kalerkantho


আমার ইলিয়াস

ইলিয়াসকে নিয়ে হাসান আজিজুল হক

স্বকৃত নোমান

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইলিয়াসকে নিয়ে হাসান আজিজুল হক

আমার ইলিয়াস : হাসান আজিজুল হক।

প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান। প্রকাশক : ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ। মূল্য : ২০০ টাকা

 

সেদিন এক আলাপচারিতায় শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক আবুল কাশেম ফজলুল হক আক্ষেপের সুরে বললেন, কথাসাহিত্যিকদের নিয়ে কথাসাহিত্যিকদের লেখা দরকার। একজন কথাসাহিত্যিককে একজন সাধারণ পাঠক যতটা বুঝতে পারেন, তার চেয়ে বেশি বুঝতে পারেন আরেকজন কথাসাহিত্যিক। ভাষা, আঙ্গিক, বিষয়—সব দিক থেকেই। এটা আমাদের এখানে হচ্ছে না। হওয়াটা খুব দরকার।

এবারের বইমেলায় ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হাসান আজিজুল হকের ‘আমার ইলিয়াস’ বইটি পড়তে পড়তে আবুল কাশেম ফজলুল হকের কথাটি বারবার মনে পড়ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে যে তিন মহিরুহকে সর্বোচ্চ আসনে আমরা আসীন দেখতে পাই তাঁরা হচ্ছেন হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শওকত আলী। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যকে নিঃসন্দেহে এই তিন কথাশিল্পী অন্য এক মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছেন। ব্যক্তি ইলিয়াস ও কথাশিল্পী ইলিয়াসকে নিয়ে একাধিক গবেষণাকর্ম হয়েছে, প্রবন্ধ-নিবন্ধও বিস্তর লেখা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো হবে। কারণ ইলিয়াস সেই লেখক, হাসান আজিজুল হক যাঁর সম্পর্কে বলেছেন, ‘গত কয়েক বছরে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাঁরা একালের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, এমনকি নোবেল পুরস্কার না পেয়েও মার্কেস, ফুয়েন্তেস, য়োসা, চিনুয়া আচিবি, ওলে সোয়েঙ্কা, নাদিন গার্ডিমার, নাগিব মাহফুজ, সালমান রুশদি, কেনজাবুরো ওয়েসহ অসংখ্য সমকালীন লেখকের পাশাপাশি বাংলা ভাষার লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে জায়গা দিতে আমি এতটুকু হীনম্মন্যতা বা আত্মশ্লাঘাবোধে ভুগি না।’ সুতরাং এমন বড় মাপের একজন কথাশিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে বিস্তর লেখালেখি, বিস্তর গবেষণা হওয়াটাই স্বাভাবিক এবং হওয়া উচিত।

হাসান আজিজুল হকের আলোচ্য বইটির নাম ‘আমার ইলিয়াস’। নামের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হচ্ছে, ইলিয়াসকে কতটা নিবিড়ভাবে পাঠ করেছেন হাসান। সাহিত্যিক হিসেবে তাঁকে কতটা বড় মনে করলে হাসান আজিজুল হকের মতো একজন বড় মাপের কথাশিল্পী বইয়ের এমন নাম দিতে পারেন। বইটি পড়তে পড়তে বিস্ময়ের সঙ্গে খেয়াল করি, হাসান আজিজুল হক যেভাবে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে দেখেছেন, যেভাবে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন, সেভাবে খুব কম সমালোচক, খুব কম পাঠক, খুব কম লেখক পেরেছেন। হাসান আজিজুল হকের একটা নিজস্ব ভাষা আছে, নিজস্ব একটা দেখার চোখ আছে। সেই ভাষায় যখন তিনি লেখেন, তখন তা হয়ে ওঠে অনন্য। বইটি পড়তে পড়তে আমরা যেন অন্য আরেক ইলিয়াসকে আবিষ্কার করি, যে ইলিয়াসকে আমরা ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পড়ে পাই না, ‘খোয়াবনামা’ পড়ে পাই না। আমাদের দেখার চোখটি নেই বলে, আমাদের বোধের গভীরতা নেই বলে পাই না। হাসান আজিজুল হকের তা আছে। তিনি আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন সেই ইলিয়াসকে, তার নিজস্ব ভাষায়, নিজস্ব ভঙ্গিতে।

হাসান আজিজুল হক বিভিন্ন সময় ইলিয়াসকে নিয়ে লিখেছেন। আলোচিত বইয়ের লেখাগুলো বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধের বইতে রয়েছে। বিভিন্ন বই থেকে প্রবন্ধগুলোকে এক মলাটে আবদ্ধ করেছেন হাসান-গবেষক ও গল্পকার চন্দন আনোয়ার। কাজটি তিনি নিষ্ঠা ও যত্নের সঙ্গেই যে করেছেন, বইটি পড়লে যেকোনো পাঠক তা বুঝতে পারবেন।

শুরুতেই হাসানের ভাবনায় ইলিয়াস প্রসঙ্গে লিখেছেন বইটির সম্পাদক চন্দন আনোয়ার নিজেই। পরের লেখাটি হচ্ছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আড্ডা অথবা আলাপচারিতা। ইলিয়াস ও হাসানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ইলিয়াসের সাহিত্যকর্ম নিয়ে চন্দন প্রশ্ন করেছেন, আর তার উত্তর দিয়েছেন হাসান আজিজুল হক। উভয়ের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছেন কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তার পরেই রয়েছে ইলিয়াসকে নিয়ে হাসান আজিজুল হকের পাঁচটি প্রবন্ধ। যথাক্রমে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিষবৃক্ষ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : স্বপ্নচ্ছায়া কল্পনার মূর্ত বাস্তব, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : সাহিত্যের নতুন সীমানা, কল্পনা-বাস্তব মিলিয়ে ইলিয়াসের সঙ্গে আলাপ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিষবৃক্ষের অমৃতফল। পরিশিষ্টে যুক্ত হয়েছে ইলিয়াস বিষয়ে হাসানের আরো একটি সংগৃহীত সাক্ষাত্কার, হাসানকে লেখা ইলিয়াসের চারটি চিঠি এবং হাসানের লেখা ‘আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিষবৃক্ষ’-এর হাতেলেখা পাণ্ডুলিপি।

ইলিয়াস-গবেষকদের জন্য সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই ‘আমার ইলিয়াস’। একজন কথাশিল্পীর ভাবনায় আরেকজন কথাশিল্পীকে সম্পূর্ণরূপেই পাওয়া যাবে বইটিতে।

 



মন্তব্য