kalerkantho


প্রদর্শনী

বরেন্দ্র কাব্য : প্রাচীন জনপদের জীবনছবি

মানব

১১ মে, ২০১৮ ০০:০০



বরেন্দ্র কাব্য : প্রাচীন জনপদের জীবনছবি

সহজ-সারল্যে নিত্য প্রকৃতির অনিন্দ্য আয়োজন। এ দৃশ্য অবগাহনের অপরিসীম স্পৃহা নিয়েই শিল্পীসত্তা দ্বার খোলে নতুন নির্মাণের। বাংলাদেশ—বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়জুড়ে বিস্তৃত যে নদী-নালা, মাঠ-ঘাট, উত্পাদনমুখী কৃষিব্যবস্থা তারই নির্যাস ছুয়ে থাকবে শিল্পের পরতে পরতে এ সত্য এবং স্বাভাবিক। রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র গ্যালারিতে সম্প্রতি শেষ হয়েছে শিল্পী সুমন কুমার সরকারের ‘বরেন্দ্র কাব্য ২’ শিরোনামের একক চিত্র প্রদর্শনী। প্রায় ৩০টি চিত্রকর্ম স্থান পায় প্রদর্শনীতে। জলরঙে স্বছন্দ শিল্পীর অধিকাংশ ছবিই প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি-কেন্দ্রিক, তবে কিছু  ছবিতে মানুষের দেহ অবয়বের ভঙ্গি সন্নিবেশিত ভিন্ন প্রয়াসও লক্ষণীয়। জলরং বলতে সচরাচর আমাদের চোখে ভাসে মুখস্থ ঢঙে আঁকা নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ভিত্তিক চিত্রের উপস্থাপন। এ যেন সেই আর্ট স্কুলের বাচ্চাদের একটি নদী, একটি নৌকা, ওপরে আকাশের মতোই গত্বাঁধা ঘণ্ট। সাহস করে বলতে পারি অন্তত এ ক্ষেত্রে সুমন সরকারের চিত্রকর্ম সে চৌকাঠ পেরিয়েছে অনায়াসে। নিজস্ব তাগিদে খুঁজে এনেছে রাঢ় বাংলার অনুল্লিখিত অধ্যায়ের টুকরা টুকরা জীবন ছবি। বরেন্দ্র কাব্য মূলত পৌরাণিক ভাষ্যানুযায়ী দেব আশীর্বাদপুষ্ট প্রাচীন এ জনপদের বর্তমান সময়-স্রোত চিহ্ন।

তাল সুপারি খেজুর সারি,

ধানের ক্ষেত আর মাটির বাড়ি

আমের মুকুল শিমুল তুলো

কল্কে ফুল আর রাঙা ধুলো

উতল করে মনটা...

শিলাজিৎ-এর গাওয়া এ গানের সুর ধরেই ঢুকে পড়া যায় উত্তরবঙ্গের লাল মাটির কৃষিভিত্তিক জনজীবনের চিত্রজগতে। প্রাচীন ঐতিহ্যের স্নিগ্ধ সহজাত স্বপ্রতিভ গল্পগাঁথায়। যেখানে বাঙালি আাাদিবাসী সান্তাল মিলেমিশে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সজীব-সতেজ টিকে থাকার নিত্য সংগ্রামে।

মগ্ন চৈতণ্য শিল্পীর সমুদয় চিত্রকর্মই যেন আহ্বান করে ছবির মতো সাজানো সেই রূপ ঐশর্যের অন্দরে। খুঁজে পাওয়া যায় ভাওয়াইয়া গানের সেই মৌষাল বন্ধুর পথ চাওয়া লোকালয়ের সুলুক সন্ধান। ক্ষয়িষ্ণু মাটির বাড়ি, টিনের চাল, গোয়ালে বাঁধা গরু, মহিষ, রৌদ্রে তেতে ওঠা লাল মাটির পথ, আঙিনায় পড়ে থাকা গরুর গাড়ি, অলস দুপুরে ছাগল ছানাদের বিশ্রাম, কর্মব্যস্ত কৃষি পরিবার, হাটের মানুষ, দিনশেষে ঘরে ফেরা মাঠের মানুষ, সান্তালি কন্যার মাথায় গোঁজা লাল ফুল, বাচ্চা কোলে মায়ের আন্তরিক ভঙ্গি, উঠোনে ধান শুকোনো, গৃহস্থালি নানা অনুষঙ্গ পার হয়ে পায়ে পায়ে সেই সবুজ মাঠ, চরে বেড়ানো গাভিদের অলস বিকেল, ধু ধু চরে হেঁটে চলা মানুষের ভিড়, খেয়াঘাটে পারাপার, নৌকায় ভেসে যাওয়া বহু দূর। স্পষ্টতই, শিল্পী সুমন কুমার সরকারের চিত্রে আলোচ্য বিষয়ভিত্তিক ভিন্নতাই মূল সৌকর্য ও আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। গড়পড়তা চেনা গণ্ডির বাইরে একটু উঁকি দিয়ে দেখার উৎসাহ। ধাবমান যান্ত্রিক জীবনে আধুনিকতার ভিড়ে ক্রমে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন বরেন্দ্রভূমি, যা মূলত শিল্পীর নস্টালজিক হৃদয়ের উৎসাহে উঠে এলেও নগরবাসীর কাছে এ জাতীয় চিত্র অবলোকনের পরিতৃপ্তি কম নয়।

প্রথম দেখাতেই অনুমান করা যায় সুমন সরকারের রং নির্বাচন ও বিন্যাস ভঙ্গি ভিন্ন। রং উজ্জ্বল ও বিষয়ভিত্তিক। পরিবেশের ভিন্ন ভিন্ন মুহূর্ত ও পরিস্থিতিকে পরস্ফুিটনে শিল্পীর প্রয়াস বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে। সার্ফেসে পেপার হোয়াইটের যথাযোগ্য ব্যবহার, নিয়ন্ত্রিত আলো-ছায়া, ছন্দময় তুলির টান, উপলক্ষ্যকে সঙ্গে রেখে স্বচ্ছ-অস্বচ্ছতার প্রকাশ সব মিলিয়ে শুধু চোখে নয়, চেতনায় ও এক ধরনের পরিপূর্ণ দৃশ্যের বিস্তার তৈরি করে। তবে এ কথা সত্য, সামগ্রিক চিত্রকর্মে স্পষ্ট না হলেও হালকা সুরের যে বিচলিত ভাবনার আভাস মেলে তা দেখিনি বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। অংশবিশেষ কিছু আড়ষ্টতা, আরোপিত দৃষ্টিগ্রাহ্যতা মনোযোগ ছিটকে দেয়, সাময়িক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। স্বভাবতই, সম্ভাবনার ক্ষেত্রেই আগ্রহ ও অনুযোগ গভীর হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে শিল্পীর পরবর্তী শিল্পের রূপরেখা আরো মসৃণ, সুস্পষ্ট গতিশীল হয়ে উঠবে—এ আশাবাদ ব্যক্ত করাই যুক্তযুক্ত।



মন্তব্য