kalerkantho


ও জোনাকি, কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ

জোনাকির মতো অদ্ভুত পোকা আছে কমই। আর এদের সম্পর্কে অবাক করা সব তথ্য দিয়ে তোমাদের চমকে দেবেন অমর্ত্য গালিব চৌধুরী

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ও জোনাকি, কী সুখে ওই ডানা দুটি মেলেছ

খৈয়াছড়া ঝরনার কথা শুনেছ? চট্টগ্রামের এক জঙ্গলের মধ্যে আছে এই ঝরনা। ওই ঝরনাটায় গিয়েছিলাম। ফিরতে ফিরতে রাত। দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটে আসার সময় একটু ভয় ভয় লাগছিল শুরুতে, অন্ধকার চারদিকে।

কিন্তু একটু পরই ঠাহর করে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তার দুই পাশে মিটিমিটি জ্বলছে অসংখ্য আলো। এই জ্বলছে এই নিভছে। কী ওগুলো? হ্যাঁ, ওগুলো জোনাকি পোকা। গ্রামে-গঞ্জে, জঙ্গলে এমনকি শহরেও নিশ্চয় তোমাদের অনেকেই দেখেছ এই পোকাটি!

পোকামাকড়ের প্রতি মানুষের একটা স্বভাবজাত ঘৃণা কাজ করে। কিন্তু জোনাকি পোকা ব্যতিক্রম। টিমটিমে আলো জ্বেলে ঘুরে বেড়ানো এই পোকাটির প্রতি মানুষের, বিশেষ করে ছোটদের কৌতূহলের শেষ নেই। তবে পোকাটির সঙ্গে পরিচিত হলেও আমরা জানি না কিভাবে এই আলো জ্বলে, কেনই বা জ্বলে। শুধু তা-ই নয়, পোকাটি হাতে নিয়ে দেখেছে—এমন লোকের সংখ্যাও কমই বলা চলে।

এই যে জীবন্ত কোনো পোকা আলো ছড়াচ্ছে, এটাকে কেতাবি ভাষায় বলে বায়োলুমিনেসেন্স। জোনাকি পোকার পেটের নিচের অংশে এক রকমের রাসায়নিক উৎপন্ন হয়। আলোটা মূলত এই রাসায়নিকের কীর্তি। হলুদ, সবুজ অথবা হালকা লাল রঙের আলো ছড়ায় এই রাসায়নিক পদার্থ। এই রাসায়নিক বা এর থেকে উৎপন্ন আলো কিন্তু নিতান্তই নিরীহ স্বভাবের। কোনো রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এ থেকে ছড়ায় না। ম্যাগনেসিয়াম, অক্সিজেন আর লুসিফেরাস নামের এক ধরনের এনজাইমের প্রভাবে তৈরি হয় এই আলো।

বাসাবাড়িতে যেসব বৈদ্যুতিক বাল্ব জ্বলে, সেগুলো আলো দেয় ঠিকই; কিন্তু একটা বাল্ব হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করেই দেখো, হাত পুড়ে যাবে। কারণ এই বাতিগুলো যে পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি গ্রহণ করে, তার ৯০ শতাংশই তাপে রূপান্তরিত হয়, মাত্র ১০ শতাংশ পরিণত হয় আলোতে। জোনাকি পোকারা সেদিক দিয়ে খুবই দক্ষ, মোট শক্তির সম্পূর্ণটাই আলোতে পরিণত করে এরা। এক বিন্দুও নষ্ট হয় না।

বিশেষ করে যারা গ্রামে থাকে, তাদের আলো ছড়ানো জোনাকিদের দেখার সৌভাগ্য হয় বেশি। গ্রামের ছোট ছেলে-মেয়েরা কাচের বোতলে বা কৌটায় পোকাটি ধরে রেখে দেয়। রাতে কাচের বোতলে যখন ওগুলো জ্বলতে থাকে, দেখতে দারুণ লাগে। অবশ্য এভাবে এদের বন্দি না করাই ভালো।

জোনাকি পোকার একটি দুটি নয়, মোটমাট হাজার দুয়েক প্রজাতি আছে। সবাই যে আলো ছড়ায় তাও না। অনেক প্রজাতি দিনে ঘুরে বেড়ায়, আলোও ছড়ায় না। আবার কিছু আছে, রাতে বের হয় শুধু। তবে আলো ছড়াক বা না ছড়াক, কাছ থেকে জোনাকি পোকা দেখলে কিন্তু বেশ দমে যেতে হবে। রাতে জ্বলজ্বলে পোকাটি দেখতে ভারি সুন্দর দেখালেও এরা কিন্তু একদম সাদামাটা। বাদামি-কালো রঙের, অনেকটা গুবরে পোকার মতো গোলগাল।

কেন জোনাকি পোকা আলো ছড়ায় এ নিয়ে কম মাথা ঘামানো হয়নি। নানা রকম কারণ বের করা হয়েছে এই বৈশিষ্ট্যের পেছনে। দেখা যাক কী সেগুলো—

ফিলিপাইন, মালয়েশিয়ার মতো উষ্ণমণ্ডলীয় দেশগুলোর জোনাকি পোকারা বড় বড় ঝাঁক বেঁধে চলে। ঝাঁকের সবাই একই সঙ্গে আলো জ্বালে আর নেভায়। এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা তুলে ধরেছেন সামাজিক যোগাযোগ ও দলীয় সমন্বয় রক্ষা করে চলার অভ্যাসকে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, মেয়ে জোনাকিরা আলো জ্বালতে পারে না, শুধু পুরুষরাই পারে। তাদের এই রংদার আলোর খেলা দেখে মেয়ে পোকাগুলো আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে আসে।

তবে সব জোনাকি পোকা অত নিরীহ না। অনেক জায়গায় মেয়ে পোকাগুলো স্রেফ কোনো এক স্থানে বসে বসে আলো জ্বালে। অন্যান্য প্রজাতির পোকারা ওই আলো দেখে আকৃষ্ট হয়ে এগিয়ে এলেই ব্যস, ভূরিভোজ করে ফেলে শিকারি জোনাকিটি। এ ছাড়া এই আলো নাকি অনেক ক্ষেত্রে বিষাক্ত। জোনাকি পোকাটি টপ করে মুখে পড়লে ভুগতে হবে বেশ। জোনাকি পোকা ঠিক কত বয়স হলে আলো ছড়ায়? বলা চলে জন্মের পর থেকেই আলো ছড়াতে পারে এরা। আর একটি জোনাকি পোকা তার গোটাজীবনই এই আলো ছড়ানোর খেলা খেলে যায়।

এত আলোচনার পর মনে হতেই পারে জোনাকিদের খাদ্যটা কী? শামুক। হ্যাঁ, এদের মূল খাবার খুব খুদে জাতের শামুকগুলো। তবে অন্য ছোট ছোট পোকাও খেয়ে থাকে। অনেকে আবার স্বজাতির মাংস দিয়েই ভূরিভোজটা সেরে নেয়। কিছু কিছু প্রজাতির জোনাকি পোকা পানির নিচে নেমে খাবার খুঁজতেও সক্ষম।

জোনাকি যে রাসায়নিকের মাধ্যমে আলো তৈরি করে, একটা সময় বৈজ্ঞানিকরা সেটা নিজেদের কাজে ব্যবহার করত। জোনাকির এই রাসায়নিক যক্ষ্মারোগের জীবাণু শনাক্তকরণে খুবই কার্যকর। অন্য কিছু চিকিত্সাসংক্রান্ত কাজেও একটা সময় এর ব্যবহার ছিল। এখন অবশ্য এই ব্যবহার অনেক কমে এসেছে। জোনাকি পোকাদের এই আলোর খেলার বদৌলতে অস্ট্রেলিয়া, মেক্সিকো, তাইওয়ান ও যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু শহর আর গ্রাম পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর অসংখ্য পর্যটক এ স্থানগুলোতে যায় শুধু একনজর পোকাগুলোর আলোর কারুকাজ দেখতে।

জোনাকি পোকারা যে এখন বিশেষ সুখে আছে—এমনটা বলা যাবে না। বিচিত্র এই পোকাগুলো গাছাপালা বা জঙ্গলে-ঢাকা এলাকায় থাকতে পছন্দ করে। তেমন জায়গা তো সব দেশেই কমছে। এ ছাড়া জোনাকি পোকা কৃত্রিম আলো রয়েছে—এমন এলাকায় থাকতে পারে না। সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, কৃত্রিম আলোর ছড়াছড়ি বা গাছ কেটে সাফ করে দিলে জোনাকিরা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পালিয়ে যায় না। স্রেফ মারা পড়ে। কাজেই অদ্ভুত সুন্দর এই পোকাগুলো দ্রুতহারে কমছে। এর অনেক প্রজাতিই আজ বিলুপ্তির মুখে।

জোনাকি পোকা আমাদের লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। জোনাকি পোকা নিয়ে লেখা হয়েছে কত গান, কবিতা, ছড়া। আমাদের দেশে, বিশেষ করে গ্রামে এখনো বেশ সহজেই দেখা মেলে জোনাকিদের। তবে ঘন বসতি আর বিজলি বাতির কারণে ওরা আর কত দিন এমন সহজলভ্য থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।



মন্তব্য