kalerkantho


ইচ্ছে মৃত্যু

হাসান অরিন্দম

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ইচ্ছে মৃত্যু

অঙ্কন : মানব

শহরের অভিজাত এলাকায় একটা সুরম্য ভবনের সপ্তম তলায় সায়ীদ আহমদ মেয়ের ফ্ল্যাটে উঠেছিলেন কোনো এক শীতের শুরুতে। এখন জ্যৈষ্ঠের শেষ, তিনি হিসাব কষে দেখেন, পেছনে সময়ের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন বছর। অথচ সেদিন এসেছিলেন সপ্তাহখানেক থাকবেন বলে। যাবেন কী করে—তার পর থেকে রোগশোক তো দুদণ্ডের জন্য আর পিছু ছাড়েনি। একটা ভালোর দিকে তো আরেকটা শ্বাসনালি কিংবা হূিপণ্ড চেপে ধরতে চায় যমের মতো। নাশতা সেরে রোদ চড়া হওয়ার আগে লাঠি হাতে সায়ীদ কিছুক্ষণ খোলা ট্যারেজটায় বিচরণ করেন। দূরে লেকের জল, আকাশে উড়ন্ত মেঘের রং, রাজপথে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা দেখেন। তারপর শরীর যদি না বিগড়ায় তো ড্রয়িংরুমের একদিকে ট্যারেজের মুখে ইজি চেয়ারটায় শুয়ে নির্বিকারভাবে পেপার-পত্রিকার পাতা উল্টান। আজ পত্রিকাটা কোলের ওপর রেখে একটু ঝিমুনির মতো আসে। তখন মনে হয়, সামান্য শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, পাশের ছোট টেবিলে রাখা ইনহেলারটা ঝাঁকিয়ে দুবার গালের ভেতর চাপ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন। উনআশি বছর বয়সে সব কিছু দেখে, গোটা পৃথিবীর এই সব কর্মকাণ্ড—এমনকি চন্দ্র-সূর্য গ্রহ-নক্ষত্রের বিচরণ নিতান্তই বিরক্তিকর, অর্থহীন বলে মনে হয়। বস্তুত দৃশ্যমান সৃষ্টিজগতের কোনো অর্থ কোনো তাত্পর্য খুঁজে পান না তিনি। সায়ীদ আহমেদের জ্যেষ্ঠ কন্যা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্নালিজমে এম এ করে একটা অভিজাত ইংরেজি স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি করছে একুশ বছর হলো, তবে এখন তার গ্রীষ্মের ছুটি। সে আসে দ্বিতীয় দফা পিতার জন্য চা নিয়ে।

‘বাবা কী ভাবছ?’

‘দেখ, ট্যারেজের ওই শালিক দুটো—কী আনন্দে ভিজছে ওরা—ছোটবেলায় খুব বৃষ্টিতে ভিজেছি, আম কুড়াতে, ফুটবল খেলতে কী যে আনন্দ হতো তখন!’

‘সেসব কথা ভেবে মন খারাপ করছ, না?’

‘না, ঠিক তা নয়।’

‘আমি জানি না তোমার স্বভাব?’

দুধচিনি-ছাড়া কালো লিকারের চায়ের কাপটা হাতে নিতে নিতে সায়ীদ ভাবেন, মেয়েকে পত্রিকার ওই খবরটা বলবেন। আর এ-ও জানাবেন যে তিনি দু-তিন মাসের মধ্যে সুইজারল্যান্ড যেতে চান। কিন্তু কী ভেবে মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নেন, তারপর মনে হয়—না, ওকে না-বলে ভালো হয়েছে। আগে বরং পরিকল্পনাটা খানিক পথ এগিয়ে নেওয়া কর্তব্য।

তিনি পরিচিত একটি ছেলেকে দিয়ে খুব সন্তর্পণে ইন্টারনেট ঘেঁটে সুইজারল্যান্ডের অলাভজনক প্রতিষ্ঠান সুইট সানসেটের খবর পান। জুরিখ শহরের কাছেই তাদের দপ্তর। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে ডাক্তারের সাহায্যে একটি মসৃণ মৃত্যু উপহার দেওয়া তাদের কাজ। জীবনের বিভিন্ন সময় নানাভাবে তিনি বিষয়টা নিয়ে ভেবেছেন, দুহাতে ছেনেছেন চেতনাভূমির বিচিত্র মৃত্তিকা। তাতে কোনো সমাধান আসেনি, হয়তো কেউ কোনো দিন এই অঙ্কের নিশ্চিত উত্তর পায় না। সব কিছুই ধারণা ও অনুমান মাত্র, তাকেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এত বড় করা। চারদিকে এত কিতাব, এত গ্রন্থের ছড়াছড়ি—জগত্জুড়ে কাব্য, সাহিত্য, ধর্ম আর চিন্তাচর্চার বিচিত্র খেলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে দ্রুতই পেয়ে যাওয়া শিপিং কম্পানির চাকরিটা তাঁর একদিক থেকে ভালোই ছিল। রাত-দিন নানাবিধ ব্যস্ততা, দেশে-বিদেশে, এখানে-ওখানে ছোটাছুটি। তখন ওই সব আজগুবি ভাবনারাশি মাথার ভেতর স্থায়ী বাসা বাঁধবার আর বিশেষ সুযোগ পায়নি, মাঝেমধ্যে দু-একবার উঁকি দিয়েছে মাত্র। দীর্ঘ প্রায় চার দশকের বর্ণিল, তরঙ্গবহুল কর্মজীবন পেরিয়ে সিঙ্গাপুরের ঢাকাস্থ একটি কম্পানির ডিজিএম পদ থেকে অবসরের দিন আসে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে। তারপর জীবন আমূল বদলে যায়, উত্তাল সাগর হঠাৎ যেন জমাট বরফে পরিণত হলো। ক্রমাগত অবসর, নিরন্তর অবসাদ ঘুমে কিংবা জেগে থাকায় আগুনের ফলার মতো তীরচিহ্ন দেখায় মৃত্যুপথের। এভাবে চৌদ্দটা বছর পেরিয়ে তিনি ভাবেন আর কত—এই বিকল প্রত্যঙ্গাদির ভার আর বইতে পারছে না সায়ীদ আহমেদের মানব-শকট, এবার সমাপ্তি টানা প্রয়োজন, তার সমগ্র আকাশ আর ভূমিজুড়ে আবশ্যক প্রচণ্ড এক প্রলয়। কিন্তু কিভাবে? 

সায়ীদ ভাবেন, প্রকৃতির ইচ্ছার অপেক্ষায় তিনি আর বসে থাকবেন না, নিজেই হবেন সর্বগ্রাসী প্রলয়ের কারিগর। মনে পড়ে সবুরের কথা, তার অর্থশালী বাল্যবন্ধু। সবুর বেশ কিছুদিন সুইজারল্যান্ড থেকেছে একসময়, ও পরামর্শ দিতে পারবে, কিভাবে দ্রুত ওখানে গিয়ে কাজটা সমাধা করা যায়। কিন্তু কথাগুলো টেলিফোনে নয়, সাক্ষাতে বলতে হবে। একদিন ধানমণ্ডি থেকে উত্তরা যান নিরিবিলি তাঁর সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে কথা বলতে। সবুর বৃত্তান্ত শুনে থমকে গিয়ে বলেন, ‘আমি যা সমর্থন করি না সে বিষয়ে তোমাকে কোনো সাহায্য করতে পারব না। স্যরি।’

সায়ীদ বলেন, ‘আমি তো বলেছি, রোগশোকে এই শরীরের বোঝা আমি আর বইতে পারছি না, পৃথিবীর আলো-বাতাসে শ্বাস নিয়ে আমার আর স্বস্তি নেই। স্বপ্নগুলো মরেছে অনেক আগেই। এই বেঁচে থাকা বিরক্তিকর, কুিসত, ভয়ংকর।’

‘তুমি রোগশোকের কথা বলছ, আমিও কি অসুখ-বিসুখে কম ভুগছি—এই বুড়ো বয়সে সেদিন গলব্লাডারের অপারেশন করতে হলো, কিডনি আর ফুসফুসের অবস্থা ভালো নয়, সারা দিনে শুধু দুকাপ পানি খেতে পাই। গলাটা তৃষ্ণায় শুকিয়ে আসে, তবু ডাক্তারের মানা। কই, আমি তো মৃত্যু প্রার্থনা করছি না।’

‘আমার যন্ত্রণা তোমার চেয়ে অনেক অনেক বেশি। আমার জায়গায় তুমি থাকলে বুঝতে, মাঝে মাঝে কী দুর্বিষহ হয়ে ওঠে এই জীবন।’

‘আমার মনে হয়, সমস্যা শুধু তোমার শরীরে নয়, মনে। দিনে দিনে তুমি নিজেই জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা চাষ করেছ। সে এখন বিষবৃক্ষ হয়ে তোমাকে গ্রাস করতে চায়। তুমি বরং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাও। তোমাকে মৃত্যুর জাহাজে তুলে দিয়ে আমি পাপের ভাগীদার হতে পারব না।’

সায়ীদ পাল্টা যুক্তি দেখান, ‘তোমার এই কথাটি অন্যায়। আমি অকপটে সব তোমাকে খুলে বলেছি, আমি অন্য কথাও বলতে পারতাম। আর পাপের ভয় পাও—আমি বলছি, এতে যদি কোনো পাপ থাকে, তার অংশীদার তুমি হচ্ছ না। আর তা ছাড়া আমি ভালো করে জানি, আমার এই ভাবনা কোনো পাগলামির ফসল নয়, আমি অহেতুক পাগলের ডাক্তারের কাছে যেতে চাই না।’

শেষে নাছোড়বান্দা বন্ধুকে সহযোগিতা করতেই হলো। সবুর ভিসার জন্য আবেদনের যাবতীয় প্রক্রিয়া জানিয়ে দেন। আর বলেন, অসুস্থতা প্রমাণের যাবতীয় ডকুমেন্ট, ডাক্তারি সার্টিফিকেট সঙ্গে নিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান এ কাজে সহযোগিতা করবে, তাদের সঙ্গে করা চুক্তিপত্রটি দেখাতে হবে এমবাসিতে। মৃত্যুর পর তার দেহটা যে দেশে ফিরিয়ে আনতে চান না, তা-ও কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

মৃত্যুও যে একটা স্বপ্ন হতে পারে, তা সায়ীদ আহমদকে দেখে বোঝা সম্ভব। কন্যার অগোচরে বন্ধু সবুরের পরামর্শ ও সহযোগিতায় বেশ দ্রুতই তাঁর প্রবাস গমনের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে এলো। এবার তো না জানিয়ে উপায় নেই, তিন সন্তানের একজনই মাত্র দেশে আছে, সেটি একদিক থেকে ভালো, সমষ্টিগত হতে না পেরে ওদের আপত্তি অতটা জোরালো হতে পারবে না। প্লেনের টিকিট করার আগের রাতে লাঠিটা ভর করে তিনি মেয়ের ঘরে গিয়ে হাজির হলেন।

‘আব্বা, তুমি কষ্ট করে আসতে গেলে কেন—আমাকে ডেকে পাঠালেই হতো।’

‘আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাই তোকে বলতে এলাম। আগেই বলে রাখছি, ব্যাপারটা নিয়ে তোমরা অহেতুক ইমোশনাল হবে না। আমি সুইজারল্যান্ড যাচ্ছি দশ-বারো দিনের মধ্যেই।’

‘কী বলো, সুইজারল্যান্ড? ওখানে তো কেউ নেই।’

‘যে কাজে যাচ্ছি—আমার কাউকে লাগবেও না।’

‘কিন্তু তুমি এই শরীর নিয়ে কিভাবে পারবে?’

‘শরীরের কথা বলছিস—সেই বোঝাটা থেকে মুক্তি পেতেই তো যাওয়া, শুধু কোনো রকমে ওখানে একবার পৌঁছতে পারলেই হলো, বাকি দায়িত্ব সুইট সানসেট নামক প্রতিষ্ঠানের।’

 ‘মানে? তুমি ফিরবে কবে? খুব দরকার হলে আমরা কেউ সঙ্গে যাব।’

‘ফিরব না, এটা ওয়ানওয়ে টিকিট। আর আমি চাই তোমরা অহেতুক এ নিয়ে ঝামেলা না-বাড়াও।’

‘আব্বা, আমি তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না, তুমি খুলে বলো তো বিষয়টা।’

‘ওদেশে একটা আইন আছে, যে সুবিধা এখনো আমাদের দেশে নেই—ওখানে কেউ জীবনকে যৌক্তিকভাবে শেষ করতে চাইলে সরকার তাতে বাধা দেয় না, ডাক্তাররা সাহায্য করে। আমার চুক্তি হয়েছে সুইট সানসেটের সঙ্গে।’

‘তাতে কী হয়েছে? আমরা এই অন্যায় সিদ্ধান্ত মানতে প্রস্তুত নই।’

‘না, তোরা কোনো বাধা দিবি না, এটা আমার শেষ অনুরোধ। নইলে আরো খারাপভাবে শেষ হতে পারে।’

রুম্পা হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বলে, ‘আসিফ যদি জানে, সব দায় আমার ওপর চাপাবে। রাজু আর রাহা আমেরিকা থেকে আসে না আজ ছয় বছর হলো। তুমি আমাদের ওপর এ অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারো না, আব্বা। তুমি গোপনে এত দূর এগিয়েছ, এতগুলো টাকা ব্যয়, আমাদের কিচ্ছু জানতে দাওনি। আমরা তোমার সন্তান, তোমার ওপর কি আমাদের কোনো অধিকার নেই?’

‘আমি সম্পত্তির প্রায় সবটুকুই তোমাদের জন্য রেখে যাচ্ছি। এ ছাড়া মৃত্যু কিন্তু অন্য সব অধিকার কিংবা অধিকারহীনতার বিষয়টি মুছে দেয়, আমি তো এমনিতেও তিলে তিলে শেষ হচ্ছি।’

‘আব্বা, এই কষ্টটা তুমি একা করছ না, বার্ধক্যের যন্ত্রণা সবাইকেই সইতে হয়, বেঁচে থাকলে আমরাও তো বুড়ো হব। একই কষ্টের পথ ধরে যেতে হবে আমাদের।’

‘কিন্তু আমার মনে হয়, অহেতুক কষ্ট করার দিন শেষ হয়ে আসছে, এ আইন একদিন সব দেশেই হবে। আদিকাল থেকে পৃথিবী সব সময় সামনের দিকেই এগিয়েছে। মানুষ চিরকাল স্বস্তি খুঁজেছে, মুক্তি চেয়েছে।’

‘না আব্বা, আমি কিছুতেই তোমার এ কাজ মেনে নিতে পারব না, এক্ষুনি ফোন করে ওদের জানাচ্ছি।’

‘সেটা ঠিক আছে, আমারও ওদেরকে জানিয়ে বিদায় নেওয়া প্রয়োজন।’

‘আব্বা, তোমাকে কিন্তু জন্ম থেকে কোমল মনের মানুষ বলেই জেনে এসেছি, তুমি কিভাবে এতখানি নিষ্ঠুর হতে পারছ?’

‘কোমল, হ্যাঁ কোমল বলেই তো আমাকে নিয়ে প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর খেলা আর মেনে নিতে পারছি না। এক মানুষের এই ছোট্ট শরীর কতগুলো রোগের যন্ত্রণা বইতে পারে? তোরা বলতে পারিস কী অপরাধ আমার, আমি কার কী ক্ষতি করেছিলাম?’

‘এখানেই সব শেষ নয়, এর প্রতিদান তুমি পাবে।’

‘আর এই কষ্ট যদি আমি মানতে না পারি তো আমাকে প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করা হবে? হোক।

‘তুমি কি বিশ্ববিধানকে অস্বীকার করতে চাও?’

রুম্পা শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়। একজন মানুষকে মারতে একটি প্রতিষ্ঠানকে এতগুলো টাকা দিতে হয়, সে ধারণা আগে ছিল না রুম্পার। সে ভাই-বোনকে টেলিফোন করে, পৃথিবীর দুই প্রান্তে বসে তারা কাঁদে।

রুম্পার স্বামী এসে শ্বশুরের সঙ্গে কথা বলেও কোনো কূল-কিনারা পায় না, সায়ীদ আহমদ তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে এক চুলও নড়েন না। বরং তিনি প্রত্যাশিত দিনের জন্য অধৈর্য হয়ে ওঠেন। তবে অন্য সবার জন্য ক্যালেন্ডারে ১১ নভেম্বর দ্রুত ঘনিয়ে আসতে থাকে।

রুম্পা ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রেখেছিল সকাল ৬টায়। সে জানে, আব্বা আগেই উঠে বসে থাকবে। এমনও হতে পারে, সারা রাত হয়তো ঘুমোবেই না।

 রুম্পাই বরং একটা স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়েছিল। তাই সকালে ও এলার্ম শুনতে পায়নি। আসিফ তাকে জাগিয়ে দেয়, ‘ওঠো, আব্বার গোছগাছ কত দূর, একটু দেখে আসো। ড্রাইভার আসবে সাড়ে ৬টায়।’

রুম্পা সায়ীদ আহমদের ঘরের দরজা নক করে ভেতরে ঢুকে দেখে, তিনি তখনো ছাইরঙা মশারির ভেতর শুয়ে আছেন। সাড়ে ৯টায় ফ্লাইট হলে আগেই ওঠা দরকার ছিল। দুই ঘণ্টা আগে রিপোর্টিং, তা ছাড়া রাস্তায় যে জ্যাম। পিতার দিকে তাকিয়ে তাঁর বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে, একবার মনে হয়, ঘুমিয়ে আছে থাক। সে বলবে, সে ঘুম থেকে জাগতে পারেনি, মোবাইলের এলার্মটাও বাজেনি ঠিকমতো। সময় পেরিয়ে গেলে তাঁকে আরো একবার বোঝানোর সুযোগ পাওয়া যাবে, যদি ফিরিয়ে আনা যায়! পরে মনে হয়, এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। বেচারা অনেক দিন দৌড়াদৌড়ি করে এ পর্যন্ত এসেছে। তাই শেষ পর্যন্ত কী ভেবে ডাক দেয়, ‘আব্বা আব্বা—তুমি যাবে না আজ? প্লেনে টিকিট করা—’

সায়ীদ আহমদ জবাব দেন না, কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে রুম্পা চিত হয়ে শুয়ে থাকা পিতার গায়ে হাত দিয়ে কেমন যেন শীতলতা টের পায়। পাখাটা বড্ড বেশি জোরে ঘুরছে, জানালার গ্লাস পুরোটাই খোলা। কাঁধের কাছটা স্পর্শ করে পাশ ফিরতে গিয়ে মনে হয়, বয়স্ক শরীরটা খুব আড়ষ্ট। রুম্পা ভয় পেয়ে স্বামীকে ডেকে আনে। সাজেদ এসে গায়ের তাপ, পালস, বুক ও চোখ পরীক্ষা করে। তখন উপস্থিত দুজনের বুঝতে বাকি থাকে না, সায়ীদ আহমেদের সুইজারল্যান্ড যাওয়া হচ্ছে না। রুম্পার বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে, মনে হয় দুমড়ে যাচ্ছে হূিপণ্ডের একপাশ।

পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁর পিতার মৃত্যুর তারিখ ছিল ২২ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টা, স্থান : সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে। লাশটা নিকটজনের অগোচরে সে দেশেই সমাহিত হওয়ার কথা ছিল। রুম্পা আঁচলে চোখ মুছে ভাবে, একদিক দিয়ে ভালোই হলো—অন্তত জনকের মৃতদেহটা দেখতে পাচ্ছে সে। সে সময় তার মনে আরো একটি প্রশ্ন খোঁচা মারতে লাগল, এতেও কি অন্তর্যামী তার পিতার হিসাবের খাতায় স্বেচ্ছামৃত্যুর পাপ লিখবেন? কে জানে? এই মুহূর্তে এই সব জন্ম-পুনরুত্থান, হিসাব-নিকাশের প্রসঙ্গ রুম্পার কাছে খুব ঘোলাটে লাগে, সব কিছু ধোঁয়াশা মনে হয়।

আশ্চর্য! আব্বাও ঠিক এই কথাগুলো বলতেন!



মন্তব্য