kalerkantho


ফরাসি ভাষার কানাডীয় লেখক গ্যাব্রিয়েল রয়

সুব্রত কুমার দাস

১১ মে, ২০১৮ ০০:০০



ফরাসি ভাষার কানাডীয় লেখক গ্যাব্রিয়েল রয়

কানাডার ফরাসি ভাষী লেখকদের মধ্যে গ্যাব্রিয়েল রয় (১৯০৯—১৯৮৩) বিশেষ উল্লেখের দাবিদার। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টিন ফ্লুট’-এর ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি ১৯৪৭ সালে গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পান। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত ‘স্ট্রিট অব রিচেস’ এবং ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘চিলড্রেন অব মাই হার্ট’ উপন্যাসের জন্যও গ্যাব্রিয়েল গভর্নর জেনারেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কানাডীয় সাহিত্যে স্বল্প যে কয়জন সাহিত্যিক তিনবার করে বহুল আকাঙ্ক্ষিত এই পুরস্কারটি পেয়েছেন, গ্যাব্রিয়েল তাঁদের মধ্যে অন্যতম। আরো বলে রাখা যেতে পারে যে ১৯৮৭ সালে গ্যাব্রিয়েলের আত্মজীবনী ‘এনচ্যান্টমেনট অ্যান্ড সরো’র ইংরেজি অনুবাদকও গভর্নর জেনারেল পুরস্কার লাভ করেন। মূল ফরাসি থেকে ইংরেজিতে ৪০০ পৃষ্ঠার এই বিশাল বই অনুবাদ করেছিলেন প্যাট্রিসিয়া ক্লাক্সটন। উল্লেখ করে রাখা উচিত হবে যে প্যাট্রিসিয়ার অনুবাদে ফ্রাঙ্কোয়েস রিচার্ডের লেখা প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার জীবনীগ্রন্থ ‘গ্যাব্রিয়েল রায় : আ লাইফ’ বইটিও ১৯৯৯ সালে ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ শাখায় ওই পুরস্কার লাভ করে।

ফরাসি ভাষায় ‘দ্য টিন ফ্লুট’ উপন্যাসটির নাম ছিল  “Bonheur D’occasion” । বলে রাখা প্রয়োজন, সে সময় পর্যন্ত ফরাসি ভাষার গ্রন্থকে পুরস্কার দেওয়ার প্রবর্তন হয়নি, ফরাসি থেকে ইংরেজিতে অনূদিত গ্রন্থকেই শুধু বিবেচনা করা হতো। ‘দ্য টিন ফ্লুট’-এর অনুবাদক ছিলেন হানা জোসেফসন। সেটি প্রকাশিত হয় আমেরিকা থেকে। উপন্যাসটির যে অনুবাদটি বর্তমান লেখকের পড়ার সুযোগ হয়েছে, সেটির অনুবাদক এলান ব্রাউন। ১৯৮১ সালে নতুন এই অনুবাদটি প্রকাশিত হয় কানাডা থেকে। মন্ট্রিয়লের সেইন্ট হেনরি অঞ্চলের বস্তিতে ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ‘দ্য টিন ফ্লুট’-এর কাহিনি বিস্তৃত। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল। চলছে মহামন্দা। এটি কানাডীয় ফরাসি ভাষার সাহিত্যে এত বেশি আলোড়ন তুলেছিল যে ফ্রান্সের ‘প্রিক্স ফেমিনা’ পুরস্কারও লাভ করে বইটি। বইটি নিয়ে সিনেমা তৈরি হয় ১৯৮৩ সালে। আত্মজীবনীটির ইংরেজি অনুবাদের শেষে বলা আছে, বইটি স্প্যানিশ, ডেনিশ, সুইডিশ, নরওয়েজিয়ান, স্লোভাক, চেক, রোমানিয়ান এবং রাশিয়ান ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

উপন্যাসে ফ্লোরেন্টাইন ল্যাকাসি নামের এক তরুণী ওয়েট্রেসকে আমরা পাই। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত ১০ ভাই-বোনের বড় ফ্লোরেন্টাইন কাজ করে ‘ফাইভ এবং টেন’ হোটেলে। স্বপ্ন আছে বড় হওয়ার। মা-বাবার জন্য স্নেহশীল ও দায়িত্বশীল এই মেয়েটি প্রেমে পড়ে জ্যাঁ ল্যাভেস্ক নামের এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পুরুষের। তত দিনে ফ্লোরেন্টাইনের পেটে সন্তানও এসে গেছে। কিন্তু জ্যাঁ দ্রুতই ক্লান্ত হয়ে পড়ে সম্পর্ক রক্ষায়। আর তখন মঞ্চে দেখা যায় ইমানুয়েল নামের এক সৈনিকের। ছুটিতে থাকা এই সৈনিককে ফ্লোরেন্টাইনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল জ্যাঁ নিজেই। ইমানুয়েল প্রেমে পড়ে ফ্লোরেন্টাইনের। দুজনের বিয়ে হয়। ইমানুয়েলকে ভালোবাসে ফ্লোরেন্টাইন। স্বপ্ন দেখে—পেটের সন্তানকে নিজের সন্তান হিসেবেই ভাববে ইমানুয়েল।

সমালোচকদের মতে, কুইবেক প্রদেশের নগরায়ণের সত্যিকার চিত্রায়ণ পাওয়া যায় গ্যাব্রিয়েল রয়ের এই উপন্যাসটিতে। এর আগে কুইবেক বলতে মানুষ জানত গ্রামীণ জনজীবন, একটি প্রথাবদ্ধ জীবন। সে জীবনের যে পরিবর্তন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং মহামন্দার ভেতর দিয়ে সংঘটিত হয়েছে, যে পরিবর্তনের ভেতরের দিকে একটি নগর সংস্কৃতির আলো বিকশিত হয়েছে, লেখক সেটি ধরতে সক্ষম হয়েছেন পুঙ্খানুপুঙ্খতায়। পূর্ণ বাস্তবতায় সমাজকে ধরার এই ক্ষমতাই গ্যাব্রিয়েলকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। পরিণত করেছিল কানাডায় ফরাসি-ভাষী সাহিত্যচর্চার প্রধান ব্যক্তি হিসেবে। জানা যায়, আমেরিকায় বইটি সাত লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। এমনকি জনসমাগম এড়াতে গ্যাব্রিয়েলকে মন্ট্রিয়ল ছেড়ে শৈশবের শহর ম্যানিটোবাতে চলে যেতে হয়।

গ্যাব্রিয়েলের পদবিটি যেকোনো বাঙালিকে আকর্ষণ করবে সন্দেহ নেই। গ্যাব্রিয়েল ছিলেন বাবা লিওন রয় (১৮৫০-১৯২৯) এবং মা মেলিনা ল্যান্ড্রির (১৮৬৭-১৯৪৩) সন্তানদের মধ্যে কনিষ্ঠ। তাঁর বাবা কাজ করতেন সেটেলমেন্ট অফিসে। সেখানে তাঁর চাকরি চলে গেলে সেলাই করে মা সংসার চালিয়েছেন। গ্যাব্রিয়েলের জন্ম কিন্তু ম্যানিটোবার সেইন্ট বোনিফেস শহরে। কিন্তু ইউরোপ থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৩৯ সালে মন্ট্রিয়লে বসতি গড়েন। গ্যাব্রিয়েলের উপন্যাসগুলোতে তাই দুটি জীবনের চিত্র পাওয়া যায়—একটি হলো মন্ট্রিয়লের মন্দাকালীন জীবন এবং অন্যটি ম্যানিটোবার গ্রামীণ জীবন, যেখানে গ্যাব্রিয়েল কাটিয়েছেন তাঁর শৈশব-কৈশোরের মধুর দিনগুলো।

লিওন রয়ের বাবার নাম ছিল চার্লস রয় (১৮০৩-১৯০০)। চার্লসের বাবা ছিলেন জ্যাঁ রয় (১৭৬৭-১৮৩৩)। উইকিট্রি বলছে, জ্যাঁ রয়ের জন্ম হয়েছিল কুইবেকে। জ্যাঁর বাবা ছিলেন গুইলাম রয় (১৭৪০-১৮০০)। গুইলামের বাবা ছিলেন পিয়ের বানার্ড রয় (১৭০৬-১৭৮৩)। উইকিট্রি আরো জানাচ্ছে, তাঁদের পূর্বপুরুষের একসময় পদবি ছিল লিরয়। ধারণা করা হয়, সেখান থেকে পারিবারিক পদবি একসময় রয় হয়ে যায়। তবে লিরয় পদবিটা আসলে এসেছিল তাঁদের আরো পূর্বের পুরুষ লিরয় ডি নর্সম্যানের (আনুমানিক ১০৯০-১১০০) নাম থেকে। লিরয় ছিলেন স্কটল্যান্ডের বাসিন্দা।

২০১৭ সালে গ্যাব্রিয়েলের ১০৮তম জন্মদিনে মার্গারেট অ্যাটউড তাঁকে নিয়ে এক রচনা লিখেছেন। ছাপা হয়েছিল ‘ম্যাকলিন’স সাহিত্য পত্রিকায়।  ‘Gabrielle Roy, in nine parts’ শিরোনামের সেই লেখাটি ২০১৬ সালে ‘‘Legacy : How French Canadians Shaped North America’  শিরোনামের বইয়ে প্রথম প্রকাশিত হয়। লেখাটি মার্গারেট শেষ করেছেন ২০০৪ সালে কানাডায় কুড়ি ডলারের নোটে ব্যবহৃত গ্যাব্রিয়েলের উদ্ধৃতিটি দিয়ে। ফরাসি ও ইংরেজি ভাষায় উত্কীর্ণ সে উদ্ধৃতিতে লেখা ছিল  ‘Could we ever know each other in the slightest without the arts?’  সেটা যে আমরা পারি না, সে কথাই মার্গারেট ব্যাখ্যা করেছেন এবং জানিয়েছেন, কিভাবে বর্তমান সময়ে গ্যাব্রিয়েল রয় আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।

১৯৬৭ সালের ৬ জুলাই ‘কম্পানিয়ন অব দি অর্ডার অব কানাডা’ (সিসি) অভিধায় ভূষিত হন গ্যাব্রিয়েল। শংসাবচনে লেখা ছিল : One of the greatest Canadian novelists whose work won one of the first to be recognized outside of the country|

সারা কানাডায় মোট সাতটি স্কুল আছে গ্যাব্রিয়েলের নামে। ফরাসি ভাষা শিক্ষাদানের সেসব প্রতিষ্ঠানের একটি টরন্টোতে অবস্থিত, যার ঠিকানা—১৪ পেমব্রুক স্ট্রিট। ২০০৪ সালে ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস সমকালীন আরেক খ্যাতিমান সাহিত্যিক মার্গারেট লরেন্সের সঙ্গে গ্যাব্রিয়েল রয়ের পত্রালাপের একটি সংকলন প্রকাশ করেছে  ‘Intimate Strangers’ শিরোনামে।

গ্যাব্রিয়েল রয়ের রচনাসম্ভারের প্রতি একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। আগের উল্লিখিত বইগুলো বাদে বাকি প্রকাশিত বইগুলো হলো : হোয়ার নেস্টস দ্য ওয়াটার হেন (১৯৫০), দ্য ক্যাশিয়ার (১৯৫৪), দ্য হিডেন মাউন্টেইন (১৯৬১), দ্য রোড পাস্ট আলতামন্ট (১৯৬৬), ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার (১৯৭০), এনচ্যান্টেড সামার (১৯৭২), গার্ডেন ইন দ্য উইন্ড (১৯৭৫), মাই কাউ বসি (১৯৭৬), দ্য ফ্রেজাইল লাইটস অব হার্ট (১৯৭৮), ক্লিপটেইল (১৯৭৯), দ্য টরটয়েজশেল অ্যান্ড দ্য পেকিনিজ (১৯৮৭)।

গ্যাব্রিয়েলের পুরস্কারপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘স্ট্রিট অব রিচেচ’ বেশির ভাগই আত্মজৈবনিক। সেখানেও একটি মেয়েকে আমরা পাই, যে কিনা ক্রমে ক্রমে খ্যাতিমান লেখকে পরিণত হয়। এ ছাড়া ম্যানিটোবায় গ্যাব্রিয়েলের শৈশবকালে ফরাসি-কানাডিয়ান ও ইংরেজ-কানাডিয়ানদের যে বিভাজন ছিল সেটিও ফুটে উঠেছে উপন্যাসের কাঠামোতে। ক্রিস্টিন নামের কিশোরী মেয়েটির এই গল্পটি চলতে থাকে  ‘The Rood Past Altamont’  উপন্যাসেও।

পুরস্কারপ্রাপ্ত আরো একটি উপন্যাস ‘চিলড্রেন অব মাই হার্ট’ও কিন্তু আত্মজৈবনিক। এটিই ছিল নন্দিত এই লেখকের কথাসাহিত্য রচনার শেষ নিদর্শন। এই উপন্যাসের চরিত্রটির নাম কিন্তু লেখকের নামেই। সেখানে তিনি শিক্ষক—১৯৩০-এর দশকে তরুণ গ্যাব্রিয়েলকে যেমনটি আমরা দেখেছিলাম। বলে রাখা যেতে পারে, গ্যাব্রিয়েলের পুরস্কারপ্রাপ্ত তিনটি উপন্যাসই সিনেমায় রূপান্তরিত হয়েছে।

‘গ্যাব্রিয়েল রয় : অ্যা লাইফ’ জীবনীতে লেখক গ্যাব্রিয়েলের জীবনকে বিস্তারে ধরা হয়েছে। অনেক অনুপুঙ্খ বর্ণনা আছে গ্যাব্রিয়েলের জীবনের বিভিন্ন অধ্যায় নিয়ে, অগ্রসরণ নিয়ে। প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টিন ফ্লুট’ নিয়ে জীবনীকার ফ্রাক্সোয়েস জানাচ্ছেন যে তিনি উপন্যাসটির দুটি পাণ্ডুলিপি করেছিলেন। সংশোধিত দ্বিতীয় পাণ্ডুলিপিটি শেষ করার পর গ্যাব্রিয়েল গেলেন জ্যাকুলিন জেনিসেটের কাছে। ওটির একটি ঝকঝকে টাইপ কপি পেতে। জ্যাকুলিনের বরাদ দিয়ে জীবনীকার জানাচ্ছেন, সেদিন পাণ্ডুলিপিটি তাঁর হাতে এমন করে ধরা ছিল যেমন করে একজন মা তাঁর বাচ্চাকে ধরে থাকেন। জ্যাকুলিনকে ২৫ ডলার দিয়েছিলেন পারিশ্রমিকের অগ্রিম হিসেবে। পরে দুটি বাঁধানো খণ্ডে ৪৯৯ পৃষ্ঠার ওই পাণ্ডুলিপিটি তিনি প্রকাশকের কাছে জমা দেন (পৃ. ২৪৪)। ফরাসি ভাষার গ্রন্থটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে ১৯৪৫ সালের জুন মাসে। জীবনীকার বলছেন, গ্যাব্রিয়েলের প্রথম বই প্রকাশের বিষয়টি যেন অনেকটা সিন্ডারেলার গল্পের মতো ছিল। আমরা জানতে পারি, এই বই রাতারাতি একটি সাধারণ কৃষি পত্রিকার একজন সাধারণ সাংবাদিককে দেশজুড়ে একজন সেলিব্রেটিতে পরিণত করে। বহু পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। বিপুল অর্থও আসতে থাকে। সাংবাদিকরা তাঁর সাক্ষাত্কার পেতে হন্যে হয়ে ঘুরতে থাকেন। ফ্রাঙ্কোয়েসের ভাষায় কানাডীয় সাহিত্য বা কুইবেকীয় সাহিত্যে এই গ্রন্থের প্রকাশ সর্বপ্রথম একটি ‘আমেরিকান স্টাইল’-এর ঘটনা। এরপর ১৯৪৭ সালে বসন্তকালে বইটির আমেরিকান অনুবাদ প্রকাশিত হলো এবং গ্যাব্রিয়েল রয় শীর্ষ সাহিত্যিকের আসনে ভূষিত হলেন।

আগ্রহী পাঠকের জন্য বলে রাখতে চাই, গ্যাব্রিয়েলের আত্মজীবনীটি একটু অসম্পূর্ণ। পরিকল্পনায় তিন অথবা চারটি খণ্ড করার ইচ্ছা থাকলেও তিনি মাত্র দুটি খণ্ড শেষ করতে পেরেছিলেন, আর তাই সেটিতে ‘দ্য টিন ফ্লুট’ রচনার আগ পর্যন্ত আমরা পাই। ফ্রাঙ্কোয়েসের বিশালাকার জীবনীটি লেখক গ্যাব্রিয়েল রয়কে বুঝতে এক অসামান্য উৎস।



মন্তব্য