kalerkantho


মায়ানগর

বিচিত্র দিনের অনুপুঙ্খ চিত্র

এমরান কবির

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিচিত্র দিনের অনুপুঙ্খ চিত্র

মায়ানগর : ইমদাদুল হক মিলন। প্রকাশক : প্রথমা। প্রচ্ছদ : মাসুক হেলাল। মূল্য : ৩২০ টাকা

 

অক্ষর দিয়ে সাজানো জীবনের প্রতিবিম্বের কাছে আমরা কী চাই? কাহিনি? ধারাবিবরণী? সংকটের চিত্র? সমাধানের সূত্র? গুজব? ভাষার মারপ্যাঁচ? সরল গরল কথামালা? আধো বাস্তবতার আলেখ্য? কোনো একদিনের বিচিত্র রোদের ভেতরে গেয়ে যাওয়া বাতাসের গান? আমাদের স্বপ্নগুলো কিরূপে স্বপ্ন হয়ে যায় কিংবা আমাদের স্বপ্নগুলো কিরূপে কশাঘাত করতে থাকে তার হাহাকার? কী? কী চাই? এই সিরিজ প্রশ্নের শেষ নেই। এই অন্তহীন প্রশ্নমালার শেষ বিন্দুর পরেও যে মহাশূন্যতা বিরাজ করে, সেখান থেকে উঠে আসে জীবনের আলো।

জীবনের ওই আলো এমনি এমনি আসে না। এ জন্য থাকতে হয় বীক্ষণযোগ্য চোখ। থাকতে হয় অনুভবযোগ্য অনুভূতি। থাকতে হয় দেখানোর সুনিপুণ ভঙ্গি। থাকতে হয় নিজের সুখগুলোকে অন্যের সুখ করে তোলার আন্তরিকতা। থাকতে হয় নিজের দুঃখগুলোকে অন্যের দুঃখ হিসেবে তুলে আনার প্রকৃত সহানুভূতিশীল হৃদয়। এগুলোর সমপাতনতায় যে যত কুশলী সে তত আত্মগ্রাহী, সে তত হৃদয়বেদি।

চলতি বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে দুই বাংলার অন্যতম জনপ্রিয়তম কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘মায়ানগর’। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে উপর্যুক্ত কথাগুলো মনের ভেতরে খেলে গেল বারবার। কারণ একজন প্রকৃত কথাসাহিত্যিকের সব শিল্পগুণ যেন প্রয়োগ করা হয়েছে মায়ানগর উপন্যাসে। উপন্যাসটির পটভূমি পুরান ঢাকা ও বিক্রমপুর। কালখণ্ড বিগত শতকের ষাটের দশক। কথক মিলু। একজন দশ-বারো বছরের শিশু। তার চোখেই দেখা হয়েছে সে সময়ের সব চালচিত্র। তার জবানিতেই চলিষ্ণু হয়েছে উপন্যাসের ধারা। তার দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা হয়েছে সব সংগতি-অসংগতি, অভাব, দুঃখ, সুখ—এককথায় সব চিত্র। পাঠকের ভাবতে একটুও কষ্ট হয় না যে এই মিলু স্বয়ং লেখকের শৈশব। কিন্তু এই শৈশব এতই সৎ যে একজন পরিপূর্ণ ইমদাদুল হকের মানস সেখানে প্রভাব ফেলে না। মিলু এখানে নির্লিপ্ত। লেখক ইমদাদুল হক মিলন এখানে কেউ না।

এই দুইয়ের ভেদরেখা এমনতর স্পষ্ট যে দশ-বারো বছরের বালক মিলু যা বলে, যা ভাবে, যা করে, তা যেন মিলুই করতে পারে। লেখক এখানে মিলুকে একটুও প্রভাবিত করেন না।

তাতে কী হয়? তাতে উপন্যাসের বিশ্বস্ততা বাড়ে। তাতে চরিত্রগুলোকে যথার্থ জীবন্ত মনে হয়। তাতে ঘটনাগুলো অধিকতর বাস্তবানুগ হয়ে ওঠে। এতই বাস্তবানুগ হয়ে উঠে যে পাঠক নিমেষেই চলে যায় তার শৈশবে। চলে যায় ফেলে আসা সময়ের বাস্তবতায়। এই যে পাঠককে নিমেষেই তার জীবনে অতীত হয়ে যাওয়া একটা পর্বে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা, তা একজন প্রকৃত লেখকের পক্ষেই সম্ভব। জীবনের ভেতরে জীবনকে যাপিত না করতে পারলে সেটা হয় না। লেখক ইমদাদুল হক মিলন তাঁর ‘মায়ানগর’ উপন্যাসে এটা যেন খুব বেশি করে দেখিয়েছেন।

দেখিয়েছেন ষাটের দশকের পুরান ঢাকাকে। দেখিয়েছেন পুরান ঢাকার বিচিত্র মানুষগুলোকে। দেখিয়েছেন সেই বিচিত্র মানুষগুলোর বিচিত্র জীবন প্রণালীকে। অনেক ভাই-বোনের মধ্যে বেড়ে ওঠা মিলুর পরিবারের এক অংশ থাকে পুরান ঢাকায়। আরেক অংশ থাকে বিক্রমপুরের মেদিনীমণ্ডলে। মিলু যখন পুরান ঢাকায় থাকে তখন তার চোখ দিয়ে দেখা যায় এই অংশের চালচিত্র। শুধু তা-ই নয়, তার পুরান ঢাকার জীবনেও মেদিনীমণ্ডল গ্রামখানি উঠে আসে। তেমনি সে যখন মেদিনীমণ্ডলে থাকে, তখনো তার স্মৃতিতে উঠে আসে পুরান ঢাকা। এভাবে দুই অংশের সমপাতনে উঠে আসে মিলুর ব্যক্তিগত সংকট। এই ব্যক্তিগত সংকটই প্রতিনিধিত্ব করে পুরো উপন্যাসের চিত্রকে। একজন মিলুর জীবনে দেখা ও ঘটে যাওয়া ঘটনাই তুলে আনে সে সময়ের চালচিত্রকে। সে সময়ের সংস্কৃতি, পারিবারিক আলেখ্য আর সামাজিক সংস্কার।

কিন্তু এটা সম্ভব হলো কী করে। একজন দশ-বারো বছরের শিশুর চোখ দিয়ে দেখা একটা সময়, সে সময়ের পুরো চিত্রকে কিভাবে উপস্থাপন করে! কারণ এই শিশুর চোখের পেছনে রয়েছেন ইমদাদুল হক নামীয় একজন শিল্পী। পুরো চিত্র উপস্থাপিত হয়। কারণ এই শিশুর সঙ্গে সঙ্গী হিসেবে আছে লুত্ফন। লুত্ফন পুরান ঢাকার এমন কোনো জায়গা নেই, যে চেনে না। কিন্তু লুত্ফনও একসময় হারিয়ে যায়। তবু মিলুর ঘোরা থামে না। তারপর পেয়ে যায় আলীকে। এত পথ, এত মানুষ, এত সম্পর্ক, এত ভাঙাগড়া, জীবন নিয়ে এত সিদ্ধান্ত—সব কিছু মিলে তৈরি করে এক কুহক। এই কুহকের এক গভীর ঐকতান ‘মায়ানগর’ উপন্যাসটি।

 


মন্তব্য