু এখন ওই প্যাভিলিয়নে থাকা সব পণ্য নগরীর যেকোনো মার্কেটে মেলার চেয়ে কমদামে পাওয়া যায়। ফলে টেক্সিভাড়া দিয়ে কেন এখানে পণ্য কিনতে আসব-এমন প্রশ্ন অনেক ক্রেতার। তাঁদের মতে, শপিং মল থেকে কিনলে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তাঁকে ধরতে পারব। আর মেলার ব্যবসায়ীদের ধরার সেই সুযোগ নেই।

রবিবার বিকেলে মেলা ঘুরে দেখা গেছে, মেলার মাঝখানে ১২টি প্যাভিলিয়ন ও মিনি প্যাভিলিয়নের মধ্যে ছয়টি হলো আরএফএল ও প্রাণ গ্রুপের। পুরো মেলায় এই গ্রুপের ১৪টি স্টল ও প্যাভিলিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে সবচে ভিড় ছিল প্লাস্টিক ও প্রাণ প্যাভিলিয়নে। সেখানকার বিক্রয়কর্মী সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুরো মেলায় এক কোটি টাকার বিক্রির টার্গেট রয়েছে আমাদের। কিন্তু মেলার মাসখানেক হতে চলল, টার্গেটের অর্ধেকও অর্জিত হয়নি। অথচ ঢাকায় তিন কোটি টাকা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ায় ২৫ দিনেই।’

মেলায় বিদেশি প্যাভিলিয়নে পাকিস্তানি, ইরানি ও ভারতীয় পণ্য থাকার কথা বলা হলেও সেগুলোর কোনো বিশেষত্ব নেই। দুবাই প্যাভিলিয়নে যা রাখা হয়েছে সেসব পণ্য একেবারে গতানুগতিক। এর পরও প্রচুর মানুষের ভিড় দেখা গেছে। এবার মেলায়

সবচেয়ে বেশি ক্রেতা প্রবেশ করেছেন পহেলা বৈশাখ। এর সংখ্যা প্রায় এক লাখ। মেলা আয়োজকরা জানান, সেইদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পুরো মেলা নিরাপত্তার জন্য বন্ধ রাখা হয়। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত এক লাখ দর্শক প্রবেশ করেন। আয়োজকরা জানান, আগামী ২৭ মার্চ পর্যন্ত মেলা চলতে পারে।

জানা গেছে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ১৩ লাখ ৭৩ হাজার বর্গফুট জায়গাজুড়ে হয় সরকারি উদ্যোগে। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ওই মেলায় ছিল ৫৭৭টি স্টল ও প্যাভিলিয়ন। যার মধ্যে ৪৮টি প্রতিষ্ঠান বিদেশি। মেলাটি হচ্ছে ২২ বছর ধরে। প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। তবে ছোটদের জন্য ২০ টাকা।

আর চট্টগ্রাম চেম্বারের উদ্যোগে বেসরকারিভাবে ২৫ বছর ধরে হচ্ছে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা। চার লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে এই মেলার প্রবেশ মূল্য অন্তত ১০ বছর ধরেই ১০ টাকা নির্ধারিত আছে। 

ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, বেসরকারি উদ্যোগে দেশের সবচেয়ে বড় চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা ব্যতিক্রমী করার কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। আয় করাই যেন মুখ্য উদ্দেশ্যে পরিণত হয়েছে। এর ফলে মেলাটি জৌলুশ হারিয়ে চট্টগ্রামের অন্য বাণিজ্যমেলার মতো গতানুগতিক হয়ে পড়ছে।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com