kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

গল্পের জগতে বেড়ে ওঠেন মার্কেস

৯ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গল্পের জগতে বেড়ে ওঠেন মার্কেস

বিশ শতকের প্রভাবশালী সাহিত্যিকদের অন্যতম এবং লাতিন আমেরিকার মহান লেখকদের একজন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। জন্ম ১৯২৭ সালের ৬ মার্চ। কলম্বিয়ার সাংবাদিক, চিত্রনাট্যকার, প্রবন্ধকার, ছোটগল্পকার ও ঔপন্যাসিক মার্কেস ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান।

আইন বিষয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সাংবাদিকতায় হাত পাকান। নিজের দেশ কলম্বিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য জায়গার রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে কখনো দ্বিধাবোধ করেননি। প্রেম, পাগলামি, যুদ্ধ, রাজনীতি, স্বপ্ন, মৃত্যু—এগুলো তাঁর কথাসাহিত্যে বারবার এসেছে। বড় হয়ে তিনি যা যা লিখেছেন, সেগুলোর সবই আট বছর বয়সের মধ্যেই শুনেছিলেন। মার্কেস লেখালেখি শুরু করেছিলেন আঠারো বছর বয়সে।

জীবনের একেবারে প্রারম্ভে কয়েক বছরের জন্য মার্কেস মা-বাবার সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তখন ছিলেন নানা-নানির কাছে। ১৯৩৭ সালে নানার মৃত্যুর পর আবার মা-বাবার সঙ্গেই ছিলেন তিনি। নানা-নানির সঙ্গে কাটানো দিনগুলো মার্কেসের মানস গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। নানা ছিলেন যুদ্ধফেরত কর্নেল। কলম্বিয়ার উদারপন্থীদের কাছে তিনি ছিলেন বিশেষ শ্রদ্ধার ব্যক্তিত্ব। সমাজের অসংগতির বিরুদ্ধে তিনি কখনো নীরব থাকতেন না। ছোট মার্কেসের কাছে তিনি মজার মজার সব গল্প বলতেন। তাঁর গল্পের মধ্যে ছোট বালক মার্কেসের জন্য থাকত অনেক অলৌকিক উপাদানও। তাঁর কাছ থেকেই মার্কেস শুনেছিলেন মৃত মানুষের ওজন সম্পর্কে : কাউকে হত্যা করার মতো ভারী কাজ আর হতে পারে না। এ  রকম সত্য পরে মার্কেস তাঁর কথাসাহিত্যে ব্যবহার করেছেন। মার্কেসের ওপর তাঁর নানির প্রভাব ছিল আরো সরাসরি। অসাধারণ কোনো বিষয় নানি খুব স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতেন। ভূত-পেত্নী আর অশুভ আত্মাদের আগমনের ইঙ্গিতে পূর্ণ ছিল নানির গল্পের আঙিনা। বাস্তবতার ভেতর প্রচলিত বিশ্বাস আর অতিপ্রাকৃত বিষয়ের সন্ধান দিতে পারতেন নানি। নানির গল্প বলার ধরন খুব ভালো লাগত মার্কেসের। গল্পের মধ্যে অতিকল্পিত আর অসম্ভব বিষয়গুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতেন, যেন সেগুলো আসলেই বাস্তবের ঘটনা। বিশেষভাবে উল্লেখ করলে বলা যায়, তাঁর গল্প বলার ঢং দারুণভাবে প্রভাব ফেলে নাতি মার্কেসের কথাসাহিত্যে। নানা ও নানির গল্পের জগতের ভিন্নতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমার নানার জগৎ ছিল কট্টর বাস্তবতার জগৎ। অন্যদিকে, আমার নানির জগৎ ছিল অতিকল্পনার জগৎ। বাস্তবতা থেকে একেবারেই দূরের সে জগৎ।

উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছোটগল্প কিংবা মহাকাব্যিক উপন্যাস, যেকোনো ধরনের সাহিত্য প্রসঙ্গে কথা বলার সময় মার্কেসকে মহান লেখকদের অন্যতম হিসেবে গণ্য না করে উপায় নেই। আরেক লাতিন কথাসাহিত্যিক কার্লোস ফুয়েন্তেস তাঁর সম্পর্কে বলেন, ‘সার্ভান্তেসের পর থেকে এ পর্যন্ত স্প্যানিশ ভাষার সবচেয়ে প্রিয় এবং সম্ভবত মহান লেখক তিনিই।’ বিশাল কাহিনির নিবিড় বয়ানের দিক থেকে মার্কেসকে তুলনা করা হয়ে থাকে উইলিয়াম ফকনার এবং আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে। আর অবিচ্ছেদ্য ঘটনাবলির কাহিনিও তাঁর হাতে সাবলীল গতিতে চলে বলেই তাঁকে দেখা হয় সার্ভান্তেসের সমান্তরালে। তাঁর কথাসাহিত্যে কলম্বিয়ার যে জগৎ তুলে ধরেন, সেখানে মধ্যযুগ আর আধুনিককালের রীতিপ্রথা, বিশ্বাস, সংস্কার পরস্পরের মুখোমুখি হয় আনন্দ-বেদনার মিশেলে। ২০১৪ সালে তাঁর মৃত্যুর পর কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস তাঁকে ‘কলম্বিয়ার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব’ হিসেবে অভিহিত করেন।

নিজে গল্প শুনে বড় হয়েছেন এবং পরবর্তী সময় গল্পই তৈরি করেছনে। তাঁর সন্তানদের জন্যও গল্পের আবহ তৈরি করেছেন। তাঁরা বড় হতে হতে গল্পের জগতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। মার্কেসের ছেলে চিত্রনাট্যকার এবং টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র পরিচালক রডরিগো গার্সিয়া জানান, বড় হতে হতে তিনি দেখেছেন, তাঁদের বাড়িতে গল্প বলার, গল্প তৈরির আসর হতো। তাঁর মা-বাবার বন্ধুবান্ধবরা বসার ঘরে গল্প নিয়েই কথা বলতেন। বাড়িতে আগতরা ছিলেন লেখক, চিত্রকর, অভিনেতা ও নাট্যকার। ছেলে রডরিগেজ যখন চিত্রনাট্য লেখা শুরু করেন, তাঁর প্রথম পাঠক ছিলেন মার্কেস। পরবর্তী সময় যত দিন বেঁচেছিলেন, তিনিই ছেলের সব লেখার প্রথম পাঠক ছিলেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তিনি ছেলের লেখার সমালোচক হিসেবে খুব কড়া ছিলেন না মোটেও; বরং ছেলের লেখার প্রতি উদার সমর্থন দিয়ে যেতেন। ছেলের চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের কাজ সম্পর্কেও তিনি ছিলেন দারুণ উদার। ছেলের কাজ তাঁর বন্ধুদের দেখাতেন এবং তাঁদের কাছেও দ্বিধাহীন কণ্ঠে ছেলের প্রশংসা করতেন মার্কেস।

 

► দুলাল আল মনসুর


মন্তব্য