kalerkantho


রাজার বন্ধু মৌমাছি

শেখ আবদুল হাকিম

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রাজার বন্ধু মৌমাছি

অঙ্কন : মানব

রাজা সলোমন ছিলেন তাঁর সময়ে গোটা জগতের সব জ্ঞানীর মধ্যে সেরা। পবিত্র নগরী জেরুজালেমে তিনি একটা দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন। প্রাসাদের সঙ্গে ছিল ভারি সুন্দর বাগান।

প্রতিদিন সকালে ফুলবাগানের মাঝখানে বসে মনে শান্তি পাওয়ার আশায় প্রার্থনা করতেন রাজা। কিন্তু রোদ ঝলমলে এক সকালে তাঁর খুব রাগ হলো এবং তিনি হতভম্ব হয়ে পড়লেন। কী ব্যাপার? না, একটা মৌমাছি সরাসরি তাঁর রাজকীয় নাকে কুটুস করে কামড় বসিয়ে দিয়েছে!

‘উফ্!’ চেঁচিয়ে উঠলেন রাজা, অনুভব করলেন তাঁর নাক ফুলে ডালিমের মতো বড় হয়ে গেছে। ‘একটা মৌমাছির এত স্পর্ধা যে আমার নাক কামড়ে দেয়!’

এখন, যেমনটা প্রচলিত ছিল, রাজা সলোমন সব পশু-পাখির ধরন-ধারণ খুব ভালো বুঝতেন, এবং এমনকি ওগুলোর ভাষাও তাঁর জানা ছিল। তারপর যখন দেখতে পেলেন খুব ছোট এক মেয়ে মৌমাছি টকটকে লাল এক গোলাপের ভেতর লুকিয়ে বসে আছে, তিনি তখন ওটাকে বললেন, ‘তুমি আমার নাকে কামড় দিয়েছ কেন?’

ছোট্ট মৌমাছি খুব ভয় পেল। ‘ও রাজা, দয়া করে আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।’ বলল সে। ‘ওটা ছিল সত্যি সত্যি একটা দুর্ঘটনা। মিষ্টি লাল গোলাপ থেকে মধু সংগ্রহ করার জন্য চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম আমি, ওগুলোই আমার বিশেষ পছন্দ, এই সময় মনে হলো ভারি সুন্দর একটা গোলাপ দেখতে পেয়েছি, তাই সোজা ওটার দিকে ছুটে যাই। কী করে আমি বুঝব ওটা ছিল রোদ লেগে লাল হয়ে থাকা আপনার নাক?’

খুদে মৌমাছির গল্প শুনে হেসে ফেললেন রাজা। তাঁর রাগ পানি হয়ে গেল। ‘তুমি এখন শান্তিমতো নিজের পথে যেতে পারো, ছোট্ট খুকি।’

‘ধন্যবাদ, ধন্যবাদ,’ বলতে বলতে ডানা ঝাপটে খুশি মনে উড়াল দিল মৌমাছি, যাওয়ার সময় বলে গেল, ‘সুযোগ পেলে কোনো একদিন আপনার জন্য ভালো কিছু একটা করব আমি।’

রাজার মন থেকে দ্রুতই অদৃশ্য হলো ছোট্ট মৌমাছি, কারণ তাঁর মাথায় অনেক চিন্তা। শিবার মহীয়সী রানি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন।

রানি রাজপ্রাসাদে আগমনের পর পরই রাজা বুঝতে পারলেন এই নারী পরীক্ষা করে দেখতে চান তিনি সত্যি সত্যি একজন জ্ঞানী মানুষ কি না। রাজাকে তিনি পরীক্ষা করতে চান সারা দুনিয়ার সবচেয়ে জটিল আর কঠিন ধাঁধার মধ্যে ফেলে।

শিবার রানি প্রথমে প্রশ্ন করলেন, ‘কোন পানি আকাশ থেকে পড়ে না, আবার পাহাড়ি বরফ থেকেও নামে না? পানিটা মধুর মতো মিষ্টি হতে পারে, আবার হতে পারে ওষুধের মতো তিতা, অথচ ওই পানি সব সময় একই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে।’

রাজা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন, ‘উত্তর হলো চোখের পানি। আমরা যখন আনন্দে থাকি, চোখের পানি হয় মিষ্টি; কিন্তু আমরা যখন দুঃখ পাই বা শোক পালন করি, চোখের পানি হতে পারে খুবই তিতা। অথচ এই পানি সব সময় একই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে—আমাদের চোখ থেকে।’

‘বাহ্, দারুণ!’ বললেন রানি। তারপর তিনি ৬০ জন শিশুকে ডাকলেন, এদের সবাইকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তিনি।

শিশুরা দরবারে প্রবেশ করতে রানি বললেন, ‘এখানে যত শিশু আছে তাদের সবার বয়স এক, তারা সবাই পরেও আছে একই রকম আলখেল্লা। মহামান্য রাজা, আপনাকে বলতে হবে এদের মধ্যে কারা মেয়ে আর কারা ছেলে?’

রাজা সঙ্গে সঙ্গে এক বস্তা সুস্বাদু বাদাম নিয়ে আসার হুকুম করলেন। সেই বস্তা থেকে প্রত্যেক শিশুকে মুঠোভর্তি করে বাদাম উপহার দেওয়া হলো। ছেলেরা তাড়াতাড়ি তাদের আলখেল্লা তুলে ভেতরে পরা প্যান্টের পকেটে বাদামগুলো রেখে দিল। আর মেয়েরা তাদের আলখেল্লাকে পোঁটলা বানিয়ে সেই পোঁটলায় ভরে রাখল নিজেদের বাদাম। ‘এখন ব্যাপারটা জানা গেল’, শিশুদের দিকে হাত তুলে রাজা বললেন। ‘এখন যে কেউ বলতে পারবে কারা ছেলে আর কারা মেয়ে।’

‘আমি কি আরো একটা প্রশ্ন করতে পারি?’ রানি অনুরোধ করলেন। তিনি সবচেয়ে কঠিন ধাঁধাটা শেষবার ছাড়বেন বলে রেখে দিয়েছেন।

‘হ্যাঁ, অবশ্যই,’ বললেন রাজা।

রানি তালি বাজালেন, অমনি দরবারে প্রবেশ করলেন ৪০ জন রাজকীয় শিল্পী। প্রত্যেকের হাতে ভারি সুন্দর একটা করে লাল গোলাপের তোড়া। রানি হাসলেন। ‘শুধু একটা তোড়া আসল গোলাপ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে,’ তিনি রাজাকে বললেন  ‘আপনাকে শুধু ওই তোড়াটি খুঁজে বের করতে হবে।’

রাজার কপালে চিন্তার রেখা ফুটল। এই শেষ ধাঁধার উত্তর তিনি কিভাবে দেবেন? এই সময় শুনতে পেলেন ছোট্ট এক মৌমাছি তাঁকে ডাকছে। এ হলো সেই মৌমাছি, যেটা তাঁর নাকে কামড় দিয়েছিল! খুদে মৌমাছি ফুলের তোড়াগুলোর দিকে উড়ে এলো, তারপর ঠিক মাঝখানের তোড়াটা লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল। গোলাপের ভেতর থাকা মধুর গন্ধ খুঁজে পেতে ওটার কোনো অসুবিধাই হয়নি। রাজা শিবার রানির দিকে ভদ্রতাসূচক মাথা নোয়ালেন, তারপর হেঁটে গিয়ে নির্দিষ্ট তোড়াটা হাতে নিয়ে বললেন, ‘এই গোলাপগুলোই আসল।’

এরপর রাজা একটু ভোঁ ভোঁ আওয়াজ করলেন, যেটা একা শুধু ছোট্ট মৌমাছি শুনতে পেল—‘সাহায্য করার জন্য ধন্যবাদ, প্রিয় বন্ধু। অনেক অনেক শুভেচ্ছা।’

(ঐতিহাসিক ইহুদি গল্প)

 



মন্তব্য