kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

প্যাট্রিক মদিয়ানোর স্মৃতির দায়

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্যাট্রিক মদিয়ানোর স্মৃতির দায়

ফরাসি কথাসাহিত্যিক প্যাট্রিক মদিয়ানোকে মনে করা হয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ের প্যারিসজীবনের সার্থক কথাকার। তবে ২০১৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আগে বাইরের পাঠকদের কাছে তাঁর পরিচিতি খুব একটা ছিল না। মদিয়ানোর জন্ম ১৯৪৫ সালের ৩০ জুলাই প্যারিসের উপশহরে। বাবা আলবার্ট মদিয়ানোর বংশের শিকড় ইতালিতে। মায়ের পরিবারের উৎস গ্রিসে। তবে মা ছিলেন বেলজিয়ামের চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। মা-বাবার পরিচয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে। প্যাট্রিকের জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই মা-বাবা আলাদা হয়ে যান। প্যাট্রিক মদিয়ানোর ছেলেবেলার গোটা সময়ই কেটেছে অন্যদের থেকে একেবারেই আলাদা পরিবেশে। অনেকটা সময় তিনি কাটিয়েছেন নানা-নানির কাছে। তাঁদের কাছ থেকে জীবনের প্রথম ভাষা হিসেবে শিখেছিলেন ফ্লেমিশ। বাবার অনুপস্থিতি এবং অভিনেত্রী মায়ের স্বল্প সান্নিধ্য পাওয়ার কারণে তাঁর দুই বছরের ছোট ভাই রুডির সঙ্গে তাঁর সময় ভালোই কাটতে থাকে; কিন্তু মাত্র ৯ বছর বয়সে রুডি মারা যায়। সেটি ছিল নিঃসঙ্গ প্যাট্রিকের জন্য একটি ভয়াবহ দুঃখের অভিজ্ঞতা। ১৯৬৭ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত লেখা সব কিছুই তিনি উৎসর্গ করেছেন ছোট ভাইয়ের নামে। এ সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা ‘আন প্রেডিগ্রি’ সম্পর্কে বলেন, ‘আমি আত্মজীবনী লিখতে পারতাম না বলেই এ লেখাটাকে প্রেডিগ্রি নাম দিয়েছি। এখানে আমার নিজের কাজকর্ম সম্পর্কে যতটা বলেছি, তার চেয়ে বেশি বলেছি অন্যেরা, বিশেষ করে আমার মা-বাবা আমার জীবনে কেমন ও কী করেছেন—সেসব সম্পর্কে।’ তাঁর ছেলেবেলা সম্পর্কে এখানে লেখেন, তিনি ‘চমৎকার দারিদ্র্যের’ মধ্যে বড় হয়েছেন। চারপাশের পরিবেশ ছিল বিলাসী; কিন্তু টাকা-পয়সা ছিল না। ছেলেকে সাহিত্য ও বিনোদনের জগতের দিকে পথ দেখিয়েছেন প্যাট্রিকের মা। অন্যদিকে বাবার চেনানো জগতে তিনি দেখেছেন গ্যাংস্টারদের। এরা তাঁর কথাসাহিত্যের চরিত্র হওয়ার জন্য উপযুক্ত। এমন নিষ্ঠুর জগতের অভিজ্ঞতাভরা ছেলেবেলা কষ্টকর হলেও তাঁর মতো লেখকের জন্য বরং দারুণ ছিল।

ফরাসি কবি-ঔপন্যাসিক-সমালোচক রেমোঁ কেনোর সঙ্গে পরিচয় প্যাট্রিকের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেনো ছিলেন তাঁর মায়ের বন্ধু। সাহিত্যজগতের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে কেনোর মাধ্যমে। তাঁকে এদিসিও গালিমারের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে পরিচয় করিয়ে দেন কেনো। পরে গালিমার মদিয়ানোর উপন্যাস প্রকাশ করেন। কেনোর একটা পাণ্ডুলিপি দেখে উৎসাহিত হয়ে প্যাট্রিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লেখেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘লা প্লেস দে ই-এতোইলে’। এটি প্রকাশ করেন ১৯৬৮ সালে। এ উপন্যাসে একজন ইহুদি দালালের কথা বলা হয়েছে। উপন্যাসটি পড়ে তাঁর বাবা প্যাট্রিকের ওপর রুষ্ট হন। দোকান থেকে সব কপি কিনে ফেলার চেষ্টা করেন। এর আগে ১৯৫৯ সালে লন্ডনে তাঁর বাবার কাছে আর্থিক সহায়তা চান প্যাট্রিক। বাবা তাঁকে সাহায্য করার কথা বলেও কথা রাখেননি। ১৯৬৫ সালে তাঁর মা প্যাট্রিককে পাঠান বাবার কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য। সেইবার তাঁর বাবার বান্ধবী প্যাট্রিককে শায়েস্তা করার জন্য পুলিশ ডাকেন। বাবার এ রকম ইমেজ ছেলের লেখার অনেক রসদ জুগিয়েছে।

প্রথম উপন্যাস থেকেই অতীত সম্পর্কে লেখার দায়বদ্ধতা নিয়ে লেখা শুরু করেন। তাঁর লেখায় ব্যক্তিসত্তার বিলীন হওয়ার আশঙ্কা, নৈতিকতার সীমারেখা এবং আত্মার অন্ধকার দিক প্রাধান্য পেয়েছে। মদিয়ানোর কথাসাহিত্যে একটি নির্দিষ্ট সময় ধরা হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী প্রায় ত্রিশ বছর এসেছে বিভিন্ন অবয়বে। তাঁর শহরের অগ্রগতির উপজাত চেহারা স্থান পেয়েছে তাঁর সাহিত্যে। 

পরিচয়ের ধাঁধার ভেতর দৃষ্টি ফেলে অতীতের সীমানায় অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা করেন তিনি। প্রতিটি লজ্জাকর কাজ, বিস্মৃত অবস্থায় নিরাপদে থাকা প্রতিটি অমীমাংসিত ঘটনা তাঁর লেখায় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায়। মদিয়ানো বলেন, ‘একেকটি উপন্যাস শেষ করার পর মনে হয়, আমি অতীতের দায় ধুয়ে-মুছে সাফ করে ফেললাম; কিন্তু আমি বুঝতে পারি, আমাকে আবার ফিরতে হবে ছোট ছোট স্মৃতিভরা ঘটনার কাছে, এগুলোই তো আমার এই অস্তিত্ব তৈরি করেছে। আমরা যে সময়ে এবং স্থানে জন্মেছি, শেষমেশ সেটাই তো আমাদের পরিচিতির নির্ণায়ক। মূলত স্মৃতির দায় মদিয়ানোকে অবিরাম সৃষ্টির গতির ওপরে রেখেছে।

দুলাল আল মনসুর

 



মন্তব্য