kalerkantho

থাপ্পড়

নাসিমা আনিস

১৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



থাপ্পড়

অঙ্কন : মাসুম

অন্ধকার কেটে আসছে ও যখন রেলস্টেশনে এসে পৌঁছে। ভিড় নেই স্টেশনে, ভিড় মাথায়। স্টেশনের কংক্রিটের বেঞ্চিতে বসতে চায়, খুঁজে পেয়ে বসে ভাবতে থাকে—কতকাল পর বসতে পেলাম, পাটা রেহাই পেল! কিন্তু পরক্ষণেই ও ভেবে দেখল, আসলে তো ও হাঁটেওনি দাঁড়ায়ওনি বিশেষ কোথাও! গোলাপি পাজামার নিচে হাঁটুর দিকে মনকে জড়ো করে চোয়াল শক্ত করে বসে থাকে। একটু পরেই বলাকা এসে পড়বে স্লিপারে, লাইনে আর চাকার ঘর্ষণে কোলাহল করে, তারপর পৌঁছে যাবে ঠিকঠাক, এই তো!

পথে সে কাঁদতে চাইবে, কাঁদবে না। কারণ কান্নার দলাটা গলায় আটকে নিচের দিকে নেমে যাব যাব করবে; কিন্তু যাবে না। কান্নাটা চোখে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই বুদ্বুদের মতো মিলিয়ে যাবে কিছু বাষ্প। এসব কারণেই ঘাড়ের কাছে চিনচিনে একটা স্থায়ী ব্যথা তৈরি হবে তখন। তারপর সে ট্রেনে বসে থাকবে সামনে শূন্য দৃষ্টি মেলে। যেন আর কোনো চিন্তার দরকার নেই।

ভূত! ভূতের থাপ্পড়! দাগটা নাকি পরিষ্কার। কেমন পরিষ্কার! দাগের গায়ে লেখা আছে, এই থাপ্পড়টা ভূতের! তো, আহা রে মা, সরল মা আমার! অথচ আমরা দুই ভাই-বোন মিলে ঠিক করেছিলাম, ছোট বোনটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করব। ওর পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দেব। মিরাজ রিকশা চালাতে চালাতে বলবে, আমার বোন অমুক স্কুলের মাস্টার, অমুক কলেজের প্রফেসর আর আমি বলব, আমি লটকন বেচি, বিশ কেজি লটকন কারওয়ান বাজার থেকে কিনে আনি এগারো শ টাকায়, মহাখালী বেচি নব্বই টাকা কেজি। সিটিং সার্ভিস গাড়িতে বিশ টাকা করে মোট চল্লিশ টাকা ভাড়া দিই। বিশ-ত্রিশ কেজিতে মিনতিভাড়া লাগে না, নিজেই টানতে পারি। শুকনা আমি! তো অসুবিধা নাই—আমার গায়ে অনেক শক্তি। আমার বোন নাইনে পড়ে। তারে কলেজে পড়াতে হবে। তারে ইউনিভার্সিটিতে পড়াতে হবে। আমার গায়ে শক্তি না থাকলে কেমনে চলবে! লটকন বেচব, পেয়ারা বেচব, আমড়া বেচব। অফ সিজনে তরকারি বেচব, স্বামীর অগোচরে প্রতিদিন পঞ্চাশ টাকা করে লুকিয়ে রাখব। মাস গেলে পাঠাব এক হাজার টাকা, তার প্রাইভেট স্যারের। স্বামীকে হিসাব দিতে থতমত খেলে হবে না, হিসাব টনটনে মজবুত রাখতে হবে। হিসাব তো তার চেয়ে আমার ভালো জানার কথা। আমি ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়েছি, সে মোটেই স্কুলে যায়নি। তো অবশ্যই হবে আমার বোন ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ অফিসার।

 ভূতে থাপ্পড় দিল কবে! মা জানে না! ও হয়তো টেরই পায়নি কিভাবে ভূতে পথে কি স্কুলে কি সন্ধ্যারাতে পাকের ঘর থেকে শোবার ঘরে যেতে গিয়ে পথ আগলে ধরেছিল কিংবা ভরদুপুরে স্কুল থেকে ফিরতে গিয়ে তেঁতুলগাছটার নিচে কিংবা ভোরবেলা মা ছাড়া পায়খানায় যাওয়ার পথে, বলে—কিলা, তুই বেয়ানবেলা আমারে জ্বালায়ে মারস! দিল কষে এক চড়। কিন্তু মাকে কেন বলল না! নাকি সিক্তা নিজে টেরই পায়নি, ঘুমের ঘোরে। ও কি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল? না হলে পিঠে মারবে কেমন করে। কিন্তু ও তো কোনো দিন উপুড় হয়ে শোয় না! আচ্ছা, সেদিন কি সত্যি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল?

কাল রাতে মা কাঁদতে কাঁদতে বলল—মা গো, তোর বইনেরে ভূতে থাপ্পড় দিছে, পিঠে নীল দাগ, তারে হাসপাতালে নিমু এহন, অবস্থা ভালা না, মুখ দিয়া ফেনা বাইরাইতাছে! দরজায় ভ্যান দাঁড়ায় আছে, পরে কথা কমুনে!

ট্রেন থেকে নেমে ভ্যানে এক ঘণ্টা, মাথার ওপর চৈত্র মাসের রোদ। মাথায় ওড়না দিয়ে বসে থাকে ও। ভ্যানচালক একা একা কথা বলে। উত্তর পায় না বলে সে থামবে এমন বান্দা সে নয়। বলার বিষয়, বৃষ্টি থেকে গায়ের ছেলেছোকরা থেকে ফেসবুক-ইউটিউব পর্যন্ত।

একসময় ও ধমকের সুরে বলে, এত প্যাটপ্যাটান কেন! ভাল্ লাগে না!

না, ভ্যানচালক থামে না। তার মেয়েটাকে আর স্কুলে পাঠাবে না, পথে ছেলেরা নানা কথা বলে। বন্ধ করেছে স্কুল। স্কুলের মাস্টাররা এইগুলো খেয়াল করে না, তারা আছে ব্যাচ পড়ানো কি প্রাইভেট পড়ানোর ধান্দায়!

অর্ধেক রাস্তায় ভ্যান থামায় চালক, পেশাব করতে যায়। ও বুঝে পায় না, মহিলা আরোহী ভ্যানে বসায়ে রেখে কিভাবে পেশাব করতে যায়! শব্দ করেই বলে, লুচ্চর লুচ্চ, খাচ্চর!

এই অবকাশে দুটি মহিলা ওর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। কড়া রোদে বাহনের জন্য অপেক্ষা করে করে মুখচোখ লাল। ও সাহায্য করতে রাজি হয়।

বাড়ি পৌঁছে দেখে, এরা এই বাড়িতেই এসেছে মরা দেখতে। মরা দেখতে এসেছে তো সে-ও! যার কিনা শিক্ষক, প্রফেসর কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট কি পুলিশ অফিসার হওয়ার কথা ছিল! যার মাথা ছিল পরিষ্কার, একবার বোঝালেই যে বুঝে ফেলে সব কঠিন গণিত! নাইনে উঠে বিজ্ঞান গ্রুপ নিয়ে যে একটুও ভয় পায়নি, ফোনে বলেছে—আপা, আমি তো সব বুঝি। প্রথম কয়েক দিন রসায়ন একটু কঠিন লাগত, এখন এই সাবজেক্ট আমার ফেভারিট। বকুল স্যার বলছে কোনো চিন্তা নাই, যা না পারব আমি যেন তার কাছে যাই, স্যার লাগলে আমারে একাই বুঝায় দিবে।

ও বলেছিল, ভিনদেশি মাস্টার না! একা যাওনের দরকার নাই, কেউরে সঙ্গে নিস। স্যারের তো বয়স বেশি না।

—না, স্যারের বউ আছে, বাচ্চা হইতে দেশে গেছে,  স্যার ভালোই।

মশারির ভেতর রিক্তা, বেলপাতায় চুবানো গরম পানি, আতর, লোবান, নতুন লাক্স আর কী কী—কে জানে। কোনো কোনো জন এসে ওকে ধরে কান্না করার অবকাশ চায়; কিন্তু ওর কোনো কান্না নাই, গায়ে ধরতে দেয় না কাউকে।

একটাই তো ঘর, ঘরের মাটির মেঝেতে বমির ছিটার দাগ, একটা গোলাপি ওড়না। টেবিলে কত কত বই, ম্যাজিস্ট্রেট না পুলিশ অফিসারের ছোটবেলার বই থরে থরে সাজানো। এক জোড়া চপ্পল লাল রঙের, এটা দেখে রিক্তা বলেছিল—আপা, আমি ছোট নাকি, এখনো লাল স্যান্ডেল কিন্না আনো?

মিরাজ একবার ঘরের দরজায় এসে উঁকি দিয়ে ফিরে যায়, তার প্রফেসর বোনের জন্য আজকে খুব ব্যস্ততা। বাড়িভর্তি মানুষ, তাদের প্রশ্নের উত্তর তাকেই দিতে হচ্ছে। গতকাল সে হাসপাতালে যাওয়ার পথে বোনের মাথাটা কোলে নিয়ে দেড় ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়েছে, নার্সকে ডাক্তার ভেবে আকুল মিনতি জানিয়েছিল। আমার বোন, আমার বোন, আমার বোন...

ভালো ছাত্রী, ভালো ছাত্রী, ভালো ছাত্রী...

সন্ধ্যায় ভালো মানুষ, তারপর বমি, মুখ দিয়া ফেনা...

মা বলে, পিঠে ভূতের থাপ্পড়, আমি জিগাইলাম কী হইছে, কয় ভূতে মারছে, ভূতে থাপ্পড় দিছে আমারে মাগো, মা, আমার আর বাঁচন নাই... 

মিরাজ কেন কাছে আসে না! না আসুক, এসে কী-ই বা লাভ।

উঠানে স্যার-আপারা এসেছে, সহপাঠীরা এসেছে, গ্রামের মানুষ আসছে তো আসছেই, সে-ও কি আসছে? আসছে সে। নড়েচড়ে, কথা বলে সবার সঙ্গে, ঘর থেকে দেখাও যায় মাঝে মাঝে।

লাইন দিয়ে সবাই দেখছে, মুখের আবরণ সরানো, দেখে নিচ্ছে স্কুলের ভালো ছাত্রীটাকে।

নিমগাছের পাতা ঝরছে তাদের ক্রন্দনে, চৈত্রের রোদের তেজ গেছে বেড়ে ক্রন্দন সইতে না পেরে। গুটি ঝরছে আমের, বিপুল ঝরা ঝরছে। বাতাবিলেবু ফুলের গন্ধটা বোটকা গন্ধ ছড়ায় ঝিম ধরা দুপুরে। লাইন দিয়ে দাঁড়ানো ছাত্রীদের কেউ কেউ চারদিকে সচেতন পরখ রাখে, ভরা দুপুরেই তো তানারা বের হন, পথের সামনে পড়লে অনিষ্ট করে ছাড়েন! গা ছমছম!

একজন হুজুর আমগাছটার নিচে চেয়ারে বসে কিছু বলছেন, লোকও জুটেছে বর্ষীয়ান কিছু। —মানা না মানার ব্যাপার না, নিজের চোখে দেখলেন তো! তার পরও বিশ্বাস যায় না কিছু ইবলিস! ইবলিসগো ধইরা ধইরা বোঝান!

কান্না পর্ব কিছুতেই সাঙ্গ হয় না। ও ভাবে, কত কাঁদতে পারে মানুষ! আমার তো কান্দন আসে না। মা একবার ঘরের দরজায় আসে, এতক্ষণ রান্নাঘরে পা বিছিয়ে বসে কান্না করেছে, যাকে বলে বিলাপ। সঙ্গীও ছিল কিছু প্রতিবশী কিংবা পরম আত্মীয়। এখন বলছে—যা, বইনেরে বিদায় দিয়া আয়! মাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন সমবয়সী নারী।

ও ভাবে, বাবার কি সৌভাগ্য, এই দিনটা দেখতে হলো না। বাবাও কি এসবে আস্থা রাখত, ভূতের থাপ্পড়!

রিক্তাকে নিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে রিক্তার একজন বান্ধবী এসে বসে ওর কাছে, বলে—যাবেন না বইনেরে শেষ দেহা দেখতে? ও বলে, না! বান্ধবী গা ঘেঁষে বসে, মাথায় বিলি কাটে আর কিছু মগজেও। মগজ পরিষ্কার হয়ে যায়।

তিন দিন বাদে বাদ আছর মসজিদে জিলাপি দিয়ে মিলাদ। আর দুপুরে গোরখোদকদের জন্য এক বেলা মাছ-ভাত। তা-ও মসজিদের ইমামসহ সাতজন। দূর থেকে খেতে দেখে ওদের। মিরাজ ভাত-ডাল দিতে দিতে হাঁপিয়ে ওঠে, কলাপাতায় ঘন মাষকলাইর ডাল দিয়ে ভাত মাখানো দেখলে মনে হয় বিয়ার খাওন!

যে রাতের পর দিনের পরদিন ওর ঢাকায় চলে যাওয়ার কথা। সেই রাতে সে তন্নতন্ন করে কিছু খুঁজে পায়, রসায়ন খাতার শেষ পাতায়, ক্যান এমন করলেন, ক্যান এমন করলেন, ক্যান এমন করলেন...ত্রিশবার লেখা। ও বসে বসে গুনল।

পরদিন দুপুরে গেল সেই বান্ধবীর বাড়ি, যে মগজ পরিষ্কার করেছিল। তারপর কত কত প্রান্তর ঘুরল। সন্ধ্যায় চৈত্র মাসের এক মাথা মেঘ নিয়ে বাড়ি ফিরেই ঘুমিয়ে পড়ল। ছন্নছাড়া জীবন এখন তিনটা প্রাণীর, কে কার খবর নেবে!

তারপর ঠিক শেষরাতে আজানের আগে বলাকা ধরবে বলে সে বের হলো কাউকে কিছু না বলে, ব্যাগে খাতাটা রাখা। তারপর যায়, যেখানে তার যাওয়ার কথা। অন্ধকারেই সে উঠান পেরিয়ে উদ্দিষ্ট ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়, বাইরে থেকে শিকল তুলে দেয় সন্তর্পণে। জানালা দিয়ে তাকে ঠাওর করে টর্চ জ্বেলে, গরমে লুঙ্গি উঠে গেছে বুকে, অণ্ডকোষ বেরিয়ে।

ব্যাগ থেকে বের করে খাতাটা। মুঠি পাকিয়ে ধরে বগলে, তারপর চারটা কাঠি একসঙ্গে ঠোকে, খাতায় ভালো করে ধরায়। যে জানালা দিয়ে বসন্তবাতাস তাকে উতলা করত, সেখান দিয়েই আস্তে বিছানায় ফেলে তার ওপর দেয় শুকনো কিছু খড়। তারপর সরে আসে আড়ালে। বড় রাস্তায় উঠতে উঠতে ও পেছন ফিরে তাকানোর একবারই সুযোগ পায়। কারণ এবার দ্রুতই সরতে হবে তাকে। দাউদাউ আগুনের শিখাটা খুব তো দূরে নয়।



মন্তব্য