kalerkantho

ময়নাতদন্ত

মণিকা চক্রবর্তী

৮ জুন, ২০১৮ ০০:০০



ময়নাতদন্ত

অঙ্কন : তন্ময় হাসান

গত রাতে হাড়-কাঁপানো শীতের ভেতর রাস্তার কুকুরগুলো এত তীব্র স্বরে ডেকে উঠেছিল! নাদিরা তখন কম্বলের ওমের ভেতর। নাদিরার শয্যায় শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকা তার স্বামী জহির। সে তার গা ঘেঁষে অনুভব করছিল আরো একটু বেশি উষ্ণতা। প্রচণ্ড শীতে কাঁপছে এই কুয়াশামোড়া বেলকুচি সদর উপজেলার রাতের প্রহর। শব্দহীন, নির্জীব, অবসন্ন। ঘুম আসছিল না নাদিরার; বরং এই নীরব শীতের রাতে সে যেন নিজেকে নিয়ে হিসাব কষছিল। উল্টেপাল্টে দেখতে চেয়েছিল কি নিজেকে? নয়তো বা কিছু উল্টাপাল্টা চিত্রকল্প ঝিম ধরা ভাব নিয়ে বারবার হাজির হয়েছিল মনের দরজায়। কম্বল ছেড়ে তার উঠে পড়তে ইচ্ছা হলো, কিন্তু শীতের বাধায় তা আর হয়ে উঠল না। ছটফটানি তৈরি হলো মাথার ভেতর। কুকুরের একটানা শোকার্ত চিত্কারের আর্তির ভেতর এক অকারণ অলক্ষুনে উদ্বেগ অস্থির করে তুলল তাকে। জহিরকে নিয়ে তার কিছু চিন্তা আছে। এখানে প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা হয়ে বদলি হয়ে এসেছে ছয় মাস আগে। পরীক্ষায় নকল ঠেকাতে গিয়ে বারবার অনেক ধরনের উড়ো চিঠি পেয়েছে সে। চিঠিগুলো বরাবরের মতো জহিরের পকেটেই থাকে। কাপড় ধুতে গিয়ে হঠাৎ নজরে আসে নাদিরার। তা ছাড়া কয়েক দিন আগে রাজনৈতিক কোন্দলে এখানে একজন খুন হয়েছে। এসব নিয়ে পত্রিকাগুলো সরগরম। নাদিরা জানে, এসব ঘটনা তার বিবাহিত জীবনে অনেকবারই অস্থিরতার ঝাপটানি এনেছে। যেমনভাবে পত্রিকাগুলো সরব হয় আবার কয়েক দিন পর তেমনভাবে থেমেও যায়; কিন্তু এবারের সময়টা যেন একেবারেই অন্য রকম লাগছে। এখানে আসার আগে ওরা ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ছিল। আর সেখানেই নাদিরার প্রথম বাচ্চাটির অ্যাবরশন হয়ে যায়। তারপর দুটি বছর পার করেও নাদিরার গর্ভে সন্তান আসে না। সারাক্ষণই একটি আকাঙ্ক্ষার ভেতরে ডুবে যাওয়া, আর তা পূরণ না হওয়ার হতাশা ওদের দাম্পত্যকে ক্লান্ত করে রেখেছে। সংসারের ভেতরে সে আর জহির আগের মতো কোনো টানই অনুভব করে না এখন। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা আর্তনাদ। নাদিরা তার নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা এড়াতে সেলাই মেশিন নিয়ে বসে। নতুন ডিজাইনের জামা, বিছানার পর্দা, শাড়ির পাড়—আরো কত কিছু তৈরি করে! আজকাল সেলাই করতেও ভালো লাগে না। ববিনের সুতাগুলো শুধু জড়িয়েই যেতে থাকে।

বেশ ভোরেই উঠে পড়ল নাদিরা। ডুপ্লেক্স বাড়িটির নিচের অনেক জায়গাজুড়ে বাতাবিলেবু, আম, সেগুন আর মেহগনিগাছের বাগান। এই শীতের আগে কিছু গাঁদা ফুলের চারা লাগিয়েছিল নাদিরা। তাতে অনেক ফুল ফুটেছে। বয়স্ক দারোয়ান অনেক আগে উঠেই সামনের গেটের তালা খুলে রেখেছে। নাইট গার্ডটি নিচের তলার অফিসরুমেই ঘুমায়। এই শীতের ভোরে কারো কোনো আওয়াজ নেই। কুয়াশায় মুড়ে রয়েছে চারপাশটা। বাগানের অল্প কিছু ঘাসের ওপর শিশির পড়ে বৃষ্টির মতো ভেজা। নাদিরা ঠাণ্ডা লাগার ভয়ে পায়ের মোজা ভালো করে টেনেটুনে ঠিকঠাক করে নেয়। মাথার চারপাশটা চাদর দিয়ে ভালোভাবে মুড়ে বাগানের ভেতর ঘুরে বেড়াতে থাকে। ভোরের এই নির্জনতা তার যেমন খুব ভালো লাগছে, আবার পাশাপাশি একটা অনিবার্য অস্বস্তিও হচ্ছে। অস্বস্তির কারণ এই বাসার অল্পবয়সী নাইট গার্ড। নাদিরা খেয়াল করেছে, সে যখন মাঝেমধ্যে কোনো প্রয়োজনে ওর মুখোমুখি হয়, ছেলেটি কেমন অসভ্যের মতো তাকিয়ে থাকে। শুধু তাকিয়েই থাকে না, সে অনায়াসে তার বাঁ হাতটি লুঙ্গির গিঁটের কাছাকাছি তলপেটের নিচের দিকে নিয়ে একটা কুিসত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। নাদিরা রাগে দাঁত কিড়মিড় করে। বিষয়টি তার ইচ্ছাকৃত কি না এটা নিয়ে নাদিরা অনেক ভেবেছে। তারপর সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এরা একেবারেই অশিক্ষিত। তাই দৈহিক প্রবৃত্তির ক্ষেত্রে সংযমের শিক্ষাটা ওদের নেই। ছেলেটির শরীরের গঠন বেশ শক্তপোক্ত। শরীরটা মিশমিশে কালো হলেও চেহারাটি আকর্ষণীয়।

অফিসের কাজে জহিরের বাসায় ফিরতে দেরি হলে নাদিরা ওপরের বেডরুমের সঙ্গের কলাপসিবল গেটে তালা দিয়ে রাখে। অল্পবয়সী এই নাইট গার্ডটির স্বভাব-চরিত্র নাদিরার একেবারেই পছন্দ নয়। নিচের তলার রান্নাঘরে বুয়া যখন কাজ করে, নাইট গার্ডটি ওখানে কোনো কাজ ছাড়াই বসে থাকে। অথবা মসলা পেষার নাম করে এমন ভঙ্গিতে লুঙ্গিটিকে দুই ভাঁজ করে কাজের বুয়ার মুখোমুখি বসে, যে ভঙ্গিটিতে একটি আদিম প্রবৃত্তি ছড়িয়ে থাকে। নাদিরা কখনো কখনো কোনো প্রয়োজনে হঠাৎ এসে পড়ে তীব্রভাবে লজ্জা ও অস্বস্তিতে ভুগেছে।

এখন সে কয়েকটি গাঁদা ফুল তুলে সাজিয়ে রাখার জন্য একটি প্লেট নিতে রান্নাঘরের দিকে যাবে ভাবছে; কিন্তু পরক্ষণেই সে সিদ্ধান্ত পাল্টে দারোয়ানকে খুঁজতে থাকে। না, তাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। সে বোধ হয় বাইরে কোথাও চা খেতে গেল। ভাবতে ভাবতে নাদিরা রান্নাঘরের দিকে এগোতে থাকে। মনের ভেতরে যদিও তীব্র বাধা রয়েছে, তবু সে কোনো এক অদৃশ্য টানে এগোতেই থাকে। রান্নাঘর পর্যন্ত যাওয়ার আগেই ডান দিকে একটি গেস্টরুম। রুমটির দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে তীব্র গোঙানি আর শীত্কার মিলে এক ভৌতিক আওয়াজ। নাদিরা তবু থামছে না, যদিও তার ভেতরে ওই আওয়াজের ঘূর্ণন ক্রমাগতই ঘুরছিল। সে ক্রমেই রান্নাঘরের দিকে যেতে থাকে, সেখান থেকে একটি সুন্দর গাঢ় সবুজ রঙের প্লেট হাতে নেয়। এরপর এক অদৃশ্য কৌতূহলতাড়িত হয়ে সোজা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে বাগানের ভেতর দিয়ে গেস্টরুমের জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। গোঙানির আওয়াজটা তাকে আরো বেশি কৌতূহলী করে। তারপর সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে চাদরের সামান্য অংশ দিয়ে ঢাকা নগ্ন নিমগ্ন দুটি কালো শরীরের দিকে। একটি নাইট গার্ডের, অন্যটি ওড়িয়া ভাষার টোনে বাংলায় টেনে টেনে কথা বলা সুইপার মেয়েটির, যে প্রতিদিনই ভোরবেলা এসে বাড়ির সর্বত্র পরিষ্কার করে যায়। স্তব্ধ মুহূর্তটি পার হতেই নাদিরা দ্রুত সরে পড়ে। নিজের মনের ভেতরে দৃশ্যটি ফ্রেমবন্দি হয়ে যাওয়ার পর সে অতি স্বাভাবিকভাবেই গাঁদা ফুল তোলে আর বিশাল ড্রয়িংরুমের এক কোণে সাজিয়ে রাখে। যদিও সে ছিল আপাতস্বাভাবিক; কিন্তু ভেতরে এক রুদ্ধ ক্ষোভ দানা বাঁধে। সে নিজের ঘরের দিকে ফিরে যায় জহিরের সঙ্গে এক যুদ্ধংদেহি মনোভাব নিয়ে।

জহির তখনো ঘুমাচ্ছে। নাদিরা তার ব্যালকনিতে চুপ করে বসে থাকে। নাশতার টেবিলে থমথমে চেহারা নিয়ে নাদিরাই বলে ওঠে, ‘এই নাইট গার্ডকে আমি রাখব না। একে তুমি আজকেই বিদায় করবে।’

জহির অবাক হয়, ‘কেন, কী হয়েছে?’

‘এত কথা আমি বলতে পারব না। একে তুমি বিদায় করবে কি না বলো?’

জহির রুটি, ডিম পোচ আর ভাজি মুখে দিয়ে খুব আয়েশে মুখে পুরে চিবাতে চিবাতে বলতে থাকে, ‘আজ সন্ধ্যায় ডিসি অফিসে মিটিং আছে। আমার ফিরতে দেরি হবে। এই মুহূর্তে অফিসের নানা ঝামেলায় আছি। টেন্ডার নিয়ে অনেক গোলমাল হচ্ছে। পত্রিকায় দেখেছ নিশ্চয়ই! কাজেই এসব নিয়ে এখন আমার মাথা গরম কোরো না। অফিসের ঝামেলা শেষ হলে কী সমস্যা সেটি আমি দেখব।’

 নাদিরা ব্যালকনিতে থমথমে চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে জহিরের অফিসের জিপটিকে গেট পার হয়ে যেতে দেখল। জহিরকে আজ দারুণ হ্যান্ডসাম দেখাচ্ছে সাদা শার্ট, কালো কোট আর গলাবন্ধ রঙিন টাইতে। সবারই কাজ আর কাজ, ব্যস্ততা। শুধু নাদিরার কিচ্ছু করার নেই। শুধু এঘর থেকে ওঘর। অথবা ব্যালকনি বা বিকেলের ছাদে বসে থাকা। ওর বাচ্চাটা থাকলে এই দমবন্ধ অবস্থা থেকে সে মুক্তি পেত। অথবা একটি চাকরি, সময়টা ভালো কাটানোর জন্য। ঘন ঘন বদলির চাকরি আর জহিরের ব্যক্তিগত অনিচ্ছার জন্য নাদিরা কোনো চাকরিতেও ঢুকতে পারছে না। কবেই মাস্টার্স কমপ্লিট করেছে সে, ভালো সাবজেক্ট নিয়ে।

নিঃসঙ্গতা আর যাবতীয় ক্ষোভ মিলে তার ভেতর থেকে বের হয়ে আসে এক অশান্ত কান্না। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে পাশের স্টাফ কোয়ার্টারটি চোখে পড়ে। সেসব মানুষ কী চমত্কার সরল আর সজীব জীবনের মধ্যে আছে! ওরা সবাই মিলে সকালের মিঠে রোদে বসে পিঠা খাচ্ছে আর মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছে। তাদের হাসি আর গল্পের শব্দ তার স্থির বন্দিজীবনের ওপর আছড়ে পড়ে। সে এখানে সর্বোচ্চ কর্মকর্তার মিসেস। তাই স্টাফ কোয়ার্টারের আড্ডায় গলা মিলিয়ে বসে পড়া তার পক্ষে অশোভন; কিন্তু তার সত্যিই ইচ্ছা করছে আজকের মনের চাপগুলো সব উগরে দিতে। এই চাপ ধরা কথাগুলো তার মা বা বোনকে বলবে, তারও উপায় নেই। কারণ কথা বলার জন্য যে টেলিফোন সেটটি রয়েছে, তার সংযোগ দেওয়া হয় স্থানীয় উপজেলা সদরের সংযোগ অঞ্চল থেকে। তাই ফোনে কেউ আড়ি পাতলে বিষয়টি খুব বিপজ্জনক হয়ে যাবে। নাদিরা অস্থিরভাবে সাতপাঁচ ভাবে। আজ তার সেলাই মেশিন নিয়েও বসতে ইচ্ছা করে না; বরং সে চোখে জল নিয়ে কম্বল গায়ে দিয়ে শুয়েই থাকে। বুয়া একবার বেল টিপে জিজ্ঞেস করে, ‘সালামালাইকুম ভাবি, আইজ কী পাক করুম!’ সে নিরুত্তর থাকে। বুয়া আবারও বললে নাদিরা খুব বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘যা ইচ্ছা একটা কিছু কর। খাওয়ার রুচি নাই।’

নাদিরা বেডরুমে শুয়ে শুয়ে শোনে বুয়া আর নাইট গার্ডটি কী সহজ হাস্যরসিকতার মধ্য দিয়ে দুপুরের খাবারের আয়োজন করছে। সকালের বেঁচে যাওয়া নাশতাগুলো তারা দুজনে চেটেপুটে খাচ্ছে সরল আদিমতায়। কোনো কৃত্রিমতা নেই। বুয়ার শরীরের শক্ত গঠনের সঙ্গে তার শরীরের দরিদ্রতম ময়লা চাদরটিও উষ্ণতা দিচ্ছে। তার অনেকটাই ছড়িয়ে থাকছে তাদের অন্তরঙ্গ হাসিতে। ঝাঁকড়া আমগাছটির পাতায় কেমন সরসর করে শীতের তীব্র হাওয়া খেলে গেল, আর তার ধাক্কায় যেন কেঁপে উঠল কোয়ার্টারের ডান পাশের বড় দিঘির জল। সেই শীতের হাওয়া আরো তীব্রতর হয়ে যেন ঢুকে যেতে চাইল নাদিরার পাঁজরের ভেতর। এত বিষাদ! মুহূর্তটি যেন আত্মহত্যার মতো। সে তার মনের দুর্ভেদ্য জায়গাগুলোতে উঁকি দিয়ে তার দাম্পত্যকে আরেকবার দেখে নিতে চায়। যেন মনে হয় তার আর জহিরের দাম্পত্যে ক্লান্ত, বিষণ্ন সংগম ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। প্রেমহীন, দয়াহীন এক নারকীয় সংগম। সকালের ফ্রেমবন্দি দৃশ্যটি তাকে যেন ভেতরে ভেতরে অর্ধোন্মাদ করে তোলে। হঠাৎ দুটি আনন্দমুখর আত্মার ছায়া, তার নিজস্ব কুঁকড়ে যাওয়া পচাগলা সময়ের কদর্যতাকে যেন আজ এই মুহূর্তেই তীব্রভাবে তার সামনে তুলে ধরেছে। তার সমস্ত অপ্রাপ্তি আর ব্যর্থতা যেন নিমেষেই মনের ভেতরে চিতার মতো আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

 

দুই

জহিরকে সে কিছুই বলেনি, কারণ বলতে তার ইচ্ছাই করেনি। জহির যেন অনেক দূরের কেউ। তার হতাশা আর যন্ত্রণার গভীরে জহিরের ব্যস্ততাই শুধু বেড়েছে। জহিরের কাছে নাদিরার সব চাওয়াই এক অদ্ভুত পাগলামি। নিজের মনের শুশ্রূষার ক্ষেত্রে কোনো সমবেদনা না পেয়ে নাদিরার তীব্র ক্রোধ ঝাঁপিয়ে পড়ে সুইপার মেয়েটির ওপর। নাদিরার কথায় তার মাস্টাররোলের ৮০০ টাকা বেতনের চাকরিটি চলে যায়। শাস্তিস্বরূপ নাইট গার্ডকে দেওয়া হয় সুইপার মেয়েটির কাজগুলো। ওরা কেউই বুঝে উঠতে পারে না বেগম সাহেবার হঠাৎ রাগের কারণ। নাদিরার দমবন্ধ করা জীবনের ভেতরে কোনো জ্বালা ধরানো হাস্যরসিকতার ঝলক নিশ্চিতভাবেই দূর হয়ে যায় বুয়াকে কাজ থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার পর। বুয়ার বদলে রান্নার জন্য একজন বাবুর্চি রাখা হয়।

 

তিন

দীর্ঘ পনেরো বছর পর নাদিরা আর তার দুই বান্ধবী মিলে বেলকুচি যাচ্ছে। গাড়িতে বসে তাদের বেপরোয়া স্ফূর্তি। জহিরের সঙ্গে বিবাহিত জীবনের সম্পর্ক নাদিরা পনেরো বছর আগেই চুকিয়ে দিয়েছে। সে এবং তার স্কুলজীবনের দুই বান্ধবী রেণু আর তানিয়া মিলে ‘সন্ধ্যাতারা’ নামের একটি বুটিক শপ খুলেছে। রেণুর বিবাহিত জীবনেও অনেক সমস্যা। আর তানিয়ার স্বামী দীর্ঘ বছর ধরে কাতারে থাকে। তানিয়ার কাছে স্বামী থাকা আর না থাকা সমান অর্থই বহন করে। এদের তিনজনের ক্ষেত্রেই একটি বিষয়ে খুব ভালো বোঝাপড়া। তিনজনই ভালো সেলাই করতে পারে, ডিজাইন করতে পারে, আর তিনজনের ভেতরেই আছে তীব্র অন্তঃশক্তি। কী পেলাম, কতটা পেলাম, কী পেলাম না—এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে ব্যক্তিগত আঘাতকে গুরুত্ব না দিয়ে এরা প্রত্যেকেই মনের মতো কাজটি বেছে নিয়েছে। পাঁচ বছর ধরে খেটেখুটে মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডে দাঁড় করিয়েছে তাদের বুটিক শপ ‘সন্ধ্যাতারা’। তাদের তিনজনের সম্পর্কের মধ্যে কোনো ফাটল নেই। যদি মন ভার করা কোনো সময় এসেও যায়, তারা নিমেষেই হাঃ হাঃ স্ফূর্তি দিয়ে অতিক্রম করে যায় বিষময় সময়টুকু।

বেলকুচি যমুনার পারে। প্রতিবছরই এখানে বন্যা হয়। আর জুন-জুলাই মাসের দিকে বন্যার কারণে তাঁতিদের হাতে কোনো কাজ থাকে না। অন্য সময়জুড়ে শুধুই তাঁত চালানোর খটাখট শব্দ। নাদিরা পনেরো বছর আগে এই অঞ্চলে বসবাসের সময় প্রায়ই বিভিন্ন তাঁতঘর ঘুরে দেখেছে। বুনন, ডিজাইন আর সুতার দিক থেকে খুব ভালো মানের তাঁতের শাড়ির খোঁজ সে এই অঞ্চলে পেয়েছে। কিছু একরঙের তাঁতের শাড়ির ওপর হাতের কাজ ও ব্লক করার আইডিয়া নিয়ে এখানে আসা। সকালেই এখানকার হাজিবাড়ির তাঁতঘর থেকে কাপড় কেনার পর খাওয়াদাওয়া শেষ করে এলাকাটি ঘুরে দেখেছে তিনজনেই। এনায়েতপুরের মাজারেও গেছে। সেখানে নদীর ধারের উঁচু রাস্তা পর্যন্ত পানি। কিছু মানুষ গবাদি পশুসহ রাস্তায় বসে আছে। আজ বৃষ্টি নেই। তীব্র রোদ। বৃষ্টির পরের এই রোদ ভারি সোনালি সুন্দর। শিগগিরই পানি টেনে নেবে। রাস্তার ওপরে উঠে আসা মানুষ তখন ঘরে ফিরবে। ওরাও দ্রুতই ঢাকায় ফিরতে চাইছে। এখন বিকেল তিনটা। গাড়িটা কড্ডার মোড়ে এলে নাদিরা আর তানিয়ার খুব চায়ের তেষ্টা পেল। রেণুর চোখ গাড়ির দুলুনিতে ঢুলুঢুলু। তিনজনেই রাস্তার মোড়ের একটা চায়ের স্টলের বেঞ্চিতে বসল। নাদিরার চোখে কালো সানগ্লাস। বেলা পড়ে আসছে, যদিও রোদটা এখনো তীব্র।

ছোট্ট দুটি ছেলে। কালো গায়ের রং, হাফপ্যান্ট পরা। বয়স দশের মতো হবে, চায়ের কাপ দ্রুত ধুয়ে দিচ্ছে। ওদের মা মাথায় ঘোমটা টেনে নীরবে চা বানাচ্ছে। মুখটি ভালো দেখা যাচ্ছে না। ঘোমটার ভেতর দিয়ে বের হয়ে আসছে তার চুলের দু-একটি সাদা অংশ। নাদিরা কালো সানগ্লাসের ভেতর দিয়ে ওই দিকেই তাকিয়ে ছিল আনমনে। ঘোমটার ভেতর দিয়েও মুখটি যেন চেনা চেনা লাগছে। তারপর পাশ ফিরতেই সে চমকে উঠল। দীর্ঘ বছর আগে দেখা নাইট গার্ডটি একই ভঙ্গিতে সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক হাতে একটি ডাব নিয়ে। ডাবটি সে অন্য এক কাস্টমারের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে, ‘ওই মালতি, শিগগির কর। বেবাক মাইনসে দাঁড়াই রইছুন।’ বাচ্চা দুটি কাপগুলো ছোট্ট লাল বালতির পানিতে ধুয়ে অতি দ্রুত আম্মা আম্মা করতে করতে দোকানে বসা মহিলাকে এগিয়ে দিল। নাদিরার হঠাৎ মনে পড়ল, সুইপার মেয়েটির নাম ছিল মালতি। সেই তুচ্ছ নাম আর এই চা দোকানির ভরা সংসার, বিবর্ণ হয়ে আসা নাদিরার অতীত ও বর্তমানের ওপর একটি গভীর প্রশ্ন রেখে গেল।

 



মন্তব্য