kalerkantho


এই যে অন্ধকারে

ধ্রুব এষ   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এই যে অন্ধকারে

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

পারওয়েজ একজন ন্যাকটোফিলিয়াক। অন্ধকার পছন্দ করে। সুবিধা আছে। অন্ধকারে নিজেকে দেখা যায়। মুখোমুখি বসে দেখা যায়, দাঁড়িয়ে দেখা যায়। শুয়ে কখনো দেখেনি পারওয়েজ। আমার মুখোমুখি আমি শুয়ে আছি, চিন্তাটাই অস্বস্তিকর কেমন।

বয়স এই জানুয়ারিতে ৪৬ হয়েছে। ম্যারিটাল স্ট্যাটাস কি বলা যায়? বিয়ে করেছিল চার বছর আগে। দুই বছরে বুঝে গেছে তাদের হবে না। পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি। নোটারি পাবলিক সমীপে উপস্থিত হতে হয়েছিল একদিন। পুরান ঢাকার কোর্ট-কাচারি এলাকায়। কাগজপত্রে সইসাবুদ করে একা চলে গিয়েছিল নোশিন। পারওয়েজ সূত্রাপুর গিয়েছিল এবং ডাইলপট্টির বাংলা গলিতে বসে তিন গ্লাস বাংলা মদ খেয়ে মাতাল না হয়ে বাসায় ফিরেছিল। দুই বছর আগের ঘটনা। তাদের আর দেখা হয়নি কোথাও। দ্বিতীয় বিয়ে তারা কেউ এখনো করেনি।

নোশিনের কথা সে বলতে পারবে না, তবে পারওয়েজ বিয়ে করবে আবার। বর্তমানে একজনের সঙ্গে স্পষ্ট এবং একজনের সঙ্গে অস্পষ্ট, দুটি সম্পর্ক তার যাচ্ছে। এই দুজনের মধ্যে কেউ না, সে বিয়ে করবে আর কাউকে। সে কি অরু?

৬টা কার্লসবাগ বিয়ার ছিল ফ্রিজারে। তিনটায় কী হয়, মাথা আউলা হয়েছে কিছুটা। সঙ্গে আবার উইড। ১২টা ২৮ মিনিটে সর্বনাশ করেছে পারওয়েজ। বহুদিন পর টেক্সট করেছে অরুকে, ‘তুমি কেমন আছ, অরু?’

অফিস করে ক্লান্ত অরুর এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়ার কথা। ফোন অফ করে দিতে যাচ্ছিল পারওয়েজ। রিপ্লাই দিল অরু, ‘খুব ভালো আছি। আপনি?’

সব সময় ভালো থাকে সে।

পারওয়েজ বলে, চিরসুখীজন।

কেমন আছে পারওয়েজ? রিপ্লাই দিল, ‘আমি তোমার মতো ভালো কী করে থাকব?’

একটা সেন্ড করেই আরেকটি টেক্সট, ‘তুমি এত ভালো থাক কী করে? হ্যাঁ?’

রিপ্লাই : ১২ : ৫৫ : ৪০।

শিওর... কেন না?... ভালো থাকার রাইট আপনারও আছে... শুধু পথটা খুঁজে নিতে হবে।

রিপ্লাই : আমি কোনো পথ চিনি না। তুমি কী করো? ঘুম ধরে গেছে?

রিপ্লাই : ১২ : ৫৮ : ১৭।

নাহ... আজ অনেক ঘোরাঘুরি করলাম। আড্ডা দিলাম।... আবার আড্ডার প্ল্যান করি।

রিপ্লাই : বাহ্!

রিপ্লাই : ০১ : ০০ : ৩৪।

আপনি আসবেন একদিন আড্ডা দিতে?

রিপ্লাই : আসব... তুমি আর কারা?

রিপ্লাই : ০১ : ২৮ : ৫৫।

আপনি... কাকো, আমি। আর কেউ না।

অরুর বন্ধু কাকো। বিয়ে করেছে নোশিনের কাজিন শর্মিকে। তার নাম কাকো কেন? সে দেখতে কাকের মতো বলে? দাঁড়কাকের মতো। অরু এবং দাঁড়কাকের সঙ্গে একদিন আড্ডা দিতে যাবে পারওয়েজ? না। পারওয়েজ আর আড্ডায় যায় না। তেমন আড্ডা হয় নাকি আর? পাবলিক বাসে করে এখন ভার্চুয়াল জগতে। ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াট্স অ্যাপ, কত কী! পারওয়েজ ওসব কিছুতে নেই। ফেসবুকে ছিল কিছুদিন। ত্যক্ত হয়ে আইডি ব্লক করে রেখেছে। মোবাইল ফোনই বিরক্ত লাগে তার। তাও টাচফোন না, সস্তা অত্যন্ত সাদামাটা সেট, মেসেজ অপশন আছে, মিউজিক স্টেশন আছে। মিউজিক শুনতে হলে এয়ারফোন লাগবে। সেটের সঙ্গে ছিল একটা। হারিয়ে গেছে। ভালো হয়েছে।

 

রাত ০২ : ০২ : ০২।

ঘুম?

ধরছে না।

বহুদিন পর অরু নিউরনে নিউরনে। হাই প্রোফাইল অরু। তিনটি বিয়ে এক্সপেরিয়েন্স করেছে। পারওয়েজ প্রথম এবং দ্বিতীয় জামাইটাকে দেখেনি। তৃতীয়টাকে দেখেছিল এবং যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছিল। ‘বাঙালি’ সংস্কৃতির ধারক বাহক এবং প্রমোটার। কথা বলে টোন বেজে নামিয়ে। দেড় শ বছর শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করেছে—এ রকম একটা ভাব প্রকট হয় কথায়।

‘আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আনন্দিত হলাম, পারভেজ ভাই।’

‘পারভেজ না ভাই, আমার নাম পারওয়েজ। বানানো নাম না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমার বাপজান রেখেছিলেন।’

‘দুঃখিত, পারভ্...ওয়েজ ভাই। আপনার বাবা শিক্ষক ছিলেন শুনে অত্যন্ত প্রীত হলাম। আমার বাবাও প্রধান শিক্ষক ছিলেন। হবতপুর বহুমুখী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের। এই যে দেখেন, এই হলো হবতপুর বহুমুখী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। এই হলেন আমার বাবা।’

পারওয়েজ বিরক্ত হতে হতে হয়নি। ট্যাবে হবতপুর বহুমুখী বালিকা বিদ্যালয়ের ছবি দেখে। জারুলগাছের এলাকা। পৃথিবীর সব জারুল ফুল ফুটে আছে। তার মধ্যে দোতলা বালিকা বিদ্যালয়। সাদা বিল্ডিং। বহু দূরে নীল রঙের পাহাড়।

সাংস্কৃতিক প্রমোটার যেদিন গেছে চুরি করে অরুর বেডরুম থেকে টেবিলফ্যান, হেয়ার ড্রায়ার, কিচেন থেকে মাইক্রোওয়েভ ওভেন এবং ফ্রিজার থেকে তিন বোতল হোয়াইট ওয়াইন নিয়ে গেছে। অরু তখন বাসায় ছিল না। এ রকম একটি জিনিসকে কেন বিয়ে করতে গিয়েছিল অরু? সেও কি মানুষ চিনতে পারে না?

 

বাচ্চাকাচ্চা অরুর হয়নি। সমস্যা আছে। ওভারি ম্যাচিউর করেনি। অরুকে দুই চোখে দেখতে পারে না মাসুম হাবীব। বিনোদন এবং করপোরেট সাংবাদিক। অরু পত্র-পত্রিকার ‘করপোরেট’ পাতার নিউজ আইটেম। মাসুম হাবীব যা বলেছে তা অবশ্য কখনোই নিউজ হবে না।

‘আরে বস! সে তো বিরাট হান্টার। দিনে দুটি-তিনটি নেয় পারলে।’

‘সে তো তুইও। হান্টার। উদ্যান হোটেল, হাঙর হোটেলে যাস।’

‘আরে! দুটি ব্যাপার এক হলো, বস?’

‘কেন? এক হলো না কেন? অরু মেয়ে বলে?’

১৮-১৯ বছর ধরে পরিচিত তারা। ৩০-৩১ বছর বয়সের পারওয়েজ অরুকে একদিন বলেছিল, ৪০ বছর বয়স হয়ে গেলে আমরা একসঙ্গে থাকব।

কেন বলেছিল?

অরুর বয়স কি ৪০ হয়নি? না হলেও হয়ে যাবে। অরু কি পারওয়েজের সঙ্গে থাকবে? কথাটাই হয়তো মনে নেই অরুর। টেক্সট না করলে কি পারওয়েজের কথা কখনো মনে পড়ে অরুর? এমনি এমনি মনে পড়া না, পারওয়েজ যে রকম মনে করে। পারওয়েজ কিরকম মনে করে?

বিয়ারের যন্ত্রণামূলক একটি সাইড এফেক্ট হলো প্রস্রাব পায় একটু পরপর। আবার পেয়েছে। পারওয়েজ উঠল। অন্ধকার ওয়াশরুমে ঢুকে কী কী ভাবল? অরুর কিছু কথা। কখনোই রোমান্টিক টাইপের ব্যক্তি না সে। ফ্লাইংজোনে থাকলে এক রকম, না থাকলে এক রকম। এখন যেমন ফ্লাইংজোনে আছে। মাথা কিছু আউলা হলেও ঠাণ্ডা। প্রস্রাব করতে করতে সে অস্পষ্ট সম্পর্ক ‘ডিপ’-এর টেক্সটটা দেখল।

স্যরি, আমি রাগ করিনি আপনার সঙ্গে... অ্যাকচুয়ালি আইঅ্যাম পিসড অফ। নেভার মাইন্ড। আইঅ্যাম নেভার গোনা টক উইথ ইউ।

 

রাত : ১১ : ০২ : ২৩।

১৮ ডিসেম্বর।

মজা হয়েছিল। এই টেক্সট পড়ে মাথাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল পারওয়েজের। পিসড অফ কী বুঝতে পারছিল না। টেক্সট করেছিল আশ্বিন পাগলিকে, ‘পিসড অফ মানে কী?’

রিপ্লাই : প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া।

!!!

ডিপের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেছে!

পরে বুঝেছে।

হিসাব করে দেখল পারওয়েজ। ২৩ দিন আগের টেক্সটটা। ডিপ আর টেক্সট করেনি তাকে এবং কোনো রকম যোগাযোগ রাখেনি। এখন টেক্সটটা ডিলিট করে দিল। এমন না হলেও ফোনে আর কিছু টেক্সট আছে ডিপের। ডিলিট করে দিতে হবে সব।

প্রস্রাব শেষ। ফোন বাজল।

পারওয়েজ ধরল, ‘হ্যালো।’

‘তুমি কোথায়?’

নারী কণ্ঠ। কে?

পারওয়েজ বলল, ‘আমি(।)’

‘আমি কী? তুমি কোথায়? রাত কটা বাজে, বলো তো? যতবার কল দিই ফোন ব্যস্ত। কার সঙ্গে এত কথা বলো? আমি এদিকে চিন্তায় মরে যাই। সত্যি সত্যি তুমি এখন কোথায়?’

‘সত্যি সত্যি আমি এখন লিফটে।’

পারওয়েজ কেন বলল?

‘ওহ্। আসো।’

বলে ফোনের লাইন কেটে দিল মেয়েটা। মেয়ে না, মহিলা? বিবাহিত কেউ বোঝাই যাচ্ছে। কল দিয়েছিল স্বামীপ্রবরকে। পারওয়েজের কণ্ঠস্বর কি এতটাই তার স্বামীপ্রবরের মতো? আরে! চমকাল পারওয়েজ। তার মনে হলো অরু ছিল ওটা! কিভাবে? রিসিভড কল লিস্ট দেখল পারওয়েজ। অরুই!

আরে! সে কোথায়? ওয়াশরুম না, সত্যি সত্যি সে একটা লিফটে, দেখল পারওয়েজ। ফ্লোর বারোর বাটন রেড হয়ে আছে। লিফট যায় ফ্লোর ১৮ পর্যন্ত। এখন আছে ফ্লোর ৮-এ। আয়না আছে লিফটে। পারওয়েজ তার মিরর ইমেজ দেখল। সাক্ষাৎ দাঁড়কাক। পিকক বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট থেকে সামান্য পান করে সে ফিরেছে। রাব্বী, শাহরিয়ার ও জগদ্বিখ্যাত তরলদার সঙ্গে।

ফ্লোর ১২। লিফট থামল। মাত্র লিফট থেকে নেমেছে পারওয়েজ, ইলেকট্রিসিটি ফেইল করল কমপ্লেক্সের। আনন্দিত হলো ন্যাকটোফিলিয়াক পারওয়েজ। অন্ধকার ভালোবাসে সে। কত কী হয়, কত কী দেখা যায়। কমপ্লেক্সের জেনারেটর চালু হয়ে যাওয়ার কথা, হচ্ছে না কেন? না হোক।

এল (১১) অন্ধকারে ফ্ল্যাটের দরজায় টোকা দিল পারওয়েজ। দরজা খুলে দিয়ে অরু বলল, ‘হুঁ।’

অরু ন্যাকটোফিলিয়াক না। অন্ধকার ভয় পায়। চার্জার লাইট আবার পছন্দ করে না। মোম জ্বলছে মাটির মোমদানিতে। পারওয়েজ দরজা আটকে অরুকে দেখল। অরু রঙিন নকশা করা নীল জমিনের কাফতান পরেছে। মোমের শিখা নাচছে তার চোখের মণিতে।

মোম নিভিয়ে দিল পারওয়েজ।

অরু বলল, ‘এই! কী হলো? কী হলো?’

পারওয়েজ বলল, ‘কিছু নয়, চুপ!’

লক্ষ্মী মেয়ে। কথা শুনল অরু। সুখে-দুঃখে ছয় বছর আট মাস... না ৯ মাস হয়ে গেল লক্ষ্মী এই মেয়েটার সঙ্গে আছে পারওয়েজ। সারা জীবন থাকবে। আর যত দিন তার সারা জীবন আর কী।

অরু বলল, ‘নোশিন ফোন করেছিল। এই শীতে তারা দার্জিলিং যাচ্ছে।’

পারওয়েজের বাল্যবন্ধু মারুফুলের বউ নোশিন। মুটকির মুটকি। জাহান্নামে যাক তারা।

পারওয়েজ অন্ধকারে অরুকে দেখল। আহ্! অরুকে শুধুই একটা প্রজাপতিনী মনে হলো তার। একটা প্রজাপতিনীর সঙ্গে সে থাকে! থাকবে।


মন্তব্য