kalerkantho


বিশ্বসত্তার ঠিকানায়

হামীম কামরুল হক

৯ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বিশ্বসত্তার ঠিকানায়

তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ সিদ্দিকী ও আহসান আকবর

ঢাকা লিট ফেস্ট অভিজ্ঞতার সাতটি ধাপ পার হয়ে অষ্টম ধাপে পা রাখছে। বিগত সময়ের নানা রকমের বাধা-বিপত্তি পার হয়ে, অনেক তর্ক-বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অব্যাহত এর যাত্রা। কারণ এর ভেতরের শক্তির সৌন্দর্য মানুষের আগ্রহকে ধরে রেখেছে। সেই শক্তিটি হলো দেশের সীমানায় বিশ্বের আহ্বান শুনতে পাওয়ার ইচ্ছা। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা ভাষা ও সাহিত্যের খ্যাতনামা মানুষ এসে বলছেন তাঁদের নিজেদের কথা, অন্যদিকে দেশে বসে আমরা আমাদের কথাগুলো বলতে পারছি তাঁদের উদ্দেশে। আমরা পাচ্ছি বিদেশের শিল্পসাহিত্যের সাম্প্রতিকতম পরিস্থিতির সন্ধান। হালনাগাদ হওয়ার সুযোগ মিলছে কত না বিষয়ে। কারণ সাহিত্যের পাশাপাশি চলচ্চিত্র, সংগীত, মঞ্চাভিনয়সহ কত না বিষয়ে বৈচিত্র্যময় পরিবেশনার খোঁজ মেলে এই লিট ফেস্টে। নভেম্বরের ৮, ৯ ও ১০ তারিখে এ আয়োজন হবে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা—এই সময়ের ভেতরে নিজের পছন্দমতো নানা সেশনে থাকতে পারবেন আগ্রহীরা। 

একের পর এক উজ্জ্বল পালক যোগ হচ্ছে ঢাকার এই সাহিত্য উৎসবে। এসেছিলেন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অসামান্য লেখক ভি এস নাইপল। গতবার এসেছিলেন সমকালীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান কবি অ্যাদোনিস এবং ততটাই খ্যাতিমান বেন ওকরি; সঙ্গে আরো অনেকের নাম করা যেতে পারে। বিজ্ঞানে নোবেলপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব, চলচ্চিত্রের সবচেয়ে তাক লাগানো স্বীকৃতি যে অস্কার, সেই অস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী। বাংলাদেশের বাইরে থেকে যাঁরা ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনা করে চমকে দিয়েছেন গোটা বিশ্বকে, এমন কজন লেখক। কিন্তু আমরা শুধু বাইরের সাহিত্যের এবং এর স্রষ্টাদের কথা বলে এর গৌরবকে বড় করে দেখতে চাই না। আমাদের বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের উল্লেখযোগ্য লেখকের অংশগ্রহণ ঢাকার এই সাহিত্য উৎসবের জন্য বড় পাওয়া।

এবারও এসেছেন আগের মতোই নানা দেশের নানা ক্ষেত্রে খ্যাতনামা কবি, লেখক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, অভিনেতা-অভিনেত্রী। নন্দিতা দাশের ‘মান্টো’ নিঃসন্দেহে এবারের অন্যতম দ্রষ্টব্য বিষয় হয়ে উঠবে। আসছেন বিখ্যাত অভিনেত্রী মনীষা কৈরালাও। বাংলা ভাষার জনপ্রিয়তম লেখকদের একজন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে পাওয়া যাবে একটি সেশনে।

ঔপন্যাসিক মোহাম্মদ হানিফের নতুন বই দিয়ে এখানে প্রকাশনা উৎসবের মতো হবে। আসবেন পুলিত্জার পুরস্কারপ্রাপ্ত অ্যাডাম জনসন, লেখক জেমস মিক, কোর্টনি হডেল প্রমুখ।

এ উৎসবে বিভিন্ন ভাষা থেকে বাংলায় এবং বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদে বইপত্র প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের লেখক সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, মঈনুল আহসান সাবের প্রমুখের গল্প-উপন্যাসের অনুবাদ পেয়েছেন এতে। এবার বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি মোহাম্মদ রফিকের অনুবাদ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। বিখ্যাত অনুবাদক ক্যারোলিন ব্রাউন দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অনুবাদ করে আসছিলেন। কিন্তু সেটি প্রকাশিত হচ্ছিল না, এবার মিলেছে সেই সুযোগ। সেদিক থেকে এখানে বিশ্বের শিল্পসাহিত্যের অনুবাদ পাচ্ছেন। টের পাচ্ছেন তালাল আসাদের সেই ‘পলিটিকস অব ট্রান্সলেশন’। এখানে একটা ক্ষমতা ও হীনম্মন্যতার প্রকাশও কেউ কেউ টের পান। একবার পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত লেখক একটু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, কুড়ি বছর আগে থেকে চেষ্টা করলে এত দিনে ইংরেজিতে লিখতে পারতুম। এই কথার পরিপ্রেক্ষিতে মনে পড়ে অমিতাভ ঘোষের কথা। তিনি বলেছিলেন, ভবিষ্যতে হয়তো আর অন্য ভাষায় লেখার কথাই ভাবতে হবে না। একটি ভাষায় লিখলেই তা সর্বভাষায় পৌঁছে যাবে। ঢাকা লিট ফেস্টে বরাবরই অনুবাদের বিষয়টি বিবেচনায় থাকে।

আর একটি ব্যাপার, এ ধরনের উৎসবের মূল ব্যাপার হলো বিচিত্র বিষয় বা টপিক। এই টপিককেন্দ্রিক উৎসবই মূলত ঢাকা লিট ফেস্টের মূল দিক। সেশনগুলোতে নানা দিকে আলোকপাত করা হয়। কী নেই সেখানে—নাগরিকজীবনে সাহিত্যের বর্তমান ভূমিকা, বাংলা কবিতার নতুন ধারা, নারী ও পুরুষের বিচিত্র বিষয় নিয়ে থাকে নানা সেশন। সাম্প্রতিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক পরিবর্তনের নানা দিকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলোর কোনোটাই যেন বাদ পড়ে না। ফলে দেশের ও বিশ্বের মানবসত্তার বর্তমান সংকট ও আগামী সম্ভাবনা বেজে উঠবে অংশগ্রহণকারীদের কথায় কথায়, আলোচনায় আলোচনায়, বিশ্লেষণে বিশ্লেষণে। সংগীতে, নৃত্যে মুখরিত হবে উৎসব প্রাঙ্গণ। ক্রিয়েটিভ রাইটিং নিয়েও অনুষ্ঠান আছে। এবার কিছু অনুষ্ঠানের বিষয় শিরোনাম লক্ষ করা যেতে পারে : ‘যে গল্পের পাঠক নেই’, ‘সন্ত্রাসবাদের যুগে সাংবাদিকতা’, ‘প্রকাশনা শিল্প : বইয়ের বিপণন’, ‘সময়ের গান অসময়ের কবিতা’, ‘ভাঙা-গড়ার দিনগুলো : স্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধু’, ‘অনুবাদ : মূলানুগ নাকি রূপান্তর’, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস : সংকট ও উত্তরণ’, ‘এখনো কেন কবিতা’, ‘বাংলাদেশি মৌলিক থ্রিলার : জাগরণ ও সম্ভাবনা’, ‘পেন : লেখকের মুক্তি, লেখার স্বাধীনতা’, ‘ছয় নারী’, ‘কথোপকথনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়’, ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’ শিরোনামে আছে তিন দিনে তিনটি সেশন ইত্যাদি। ইংরেজি সেশনের ভেতরে আছে : ‘পোস্ট-আমেরিকা ফিউচার’, ‘দ্য ডে দ্যাট ওয়েন্ট মিসিং’, ‘রিকশা গার্ল’, ‘দ্য রাইট টু লাই’, ‘টেলস অব ওয়ান্ডার : মিথস অ্যান্ড ফেইরি টেলস’, ‘ফার্স্ট বুক : হয়ার ডু দে কাম ফ্রম’, ‘সিক্রেট হিস্ট্রি’, ‘ক্রেজি রিচ এশিয়ানস’, ‘দ্য বাংলাদেশ প্যারাডকস’, ‘টেল অব অ্যান আর্ট লাভার’, ‘নো নোবেল : হ্যাশট্যাগ মিটু ইন লিটারেচার’, ‘টেকনোলজি অ্যান্ড ফিউচার’, ‘রেপ বাই কমান্ড : দ্য আফটারম্যাথ’ ইত্যাদি। নাটক, আবৃত্তি, এক্সিবিশন আরো কত কী, যা আমাদের অভিজ্ঞতাকে করবে সমৃদ্ধ এবং সেটি কিভাবে সম্পন্ন হয়, তা এই সাহিত্য উৎসবে না গেলে বোঝার উপায় নেই।

কথায় বলে, ‘উই শুড লার্ন সামথিং অব এভরিথিং অ্যান্ড এভরিথিং অব সামথিং’—ঢাকা লিট ফেস্টের অনেক সেশনের ভেতরে এই কথার প্রণোদনা মেলে। লিট ফেস্ট থেকে একজন তরুণ লেখক বা কবি, অভিনেতা ও শিল্পী নিজের জন্য অনেক কিছু নিয়ে আসতে পারেন। ঘটতে পারে তাঁর চেতনার নতুন বিন্যাস। একজন মানুষ শিল্পসাহিত্যের কাছে এই সময়ও কেন যেতে চায়? এর উত্তর মিলবে নতুন করে অনেকের জীবনে। সাহিত্য-শিল্পের শক্তি এবং এর চড়াই-উতরাই পেরনো পথের দেখাটা আগাম দেখে নিতে পারেন অনেকেই।

আর সেই সঙ্গে আছে দেশি-বিদেশি বইয়ের সম্ভার। একে একটা বিকল্প বইমেলাও বলা যায়। বিদেশের বইপত্রের চোখধাঁধানো এক সম্ভার বিপুল মানুষের সামনে হাজির করার সুযোগ মেলে এই উৎসবের আঙিনায়। নতুন নতুন পাঠকের জন্মমুহূর্ত তৈরি করে দিতে পারে এই উৎসব। তেমন অনেকের মনের ভেতরে বুনে দিতে পারে নতুন শিল্পসাহিত্য সৃষ্টির বীজ। এটা বলতে গেলে এই উৎসবের গভীরতম উদ্দেশ্য।

এ কথা বলা বাহুল্য, এখন সব কিছুর বিচার করা হয় এর বাজারের ওপর। কিভাবে কোন দ্রব্য বাজারজাত করতে হয়, করতে হয় এর প্রচার তা ব্যবসায়ের অন্যতম দিক। সাহিত্যও বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে মনে পড়ে দুটি বিখ্যাত উক্তি। একটি হলো বিখ্যাত ফরাসি চলচ্চিত্রকার জাঁ লুক গদারের। তিনি বলেছিলেন, ‘কালচারের কথা বলতে গেলেই আমার হাত মানিব্যাগের দিকে চলে যায়।’ আর আরেক ধীমান শিল্পব্যক্তিত্ব জাঁ ককতো বলেছিলেন, ‘যেদিন ফিল্মের দাম হবে কাগজের সমান আর ক্যামেরার দাম হবে কলমের সমান, সেদিন আমি আবার নতুন করে সিনেমা তৈরির কথা ভাবব।’ এ কথাগুলো বলতে হচ্ছে, সাহিত্য ও শিল্পের পেছনে নিয়োজিত পুঁজির কথা ভেবে। ব্যবসা ছাড়া এখন সাহিত্যকে ভাবা যায় না। লেখকের কাছে এটি তার প্রাণের জিনিস হতে পারে; কিন্তু এর প্রকাশক, বিক্রেতার কাছে এটি শেষ অবধি একটি পণ্য।

ফলে এই পণ্যের মান ও গুণ নির্ধারণ করা তাদের দায়। সেই সঙ্গে এটির সঠিক বিপণন। ঢাকা লিট ফেস্টে সাহিত্যের এই বাণিজ্যকে স্রেফ বাণিজ্য বললে ভুল হবে। এর সঙ্গে মিলেছে এক অনিন্দ্য নান্দনিকতা।

বোধ করি আমাদের অনেক সমস্যার একটি হলো নান্দনিকতা ও বৈজ্ঞানিকতার সমন্বয়হীনতা। এর শিকড়ও গভীরে। আমাদের বিদ্যাচর্চাকে পেয়ে বসেছে বাণিজ্যবুদ্ধি। বিজ্ঞানচর্চায় যে বিপুল ব্যয়, সেখানে আছে ঘাটতি। বিজ্ঞানচর্চার মূল যে ল্যাবরেটরি, সে সব ততটা হালনাগাদ হয়নি কোথাও। অন্যদিকে নান্দনিকতার পেছনে যে শিল্প-সাহিত্যজ্ঞান ও চর্চা, তাতে মেধাবী ও সৃষ্টিশীল মানুষের আগমন যতটা ঘটে, তার চেয়ে বেশি ঘটে প্রস্থান।

অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী এবং বলতে গেলে কিছু ফন্দিবাজ মানুষ আমাদের শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার জমি ও ভূমি দখল করে রেখেছে। সাহিত্য তাদের কাছে একটি স্ট্যাটাস সিম্বল, ভালোবাসার আকর নয়। ফলে ভূমি দখলের মানসিকতা শুধু মাটির জমিতে নেই, চিন্তা-মননের ক্ষেত্রেও তা বিরাজমান। সাহিত্য উৎসবের ভেতরে দিয়ে সেই গুণগত মানটিই প্রকাশিত হয়, যার ভেতর দিয়ে আমাদের ওই নান্দনিকতা ও বৈজ্ঞানিকতার সমন্বয় আমরা দেখতে পাই। ঢাকা লিট ফেস্ট এই দুইয়ের চমৎকার সমন্বয়। আমাদের বিস্মিত হতে হয়, একই জায়গায় আরো তো অনুষ্ঠান আমরা হতে দেখি; কিন্তু ঢাকা লিট ফেস্টের সময় বাংলা একাডেমির নানা অংশ এবং এর অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য মঞ্চ যেগুলো আছে, তার রূপই আলাদা হয়ে যায়। অসামান্য পরিমিতিবোধ আর শিল্পসুষমার এই নজির পরে কেন দেখতে পাওয়া যায় না? এর পরিবর্তে দেখা যায় উত্কট ও জাঁকালো আয়োজন, যেখানে নান্দনিকতাটাই আর থাকে না। ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজন থেকে একটি অনুষ্ঠান কিভাবে আয়োজন করে সুন্দর করে পরিবেশন করতে হয়, সেই অভিজ্ঞতা বা পাঠ বা শিক্ষাটুকু আমরা নিতে পারি।

আমাদের সৌভাগ্য যে দেরিতে হলেও একটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসব এক অসামান্য নান্দনিকতায় আমরা এ দেশে হতে দেখছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর পরই যদি এর সূচনা হতো, তাহলে এর বয়স হতে পারত চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ বছর। সেখানে মাত্র আট বছরে পা দিয়েছে এই সাহিত্য উৎসব। তবু সেই ইংরেজি প্রবাদে আমরা আমাদের সান্ত্ব্তনা পেতে পারি : ‘বেটার লেট দেন নেভার’। বিশ্বের নানা সাহিত্যের ও শিল্পের মুখ আমরা এ দেশে বসে ঢাকা লিট ফেস্টের আয়নায় দেখতে পাচ্ছি। যাঁরা ঢাকা লিট ফেস্টের নানা অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন আগে, তাঁরা জানেন, এ আমাদের এক পরম পাওয়া।



মন্তব্য