kalerkantho


ধারাবাহিক উপন্যাস

বিষণ্ণ শহরের গল্প

সেলিনা হোসেন   

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিষণ্ণ শহরের গল্প

অঙ্কন : বিপ্লব

দশ

একটু আগে ফাঁসির দড়ি থেকে নামিয়ে আনা মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে থাকে নুটু জল্লাদ। দেখে মনে হয়, বুক টান করে শুয়ে আছে লোকটি। ওর মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু শরীরে কথা আছে। পুরো শরীর গবগবিয়ে কথা বলছে। সে কথা ভেসে যাচ্ছে জেলখানার সব জায়গায়। এমনকি ফেলে রাখা শূলঘরেও। ফাঁসি দেওয়ার জন্য কখনো এই ঘর ব্যবহার করা হয়। যদি ঝড়বৃষ্টির কারণে ফাঁসির মঞ্চ ব্যবহার করা না যায়। নুটুর চোখের সামনে শূলঘর ভেসে ওঠে। ওকে একবার শূলঘরে জল্লাদের কাজ করতে হয়েছিল। ১০ নম্বর সেলের পাশের ঘরটি এখন শুধু ঘর নয়, ওটা নুটুর সামনে পুরো জেলখানা। আর এই খুনি লোকটির মৃতদেহ সবখানে বুক টান করে পড়ে আছে।

গবগবিয়ে কথা ভেসে আসে, আমাকে নিয়ে তোর এত ভাবনা কেন নুটু জল্লাদ? শয়তান একটা।

—ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগে তুই সারাক্ষণ চেঁচামেচি করেছিলি। তুই মৃত্যুভয়ে কাতর ছিলি না। উল্টো বলেছিলি, যে অপরাধের জন্য আমাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, সে অপরাধ করে অনেকে বেঁচে গেছে।

—ঠিকই তো বলেছি। এই শহরে এমন ঘটনা ঘটেনি?

—আমি জানি না। তুই আমাকে এসব কথা বলবি না। আমি জানি, তুই একটা খুনি। অপরাধ করেছিস। তার জন্য মরেছিস।

নিজের সঙ্গে এভাবে কথা বলে থেমে যায় নুটু জল্লাদ। ওর দৃষ্টি মৃতদেহের ওপর ঘুরে বেড়ায়। দৃষ্টি মুখের ওপর থেকে বুকের ওপর আসে। তারপর পেট থেকে পা পর্যন্ত দেখা হলেও নিজের দুই হাতের দিকে তাকায়। বাহার আর ও মিলে ঝুলন্ত লাশ নামিয়েছিল।

একে একে অন্যরা এদিক-ওদিক চলে যাচ্ছে। ও নিজেও দুই পা পিছিয়ে আসে। ওকেও চলে যেতে হবে। কিন্তু চিন্তা ছাড়ে না ওকে। ও এই জেলখানার দীর্ঘমেয়াদের কয়েদি। সবাই জানে, দেশে পেশাদার জল্লাদ নাই। সে জন্য জেলখানার দাগি আসামিদের মধ্য থেকে জল্লাদ বাছাই করা হয়। জল্লাদের কাজ করলে এসব আসামিকে তাদের সাজার মেয়াদ থেকে এক বছর মাফ করে দেওয়া হয়। এটিই কাজের মজুরি। নুটু জল্লাদ এই মজুরির কথা ভেবে খুকখুক শব্দে হাসে।

—হাসছিস কেন, জল্লাদ? মেয়াদের এক বছর মাফ পেয়ে খুশি হয়ে গেলি?

—খুশি তো হবোই। হবো না কেন? এক বছর কি কম সময়? তোর মতো ১০টা খুনির ফাঁসির কাজ করতে পারলে ১০ বছর মাফ পেতাম রে শয়তান।

—তুই তো নিজেও একটা শয়তান।

—মরেছিস, মরে থাক। আর কথা বলবি না।

বড় আমগাছটার নিচে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে নুটু জল্লাদ। বুঝতে পারে, ফাঁসির আসামির মরণ ওকে নানা কিছু ভাবাচ্ছে। একদিন ডাকাতির অপরাধে আসামি হয়ে ঢুকেছিল জেলখানায়। কয়েদি হয়ে দিন কাটাচ্ছে। আবার জল্লাদ হয়ে ফাঁসির আসামির কপিকল ঘুরিয়েছে। যেসব কয়েদি ফাঁসির কাজের সঙ্গে যুক্ত হয় তারা সবাই জল্লাদ। যে আসামির পোশাক পরায়, যে হাত বাঁধে, যে পা বাঁধে, যে দুজন দুপাশে থেকে ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যায়, যে যমটুপি পরায়, যারা ঝুলন্ত আসামিকে দড়ি থেকে নামিয়ে আনে তারা সবাই জল্লাদ।

—জল্লাদ, জল্লাদ, আমরা সবাই জল্লাদ—

উত্ফুল্ল কণ্ঠে টেনে টেনে এসব বলে নিজের শরীর ঝাঁকায় নুটু। কতকাল আগে বাবা একটি ভালো নাম রেখেছিল, সে নাম ধরে এখন আর ডাকে না। একবার একজন মুরব্বি বলেছিল, ডাকাতের আবার ভালো নাম কী? ডাকাতকে ডাকাত বলে ডাকবি তোরা। ওই মুরব্বির ওপর খুব রেগে গিয়েছিল ও। শাসিয়ে কথা বলেছিল। এখন ওর বয়স হয়েছে। সেই মুরব্বিও বেঁচে নেই। শুধু নিজের নামের জন্য দুঃখ হয়। তার পরও জল্লাদ, জল্লাদ বলে সুর করে গায়।

ভেসে আসে শহরের কণ্ঠস্বর।

—কী রে, তুই এত খুশি কেন নাড়ুগোপাল?

—তুমি আমাকে নাড়ুগোপাল বলছ, কেন শহর?

—তোকে একটা নাম দিলাম। তুই তো তোর আসল নাম হারিয়েছিস? একটা নাম দিলাম সেটা নে না।

—ঢং দেখিয়ো না। তোমার নামে আমার কিছু যায়-আসে না।

—ঠিক আছে, কিছু না আসলে-গেলে আর কী করা। এটা তো তোর ছয় নম্বর ফাঁসির মৃত্যু। তুই ছয় বছর সাজা মাফ পেয়েছিস। আজ তোর ফুর্তি করার রাত।

—ঠিক বলেছ, কারো মৃত্যু, কারো ফুর্তি। তুমি আর আমার সঙ্গে কথা বলবে না।

—তুই কী চাস যে এমন ফাঁসির মৃত্যু মাসে দু-চারটা হোক?

—ধুত কী যে বলো না, তুমি তো ইচ্ছামতো কথা বলো না বিষণ্ন শহর। আজ তোমার কী হলো?

শহরের কণ্ঠস্বর আর ভেসে আসে না। নুটু জল্লাদ দেখতে পায়, ফাঁসির মঞ্চের ফ্লাডলাইট নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। চারপাশে সাধারণ বাল্ব জ্বলছে। খুনিটার লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। জেলখানার নিয়ম অনুযায়ী কাল সকালে ওই লাশ পরিবারের কাছে দেওয়া হবে। ও আবার হাঁটতে শুরু করলে বাহার ওকে ডাকে।

—দাঁড়াও, নুটু ভাই।

ও কাছে এলে নুটু জল্লাদ জিজ্ঞেস করে, ক রে কিছু বলবি?

—আমাদের জেলঘর থেকে এক বছরের আয়ু কমল।

—ভালোই তো। লোকে বাইরে বসে খুন করবে, আমরা জেলে বসে আয়ু গুনব। বেশ মজার খেলা না রে?

—হ্যাঁ, ভীষণ মজার। চলো শিস বাজাই।

—চলো, চলো। দুজনে শিস বাজাতে বাজাতে যার যার সেলে যেতে থাকে। একসময় শিস বাজানো থামিয়ে বাহার বলে, তুমি এত হালকা করে শিস বাজাচ্ছ কেন, সরদার?

—আমাকে সরদার বলবি না।

—কেন বলব না? তোমাকে তো জল্লাদ দলের সরদার করেছে জেলখানা।

—আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে।

—তাতে কী হয়েছে? এটা তো জেলখানার কাগজপত্রে থাকবে যে তুমি সরদার ছিলে।

—এসব তো আমি জানি। একটি ফাঁসির কাজ করার জন্য যাদের জল্লাদ বানানো হয়, তার একজন সরদার থাকে।

—এই সরদারই ফাঁসির শেষ কাজটি করে।

—চুপ কর, বাহার।

—তাহলে চলো, ওই ঘরটার সামনে দিয়ে ঘুরে আসি।

—কোন ঘর?

—ওই যে, ফাঁসির দণ্ড শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের যে ঘরে রাখা হয়।

—কেন রাখা হয়, জানিস?

—কেন? এমন কথা তো আমি শুনিনি।

—এখন এই ঘর দেখে কী হবে?

—এমনি দেখতে চাই। আজকে সারা দিন সবাই মিলে ওখানে থাকলাম।

—এটা থাকা নয়। বলতে হবে ফাঁসির কাজ ঠিকঠাক মতো করার জন্য আমাদের প্রস্তুত করা হয়েছে।

—ভালো ভালো খাবার খাইয়েছে। ওই ঘরে নিজেকে বন্দি মনে হয়নি। আমরা বেশ হাসিখুশি ছিলাম।

—ভালো খাবার তো খাওয়াবেই। খাওয়ায় এ জন্য যে আমাদের মনের জোর যেন ঠিক থাকে। আমরা যেন উল্টাপাল্টা কোনো কিছু না করে ফেলি।

—তুমি এত বোঝো নটু ভাই। সে জন্য তো তোমাকে সরদার বলি।

—ভাগ, ভাগ আর কথা বাড়াস না। আমাদের পাহারায় রাখা হয়েছিল। দেখেছিস তো?

—হ্যাঁ, তা দেখেছি।

—পাহারা দিয়েছে কেন বল তো?

—তা জানি না।

—খেয়েদেয়ে আমরা যেন বেসামাল হয়ে না পড়ি সে জন্য। লোকটা আমাদের ওপর কড়া নজর রেখেছিল।

—হ্যাঁ, তা আমিও খেয়াল করেছি। এসব করা ঠিক আছে। ফাঁসি যেন ঠিকমতো দেওয়া হয় সে জন্য জেলখানার সব কিছু তৈরি থাকা।

—মেলা কথা হয়েছে। থাম।

—থামব কেন? কথা তো এখন বলব। ফালতু কথা বলব। ফাঁসির সময় তো কথা বলা নিষেধ ছিল।

—শুধু দরকারি কথা বলা যাবে। বেদরকারি কথা না।

—এ জন্যই তো তুমি আমাদের সরদার।

—জল্লাদের আবার সরদারগিরি। রাখ এসব কথা।

—ঠিক আছে, থাক। চলো শূলঘর ঘুরে আসি।

—ওটা তো এখন বন্ধ।

—দরজার সামনে গিয়ে কড়া ধরে নাড়াব।

—না, আমি যাব না।

—তাহলে চলো, যে বেটা মরল তার থেকে যাওয়া কনডেম সেলটা দেখে আসি।

—কেন? তোর হয়েছে কী? তুই কি সারা জীবন জল্লাদ থাকবি? এসব খোঁজখবর করার দরকার নাই। আসামির আবার এত ফুর্তি কী রে?

—তুমি কনডেম সেলটা দেখেছ?

—দেখেছি। ছোট একটা ঘর। একদিকে আট ফুট, আর একদিকে দশ ফুট। ভেতরে বাথরুম আছে। খুব কম আলোর একটা বাল্ব আছে। তাও আবার দেয়ালের বেশ উঁচুতে লাগানো। লাফ দিয়েও হাতে পাওয়া যায় না। ঘরের দরজা একটাই। দরজার ওপরে একটা ভেন্টিলেটর আছে। উল্টো দিকে আছে আরেকটা। এই তো।

—তুমি যেভাবে বললে, তাতে আমার মনের চোখে ঘর দেখা হয়ে গেল।

—ভালোই দেখেছিস। যা এখন। নিজ নিজ জায়গায় যাই।

—ঘরে গিয়ে কী করবে?

—কী আর, ঘুমিয়ে পড়ব। মাঝরাত হয়েছে না।

—এত তাড়াতাড়ি তুমি ঘুমিয়ে পড়বে না। ঘুমের মধ্যেও তোমার মাথা কাজ করে, সরদার।

নুটু জল্লাদ কথা বলে না। বাহারের পিট চাপড়ে দিয়ে চলে যায়। পেছন থেকে বাহার হাসতে হাসতে বলে, জল্লাদ জল্লাদ, ঘরে যায় জল্লাদ। নুটু ওর কথা শুনতে পায়; কিন্তু পেছন ফিরে তাকায় না। বরং ওর সুরেলা কণ্ঠস্বর দুকানে ভরে নিয়ে প্রিজন সেলে ঢোকে।

আশপাশে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। যে যার বিছানায় শুয়ে আছে। ও নিজেও বিছানার কাছে যায়। কাপড় বদলে শুয়ে পড়ে। ওদের পেটপুরে খাওয়ানো হয়েছে। এত রাতে কোনো খাবার নেই। ওর নিজের খিদেও নেই। শুয়ে পড়লেও ঘুম আসে না। কত রাত হয়েছে জানে না নুটু। চোখ বন্ধ করলে ফাঁসির আসামির মুখটা ভেসে ওঠে। সে মুখের ওপর একদলা থুথু ছুড়ে দিতে ইচ্ছা করে ওর। রাতের অন্ধকারে কারো মুখ মনে করে থুথু ছোড়া যায় না। মেজাজ খারাপ হয়। মাথার ভেতর ঘূর্ণির চক্কর ওঠে। পাশ ফিরে শুয়ে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে। জয়নুলের কথা মনে হয়। প্রিজন সেলের বিছানায় মারা গিয়েছিল জয়নুল। ফরিদপুরের জেলে থাকার সময় দুই ফাঁসির আসামিকে দড়িতে ঝুলিয়েছে ও। নুটুকে বলেছিল ও, ফাঁসির দড়িতে ঝোলানোর আগে দুই দিন বেশি বাঁচতে চেয়েছিল লোকটি। নুটুর প্রশ্ন ছিল ওর কাছে, লোকটি কেন বাঁচতে চেয়েছিল? কোনো কারণ দেখিয়েছিল?

—লোকটি বলেছিল যে এই দুই দিনে জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোর নানা কিছু মনে করবে।

—তাতে কী, ও মৃত্যুর শান্তি পাবে?

—সে আর আমরা কী জানি; কিন্তু আমি হলে এই দুই দিনকে সারা জীবন ভেবে মরতে যেতাম।

—এত সোজা না সব কিছু।

জয়নুল ওর দিকে তাকিয়ে হা হা করে হাসতে হাসতে বলেছিল, এটা হলো নিজের সঙ্গে বাজি ধরা।

—বাজি? বাজি কেন?

—বউকে হত্যা করে দায়টার জন্য অনুতাপ করবে নাকি হত্যাটাকে বেলুনের মতো উড়িয়ে দেবে মনের আকাশে।

—বাব্বা! তুই দেখি কবির মতো কথা বলিস।

—তাই নাকি? তাহলে এখন থেকে আমাকে জল্লাদ কবি ডাকবি।

—তোর তো দেখি ইচ্ছার শেষ নাই রে।

—এ জন্য নাই যে জল্লাদগিরি খারাপ কাজ না। আমি মনে করি, এটা সওয়াবের কাজ।

—ধুৎ! বাজে কথা বলিস না।

—একটা খুনিকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মারা সওয়াবের কাজ না? তুই কি বলবি খুনিও মানুষ?

—এক রকম মানুষ তো সত্যি। মানুষের আকারের মানুষ। আমরা অমানুষ বলি, শয়তান বলি—এগুলো হলো গালি দেওয়া।

নুটু এসব কথা শুনে চমকিত হয়েছিল। আজকে মধ্যরাতে জয়নুলকে মনে করে সারা দিন ধরে পরিশ্রান্ত শরীর স্নিগ্ধ হয়। ভাবে, দুজনে হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে রমনা পার্কের ভেতর দিয়ে। গাছ-ফুল-পাখি দেখে নিজেদের বন্ধুত্ব ভরিয়ে তুলছে। একসময় ও জিজ্ঞেস করে—জয়নুল, তোর লেখাপড়া কী?

—ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়েছিলাম।

—তার পরও এত কথা শিখলি কী করে?

জয়নুল এই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। অনেকক্ষণ ধরে হেসেছিল। হাসতে হাসতে বলেছিল, লোকটির ইচ্ছা পূরণ হয়নি।

—পূরণ তো হবেই না। কে পূরণ করবে? সব কিছু আইনমাফিক হয় তো। লোকটা তারপর কী করল?

—কী আর করবে? ওর সামনে থেকে দুই দিনের স্বপ্ন ফুড়ুৎ করে উবে গেল।

নুটু বিড়বিড় করে বলে, মানুষের এমন ইচ্ছাও হয়।

এই ভাবনার পরও ঘুম না-আসা রাতে ও বিরক্ত হয় না। বরং আরেকজন জল্লাদের স্মৃতি মনে করতে ভালো লাগছে। আজ রাতে জল্লাদরাই ওর স্মরণে থাকুক। বন্ধু হয়ে থাকুক। বন্ধুত্বের জায়গায় ওদের হাত ধরে হেঁটে যাবে। একটি সময়ে। যে সময়ের ঘটনাগুলো বেঁচে থাকার উপহার দেবে। স্মৃতির উপহার। নুটু গভীর আনন্দে দুই হাত বুকের ওপর জড়ো করে।

 

চলবে ►►


মন্তব্য