kalerkantho

ট্র্যাজিক নায়ক

বঙ্গবন্ধু

মোহীত উল আলম

১৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



বঙ্গবন্ধু

১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৫ মার্চ, খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সাল; জুলাই ২, ১৭৫৭ এবং আগস্ট ১৫, ১৯৭৫। প্রথম উল্লিখিত তারিখে একদল রোমান সিনেটর ব্রুটাসের নেতৃত্বে জুলিয়াস সিজারকে হত্যা করে। তখন তাঁর বয়স ছিল ৫৫ বছর। দ্বিতীয় উল্লিখিত তারিখে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে মোহাম্মদ আলী বেগ। তাঁকে আদেশ দেন মীরজাফরের ছেলে মীরন। সিরাজের বয়স তখন মাত্র ২৪। আর শেষ উল্লিখিত তারিখে কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রে সপরিবারে নিহত হন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল সিজারের মতোই, ৫৫।

আমার এ লেখা কাল্পনিকভাবে বঙ্গবন্ধুর জীবনকে অবলম্বন করে কিভাবে মহত্ সাহিত্য তৈরি হতে পারে, তারই ঠিকুজি নির্ণয় করার খুবই বিনয়ী একটা চেষ্টা। বিশ্বাসঘাতকতা থিমের ওপর সাহিত্য বহু রচিত হয়েছে, তার মধ্যে সিজার এবং সিরাজের ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজিক চরিত্র খুব মেলে। সিজারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক অনুজ সঙ্গী ব্রুটাস। ব্রুটাসকে কোনো কোনো ইতিহাসবিদ সিজারের জারজ পুত্র হিসেবেও দাঁড় করিয়েছেন। আর সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন তাঁর সম্পর্কের চাচা সেনাপতি মীরজাফর আলী খান, আর এ দুই ঐতিহাসিক চরিত্র সাহিত্যে রূপায়িত হয়ে অবিস্মরণীয় ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত হয়েছেন। সিরাজউদ্দৌলা বিখ্যাত হয়েছেন শচীন সেনের নাটকে, যেটাতে সিরাজউদ্দৌলা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নির্মলেন্দু লাহিড়ী। আর ‘সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে আনোয়ার হোসেন কালজয়ী অভিনয় করেছিলেন। তবে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত ‘সিরাজউদ্দৌলা’ (১৮৯৮) গ্রন্থটি পলাশীর ঘটনাসহ তত্পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইতিহাস জানার জন্য প্রামাণিক ধরা হয়। জুলিয়াস সিজারের জীবনী অবলম্বনে রচিত নাটক শেকসপিয়ারের ‘জুলিয়াস সিজার’, এবং নিঃসন্দেহে বলা যায় বিশ্বাসঘাতকতামূলক নাটকের ওপর এটি শেকসপিয়ারের সেরা সৃষ্টি।

জুলিয়াস সিজার, সিরাজউদ্দৌলা এবং বঙ্গবন্ধু—এ তিনজনের হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য, কেননা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় সমাজে মৌল পরিবর্তন এসেছে নেতিবাচক অর্থে। জুলিয়াস সিজারের হত্যাকাণ্ডের পর রোমান রাজ্য রিপাবলিক থেকে সম্রাটশাসিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। শুরু হয় রোমান সাম্রাজ্যবাদ। অর্থাত্ যে প্রজাতন্ত্রের প্রতি হুমকি মনে করে জুলিয়াস সিজারকে ব্রুটাসের নেতৃত্বে খুন করা হয়, তাঁর মৃত্যুতে ফল হয় ঠিক উল্টোটা। প্রজাতন্ত্র লোপ পেয়ে রোম হয়ে যায় সাম্রাজ্য এবং সিজারেরই ভ্রাতুষ্পুত্র অক্টেভিয়াস সিজার হন রোমের প্রথম সম্রাট। ঠিক সে রকম বাংলার মসনদ পাওয়ার লোভে রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে জোট বেঁধে মীরজাফর সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন। ২৩ জুন, ১৭৫৭ সালে সংঘটিত পলাশীর যুদ্ধের নানা বিবরণের মধ্যে একটি বয়ান হলো, মীরজাফর এবং ইয়ার লতিফ খান তাঁদের সেনাদলকে যুদ্ধক্ষেত্রে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় করে রাখে। ফলে সিরাজের পরাজয় হয়। সিরাজের পরাজয়ের পর মীরজাফর বাংলার মসনদে বসলেও রবার্ট ক্লাইভের পুতুল হয়ে রইলেন। বাংলার স্বাধীনতার সঙ্গে ভারতবর্ষের স্বাধীনতাও গেল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর খন্দকার মোশতাক দুই মাস বাইশ দিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় বসান কর্নেল তাহের প্রমুখ। তারপর ২১টি বছর বাংলাদেশ প্রায় পাকিস্তানরূপে শাসিত হয়। মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি এ সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশ শাসন করে।

আমার এ রচনার উদ্দেশ্য হলো, সিজার এবং সিরাজকে নিয়ে যেমন অবিস্মরণীয় সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্র হয়েছে, ঠিক সে রকম বঙ্গবন্ধুর মতো ট্র্যাজিক চরিত্র নিয়ে কেন সাহিত্য রচনা হবে না বা চলচ্চিত্র তৈরি হবে না। আমি অনুযোগ করছি না; কিন্তু এ লেখাটাতে বঙ্গবন্ধুর জীবনকে নিয়ে ট্র্যাজিক সাহিত্য বা চলচ্চিত্র নির্মাণের আকরের খোঁজ করার চেষ্টা করব।

আমার ধারণায়, বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজিক জীবনকে সাহিত্যে বা সৃজনশীল মোড়কে আনতে গেলে প্রথম উপাদান হবে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’। খন্দকার মোশতাক আহমদ, জিয়াউর রহমান এবং ‘মেজর চক্র’ তো তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেনই, সঙ্গে সঙ্গে করেছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠজনেরা। বিশ্বাসঘাতকতা ঘনিষ্ঠজনেরা করে থাকে—এটা প্রমাণিত সত্য। একটু সাহিত্যের ছায়া নিয়ে বলি : শেকসপিয়ারের অন্যতম ট্র্যাজিক চরিত্র ওথেলো তাঁর নিধনকারী ষড়যন্ত্রী ইয়াগোকে সব সময় সবচেয়ে বেশি বিশস্ত মনে করতেন। বলতেন, ‘অনেস্ট ইয়াগো’ বা বিশ্বস্ত ইয়াগো। ঠিক সে রকম তেত্রিশজন সিনেটরের বত্রিশজন যখন সিজারকে একে একে ছোরাবিদ্ধ করতে লাগল, তখনও দুর্ধর্ষ সেনানায়ক সিজার তাঁর বৃদ্ধ শরীর দিয়ে আত্মরক্ষা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষতম ব্যক্তি হিসেবে যখন ব্রুটাস তাঁর ছোরা শাণাতে শাণাতে এগিয়ে এলেন, তখন বিস্মিত সিজার আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায় ক্ষান্তি দেন। গ্রিক ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক (পরে রোমান নাগরিক হন) লেখেন, ‘এট্টু ব্রুটি’! অর্থাত্ তুমিও ব্রুটাস! এই বাক্যটি এতই অমোঘ যে শেকসপিয়ার তাঁর নাটকে এটির লাতিন থেকে ইংরেজি করলেন না, রেখে দিলেন, ‘এট্টু ব্রুটি’। সিজার ব্রুটাসকে চিনতে না পারলেও সিরাজ কিন্তু মীরজাফরকে চিনেছিলেন। অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র বইয়ে বহু প্রমাণের উপস্থিতি আছে, যাতে বোঝা যায়, বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে সিরাজ এবং মীরজাফরের মধ্যে ইঁদুর-বিড়াল খেলা অনেক দিন চলেছিল। কিন্তু মীরজাফরকে পরিচালনা করছিল সুচতুর ইংরেজ রবার্ট ক্লাইভ। তার বুদ্ধির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সিরাজ পেরে ওঠেননি।  কিন্তু বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর সময়তো ‘এট্টু মোশতাক’ বলার সময় পাননি, সুযোগও পাননি। এ দিক থেকে ভিলেন হিসেবে মোশতাক ব্রুটাস এবং মীরজাফরের চেয়ে তো সরেস ছিলেনই, এমনকি সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে বললে তিনি শেক্সপিয়ারের সবচেয়ে চতুর ভিলেন ইয়াগোর চেয়েও সরেস ছিলেন। হ্যামলেট তাঁর চাচা এবং বর্তমান রাজা ক্লডিয়াসের ভিলেনি নিয়ে বলেছেন, ‘ওয়ান মে স্মাইল অ্যান্ড স্মাইল, অ্যান্ড বি আ ভিলেন।’ (একজন ভিলেন হয়েও মুখে সব সময় হাসি বজায় রাখতে পারে।) সে রকম বঙ্গবন্ধু কোনো দিনই জানলেন না, খন্দকার মোশতাক কত ধুরন্ধর ভিলেন ছিলেন। কোথায় যেন পড়েছি, তাজউদ্দীন আহমদ খেদ নিয়ে একদিন বলেছিলেন যে বঙ্গবন্ধু কোনো দিনই তাঁর কাছে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ মাস প্রবাসী সরকারের জীবন কেমন কেটেছিল, সে কথা জানতে চাননি। ইতিহাসে বলি বা সাহিত্যে বলি, ট্র্যাজিক নায়কের চরিত্রে অ্যারিস্টটল কথিত হামার্শিয়া বা দুর্বল দিক একটা থাকবেই। যে দুর্বলতার ফাঁক দিয়ে তাঁর পতন হয়। অথচ ইতিহাস বলছে, মোশতাক আন্তর্জাতিকভাবে লবি করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পরিবর্তে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি লুজ ফেডারেশনের মাধ্যমে সমঝোতায় আসার। যে কারণে তাজউদ্দীন তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেন। এর বহু আগে, ১৯৫৫ সালে শেখ মুজিবের উদ্যোগে দলের কাউন্সিলসভায় ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি কেটে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ করা হয়, তখন আব্দুস সালাম খানসহ আরো কিছু লোক নিয়ে খন্দকার মোশতাক আহমদ দল ত্যাগ করেন। কাজেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মোশতাকের ধর্ম নিয়ে এ দ্বন্দ্বটা প্রথম থেকেই ছিল। কিন্তু এ দ্বন্দ্বকে মোশতাক ষড়যন্ত্রের চক্রান্তের মধ্যে পরিণতি দিয়ে বাংলার ইতিহাসে সর্বনিকৃষ্ট ভিলেনে পরিণত হন।

সাহিত্যের দিক থেকে মোশতাক ছিলেন যথার্থ ভিলেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটা গান আছে, ‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা।’ ভিলেনের চরিত্রও ঠিক তা-ই : বন্ধুত্বের ছলনায় হাসতে হাসতে প্রাণ নেবে। এবং আশ্চর্য, বঙ্গবন্ধু এক জায়গায় মোশতাক সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তাঁর (মোশতাকের) হাসির প্রশংসা করেছেন। এ উল্লেখটা আসছে তাঁর ‘কারাগারের রোজনামচা’ (২০১৭) বইটাতে।

১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধু জেলখানায়। ১৫ এপ্রিল পড়ল বাংলা নববর্ষ। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘২৬ সেল হাসপাতাল থেকে বন্ধু খন্দকার মোশতাক আহমদও আমাকে ফুল পাঠাইয়াছিল।’ ‘বন্ধু খন্দকার মোশতাক আহমদ’? এখন হয়তো আমরা চমকে উঠি, কিন্তু বাস্তবে এবং সাহিত্যে এভাবেই ‘বন্ধু’ শত্রুতে পরিণত হয়। আর ঠিক তার পরের রোজনামচা, ১৬ এপ্রিল—২২ এপ্রিল ১৯৬৭ উদ্দিষ্ট দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘খন্দকার মোশতাক আহমদ ও আবদুল মোমিন সাহেব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মোশতাক সাহেবের শরীর খুবই খারাপ, অনেক ওজন কম হয়ে গেছে। ... মোশতাক সাহেব তো পুরানা পাপী। অত্যন্ত সহ্যশক্তি, আদর্শে অটল। এবার জেলে তাকে বেশি কষ্ট দিয়েছে। একবার পাবনা জেলে, একবার রাজশাহী জেলে আবার ঢাকা জেলে নিয়ে। কিন্তু সেই অতিপরিচিত হাসিমুখ।’ (পৃ. ২২৪-২২৫)

সাহিত্য রচনাকারী ব্যক্তিমাত্রই জানেন, ‘সেই অতি পরিচিত হাসিমুখ’ বাক্যটি বঙ্গবন্ধুর অজান্তেই একটি চরম কূটাভাসী বাক্যালংকার হয়ে গেল। কারণ মোশতাক ছিলেন, ‘ওয়ান মে স্মাইল অ্যান্ড স্মাইল অ্যান্ড বি আ ভিলেন।’ বঙ্গবন্ধু আরো একটা অমোঘ বক্রোক্তি করেছেন ওই একই এন্ট্রিতে। বলেছেন, ‘মোশতাক সাহেব তো পুরানা পাপী।’ ১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধু এটা বন্ধুচ্ছলে বলেছিলেন; কিন্তু মাত্র আট বছর পরে এটি দুর্দান্ত ট্র্যাজিক সত্যিতে পরিণত হয়।

বঙ্গবন্ধুর জন্য বিপদসীমার রেখাটা কিছুটা হয়তো অনুধাবণ করতে পেরেছিলেন বঙ্গবন্ধুর জামাতা এম এ ওয়াজেদ মিয়া। তাঁর বই, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ (১৯৯৩) পড়লে বোঝা যায়, খোন্দকার মোশতাকের কাছে তাঁর (ওয়াজেদের) সহজ প্রবেশাধিকার ছিল। বঙ্গবন্ধুকে মোশতাক যে কথা সরাসরি বলতে পারতেন না, সে কথা অনেক সময় ওয়াজেদ মিয়াকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কানে পৌঁছাতে চেষ্টা করতেন।

১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে মোশতাকের দেখা হয় ৩২ নম্বরে বাসার গেটে। খন্দকার মোশতাক বলেন, “বাবা ওয়াজেদ ... আগামীকাল তোমার শ্বশুর (বঙ্গবন্ধু) সংবিধানের যে পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছেন, তা করা হলে সেটা শুধু একটি মারাত্মক ভুলই হবে না, এর ফলে দেশে এবং বিদেশে তাঁর ভাবমূর্তিও অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব, এক্ষুনি বাড়ির তেতলার বৈঠকখানায় গিয়ে তোমার শ্বশুরকে এ বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করানোর চেষ্টা কোরো। আমি আমার শেষ চেষ্টা করে বিফল মনোরথে দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বাসায় ফিরে যাচ্ছি।’ (পৃ. ২৩৪)

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ওয়াজেদ মিয়া সে রাতে বঙ্গবন্ধুকে মোশতাকের সতর্কবাণীর কথা পৌঁছাতে পারলেন না। ফলে তার পরের দিন, অর্থাত্ ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫-এ চতুর্থ সংশোধনী প্রায় বিনা বাক্যব্যয়ে সংসদে পাস হলে বাংলাদেশে প্রেসিডেনশিয়াল শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়। এই যে ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধুর কাছে কোনোক্রমেই মোশতাকের অনুরোধটা পৌঁছাতে পারলেন না, এটিও সাহিত্যের ছকে প্রয়োজনীয় এরর বা গুরুত্বপূর্ণ ভ্রান্তি হিসেবে বিবেচিত হবে, যা ঘটনার মোড় বিয়োগান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

চতুর্থ সংশোধনী পাস হওয়ার পর পারিবারিক প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে জুলিয়াস সিজারের স্ত্রী কালপুর্নিয়ার প্রতিক্রিয়া বেশ খানিকটা মিলে যায়, আবার বেশ খানিকটা অমিলও থাকে।

মিলটা এখানে : যেদিন (১৫ মার্চ) সিজার সিনেটের সংসদীয় সভায় যাবেন, যেখানে তাঁকে হত্যা করা হবে, সেদিন সকালে কালপুর্নিয়া বলেন যে তিনি যেন সংসদ ভবনে না যান, কারণ তিনি (কালপুর্নিয়া) দুঃস্বপ্ন দেখেছেন যে রোমের রাস্তায় রাস্তায় মৃত মানুষ হাঁটছে আর বনের সিংহী এসে খোলা রাস্তায় বাচ্চা প্রসব করছে। সিজার স্ত্রীর কথা কুসংস্কার বলে ফুত্কারে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘কাপুরুষেরা মৃত্যুর আগে বারবারই মরে; কিন্তু বীরেরা মাত্র একবারই মৃত্যুর স্বাদ পায়।’ স্ত্রীর সাবধানবাণী না শুনলেও সিজার ঠিকই মারা পড়লেন।

ঠিক সেদিন (২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫) বঙ্গবন্ধু যখন বাসায় ফিরলেন, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রণমূর্তি ধারণ করলেন। ওয়াজেদ মিয়া লিখছেন : “বাসার দোতলায় উঠে দেখি যে, শাশুড়ি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে রেহানা ও রাসেলকে রূঢ়ভাবে বকাবকি করছেন। এক পর্যায়ে রেহানা ও রাসেলকে উদ্দেশ করে শাশুড়ি বলেন, ‘তোদের আচার-আচরণ ও মেজাজ তো এখন এরকম হবেই। কারণ তোরা তো এখন পে-সিডেন্টের ছেলে-মেয়ে।’ শাশুড়ি ‘প্রেসিডেন্ট’ শব্দটি ইচ্ছাকৃতভাবেই বিকৃত করে উচ্চারণ করলেন বলে আমার মনে হলো। ...”

“সেদিন বঙ্গবন্ধু বাসায় ফেরেন সন্ধে সাড়ে সাতটার দিকে। ... বঙ্গবন্ধু হাতমুখ ধুয়ে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখার জন্যে তাঁর শয়নকক্ষের সামনের লবিতে এসে বসতে না বসতেই শাশুড়ি তাঁকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘সংবিধানের এত ব্যাপক পরিবর্তন, বিশেষ করে একদলীয় (রাজনৈতিক) ব্যবস্থার প্রবর্তন করবে সে সম্পর্কে তুমি আমাকে একটু আভাস দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলে না। আর তোমার তক্ষুনি সংসদকক্ষেই দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার কি প্রয়োজন ছিল? দু’চার দিন দেরী করলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো? যা হোক, স্পষ্ট বলে রাখছি যে, আমি এই বাড়ি ছেড়ে তোমার সরকারী রাষ্ট্রপতি ভবনে যাচ্ছি না।’ শাশুড়ির এই কথাগুলো বলার সময় বঙ্গবন্ধু মিটমিট করে হাসছিলেন। অতঃপর শাশুড়ির প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বললেন, ‘আমি রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তোমাকে সব কিছু বলতে পারি না।’ ” (পৃ. ২৩৯-২৪০) 

বঙ্গবন্ধুর জীবনী সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু নিজের এবং শেখ হাসিনাসহ অন্যদের লেখা পড়ে যতটুকু জেনেছি, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী রেণুর সম্পর্ক ছিল নিরেট ভালোবাসায় পূর্ণ। বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক সব বিষয়ই তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন। কিন্তু চতুর্থ সংশোধনীর বিষয়টি স্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করেননি। করলে কী হতো না হতো, সেটা আমাদের খোঁজ নয়, যেমন ওয়াজেদ মিয়া বঙ্গবন্ধুকে মোশতাকের উদ্বেগের কথা জানালে কী হতো, সেটাও আমাদের খোঁজ নয়; কিন্তু এ প্রমাদটা, রেণুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে আলাপ না হওয়া, এটাও সাহিত্যের ছক অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ট্র্যাজিক উপাদানের মধ্যে পড়ে।

আর কালপুর্নিয়ার সঙ্গে ফজিলাতুন্নেছার যেটা মেলেনি, সেটা হলো তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে তিনি ছেলে-মেয়ে নিয়ে সরকারি রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকবেন না।

থাকলেন না। বঙ্গবন্ধুও হয়তো সম্মতি দিলেন তাঁর কথায়। কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় প্রায় অরক্ষিত ৩২ নম্বর বাসভবনে তিনি মারা পড়লেন স্বামী, তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূ ও একজন দেবরসহ।

বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি ভবনে থাকলে রক্ষা পেতেন কি পেতেন না, সেটা এ লেখার খোঁজ নয়, বরং এটা বলা হলো যে এমন এক চরম ক্ষণে স্ত্রীর একটি সিদ্ধান্ত ট্র্যাজিক নায়কের অবশ্যম্ভাবী গতিপথ তৈরি করল।

‘যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই।’



মন্তব্য