kalerkantho


আমি কে?

বিজ্ঞানের স্বাদ বিজ্ঞানীর সাধনা

সাবরিনা কবির

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বিজ্ঞানের স্বাদ বিজ্ঞানীর সাধনা

আমি কে? : মুহাম্মদ ইব্রাহীম। প্রকাশক : অনন্যা। প্রচ্ছদ ধ্রুব এষ। মূল্য : ৪৫০ টাকা

 

‘আমি কে?’ মনোবিজ্ঞানী, ধর্মসাধক, সাহিত্যিক, চিন্তক, শিল্পী, কবি তাঁদের নিজস্ব ভাবনা ও যুক্তির প্রতিফলন ঘটিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা যতটা প্রয়োজনীয় ছিল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আত্মানুসন্ধানের একটি উপসংহার পাওয়া। কিন্তু কোনো দার্শনিক যেমন এর উত্তর যথার্থরূপে পাননি, সমাজবিজ্ঞানীরাও গলদঘর্ম হয়েছেন, মনোবিজ্ঞানীরা দিয়ে গেছেন একের পর এক তত্ত্ব, ধর্মসাধকরা একপর্যায়ে আধ্যাত্মবাদের দিকে ধাবিত হয়ে এই প্রশ্নের উপসংহার খুঁজেছেন, সাহিত্যিকরা দিয়েছেন ভিন্নার্থিক মর্ম, কবি কোনো উত্তরই খুঁজে পাননি। তাই তো প্রশ্নটি রয়ে গেছে প্রশ্নের জায়গায়। উত্তর পাওয়া গেছে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। কিন্তু কোনো উপসংহার খুঁজে পাওয়া যায়নি। মানুষ স্বতন্ত্রভাবে তাই নিজেরা নিজেদের মতো কোনো দৃষ্টিভঙ্গি লালন করে তার ভেতরে খুঁজেছেন সান্ত্বনা।

কিন্তু বিজ্ঞানও তো বসে নেই। দিবসের প্রথম সূর্য প্রশ্ন করে বেলা শেষে যতই বলুক মেলেনি উত্তর, বিজ্ঞান তার জায়গা থেকে খুঁজে গেছে তার উত্তর। বিশ্লেষণ করেছে বৈজ্ঞানিক ধারায়। মুহাম্মদ ইব্রাহীমের আমি কে গ্রন্থখানি সেই বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণের এক চমত্কার গ্রন্থ, যেখানে এই প্রশ্নের নানামুখী উত্তর খোঁজা হয়েছে।

মোট ৯টি গদ্যে বিভক্ত এ গ্রন্থখানি। শিরোনামগুলোর দিকে একবার নজর দিলেও একটি ধারণা পাওয়া যায় লেখকের অভীপ্সা কী। যেমন—সাদা খাতা নয়, ভরা বই; আষাঢ়ে গল্প, গবেষণা, অবশেষে ডিএনএ; বিবর্তন ও ডিএনএর সহজ পাঠ; বিবর্তন গড়েছে মস্তিষ্ক; বিস্তারকামী জিন; লাখো বছর ধরে সেই ভয়, সেই সুখ; ঘর কৈলু বাহির বাহির কৈলু ঘর; কালচার : বিবর্তনের বিলম্বিত রাগ এবং আমার ডিএনএ এখন খোলা বই।

পৃথিবীর প্রত্যেক আমির প্রাথমিক ভিত্তিভূমি হলো ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড)। বিজ্ঞানীরা যখন মানবদেহের ডিএনএর পাঠোদ্ধার করতে পেরেছেন, তখন থেকেই শুরু হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ আমির প্রকৃত পাঠোদ্ধার। কিন্তু এরও তো একটি ধারাবাহিক ইতিহাস রয়েছে। মুহাম্মদ ইব্রাহীম ‘আমি কে’ গ্রন্থটিতে সেই ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করেছেন।

তিনি বিজ্ঞান লেখক। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানীর চোখ, মনোবিজ্ঞানীর মন, ইতিহাস বেত্তার ইতিহাস-চেতনা, বিবর্তনবাদীর যুক্তি-শৃঙ্খল, সাধারণ ধারণার সাধারণ চিন্তার বিকাশটিকেও আমলে নিয়েছেন। ফলে গ্রন্থটি নিছক বিজ্ঞানের কাঠখোট্টা তাত্ত্বিক সূত্রের সমাবেশ হয়ে ওঠেনি। হয়ে উঠেছে সবার জন্য সহজবোধ্য একটি চিন্তার খোরাক।

কিন্তু আদিতে এবং আদতে যে প্রশ্নটিকে ঘিরে গ্রন্থখানি, তার মূল সূত্র তো নিহিত ওই ডিএনএর ভেতরে। এই আবিষ্কারই খুলে দিয়েছে আত্মপরিচয়ের বৈজ্ঞানিক দ্বার। এই উন্মোচন তা যে চমকপ্রদ ফলকে তুলে ধরেছে গ্রন্থটিকে শুধু তার ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কী রকম গবেষণা, কী রকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, কী রকম বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষার মাধ্যমে এই অসাধ্য সাধিত হয়েছে তারও কিছু স্বাদ পাঠককে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামীয় হলেও পুরো গ্রন্থে এক যৌক্তিক ধারাবাহিকতা রাখা হয়েছে। আর এতে দেওয়া হয়েছে দুটি দিকের ওপর সমান গুরুত্ব। এক. আত্মপরিচয়ের সনাতন প্রশ্নটির উত্তর পেতে আধুনিকতম বিজ্ঞান কিভাবে সহায়তা করছে। দুই. বিবর্তন ও ডিএনএর একেবারে প্রাথমিক ধারণা এবং পাঠোদ্ধার ‘আমি কে’কে কিভাবে প্রকাশ করছে তারও খুঁটিনাটি বর্ণনা রয়েছে।

বিজ্ঞান একলাফে যেকোনো আরাধ্য রহস্যকে উদ্ঘাটন করতে পারে না। খুব সরল উপাদান দিয়ে এর নিরীক্ষা শুরু হলেও তা ক্রমে হয়ে ওঠে জটিল। মুহম্মদ ইব্রাহীম দেখিয়েছেন মানুষের আত্মপরিচয়ের মতো জটিল বিষয়ের পেছনে অত্যন্ত জটিল সত্যগুলো খুঁজে পাওয়ার জন্য বিজ্ঞানীদের কিরূপ জটিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে। মজার বিষয় হলো, এ রকম জটিল একটি বিষয়ের উপসংহার যে লেখকের হাত দিয়ে হচ্ছে, তা অত্যন্ত সহজ ভাষায়। তিনি জানাচ্ছেন, ‘আজকের অগ্রগতিগুলো স্পস্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অদূর ভবিষ্যতে আমরা প্রত্যেকে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনরহস্য নিজের সমগ্র ডিএনএর তথ্য হিসেবে স্মার্ট কার্ডের মতো সঙ্গে রাখব। এবং আমাদের দৈহিক, মানসিক কল্যাণে সে তথ্য ম্যাজিকের মতো ব্যবহার করব। সেই সম্ভাবনার পথে এ মুহূর্তে আমরা কোন জায়গায় আছি তার কিছু ধারণা দেওয়ার ভবিষ্যৎমুখী প্রয়াসটিও এই বইয়ে রাখার চেষ্টা করেছি।’

লেখক মুহম্মদ ইব্রাহীম একটুও বাড়িয়ে বলেননি। গ্রন্থটি আগাগোড়া এতই সুখপাঠ্য যে মনেই হবে না এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক বই। বিজ্ঞান সাহিত্য এ গ্রন্থটি নিঃসন্দেহে একটি অনন্য সংযোজন।

 



মন্তব্য