kalerkantho


ক্যাম্পাস ১৯৯৫

ক্রান্তিকালের আখ্যান

রাজীব নূর

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ক্রান্তিকালের আখ্যান

ক্যাম্পাস ১৯৯৫ :  মোস্তফা মামুন। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : অনন্যা। মূল্য : ৩০০ টাকা

 

উপন্যাসটার নামে ১৯৯৫ সালের উল্লেখ পাঠককে বিভ্রান্ত করতে পারে। মোস্তফা মামুনের ‘ক্যাম্পাস ১৯৯৫’ প্রকৃতপক্ষে এক বছরের নয়—অন্তত এক দশকের কাহিনি, যে কাহিনিকে অনায়াসে বাংলাদেশের এক ক্রান্তিকালের গল্প বলা চলে। ওই ক্রান্তিকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা কিছুসংখ্যক যুবক-যুবতীর গল্প এটি। সত্যিকার অর্থেই উপন্যাসটি সময়ের গল্প বলেছে, ফলে সাধারণত উপন্যাসে যেমন একজন সর্বজ্ঞ কথক থাকে, এই উপন্যাসে তা নেই। বরং কথাসাহিত্যের কথক ১৯৯৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন শুরু করা কয়েকটি চরিত্রের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। এই চরিত্রগুলোর ব্যক্তিগত জীবনই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য, তবে তাদের কেন্দ্র করেই ঔপন্যাসিক একটি কালপর্বকেও চিত্রিত করেছেন, যে কালপর্বে স্বৈরাচারের অবসান হলেও গণতন্ত্র হয়েছে অধঃপতিত। তথ্য-প্রযুক্তি হয়েছে বিকশিত। হাতে হাতে না হলেও মুঠোফোনের আওতায় আসতে শুরু করেছে মানুষ। ঔপন্যাসিকের নিজের জবানিতে ওই সময়টা হচ্ছে, ‘দেশে গণতন্ত্রের ফেরা আর বিশ্বে ধনতন্ত্রের বিস্তারে নতুন নতুন উদ্যোগ চারদিকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে কাজ-চাকরির অনেক সুযোগ। ওদিকে আবার সমাজতন্ত্রের পতনে সমাজে সংস্কৃতি-মূল্যবোধ-নৈতিকতা গুরুত্বহীন হতে চলেছে।’

‘ক্যাম্পাস ১৯৯৫’ একটি ক্রান্তিকালের আখ্যান। অবশ্য ঐতিহাসিক কোনো বিবেচনায়ই একটি বছর হিসেবে ১৯৯৫ সাল খুব স্বতন্ত্র কিছু নয়। বরং ১৯৯৫ সালের তুলনায় ১৯৯০ সাল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নব্বইয়ে হয়েছে স্বৈরাচারের পতন এবং ওই গণ-অভ্যুত্থানের ফলে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। আমাদের উপন্যাসের পাত্র-পাত্রীরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে, তখনো বিএনপি ক্ষমতায় এবং ক্যাম্পাসজুড়ে তাদের ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য। তবে হালের একাধিপত্যের রাজনীতি তখনো শুরু হয়নি। হলগুলো ভাগাভাগি করে দখল করে রেখেছিল প্রধান দুই দলের ছাত্রসংগঠন দুটি। হলে সিট পাওয়ার জন্য রাজনীতি করাটাই তখন একমাত্র যোগ্যতা হয়ে পড়েনি, তবে রাজনীতি করলে তখনো সিট পাওয়াটা সহজ হতো। তাই তো বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত একটি পরিবারের ছেলে মিতুল সিলেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগ দেয় ছাত্রদলে। মনে সংকোচ ছিল তার। তবে সংকোচের বিহ্বলতা কাটিয়ে এই মিতুলই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে একজন শীর্ষনেতা হয়ে যায়। বন্ধুর রক্ত এবং শঠতা তার উত্তরণের সোপান হয়েছে। মিতুলকে ছাত্রদলে যুক্ত করতে তার যে বন্ধুটি অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল, সেই ফখরু কিন্তু রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে স্রেফ দারিদ্র্যের কারণে, শুধু বিনা পয়সায় ভাত খাওয়ার সুবিধা পাওয়া যাবে বলে। তবে ফখরু যে কতটা দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তা জানতে তার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু মিতুলেরও সময় লেগে যায় অনেক, একেবারে ফখরুর লাশ নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফখরুর সব কিছুই অজ্ঞাত থেকে গিয়েছিল মিতুলদের কাছে।

মিতুলকে দিয়ে উপন্যাসের শুরু এবং শেষেও আমরা মিতুলকেই পাই। তবে মিতুল এই উপন্যাসের নায়ক নয়; বরং আকাশ, সুজন, ইকবাল, অনন্য, আফজাল, সৌরভ—সবাই নায়ক। তুলনায় নায়িকাদ্বয় নিম্মি ও সুবর্ণলতা নিষ্প্রভ। আরো একজন, যার নাম কবিতা, একবার উঁকি দিয়েই হারিয়ে গেছে। কবিতা নামের এই নারী চরিত্রটি ঔজ্জ্বল্য পেতে পারত। তবে ফখরুর প্রতিও আরো বেশি মনোযোগ দেওয়া হলেই কবিতা আসত। ফখরুকে কেন্দ্র করেই ঔপন্যাসিকের সুযোগ ছিল গ্রামে চলে যাওয়ার। মোস্তফা মামুন এই সুযোগ ব্যবহার করেননি; বরং ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়া নিয়ে দ্বিধার কারণেই তিনি সুজনের সাংবাদিকতাকে কেন্দ্র করে উপন্যাসটিকে বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের ক্রান্তিকালের যে সাক্ষ্য করে তুলতে পারতেন, তা-ও ইঙ্গিতেই থামিয়ে দিলেন।

১৯৯০ সালের সূচনায় মুক্তচিন্তার দৈনিক হওয়ার প্রতিশ্রুতিতে ‘আজকের কাগজ’ বের হয়েছিল এবং দেশের মিডিয়ায় একটি নতুন মোড় পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। পেশাদারিরও নতুন বিকাশ লক্ষ করা যায় তখন। মেধাবী তরুণরা, যে কিনা প্রকৌশলী কিংবা কৃষিবিদ হয়ে নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারত, তারাও সাংবাদিকতায় আকৃষ্ট হয়ে নিষ্ঠা নিয়ে এগিয়ে আসে। পরে তাদের হাতেই জন্ম নেয় আরো একটি দৈনিক, যার নাম ‘ভোরের কাগজ’, এখানেই আমাদের আলোচ্য উপন্যাসের ঔপন্যাসিক মোস্তফা মামুনের এবং তাঁর উপন্যাসের চরিত্র সুজনের সাংবাদিকতাজীবনের শুরু। বলা বাহুল্য, মামুন নিজে এবং তাঁর সৃজিত চরিত্র সুজন দুজনই আইনের ছাত্র। ‘ভোরের কাগজ’ থেকে ‘প্রথম আলো’ পর্যন্ত আসতেই সংবাদমাধ্যমে বিনিয়োগের চরিত্র পরিবর্তনসহ আরো কিছু কারণে মিডিয়ার জৌলুস বেড়েছে; কিন্তু সেই নিষ্ঠা ও পরিবেশ ক্রমেই হারিয়ে যায়। নৈতিকতার সংকটও দেখা দিয়েছে। ঔপন্যাসিক এত দূর যেতে চাননি, উপন্যাসের ভূমিকায় মোস্তফা মামুন আমাদের জানিয়ে রেখেছেন, ‘ইতিহাস বা নির্দিষ্ট সময়নির্ভর উপন্যাসের একটা অসুবিধা আছে। বাস্তবতার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করে সবাই। ঘটনাটা কি এ রকম ছিল? এমন নয় বোধ হয়! কিন্তু এভাবে দেখলে আসলে উপন্যাসের প্রতি অবিচার করা হয়। উপন্যাস ঠিক ইতিহাস বই নয়। ইতিহাস ততটুকুই আসে, যতটুকু সময়কে বোঝার জন্য দরকার।’

 



মন্তব্য