kalerkantho


হে সর্বংসহা আপনাকে প্রণাম

স্বকৃত নোমান

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০




হে সর্বংসহা আপনাকে প্রণাম

লাতিন আমেরিকার কোনো কোনো গল্প-উপন্যাসের ঘটনা ও চরিত্রের বর্ণনা পড়তে গিয়ে মনে হয়, এ-ও কি সম্ভব! এমনও কি হতে পারে! সাহিত্যতাত্ত্বিকরা যাকে বলেছেন জাদুবাস্তবতা। এই বাস্তব এমন এক বাস্তব, যা পাঠকের কাছে জাদুর মতো অবাস্তব মনে হয়, অবিশ্বাস্য মনে হয়। সদ্যঃপ্রয়াত বীরমাতা রমা চৌধুরীর জীবনটাও ঠিক এমনই, জাদুবাস্তবতার মতো অবিশ্বাস্য। তাঁর জীবনকাহিনি শুনলে মনে হয়, এ-ও কি সম্ভব! এমনও কি হতে পারে! প্রায় পাঁচ বছর আগে আমি প্রথম তাঁর জীবনকথা শুনে চমকে উঠেছিলাম। মনে হচ্ছিল না কোনো বাস্তব কাহিনি শুনছি। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমাকে রূপকথা শোনাচ্ছে, কেউ যেন কোনো গল্প-উপন্যাসের কাহিনিসংক্ষেপ শোনাচ্ছে। পরে প্রায়ই আমার মনে হয়েছে, বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরীকে নিয়ে হতে পারে একটি অসাধারণ উপন্যাস। এমন বিষয়বস্তু সত্যি বিরল। কেউ লিখেছেন কি না খোঁজখবরও করেছি। না, আমার জানামতে কেউ লেখেননি।

কে ছিলেন রমা চৌধুরী, কী ঘটেছিল তাঁর জীবনে, কেমন ছিল তাঁর জীবনসংগ্রাম, তা নিশ্চয়ই অনেকের জানা। তবু আবার জেনে নেওয়া যাক। একাত্তরের জননীখ্যাত রমা চৌধুরীর জন্ম ১৯৪১ সালের ১৪ অক্টোবর, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়া গ্রামে। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বলা হয়ে থাকে, তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী, যিনি স্নাতকোত্তর (এমএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। পরে দীর্ঘ ১৬ বছর বিভিন্ন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতাজীবনে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ১২টির বেশি বিদ্যালয়ে। এত বেশি বিদ্যালয় পরিবর্তনের কারণ আছে। অনগ্রসর স্কুলগুলোর শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করাই ছিল তাঁর চিন্তা। তাই অনগ্রসর স্কুলগুলোর দায়িত্ব নিতেন তিনি। যখন স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ একটা পর্যায়ে আসত, তখন আবার নতুন করে আরেকটা অনগ্রসর স্কুলের দায়িত্ব নিতেন।

১৯৭১ সালে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। রমা চৌধুরী তখন দুই পুত্রসন্তানের জননী। থাকেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। স্ত্রী ও পুত্রদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে নিজের জীবন বাঁচাতে ভারতে চলে যান তাঁর স্বামী। বৃদ্ধ মা ও সন্তানদের নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাতে থাকেন রমা চৌধুরী। ১৩ মে সকালবেলা স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদাররা হানা দেয় তাঁর বাড়িতে। জোর করে তাঁকে নিয়ে যায় পাশের কক্ষে। বর্বর এক পাকিস্তানি সেনা লুট করে তাঁর সম্ভ্রম। তারপর তিনি যখন পুকুরে নেমে আত্মরক্ষার জন্য লুকালেন, তখন হানাদাররা গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয় তাঁর ঘরে। ঘরবাড়িহীন বাকি আটটি মাস দুটি শিশুসন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে পাহাড়ে-জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াতে হয় তাঁকে। রাতের বেলায় পোড়া ভিটায় এসে কোনোমতে পলিথিন বা খড়কুটা নিয়ে মাথায় আচ্ছাদন দিয়ে কাটাতেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো ১৬ ডিসেম্বর। বিজয়ের আগের রাতে ১৫ ডিসেম্বর থেকে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তাঁর বড় ছেলে সাগরের। বয়স তখন পাঁচ বছর। ২০ ডিসেম্বর রাতে ‘জয় বাংলা জয় বাংলা, রাজাকার চলে যা’ বলতে বলতে ফুসফুস প্রদাহে আক্রান্ত সাগর ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। একই রোগে আক্রান্ত ছিল তিন বছর বয়সী ছোট ছেলে টগরও। দুই মাস পর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সে-ও মারা যায়। আবার বিয়ে করে সংসার সাজাতে চাইলেন রমা চৌধুরী। জন্ম নিল পুত্র দীপঙ্কর টুনু। স্বামী কর্তৃক আবার প্রতারণার শিকার হলেন রমা। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেল টুনু। একেবারে নিরাবলম্বন হয়ে পড়লেন বীরমাতা রমা চৌধুরী।

হিন্দুধর্মীয় রীতি অনুযায়ী শবদেহ পোড়ানোয় বিশ্বাস করতেন না আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত রমা চৌধুরী। তাই তিন সন্তানকেই দেওয়া হয় মাটিচাপা। মুক্তিযুদ্ধের পর টানা চার বছর জুতা পরেননি তিনি। আত্মীয়-স্বজনদের পীড়াপীড়িতে অনিয়মিতভাবে জুতা পরা শুরু করলেও তৃতীয় সন্তান মারা যাওয়ার পর আবার ছেড়ে দিলেন জুতা পরা। কেন তিনি জুতা পরতেন না? কারণ যে মাটির নিচে তার সন্তানরা শুয়ে আছে, যে মাটির নিচে লাখ লাখ শহীদ মুক্তিযোদ্ধা শুয়ে আছে, সেই মাটিতে তিনি দম্ভের সঙ্গে জুতা পায়ে চলেন কী করে? তাই জুতা পায়ে দেওয়া ছেড়ে দেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন রমা চৌধুরী, এটা অবিশ্বাস্য মনে হয় না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় বহু বাঙালি নারী পাকিস্তানি হানাদার ও এদেশীয় দোসরদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। অবিশ্বাস্য মনে হয় প্রায় ৪৭ বছর জুতা না পরার তাঁর এই মাতৃ-আবেগকে। মনে হয়, এ-ও কি সম্ভব! এমনও কি হতে পারে! মনে হয়, এ যেন কোনো বাস্তব জীবনের ঘটনা নয়, এ যেন কোনো গল্প-উপন্যাসের কাহিনি। রমা চৌধুরী যেন কোনো গল্প-উপন্যাসের চরিত্র। একেই বলে বুঝি দেশপ্রেম। একেই বলে বুঝি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

রমা চৌধুরী ছিলেন এক সর্বংসহা নারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে দুর্যোগ নেমে এসেছিল, তাঁর জীবনে সেই দুর্যোগ আর পিছু ছাড়ল না। ছায়ার মতো লেগেই থাকল। মুক্তিসংগ্রাম শেষে শুরু হয় তাঁর জীবনসংগ্রাম। যুদ্ধের পর প্রায় আট বছর করেছেন শিক্ষকতা। একটা সময় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে করতে থাকেন টিউশনি। বহু বছর টিউশনি করেই জীবন কাটান। আলসার রোগে আক্রান্ত হয়ে তা-ও ছাড়তে বাধ্য হন। তারপর লেখালেখিকেই নিলেন পেশা হিসেবে। প্রথমে লিখতেন একটি পাক্ষিক পত্রিকায়। লেখার সম্মানীর বদলে পেতেন পত্রিকার ৫০টি কপি। ওই ৫০ কপি পত্রিকা বিক্রি করেই দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতেন। এভাবে চলল প্রায় কুড়ি বছর। তারপর নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ শুরু করলেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে তাঁর লেখা বইয়ের সংখ্যা ১৮টি। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে, ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘স্বর্গে আমি যাব না’, ‘চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’, ‘নীল বেদনার খাম’, ‘’৭১-এর জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’, ‘সেই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’, ‘ভাববৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’, ‘নির্বাচিত প্রবন্ধ’ ইত্যাদি। চট্টগ্রাম শহরের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে হেঁটে বই ফেরি করতে শুরু করলেন তিনি। বই বিক্রি করে যা পেতেন, তা দিয়ে কোনো রকমে চলতেন। শুধু নিজেই চলতেন না, বই বিক্রির টাকা থেকে বাঁচিয়ে পোপাদিয়ার পৈতৃক সেই পোড়া ভিটায় একক প্রচেষ্টায় ‘দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে একটি অনাথ আশ্রমও গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খোলার স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সাধ থাকলেও সাধ্যের অভাবে স্বপ্ন পূরণ করতে পারেননি। অর্থের অভাবে ‘দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয়টি’ও কিছুদিন চলার পর বন্ধ হয়ে যায়।

জীবনভর তিনি কষ্ট করেছেন, কিন্তু কখনো মানুষের কাছে হাত পাতেননি। কারণ তাঁর ছিল প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ। ২০১৩ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে লেখালেখি শুরু হওয়ার পর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কাড়ে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে খালি পায়েই তিনি দেখা করেন। নিজের কষ্টের কথা প্রধানমন্ত্রীকে জানান। কিন্তু কোনো সাহায্য চাননি প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তাঁর এই আত্মসম্মানবোধ দেখে মুগ্ধ হন প্রধানমন্ত্রী। মুগ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও বটে। যেখানে মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাওয়ার জন্য, মুক্তিযোদ্ধাভাতা পাওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের এত দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়, সেখানে রমা চৌধুরীর এই আত্মমর্যাদা দেখে তাঁর প্রতি আমাদের মাথা শ্রদ্ধায় নুয়ে আসে।

চট্টগ্রাম নগরীর জামাল খান মোমিন রোডে লুসাই ভবনের একটি কক্ষে জীবনের শেষ ১৭ বছর বসবাস করেন রমা চৌধুরী। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তারপর দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভোগার পর গত ৩ সেপ্টেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুসারে বোয়ালখালীর পোপাদিয়া গ্রামে সন্তান টুনুর সমাধির পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। তিনি চলে গেলেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে গেলেন একটি আদর্শ। তাঁর জীবনাদর্শ। নিশ্চয়ই রচিত হবে তাঁর জীবনী। বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই উদ্যোগ নেবে এই মহীয়সী নারীর জীবনী রচনার। দেশকে কিভাবে ভালোবাসতে হয়, কিভাবে জীবনসংগ্রাম করতে হয়, কিভাবে আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হয়, সেই জীবনী থেকে শিখতে পারবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। এই লেখক, এই বীরমাতা, এই লড়াকু, এই সর্বংসহা নারীর প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।



মন্তব্য