logo
আপডেট : ২৪ মার্চ, ২০১৬ ১৬:০১
ব্রাসেলস হামলায় বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশির মুখে শুনুন রোমহর্ষক বর্ণনা

ব্রাসেলস হামলায় বেঁচে যাওয়া এক বাংলাদেশির মুখে শুনুন রোমহর্ষক বর্ণনা

ব্রাসেলসের জাভেনতেম বিমানবন্দরে বোমা বিস্ফোরণে ভাগ্যগুণে বেঁচে গেছে এক বাংলাদেশি পরিবার। কয়েক সেকেন্ডের জন্য তারা রক্ষা পান। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন সে পরিবারের সদস্য ইকবাল হোসেন বাবু। দীর্ঘদিন ধরে ব্রাসেলসের এক্সেল এলাকার বাসিন্দা ইকবাল হোসেন বাবু পেশায় একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী।

গতকাল টেলিফোন আলাপে তিনি বলেন, 'আমাদের বেঁচে যাওয়া জাস্ট মিরাকল। কাল আমাদের নামও থাকতে পারতো হতাহতের তালিকায়। আল্লাহই বাঁচিয়ে দিয়েছেন'। বাবু জানান, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ব্রাসেলসে বসবাস করেন তিনি। ঘটনার দিন সকাল ১০টায় কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে দেশে যাচ্ছিলেন তার ছোট ভাই, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও তাদের এক সন্তান। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী দেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেশে ফিরছিলেন। ছোট ভাইয়ের পরিবারকে বিদায় জানাতে ব্রাসেলসের জাভেনতেম বিমানবন্দরে এসেছিলেন বাবু।

বাবু জানান, সকালে ফ্লাইট থাকায় বাসায় তাদের নাস্তা করা হয়নি। বোর্ডিং পাস সম্পন্ন হওয়ার পর টার্মিনালের ভেতরেই ব্রাসেলস এয়ারলাইন্সের পাশে একটি ক্যাফেতে যান তারা। নাস্তার পর তারা টার্মিনালের ভেতরে দুর্ঘটনাস্থলে একটি এয়ারলাইন্স কাউন্টারের সামনে অপেক্ষা করছিলেন। সময় তখন ৮টার কাঁটা ছুঁইছুঁই। বাবু জানান, বিস্ফোরণের দু-তিন মিনিট আগে তার ভাতিজা বাথরুমে যাবার কথা বললে ছোট ভাই ও তার স্ত্রী বাথরুমে যান। দেশে আরেক ছোট ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন বাবু। মোবাইলে কথা বলতে বলতে তিনিও এক বোতল পানি কিনতে পাশের ক্যাফের দিকে যান। মিনিটখানেক পরই হঠাৎ বিকট এক বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে বিমানবন্দর।

বাবু জানান, ঘটনার আকস্মিকতায় থমকে দাঁড়ান তিনি। কম্পনের কারণে প্রথমে মনে করেছিলেন হয়তো বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটেছে। পেছনে ফিরে দেখেন আমেরিকান এয়ারলাইন্সের কাউন্টারের পাশে যেখানে তারা অপেক্ষা করছিলেন সেদিকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেছে। ২০-৩০ সেকেন্ডের মাথায় ফের বিস্ফোরণের বিকট শব্দ। এবার উল্টো দিকে ব্রাসেলস এয়ারলাইন্সের কাউন্টারের পাশে। মুহূর্তেই বুঝতে পারলেন ভূমিকম্প নয় সংঘটিত হয়েছে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ।

ভয়বহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বাবু বলেন, টার্মিনালের ভেতরে আহতদের আর্তচিৎকার, প্রাণভয়ে ছুটোছুটি মিলিয়ে ততক্ষণে বিমানবন্দরে সৃষ্টি হয়েছে এক মর্মন্তুদ পরিবেশ। অটোমেটিক ডোর দিয়ে অন্য অনেকের মতো তিনিও দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান। কিন্তু ভেতরে ছোট ভাইসহ তার পরিবারের পরিণতির কথা চিন্তা করে তিনিও কেঁদে ওঠেন হাউমাউ করে। ফোন দেন ছোট ভাইয়ের নম্বরে। ভাগ্য ভালো বিস্ফোরণের সময় তারা ছিলেন বাথরুমেই। ফোন ধরে ছোট ভাই জানতে চাইলো এমন বিকট শব্দ কেন? কী হয়েছে? বাবু পাল্টা প্রশ্ন করেন, ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ও তার ছেলে কেমন আছে? ততক্ষণে তারা সবাই একত্রে মিলিত হয়েছেন। স্বজনরা বেঁচে আছেন জানার পর তিনি কাঁদতে কাঁদতে ফোন দেন দেশে এবং ব্রাসেলসে অবস্থানরত স্বজনদের। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে তিনি ফের অটোমেটিক দরজার কাছাকাছি অবস্থান নেন। বাবু জানান, ঘটনার পর বিভিন্ন ভাষায় আহত যাত্রী ও তাদের স্বজনদের আর্তচিৎকার আর হাহাকারে ভারী হয়ে উঠেছিল বিমানবন্দরের পরিবেশ। নানা ভাষায় তখন সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দটি ছিল হেল্প।

বাবু বলেন, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। একটু আগেও যারা বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিতে টার্মিনালে অপেক্ষায় ছিলেন মুহূর্তের মধ্যেই কারও হাত নেই, কারও পা নেই। চারদিকে শুরু হয়েছে ছুটোছুটি। কেউ রক্তাক্ত অবস্থায় কাতরাচ্ছেন। রক্তাক্ত অবস্থায় কেউ কেউ বেরিয়ে আসছেন অন্যের সহায়তায়। কারও মাথায় গেঁথে আছে ভেঙে পড়া কাচের টুকরো। কারও সারা শরীর থেকে বেয়ে পড়ছে রক্ত। তখনও জানতে পারিনি ভেতরে কতজন মারা গেছেন।

বাবু জানান, সকাল বেলায় ব্রাসেলসে কিছুটা ঠাণ্ডা ছিল। অনেকেই তাদের শরীরের শীতের কাপড় খুলে আহতদের জড়িয়ে দিচ্ছিলেন। দ্রুত বিমানবন্দরে এসে পৌঁছে অ্যাম্বুলেন্স আর চিকিৎসক। ভিড় জমে ওঠে পুলিশ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন সংস্থার লোকজনের। চিকিৎসকরা আহতদের চিকিৎসা দিচ্ছেন আর সুস্থদের নানা প্রশ্ন করছেন পুলিশ ও সাংবাদিকরা। সে এক অন্যরকম পরিবেশ, পরিস্থিতি তখন বিমানবন্দরে।

বাবু জানান, ছোট ভাইসহ তার পরিবার বেঁচে আছে জেনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছিলাম। আর ভেতরে যাবার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। আমি বারবার ফোন দিচ্ছিলাম ছোট ভাইকে। কিন্তু ততক্ষণে বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরা ফের বিস্ফোরণের ভয়ে ভেতরে অপেক্ষমাণ যাত্রী ও তাদের স্বজনদের সরিয়ে নেয় রানওয়ের পাশে খোলা জায়গায়। সেখানেও পৌঁছে গেছেন বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার লোকজন। তারা চিকিৎসা ও খাবার দিচ্ছিলেন। আতঙ্ক কাটাতে মানসিকভাবে উদ্দীপনা দিচ্ছিলেন। ওই অবস্থায় কেটে গেছে প্রায় চার ঘণ্টা। ছোট ভাইয়ের পরিবারকে ছাড়া বাসায় ফিরতে পারেননি তিনি। চার ঘণ্টা পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীদের সহায়তায় তারা বেরিয়ে আসার পর সবাই বাসায় ফিরেছেন। উল্লেখ্য, ইকবাল হোসেন বাবুর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর গ্রামে। তার পিতার নাম হাজি মৌলানা বরকত উল্লাহ। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি ব্রাসেলসে বসবাস করছেন। ব্রাসেলসে তিনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। ইকবাল হোসেন বাবু বিএনপি বেলজিয়াম প্রবাসী শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক।

বোমা বিস্ফোরণের পর ব্রাসেলসের পরিবেশ-পরিস্থিতির ব্যাপারে ইকবাল হোসেন বাবু জানান, বিমানবন্দরে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণের পর তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয় সকল বিমানের ফ্লাইট। নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিমান যোগাযোগসহ বাস, মেট্রোরেল, ট্রামসহ সব ধরনের যান চলাচল। গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টায় (বাংলাদেশ সময় বিকাল সাড়ে ৫টা) কথা বলার সময় পর্যন্ত সবধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে ব্রাসেলসে। বিশেষ করে যেসব যানবাহনে বেশি লোকজনের সমাগম হয় তার সবই বন্ধ রাখা হয়েছে। বোমা বিস্ফোরণের পর থেকে ব্রাসেলসের রাস্তাঘাটে লোকজনের আনাগোনা কমে গেছে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া কেউ রাস্তায় বের হচ্ছেন না।

সম্পাদক : ইমদাদুল হক মিলন,
নির্বাহী সম্পাদক : মোস্তফা কামাল,
ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ লিমিটেডের পক্ষে ময়নাল হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বসুন্ধরা, বারিধারা থেকে প্রকাশিত এবং প্লট-সি/৫২, ব্লক-কে, বসুন্ধরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, ঢাকা-১২২৯ থেকে মুদ্রিত।
বার্তা ও সম্পাদকীয় বিভাগ : বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, প্লট-৩৭১/এ, ব্লক-ডি, বারিধারা, ঢাকা-১২২৯। পিএবিএক্স : ০২৮৪০২৩৭২-৭৫, ফ্যাক্স : ৮৪০২৩৬৮-৯, বিজ্ঞাপন ফোন : ৮১৫৮০১২, ৮৪০২০৪৮, বিজ্ঞাপন ফ্যাক্স : ৮১৫৮৮৬২, ৮৪০২০৪৭। E-mail : info@kalerkantho.com