kalerkantho


ধা রা বা হি ক উ প ন্যা স ম ৎ স্য গ ন্ধা

ম ৎ স্য গ ন্ধা

হরিশংকর জলদাস

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



 ম ৎ স্য গ ন্ধা

অঙ্কন : মানব

‘এ কী করেছিস কালী! কৃষ্ণকে ওরকম করে দূরে সরিয়ে রেখেছিস কেন?’ বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে ভবানী।

মত্স্যগন্ধা নিরুত্তর। তার দুই চোখ বোজা। চোখের কোণে জলের ধারা।

ভবানী বলে, ‘মা, অ মা। কাঁদছিস কেন তুই! এভাবে চোখ বন্ধ করে আছিস কেন?’

ভবানীর গলা উঁচুতে উঠেছিল। সিন্ধুচরণ শুনতে পেয়ে ঘরে ঢুকল। কৃষ্ণের ওপর চোখ পড়ল তার। দেখল, শিশুটি হাত নেড়ে নেড়ে খেলছে। চোখ জুড়িয়ে গেল সিন্ধুচরণের। যা জানতে এসেছিল, ভুলে গেল। তার দুই চোখজুড়ে তখন নাতিটি। মন ভরে সে নাতিটিকে দেখতে থাকল।

ভবানীর কণ্ঠস্বর কানে এলো সিন্ধুর, ‘চোখ  খোল মা, চোখ খুলে চেয়ে দেখ। তোর পাশেই যে তোর পুত্রসন্তানটি খেলা করছে। তাকে বুকের কাছে টেনে নে মা।’

‘না—।’ বহু যোজন দূর থেকে যেন মত্স্যগন্ধার কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ঘোর কেটে গেল সিন্ধুচরণের। নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল ভবানী।

না! কী না! কেন না! কাকে উদ্দেশ্য করে না বলল মত্স্যগন্ধা! ভেবে কূল পায় না ভবানী। সিন্ধুচরণও দিশা হারায়। কৃষ্ণকে বুকের কাছে টেনে নিতে অস্বীকার করছে মত্স্যগন্ধা! নাকি কৃষ্ণের পুত্রত্ব অস্বীকার করছে! এই ‘না’ দিয়ে কী বোঝাতে চায় মত্স্যগন্ধা?

এই সময় ভবানী আবার বলে ওঠে, ‘কী না, মা? কাকে তুই না করছিস? কৃষ্ণকে বুকের কাছে টেনে নিতে অস্বীকার করছিস তুই?’

মত্স্যগন্ধা ততক্ষণে চোখ খুলেছে। বিছানার ওপর উঠে বসেছে। ওই অবস্থায়ই কণ্ঠকে দৃঢ় করে মত্স্যগন্ধা বলল, ‘হ্যাঁ মা, অস্বীকার করছি। শুধু ওকে কোলে নিতে অস্বীকার  করছি না, আমার মাতৃত্বকেও অস্বীকার করছি আমি।’

সিন্ধুচরণ হাহাকার করে উঠল, ‘এ কী বলছ তুমি মত্স্যগন্ধা! ও যে তোমার সন্তান! ১০ মাস যে কৃষ্ণকে পেটে ধারণ করেছ মা তুমি।’ ‘তার পরও ও আমার সন্তান নয়। ওকে আমি পেটে ধরেছি ঠিক, কিন্তু মনে ধরিনি। জোরজবরদস্তির ফসল ও।’

‘কী বলছিস মা! ও তো বৈধ সন্তান নয়। পরাশরের বীভত্স কামনার অভিজ্ঞান ও।’

‘মা, মা রে! এ রকম করে বোলো না তুমি মা। কৃষ্ণ আমাদের আদরের ধন। বুকের মানিক।’ মত্স্যগন্ধার দিকে অনেকটা ঝুঁকে পড়ে বলল সিন্ধুচরণ।

‘তোমাদের ধন হতে পারে, আমার নয়। আমার কাছে সারাটা জীবন ও অবহেলিত থাকবে। সারা জীবন ঘৃণা করব আমি তাকে।’

‘এভাবে বলিস না মা, এ রকম করিস না তুই। তোর যে পাপ হবে রে মা। সন্তানকে অবহেলা করা যে মহাপাপ!’ বলল ভবানী। ‘আর আমাকে যে বলাত্কার করল পরাশর! একজন নারীর অসম্মতিতে উপগত হওয়া কি পাপ নয় মা?’ ভবানী চুপ করে থাকে। সিন্ধুচরণ অন্যদিকে মুখ ঘোরায়। মত্স্যগন্ধা বলে ওঠে, ‘পরাশর যদি পাপ করে থাকেন, তাহলে এই সন্তানটির গায়েও তো সেই পাপ লেগে আছে, মা।’

‘শিশুরা কোনো পাপী হতে পারে না কালী।’ কণ্ঠকে এবার দৃঢ় করে ভবানী। বলে, ‘শিশুরা স্বর্গ থেকে আসে। ওরা দেবশিশু। মর্ত্যের কোনো অন্যায় তাদের ছুঁতে পারে না।’ একটু থামল ভবানী। কী যেন ভাবল। তারপর আবার বলল, ‘তুই বিশ্বাস কর মা, কৃষ্ণ নিষ্পাপ। যদি পাপ কেউ করে থাকেন, তাহলে ঋষি পরাশর করেছেন। ঋষির অন্যায়ের সাজা এই শিশুটিকে কেন দিবি, মা?’

‘কাকে তুমি ঋষি বলছ, মা? ওই লোকটি তো নরের অধম। যে মানুষটির কাছে একজন নারীর সম্মতির কোনো মূল্য নেই, যিনি কামান্ধ, যে পুরুষটি একজন নারীর সতীত্বকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন, তিনি আবার ঋষি।’

‘তুই যা-ই বলিস মা, মেনে নিচ্ছি। লোকটি যে ভীষণ দোষ করেছেন, তা-ও মানছি। কিন্তু ওই দূরে অবহেলায় পড়ে থাকা শিশুটি যে নির্দোষ! তাকে কোলে তুলে নে মা। বুকের কাছে টেনে নে।’ বলতে বলতে কৃষ্ণকে মত্স্যগন্ধার কোলে তুলে দিল ভবানী।

মত্স্যগন্ধার চোখমুখ কুঁচকে থাকল। ভবানী অপেক্ষা করতে থাকল কখন সেই কুঁচকানো মুখমণ্ডলে  বাত্সল্যের  আভা ছড়িয়ে পড়ে, তা দেখার জন্য।

একটা সময় সিন্ধুচরণ মত্স্যগন্ধার কাছে এগিয়ে গেল। বলল, ‘তোমাকে একটি কথা বলি, মা।’

বিষণ্ন চোখ দুটি বাপের মুখের দিকে তুলল মত্স্যগন্ধা। মুখে কিছু বলল না। তবে চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, বাপের কথা শোনার জন্য উদগ্রীব সে।

সিন্ধুচরণ কোমল গলায় বলল, ‘এই শিশুটি, মানে আমাদের কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন একদিন তোমার ভীষণ কাজে লাগবে। দেখো তুমি।’

কী রকম এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে হেসে উঠল মত্স্যগন্ধা। পরে হঠাত্ নিজেকে গুটিয়েও নিল সে। উপহাসের কণ্ঠে বলল, ‘ওই কিম্ভূতকিমাকার পুঁচকেটা আমার উপকার করবে? কী কাজে লাগবে বাবা ও আমার জীবনে?’ সিন্ধুচরণ কষ্টমাখা কণ্ঠে বলল, ‘আজকে মা তুমি যাকে কদাকার বলছ, সেই কুিসত কৃষ্ণ ভবিষ্যতে তোমার সংকটকালে পাশে দাঁড়াবে না, জোর গলায় বলতে পারো না তুমি। আমার মন বলছে, এই শিশুটিই যুবাকালে তোমার সহায় হবে।’

‘এটা তোমার অতিলৌকিক চিন্তা, বাবা। যে ছেলেটি আজ জন্মাল, যে আদৌ বেঁচে থাকবে কি না ঠিক নেই, সে করবে আমার উপকার! আর আমার ভবিষ্যত্জীবনের কথা বলছ তুমি বাবা, আমার আবার ভবিষ্যত্ কী? আমার ভূতভবিষ্যত্ বর্তমান—সবই তো ওই যমুনাজলে বিসর্জিত হয়েছে, বাবা।’ বেদনায় চুর চুর কণ্ঠে বলে গেল মত্স্যগন্ধা।

এ সময় কন্যার গা ঘেঁষে দাঁড়ানো ভবানী বলল, ‘তুই এই রকম করে বলিস না মা, এই রকম করে ভাবিস না। তোর বাবা দাশবংশের রাজা। তার অভিজ্ঞতা প্রচুর। বহু দেখেছে তোর বাপ, শুনেছেও অনেক। তোর বাপের কথাকে হেলা করিস না। নিশ্চয়ই তোর বাপের অভিজ্ঞতা তা-ই বলছে কালী—এই শিশুটি একদিন বিপত্কালে তোর পাশে এসে দাঁড়াবে। যথার্থ পুত্রের দায়িত্ব পালন করে ত্রিভুবনকে দেখিয়ে দেবে—তার জীবনে জননী মত্স্যগন্ধাই সব।’

মত্স্যগন্ধা কিছু বলে না। ফ্যালফ্যাল করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভবানী মমতার ডান হাতখানি মত্স্যগন্ধার মাথায় রাখে। ধীরে ধীরে বিপুল কেশরাশির মধ্যে স্নেহের আঙুলগুলো সঞ্চালন করতে থাকে।

মত্স্যগন্ধার চোখ বুঝে আসে। হঠাত্ সে কৃষ্ণকে বুকে চেপে ধরে। বুক ফাটা এক আর্তনাদ মত্স্যগন্ধার বুক চিরে ওই সময় বেরিয়ে আসে—বাবা রে!

কাকে এই সম্বোধন, সিন্ধুচরণ না কৃষ্ণকে, সিন্ধুচরণ বা ভবানী কেউ বুঝতে পারল না। হতবাক হয়ে দুজনে মত্স্যগন্ধার দিকে তাকিয়ে থাকল। তাদের চোখে তখন মত্স্যগন্ধা কন্যা নয়, মত্স্যগন্ধা একজন জননী।

দিন গড়াতে লাগল রাতের দিকে, রাত এগিয়ে গেল সকালের দিকে। পক্ষ ফুরাল, মাস ফুরাল। বছরও ফুরাতে লাগল।

কৃষ্ণ কোলে কোলে ঘোরে। এ কোল থেকে ও  কোলে। ভবানীর কোল থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে সিন্ধুচরণের বুকে। কৃষ্ণ দাদুর বুকে মুখ ঘষে, মুখে নাক ছোঁয়ায়। স্বর্গসুখে সিন্ধুচরণের বুক ভরে ওঠে। ঘরকন্নার ফাঁকে ফাঁকে ভবানী কৃষ্ণকে দেখে, স্বামীকে লক্ষ করে। তার মতো সুখী পৃথিবীতে আর কেউ নেই বলে মনে হয় তখন ভবানীর।

মত্স্যগন্ধার উদাসীনতা কাটে না। এমনিতে সে স্বাভাবিক আচরণ করে; কিন্তু একা যখন গভীর এক নির্লিপ্ততা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে, তখন কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না তার। সবাইকে দূরের মনে হয়। মনে হয়, সে বড় একা, বড় নিঃস্ব সে। তখন তার যমুনা কিনারে গিয়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে। গহিন চোখে যমুনাজলে কী যেন খুঁজতে থাকে সে তখন।

কৃষ্ণ কোল থেকে মাটিতে নামে। হামাগুড়ি দেয়। তারপর একদিন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। দুপদাপ করে পড়ে যায়। আবার উঠে দাঁড়াতে যায়। একদিন দুপায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ানোতে সফল হয় কৃষ্ণ। দাদু সিন্ধুচরণের তর্জনী ধরে এক পা দু-পা করে সামনে এগোয়।

একদিন নিজে নিজে হাঁটতে শিখে যায় কৃষ্ণ। গোটা উঠানময় দাপিয়ে বেড়ায়। পাখিদের দেখে সে। বেজির পেছনে ছুটে বেড়ায়। গাছেও উঠে যায় তরতর করে। গভীর চোখে পাখির ডিম দেখে, পক্ষীশাবকের গায়ে হাত বোলায়।

এভাবে এক, দুই করে তিনটি বছর অতিবাহিত হলো। এই সময় তিনটি ঘটনা ঘটল। তিনটি ঘটনাই অদ্ভুত। এই তিনটি ঘটনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না।

প্রথম ঘটনা—কৃষ্ণের চাঞ্চল্য হঠাত্ একদিন থেমে গেল। এক সকালে ঘুম থেকে উঠে সবাই দেখল, কৃষ্ণ ঘরে নেই। প্রথমে সবাই ভাবল, বাহ্যকর্ম সমাপনের জন্য কৃষ্ণ হয়তো অরণ্যমধ্যে বা যমুনাকিনারে গেছে। অবিলম্বে ফিরে আসবে।

কিন্তু অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কৃষ্ণ ফিরল না। দুর্ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠল সবাই। মত্স্যগন্ধার উচাটন অন্য সবার চেয়ে অধিক বলে মনে হলো। খোঁজ খোঁজ খোঁজ। সবাই কৃষ্ণকে খুঁজতে বেরোলো। এখানে খোঁজে, ওখানে খোঁজে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো তন্ন তন্ন করে খোঁজে। কিন্তু কোথাও কৃষ্ণের সন্ধান মেলে না। কী হলো! এ কী হলো! কৃষ্ণ কোথায় গেল, কৃষ্ণ! মত্স্যগন্ধার বুকের মধ্যিখানে তোলপাড়। এ কিসের কাঁপন? বাত্সল্যের? সঠিক বুঝতে পারে না মত্স্যগন্ধা। শুধু বুক চিরে কান্না আসতে চায়। শুধু চোখ বেয়ে অশ্রু নামতে চায়। এ কিসের অশ্রু? কার জন্য কান্না? কৃষ্ণের জন্য? জন্মের পর থেকে কৃষ্ণকে তো তেমন করে ভালোবাসেনি সে! পরম মমতায় তার চোখেমুখে মুখ ঘষেনি! তার মা ভবানী তার দুঃখ-সংকটে যেভাবে আকুলিবিকুলি করে, কই কৃষ্ণের জ্বরজারিতে তেমন করে তো আকুল হয়নি সে! তাহলে আজ কেন এই আকুলতা, কেন হতবিহ্বলতা? নিশ্চয়ই বুকের তলায় কৃষ্ণের জন্য গাঢ় স্নেহ দানা বেঁধেছে। নইলে কেন এত উচাটন?

মত্স্যগন্ধা আপন মনে কাঁদে আর কৃষ্ণকে খোঁজে। খোঁজে আর গাঢ় কণ্ঠে ডাকে, ‘কৃষ্ণ, কৃষ্ণ রে।’

তিনজনে তিন দিকে খুঁজে এসে উঠানে জড়ো হয়।

ভবানী বলে, ‘সব জায়গায় তো খোঁজা হলো।’

‘না, না মা। সব জায়গায় খোঁজা হয়নি। ওই—, ওই দিকে খুঁজিনি আমরা।’ উত্কণ্ঠিত মত্স্যগন্ধা বলে।

‘তুমি ঠিকই বলেছ মত্স্যগন্ধা, ওই দিকে কৃষ্ণকে খোঁজা হয়নি।’ বলে সিন্ধুচরণ।

ভবানী বলে ওঠে, ‘ওদিকে খুঁজবে কী! ওদিকটায় তো ঘন বন। জংলা জায়গা ওটা। বড় বড় গাছ বেড়ে যত লতাগুল্ম! আমরা তো ওদিকে যাইনি কখনো। কৃষ্ণই বা যাবে কেন ওদিকে।’ ‘না গেল, একবার সন্ধান করতে দোষ কী! চলো চলো, ও দিকটায় খুঁজে দেখি।’ স্ত্রীর কথাকে আমলে না নিয়ে বলল সিন্ধুচরণ।

 

মত্স্যগন্ধা কিছু বলল না, কিন্তু আগে আগে চলতে শুরু করল। গাছের ঝোপে আটকে তার বসন যে ছিঁড়ে যাচ্ছে, খেয়াল নেই মত্স্যগন্ধার, কাঁটার ঘায়ে তার পা যে রক্তাক্ত হচ্ছে, উপেক্ষা করছে মত্স্যগন্ধা।

জঙ্গলাকীর্ণ সরু পথ ধরে বেশ কিছুদূর এগোনোর পর কৃষ্ণ ধ্যানমগ্ন। বিশাল এক বৃক্ষের নিচে যোগাসনে বসে চোখ মুদে আছে সে। কার ধ্যান করছে কৃষ্ণ? বুঝতে পারল না সিন্ধুচরণ বা ভবানী, এমনকি তার জননী মত্স্যগন্ধাও।

এর পর থেকে কৃষ্ণের মধ্যে বিরাট এক রূপান্তর ঘটল। কথা বলা কমিয়ে দিল সে। আপন মনে বিড়বিড় করে কী যেন বলে সে? আর বনে বনে কী যেন খুঁজে ফেরে?

দ্বিতীয় ঘটনা—মত্স্যগন্ধা একদিন টের পেল, তার শরীর থেকে ভুরভুর করে পুষ্পগন্ধ বের হচ্ছে। পুষ্পগন্ধের মৃদুব্যঞ্জনা আগে যে তার নাকে লাগেনি এমন নয়। কিন্তু সেই গন্ধ এ রকম ভরপুর আর প্রবল ছিল না। ধর্ষিত হওয়ার পর থেকে তার ওপর দিয়ে তো ঝঞ্ঝা বয়ে গেছে। নানা সংকট বারবার তার সামনে এসে মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়েছে। বিব্রত, বিপন্ন মত্স্যগন্ধা ওইসব সংকটে হাবুডুবু খেয়েছে। বিস্রস্ত মন তার, বিত্রস্ত দেহ। নিজের দিকে তাকানোর সময় ও সুযোগ হয়ে উঠেনি তার। আজ এত দিন পরে নিজের দিকে তাকানোর সময় হলো বুঝি। আজ বুঝি সেই গন্ধের প্রকৃত স্বরূপ উদ্ঘাটিত হলো তার কাছে।

কুটির থেকে অদূরে, যমুনাপারে, সাঁঝবেলায় বসে ছিল মত্স্যগন্ধা। আনমনা ছিল সে। অথবা ভাবছিল কৃষ্ণের কথা, বিবাগী কৃষ্ণের কথা। এত অল্প বয়সে ছেলেটির মধ্যে কেন এই ভাবান্তর? কেন সে এড়িয়ে চলছে সবাইকে? কেন সে নির্জনতা বেছে নিচ্ছে? আপন মনে বিড়বিড় করে কী বলে কৃষ্ণ? এসব ভাবনায় মগ্ন ছিল মত্স্যগন্ধা। আচমকা এক পুষ্পসুবাস তার নাকে এসে ঢুকল। এ সুবাস তীব্র, এ সুবাস মনোহারী। প্রথমে মত্স্যগন্ধা কিছুই বুঝতে পারল না। মনে করল, কোনো বনপুষ্পের সুগন্ধ বুঝি! এদিক-ওদিক তাকাল একটু। হঠাত্ দক্ষিণ থেকে সমীরণ বইল। ওই সমীরণের সঙ্গে আগের সুবাস মিশে গিয়ে চারদিকটা আমোদিত করে তুলল। কস্তুরি থেকে যেমন করে সুগন্ধ বিস্তারিত হয়, এই পুষ্পগন্ধেরও সে রকম অবস্থা হলো। মৃদ্যু থেকে প্রবল, ক্ষুদ্র পরিসীমা থেকে দিগন্তবিস্তারী হলো এই সুবাস।

চট করে ডান বাহুটা নাকের কাছে নিয়ে এলো মত্স্যগন্ধা। আরে, বাহুতে পুষ্প সুবাস যে ম ম করছে! তারপর হাত শুঁকল, কাঁধ শুঁকল, হাঁটু শুঁকল। সবখানে একই রকম সুগন্ধ। ঠিক ওই সময় পরাশরের কথা মনে পড়ে গেল মত্স্যগন্ধার। পরাশর বলেছিলেন, তোমার শরীর থেকে মত্স্যগন্ধ তিরোহিত হয়ে যাবে। আমার সম্পর্শে তোমার শরীর পুষ্পগন্ধযুক্ত হবে। যোজনপথ দূর পর্যন্ত তোমার শরীরের সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়বে। তুমি পুষ্পগন্ধা।

মুনির কথাই কি ফলছে আজ! বিহ্বল পুষ্পগন্ধা যমুনাপারে গালে হাত দিয়ে বসে থাকল।

তৃতীয় ঘটনা—ঋষি পরাশর এক সকালে চরণদ্বীপে পর্ণকুটিরের সামনে এসে দাঁড়ালেন।

চলবে



মন্তব্য