kalerkantho


প্রাচীন আফ্রিকার গল্প

এক টুকরা বড় আকাশ

শেখ আবদুল হাকিম

অঙ্কন : মানব   

৮ জুন, ২০১৮ ০০:০০



এক টুকরা বড় আকাশ

অনেক অনেক প্রাচীন যুগে এমন একটা রাজ্য ছিল, যেখানে খাদ্য গ্রহণ করার জন্য বীজ বপন করতে হতো না, কষ্ট করে ফসলও কাটতে হতো না। রান্নার কাজে সাহায্য করার জন্য পানি বা কাঠ বয়ে নিয়ে আসতে হতো না শিশুদেরও। মানুষের যখন খিদে পেত তখন তারা হাত উঁচু করে নাগালের মধ্যে থাকা এক টুকরা আকাশ ভাঙত, তারপর সেটা তারা খেয়ে নিত। আকাশ খেতে ছিল খুবই সুস্বাদু।

ওই রাজ্যের রাজা ছিলেন ওবা। রাজা তাঁর প্রজাদের নিয়ে সারা বছর ধরে অনেক উত্সব করতেন, তুমুল নাচ-গান হতো, খাওয়াদাওয়াও হতো প্রচুর। কিন্তু আকাশ দিন দিন খুব খেপে উঠছিল। কারণ প্রজারা যতটুকু খেতে পারে তার চেয়ে অনেক বেশি নষ্ট করছিল। তারা ভাঙা আকাশের রয়ে যাওয়া অংশ আবর্জনা হিসেবে এক জায়গায় স্তূপ করে রেখে দিত।

এক সকালে আকাশ ঝলমল করার বদলে কালো অন্ধকার হয়ে গেল। বিশাল সব মেঘ রাজা ওবার প্রাসাদ ঢেকে ফেলল। তারপর আকাশ বজ্রকণ্ঠে বলল, ‘ওবা, আমি তোমাকে সাবধান করছি। তোমার প্রজারা যদি আমার উপহার অপচয় করে, খাওয়ার জন্য কিন্তু ওই আকাশ আর ওখানে থাকবে না।’

রাজা ওবা সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেলেন। সবখানে লোক পাঠালেন তিনি, তারা ঢাকঢোল পিটিয়ে গোটা রাজ্যের মানুষকে জানিয়ে দিল, এখন থেকে কেউ যেন আকাশ অপচয় না করে, শুধু খিদে লাগলেই তারা যেন খায়।

এর পর বহুদিন তারা নিয়মটা মেনে চলল। তারপর চলে এলো বড় একটা উত্সবের সময়। রাজ্যের সেরা নর্তকীরা নাচতে এলো রাজধানীতে, পথে পথে নাচছে আর গাইছে সবাই; এমনকি রাজা ওবাকেও নাচতে দেখা গেল। এই বার্ষিক উত্সব একনাগাড়ে বেশ কয়েক দিন চলল। রাজা তাঁর কর্মচারীদের সাহায্যে নজর রাখছেন কেউ যাতে অহেতুক আকাশের অপচয় না করে, যার যতটুকু প্রয়োজন সে যেন ঠিক ততটুকুই খায়। কিন্তু উত্সবের একেবারে শেষ দিনে অ্যাডেসে নামের এক মহিলা ও তার স্বামী ওটোলো রাজার সঙ্গে উত্সবে যোগ দিতে রাজধানীতে এসে হাজির হলো। অ্যাডেসে এমন এক মহিলা, যে সব সময় আরো চায়। নিজের গলায় সে এত বেশি প্রবালের মালা পরেছে যে ওগুলোর ভারে ভালো করে হাঁটতে পারে না। অথচ তার পরও ওগুলো আরো পেতে চায় সে। আর অ্যাডেসে সত্যি সত্যি খেতেও খুব ভালোবাসে।

রাজার প্রাসাদে খুব ভালো সময় কাটল অ্যাডেসের, খুশি মনে স্বামী ওটোলোর সঙ্গে বাড়ি ফিরল সে। ‘কী সুন্দর সময়টা কাটল, সত্যি,’ ভাবল অ্যাডেসে। ‘কী ভালো ড্রাম বাজল, নাচ হলো, গান হলো, খাওয়া হলো—আহ্, রাজবাড়ির খাবার এত মজা লাগল!’

অ্যাডেসের যেই মনে পড়ল আকাশ খেতে খুব মজা, অমনি তার খিদে পেয়ে গেল। হাত উঁচু করে বড় একট টুকরা আকাশ ভাঙল সে। কিন্তু আগে থেকেই ভর্তি হয়ে আছে তার পেট, অত বড় টুকরার একটা কোনাও সে খেতে পারল না। ‘এটা আমি কী করলাম?’ চেঁচিয়ে উঠল অ্যাডেসে। ‘ওটোলো, এদিকে এসো, আকাশের একটা কণাও অভুক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা চলবে না, কাজেই তুমি এটা খেয়ে নাও।’ ওটোলো চেষ্টা করল, কিন্তু তার পেটও তো ভরা। এর পর তাদের বাচ্চাদের ডাকা হলো, বলা হলো আকাশের এই টুকরাকে খেয়ে শেষ করো বাছারা। কিন্তু তারাও দু-একটা কামড় দিয়ে জানিয়ে দিল, তাদের পক্ষে আর খাওয়া সম্ভব নয়। অগত্যা শেষ পর্যন্ত প্রতিবেশীদের অনুরোধ করা হলো। তারা এলো ঠিকই; কিন্তু আকাশের টুকরাটা এত বড় যে তারাও খেয়ে শেষ করতে পারল না, অ্যাডেসের হাতে তার পরও রয়ে গেল এক টুকরা আকাশ। অবশেষে সে বলল, ‘মাত্র এক টুকরাই তো, এটা ফেলে দিলে কী আর হবে?’ টুকরাটা সে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দিল, তারপর পুরো স্তূপটা মাটি খুঁড়ে পুঁতে ফেলল, যাতে কেউ দেখতে না পায়।

হঠাৎ করে শোনা গেল প্রচণ্ড সব শব্দ। পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিয়ে চারদিকে বাজ পড়ছে, রাজা ওবার প্রাসাদের মাথায় বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, অথচ আকাশে এতটুকু মেঘ নেই। ‘ওবা, মহাশক্তিধর রাজা!’ বজ্রকণ্ঠে ডেকে উঠল আকাশ। ‘তোমার প্রজারা আমাকে শ্রদ্ধা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই এখন আমি তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি বহু দূরে।’

‘আমরা তাহলে খাব কী? আমার প্রজারা বাঁচবে কিভাবে?’ চিত্কার করে জানতে চাইলেন ওবা।

‘তোমরা সবাই মাঠে কাজ করতে আর শিকার করতে শেখো’—উত্তর দিল আকাশ। ‘হয়তো তখন তোমরা শিখবে উপহার কখনো অপচয় করতে হয় না।’

আর সেদিন থেকেই খাদ্য জোগাড় করতে সব মানুষকে কাজ করতে হচ্ছে। ওদিকে আকাশ সরে গেছে বহু দূরে, মানুষের নাগালের অনেক বাইরে, ঠিক আজ যেমনটি দেখতে পাচ্ছি আমরা।



মন্তব্য