kalerkantho


লে খা র ই শ কু ল

আমরা সাহিত্যের বড় একটা অংশ পড়ে থাকি অনুবাদে : আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমরা সাহিত্যের বড় একটা অংশ পড়ে থাকি অনুবাদে : আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার

পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ইডিস ভাষার কথাসাহিত্যিক আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গার। ১৯৩৫ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। তাঁর মাতৃভাষা ইডিসে লেখা গল্প-উপন্যাস আমেরিকায় ইংরেজি অনুবাদের সময় নিজে তত্ত্বাবধান করতেন। এই ইংরেজি অনুবাদই ছিল তাঁর লেখার অন্য ভাষায় অনুবাদের ভিত্তি। তাঁর লেখার ইংরেজি অনুবাদকে তিনি ‘দ্বিতীয় মূলরূপ’ বলতেন।  

১৯৭৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সময় তাঁর কৃতিত্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তিনি ইসরায়েলের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁকে ইহুদি লেখক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। লেখকের ধর্মীয় পরিচয়ে তাঁর অস্বস্তি ছিল। তিনি মনে করতেন, লেখককে আলাদা পরিচয়ে পরিচিত করাতে চাইলে বড়জোর ভাষার সঙ্গে এক করে দেখা যেতে পারে : কেউ ইডিস লেখক, কেউ হিব্রু ভাষার লেখক, কেউ ইংরেজির লেখক, কেউ স্প্যানিশ ভাষার লেখক—এ রকম হতে পারে। তবে সর্বোপরি লেখককে শুধু লেখক হিসেবে দেখাই শ্রেয়। 

সিঙ্গারের লেখালেখি শুরুর পর্যায়ে মডেল হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন ভাই আই জে সিঙ্গারকে। মা-বাবার সঙ্গে সংগ্রামের জীবন যাপন করার সঙ্গে আই জে সিঙ্গার লেখালেখিও চালিয়ে যান। তাঁকে দেখেই প্রথমত, উৎসাহ পান বাশেভিস সিঙ্গার। ভাইয়ের পরামর্শে শিখেছিলেন, ভালো লেখার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো লেখকের তরফে অতিরিক্ত ব্যাখ্যা না করা। কারণ বেশি ব্যাখ্যা দিলে লেখার উপাদান নতুন হলেও অতি দ্রুত সেটি পুরনো হয়ে যায়। লেখক ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলে লেখা শুরুর পর্যায়েই সেকেলে হতে পারে। প্রধান চরিত্রের মধ্যে কী আছে, তার ইঙ্গিত দেওয়া গেলেও বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, দস্তয়েভস্কির লেখার মধ্যে কোথাও ব্যাখ্যার নজির দেখা গেলেও সেটি শুধুই তাঁর নিজস্ব একটা ধরন মাত্র।

ইডিস ভাষার পাঠক না থাকার কারণে প্রধানত অনুবাদের ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে। তাঁর বই প্রায় ষাটটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। অনুবাদের ব্যাপারে তাঁর নিজস্ব মতামত ছিল। দ্য প্যারিস রিভিউ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি উল্লেখ করেন—প্রথমত, অনুবাদে মূল টেক্সটের কিছু না কিছু হারিয়ে যেতে পারে, বিশেষ করে কবিতায় এবং রম্য রচনায় এ ব্যাপারটি বেশি ঘটতে পারে। তাঁর মতে, লোককথা নিয়ে রচিত সাহিত্যেরও কিছু কিছু বিষয় হারিয়ে যেতে পারে অনুবাদে। এর কারণ হিসেবে বলেন, কোনো ভাষার বিশেষ প্রকাশ ক্ষমতার সঙ্গে অন্য ভাষার সমপর্যায়ের প্রকাশ ক্ষমতা নাও থাকতে পারে। তবে অনুবাদের সমর্থনে বলেন, ‘আমরা তো সাহিত্যের বড় একটা অংশ পড়ে থাকি অনুবাদেই। বেশির ভাগ মানুষ তো বাইবেল পড়েন অনুবাদে। আমরা হোমার এবং অন্যান্য ক্ল্যাসিক রচনা পড়েছি অনুবাদে। অনুবাদ হয়তো মূল লেখার খানিকটা ধারণ করতে পারে না। কিন্তু লেখাটাকে তো ধ্বংস করে দেয় না। বরং ভালো লেখক অনুবাদের মাধ্যমে পরিচিতি পান এবং টিকে থাকেন।’ অনুবাদ সম্পর্কে নিজের লেখা থেকেও অভিজ্ঞতা পান সিঙ্গার। কখনো কখনো অনুবাদককে সহায়তা করার জন্য তিনি নিজে অনুবাদের সময় পাশে থাকতেন। এই কাজটি করতে গিয়ে তিনি মূল লেখার কোথায় কোন ত্রুটি আছে, সেগুলোও ঠিক করার সুযোগ পেয়েছেন।

সিঙ্গার ধর্মীয় বইপত্র পড়তেন। বড় হওয়ার কালে ইহুদিদের লোককথা পড়েছেন, শুনেছেন। মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি দস্তয়েভস্কির ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ পড়েন। এককথায়, ছোটবেলা থেকে তিনি সব কিছুই পড়তেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ—সব পড়তেন। তলস্তয়, তুর্গেনেভ, মোপাসাঁ, চেখভ প্রমুখের লেখা পড়েছেন অল্প বয়স থেকেই। সিঙ্গারের ওপর ন্যুট হ্যামসুনের প্রভাব রয়েছে। পরবর্তী সময়ে তিনি হ্যামসুনের অনেক লেখা অনুবাদ করেন। তবে টমাস মান সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আলাদা। তাঁর নিজের লেখার প্রক্রিয়াও ছিল মানের প্রক্রিয়ার বিপরীত। মোপাসাঁর কাছ থেকে তিনি নাটকীয়তার গুণ পান। মোপাসাঁসহ আরো সব ফরাসি লেখকের মতো সিঙ্গারের লেখার মাত্র কয়েক পৃষ্ঠার মধ্যে পাওয়া যায় ব্যাপক মনস্তাত্ত্বিক চিত্র। আর চেখভের কাছ থেকে পেয়েছেন স্বল্পপরিসরে চরিত্রগুলোর মধ্যে ব্যাপক জটিলতা উপস্থাপনের কৌশল। সিঙ্গার তাঁর ছোটগল্প সংকলনের প্রাককথনে ছোটগল্পের প্রধান দুজন ওস্তাদি লেখক হিসেবে উল্লেখ করেন মোপাসাঁ ও চেখভের নাম।

 

দুলাল আল মনসুর

 



মন্তব্য