kalerkantho


অগ্নিপুরুষ

এক মলাটে দ্বিবিধ পাঠ

তুহিন ওয়াদুদ

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এক মলাটে দ্বিবিধ পাঠ

অগ্নিপুরুষ : মোস্তফা কামাল। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : পার্ল পাবলিকেশন্স। মূল্য : ৪০০ টাকা 

 

মোস্তফা কামালের ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘অগ্নিপুরুষ’। এই বইটি প্রকাশের এক বছর আগে তিনি লিখেছিলেন ‘অগ্নিকন্যা’ নামের আরেকটি উপন্যাস। অগ্নিকন্যায় আমরা মতিয়া চৌধুরীকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবেই পাই। সেখানে মতিয়া চৌধুরীকে বিচ্ছিন্নভাবে পাইনি। পেয়েছি জ্বলন্ত এক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। লেখক ভূমিকাকথনে বলেছেন—‘ঐতিহাসিক উপন্যাস অগ্নিকন্যার দ্বিতীয় পর্ব ‘অগ্নিপুরুষ’। লেখকের দুটি উপন্যাস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, লেখক পরিকল্পিতভাবেই এগিয়েছেন। ইতিহাসকে সাহিত্যের আঙিনায় মেলে ধরার ক্ষেত্রে মোস্তফা কামাল পারঙ্গম। তিনি প্রথম পর্বে যে শিল্পপ্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন, তারই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় পর্বের ভূমিতে ‘অগ্নিপুরুষে’র ছবি এঁকেছেন।

মোস্তফা কামাল ইতিহাসের ক্যানভাসে উপন্যাসের যে কাহিনি বিন্যাস করেছেন, তা আমাদের কাছে অতীতের এক গৌরবগাথা। লেখক ইতিহাসের অংশ অবিকৃত রেখে কাহিনির পারম্পর্য বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের এই মহান নেতার হাত ধরে রচিত হয়েছে ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রলিপি। দেশ বিভাগের পর থেকেই পূর্ব বাংলা তথা বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার রাজনীতি ক্রমাগত উত্তাল ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। দেশ বিভাগের পর থেকেই রাজনীতির মাঠ ক্রমেই অস্থির থেকে অস্থিরতর হয়। তখন পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ যেমন প্রকট আকার ধারণ করে, তেমনি প্রতিবাদের ভাষাও শাণিত হতে থাকে। সেই সিঁড়িতে ছয় দফা বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন চেতনার জন্ম দেয়। মোস্তফা কামাল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ইতিহাস অক্ষুণ্ন রেখেছেন। চরিত্রগুলোর নামকরণেও কোনো পরিবর্তন আনেননি। যাঁদের কাছে এ কালখণ্ডের ইতিহাস জানা আছে, তাঁরা আবার এ উপন্যাস পাঠের মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে সাহিত্যের স্বাদ ও ইতিহাসের পুনর্গঠনের আনন্দ আস্বাদন করতে পারবেন।

মোস্তফা কামাল মূলত ইতিহাসের চরিত্রগুলোর মনোলোকে প্রবেশ করেছেন। ইতিহাসে যে অংশটুকু সরাসরি পাওয়া যায় না, তার মধ্যে একটি আন্তসম্পর্ক সৃষ্টি করেছেন।            

আমরা যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অন্য রাজনৈতিক নেতাদের আলাপন লক্ষ করি, সেখানে লেখক কিছুটা স্বাধীনতা নিয়েছেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মূল বক্তব্য বজায় রেখেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আমরা আলোচ্য উপন্যাসে নিজের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যে আলাপচারিতার মধ্যে দেখি, সেটির সঙ্গে ইতিহাসের গভীর সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য লক্ষ করি না। তাই বলে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৬৯ সালে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে আইয়ুব খান আলোচনার টেবিলে বসাতে চান, তখন ফজিলাতুন নেসা মুজিবের যে সিদ্ধান্ত সেটি লেখক মনগড়া কিংবা শিল্পের প্রয়োজনে সৃষ্টি করেননি। ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনি ফজিলাতুন নেসা মুজিবের ভূমিকাকে অক্ষুণ্নভাবে তুলে এনেছেন।

ছয় দফা ঘোষণার পর থেকে পশ্চিম পাকিস্তানি গোষ্ঠী টালমাটাল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়ে। শুরুতে আইয়ুব খান সরকার ভেবেছিল ভীতি প্রদর্শন করে ছয় দফা থেকে ফেরানো যাবে। পশ্চিম পাকিস্তানিরা বহু রকম অপবাদ দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর নামে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়েছে। কিন্তু কোনো কিছু দিয়েই এ আন্দোলন বন্ধ করতে পারেনি; বরং সময় যতই ভবিষ্যৎমুখী, আন্দোলন ততই তীব্র হতে থাকে। ঠিক এই সময় আইয়ুব খানের সঙ্গে সেনাপ্রধানের সম্পর্ক, গভর্নর মোনেম খাঁর সঙ্গে আলাপের ধরন লেখক যেভাবে তুলে এনেছেন, তাতে সাহিত্য এবং ইতািহাস উভয়ের সৌন্দর্য-সৌকর্য ঋদ্ধ হয়েছে।

লেখক সুন্দরভাবে ইতিহাসের পরতে পরতে নির্জলা সত্যকে উপন্যাসের উপাত্তে পরিণত করেছেন। গভর্নর, সেনা কর্মকর্তা সবাই যে আইয়ুব খানের দাসে পরিণত হয়েছিল, সেই বাস্তবতা লেখক নিজের কল্পনাশক্তি এবং অতীত পাঠজনিত সৃষ্ট ধী শিল্পের মাধ্যমে তুলে এনেছেন। 

আইয়ুব খান ঢাকায় এসেছিলেন ছয় দফার বিরুদ্ধে জনগণকে বোঝাতে। সে সময় নিয়ে লেখকের একটি অনুচ্ছেদ—‘আইয়ুব খানের ঢাকা আগমন উপলক্ষে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয় যে প্রেসিডেন্ট এবং ক্ষমতাসীন কনভেনশন মুসলিম লীগ ছাড়া দেশে আর কিছু নেই। গভর্নর মোনেম খাঁর আয়োজন দেখে খুশিতে আটখানা প্রেসিডেন্ট সাহেব তাঁর ঘাড়ে হাত রেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। আর তাতে মোনেম খাঁর তৈলমর্দনের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তিনি একটি কথাই বারবার তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন। স্যার, ছয় দফা নিয়ে টেনশনের কিছু নেই। আপনার জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মুজিব যতই ফাল পারুক আপনার টিকিটিও ছুঁতে পারবে না; বরং তার পা-ই মচকে যাবে।’

আইয়ুব খানের ভাড়ে পরিণত হয়েছিল পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের প্রশাসন। সত্য উপলব্ধি করতে সে কারণে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। আইয়ুব খানও এমন কোনো সত্য শুনতে পছন্দ করতেন না, যেটি তাঁর বিপক্ষে যায়। সেনাপ্র্রধান মুসা খানকে বাদ দিয়ে ইয়াহিয়াকে সেনাপ্রধান করার নেপথ্যের বাস্তবতা এ রকমই।

ঔপন্যাসিক মোস্তফা কামাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্রটি এঁকেছেন ইতিহাসের নিরিখে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এখানে বহুকৌণিক বিশ্লেষণে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যক্তিকে তুচ্ছ করে, পরিবারে কম সময় দিয়ে একজন মানুষ জাতির মুক্তির জন্য কিভাবে নিবেদিত হয়েছিল সেসব অনুষঙ্গ মহাকাব্যিক পটভূমিতে চিত্রিত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার যে গভীরতা, তারও আলেখ্য এখানে বিধৃত। কারাবাসে বঙ্গবন্ধুর বাহ্যিক এবং অন্তর্গত যে অবস্থা তারও পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এখানে উঠে এসেছে।

পাকিস্তান শাসনামলে গণমাধ্যম বাংলাদেশের পক্ষে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছিল। উপন্যাসকার সেই দিকটিতে আলো ফেলতে ভোলেননি। পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সব শোষণ-বঞ্চনার স্বরূপ ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ, সংবাদ। ছয় দফার পক্ষে এগুলোর জোড়ালো ভূমিকা ইতিহাসস্বীকৃত। কখনো কখনো মুখে মুখে নিষেধ করা হয়েছে শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে খবর পরিবেশন করতে। কখনো কখনো লিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করায় ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়, একই সঙ্গে ইত্তেফাকের প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরবর্তী সময় প্রকাশনার ওপর থেকে বাজেয়াপ্ত করার ঘোষণা প্রত্যাহার করেছিল। মূলত পত্রিকাগুলোতে অনেক বিষয় প্রকাশ করা নিষিদ্ধ করা হয়—‘পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে হানিকর কোনো প্রসঙ্গ; দেশের এক অংশের বা শ্রেণিবিশেষের, অপর অংশকে শোষণের ও উভয় অংশের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ; ছাত্র ধর্মঘট, ছাত্র বিক্ষোভ, ছাত্র অসন্তোষ, ছাত্রসভা ও ছাত্রদের বিভিন্নমুখী অভিযোগ এবং সে-সংক্রান্ত সরকারি ব্যবস্থা।’

ইতিহাসের অংশ আমাদের জানা। আমাদের জানা ইতিহাসকে সাহিত্যের আঙ্গিকে মোস্তফা কামাল এমন করণকৌশলে আমাদের সামনে উপস্থিত করেছেন যে এক মলাটে দ্বিবিধ রূপ সেখানে স্থিত হয়েছে। সাহিত্যের সঙ্গে ইতিহাসের নিগূঢ় সম্পর্ক বিরাজমান। ইতিহাস পাঠ ভিন্ন সাহিত্যের রহস্য উন্মোচন অনেক সময় আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ-পীড়ন আমাদের শিল্প-সাহিত্যে ছায়া ফেলেছিল। মোস্তফা কামাল সেই ইতিহাসকে পাঠকের সামনে এনে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে উপন্যাসের শুরু। আর উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিঃশর্ত মুক্তিতে উপন্যাসের পরিসমাপ্তি। লেখক উপন্যাসের নামকরণের ক্ষেত্রে মিছিলে উচ্চারিত শাণিত শব্দ থেকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে জনতার মিছিল হতো—‘অগ্নিপুরুষ শেখ মুজিব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।’

ঔপন্যাসিক ইতিহাসের ভেতর দিয়ে সাহিত্য বুনেছেন নাকি সাহিত্যের ভেতর দিয়ে ইতিহাসের বিনির্মাণ দেখিয়েছেন, তা স্থির করে বলা কঠিন। পাঠকের কাছে এ দ্বিবিধ অর্থই কখনো কখনো সমপর্যায়ে উন্নীত হতে পারে। তবে ইতিহাসের অনেক অনুষঙ্গই ঘটনার অনিবার্য বিন্যাসে উঠে এসেছে। যেহেতু ইতিহাসের গভীর অধ্যাবসায়পূর্বক উপন্যাস রচনায় ব্রতী হয়েছেন তাই সেই অনুষঙ্গগুলো উঠে এসেছে বস্তুনিষ্ঠাতার সঙ্গে।

ইতিহাসবোধে উন্মীলিত লেখক মোস্তফা কামালের এ উপন্যাস পাঠকবোধ স্থান করে নেবে, এ প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অমূলক হবে না।

 

 


মন্তব্য