kalerkantho


অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের গল্প

বামাপামার নতুন স্বপ্ন

শেখ আবদুল হাকিম

২৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



বামাপামার নতুন স্বপ্ন

অঙ্কন : বিপ্লব

সে অনেক অনেক দিন আগের কথা, তখন সময়ের নাম রাখা হয়েছে স্বপ্নসময়। আর যে দেশটির গল্প এখানে বলা হবে, সেটি খুঁজে পাওয়া সম্ভব শুধু স্বপ্নের ভেতরই। সেই স্বপ্নের দেশে এক লোক বাস করে, নাম তার বামাপামা। বামাপামার মুশকিল হলো, ভালো-মন্দ যা-ই সে করুক না কেন, সবাই তার সেই কাজকে পাগলামি বলে মনে করে।

বামাপামা আর তার দেশের সব লোক বসবাস করে মাটির নিচে, যেখানে তাদের সূর্যটা সারা দিন একই জায়গায় থাকে। ওই আশ্চর্য সূর্যকে কেউ কখনো ডুবতে দেখেনি। গোটা দেশের মানুষ ওই সূর্যের অত্যাচারে সাংঘাতিক কষ্ট পায়, গরমে সবার প্রাণ যায় যায় অবস্থা।

বামাপামা ঠিক করল, মাটির নিচে না থেকে একবার হলেও মাটির ওপরে উঠে চারদিকটা তার একবার দেখা দরকার। তো একদিন পৃথিবীর মেঝেতে উঠল সে, আর উঠেই দেখতে পেল বিরাট এক ক্যাঙ্গারু।

‘আমি তাহলে শিকার করতে যাই।’ বলল বামাপামা। বলেই লাফ দিতে ওস্তাদ ক্যাঙ্গারুকে ধরার জন্য ধাওয়া করল। কিন্তু সমস্যা হলো, বামাপামা যত জোরে দৌড়ায় তার চেয়ে বেশি জোরে দৌড়ায় ক্যাঙ্গারু, ফলে ওটাকে নাগালের মধ্যে পেল না সে, আর তাই বর্শাও ছুড়তে পারল না।

লাফাতে লাফাতে ক্যাঙ্গারু পশ্চিম দিকে যাচ্ছে, বামাপামাও সেটির পিছু ছাড়ছে না। মাটির ওপরে দিন অনেক লম্বা, আর সূর্যটা আকাশের নিচে নামছে তো নামছেই। একসময় ক্যাঙ্গারুটা থামল আর বামাপামাও তাকে পেয়ে গেল নাগালের মধ্যে। বর্শা ছোড়ার জন্য তৈরি হচ্ছে সে, এই সময় সূর্যটা ডুবে গেল। এখন চারদিক অন্ধকার।

বামাপামা এর আগে কখনো অন্ধকার দেখেনি। সে যেখানে বাস করে, সেখানে সব সময় আলো থাকে। খুব ভয় করতে লাগল তার, তারপর একসময় বাড়ির কথা ভেবে কাঁদতে শুরু করল। কাঁদতে কাঁদতে মাথায় বুদ্ধি এলো—সে যদি কোনো গাছের মাথায় ওঠে, তাহলে হয়তো দূরে কোথাও আলো দেখতে পাবে। লম্বা গাছ খুঁজে নিয়ে সেটির মগডালে উঠে পড়ল বামাপামা। চারদিকে যত দূর দৃষ্টি যায়, তাকিয়ে দেখল সব অন্ধকার, এক বিন্দু আলোও নেই কোথাও। কী আর করা, গাছ থেকে নেমে এলো সে। তারপর কাঁদতে কাঁদতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।

পরদিন যখন ঘুম ভাঙল, তখন সকাল হয়ে গেছে। আকাশজুড়ে আবার প্রচুর আলো দেখা যাচ্ছে। অপার আনন্দে বামাপামার বুকটা ভরে উঠল। সূর্যের দিকে মুখ করে সে বলে উঠল, ‘এখানে দেখা যাচ্ছে ভারি মজার নিয়ম রে ভাই। রাত এলে তারা সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, আর সূর্যের সঙ্গে আবার সকালে ঘুম থেকে জাগে। শুধু মজার না, এটা খুব উপকারী নিয়ম—এটা আমাকে মানতেই হবে। যে যা-ই বলুক, আমার কাছে এটা বেঁচে থাকার বেশ ভালো একটা ধরন বলে মনে হচ্ছে।’

দিনের আলোয় পথ চিনে মাটির নিচে নিজেদের দেশে ফিরে এলো বামাপামা। তাকে দেখে সবাই চিন্তিত হয়ে পড়ল। কারণ তাদের সবার ধারণা, বামাপামা নির্ঘাত আবার কোথাও গিয়ে কিছু একটা বোকামি বা পাগলামি করে এসেছে। তারা জানতে চাইল, ‘কোথায় গিয়েছিলে তুমি?’

বামাপামা তখন তাদের সব কথা খুলে বলল—ক্যাঙ্গারুকে ধাওয়া করেছিল, সূর্যকে ডুবতে দেখেছে, তারপর কিভাবে ঘুম ভাঙার পর আবার আকাশে ফিরে আসতে দেখেছে আলোকে।

‘ওপরের জগত্ একদম আলাদা। কিন্তু বসবাস করার জন্য আমাদের চেয়ে ওই জায়গা অনেক ভালো। বিশ্বাস না হয়, আমার সঙ্গে চলো নিজেদের চোখে দেখে আসবে।’ বলল সে।

দেশের কিছু লোক তার সঙ্গে যেতে রাজি হলো। পথ দেখিয়ে তাদের নিয়ে আবার একবার মাটির ওপর উঠল বামাপামা। সারা দিন এখানে-সেখানে বেড়াল, রোদে গা গরম করল, বৃষ্টিতে ভিজল, কিন্তু রাত নামতে অন্ধকার দেখে খুব ভয় পেয়ে গেল সবাই। তারপর বামাপামা যা করেছিল, তারা সবাইও তা-ই করল, ছুটে গিয়ে সবাই সবচেয়ে উঁচু গাছের মগডালে চড়ে বসল।

কিন্তু তাদের কাণ্ড দেখে বামাপামা বলল, ‘ভয় পেয়ো না! তোমরা ভয় পেয়ো না! আমার কথা শোনো, সব ঠিক হয়ে যাবে!’ তার কথায় আশ্বস্ত হয়ে সবাই গাছ থেকে নেমে এলো, তারপর শুতে না শুতে ঘুমিয়ে কাদা।

পরদিন সকালে সূর্য উঠল, মিষ্টি গরম রোদে আড়মোড়া ভাঙছে সবাই। তারা সবাই বলা-কওয়া করছে, ‘পাগল বামাপামাটা শেষ পর্যন্ত তাহলে একটু বুদ্ধির কাজ করেছে। মাটির নিচের চেয়ে মাটির ওপরটা সব দিক থেকে ভালো। মাটির নিচটা সব সময় আগুনের মতো গরম। এখানে বেঁচে থাকা অনেক সহজ আর সুন্দর। এখানে আমাদের যদি ঠাণ্ডা লাগে, আমরা গাছ থেকে কাঠ কেটে এনে আগুন জ্বালতে পারব। এসো, এখানে আমরা থেকে যাই।’

কাজেই বামাপামা আর তার দেশের মানুষ চিরকালের জন্য নতুন একটা জায়গায় ক্যাঙ্গারুদের সঙ্গে বসবাস করবে বলে ঠিক করল।
 



মন্তব্য