kalerkantho


বই আলোচনা

জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ প্রসঙ্গে

মাইনুল ইসলাম মানিক

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ প্রসঙ্গে

অকুতোভয় জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একাধারে একজন প্রতিভাবান সাহিত্যিক, খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ ও প্রথিতযশা সাংবাদিক। পাঁচ দশকেরও অধিককাল ধরে তিনি পূর্ব বাংলার সমাজব্যবস্থাকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে অবলোকন করেছেন, উপলব্ধি করেছেন এবং সে অভিজ্ঞতার আলোয় সাজিয়েছেন স্বাতন্ত্র্য ও রুচিবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস। কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাঙালি মুসলমানদের জন্য আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছেন সংস্কারের আলোকবর্তিকা। এই প্রাজ্ঞজনের নামটি দু-একটি শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক ছাড়া আমাদের চৌহদ্দির প্রতিটি প্রান্তে বিস্মৃতপ্রায়। দীর্ঘ সময় পরে হলেও তরুণ লেখক ও গবেষক ইমরান মাহফুজের সম্পাদনায় যে কয়েকটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো আবুল মনসুর আহমদের চিন্তা ও দর্শনকে প্রতিটি প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে কাল থেকে কালান্তরে। কবি ও গবেষক ইমরান মাহফুজের সম্পাদনায় জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ গ্রন্থটি একটি বহুমাত্রিক প্রাচুর্যতার অনবদ্য সংকলন। সংকলনটি সাজানো হয়েছে দুটি পরিচ্ছেদে। প্রথম পরিচ্ছেদে আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি সম্মেলনের তিনটি পর্ব (সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতি) সন্নিবেশিত হয়েছে এবং প্রতিটি পর্বে যথাক্রমে সভাপতি, মূল প্রবন্ধকার ও আলোচকের ভাষণ সন্নিবেশিত হয়েছে। এ ছাড়া পরিশিষ্টে রয়েছে আবুল মনসুর আহমদের কবিতা, চিঠি ও অনুষ্ঠানের নিউজ কাটিং। আবুল মনসুর আহমদের জীবনের নানা আলোকিত-অনালোকিত বিষয় নিয়ে সংকলিত এ গ্রন্থ মুগ্ধপাঠ্য।

 সাহিত্য পর্বে সংকলিত হয়েছে সদ্যঃপ্রয়াত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ভাষণ। তিনি আবুল মনসুর আহমদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণা করেন এবং বাঙালি সমাজে বিস্মৃতপ্রায় আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি বিচলিত এই কারণে যে তাঁকে নিয়ে কেন পারিবারিক আয়োজন করতে হবে। কেন এমন একজন মানুষকে নিয়ে অন্যরা বড় ধরনের আয়োজন করেন না? আমাদের কি তাহলে কাউকে রেখে যেতে হবে, যারা আমাদের স্মরণ করবে? এটা দুঃখজনক।’ মূল প্রবন্ধে গবেষক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেছেন, ‘কবিতা দিয়ে শুরু করলেও আবুল মনসুর আহমদ কথাকোবিদ হিসেবেই সমধিক পরিচিত। কবিতা লিখেছেন, লিখেছেন প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও আত্মজীবনী। তবে গল্প-উপন্যাস রচনায়ই তাঁর সিদ্ধি শীর্ষবিন্দুস্পর্শী। তাঁর কথাশিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ, কৌতুক ও পরিহাসপ্রিয়তা। নির্মল হাস্যরস সৃষ্টি নয়, আবুল মনসুর আহমদের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ-কৌতুকের অন্তরালে ছিল তাঁর সমাজচেতনা ও উন্নত সমাজসংস্কার বাসনা।’ এই পর্বে আলোচক হিসেবে সেলিনা হোসেন ও মোরশেদ শফিউল হাসানের ভাষণ সংকলিত হয়। সাংবাদিকতা পর্বে সংকলিত হয় যথাক্রমে রফিকুল ইসলাম, মো. চেঙ্গীশ খান, শামসুজ্জামান খান, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আবুল মোমেন ও মুহম্মদ জাহাঙ্গীরের ভাষণ। রাজনীতি পর্বে আনিসুজ্জামান, নুরুল আমিন, কামাল লোহানী, আল মুজাহিদী, আবুল আহসান চৌধুরী, হাবিব আর রহমান ও মিজানুর রহমানের ভাষণ সংকলিত হয়।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে আবুল মনসুর আহমদকে নিয়ে লেখা ১০টি প্রবন্ধ সন্নিবেশিত হয়েছে। লিখেছেন সোহরাব হাসান, আন্দালিব রাশদী, ফেরদৌস আনাম, ফজলুল হক সৈকত, মনি হায়দার, স্বকৃত নোমান, কুতুব হিলালী, পিন্টু রহমান, রফিকুজ্জামান রনি ও ইমরান মাহফুজ। আবুল মনসুর আহমদের আত্মজীবনীকেন্দ্রিক অসাধারণ একটি গল্প লিখেছেন রাশেদ রহমান। এ পরিচ্ছেদে আরো সন্নিবেশিত করা হয়েছে খ্যাতনামা অনেক লেখকের পাঠপ্রতিক্রিয়া।

সম্পাদক ইমরান মাহফুজ তাঁর শ্রমে-ঘামে, মেধা ও মননের সৌকর্যে সাজিয়েছেন এই সংকলনগ্রন্থটি। তুলে এনেছেন আবুল মনসুর আহমদের জীবনের আলোকিত-অনালোকিত বিষয়গুলো, যা আমাদের দিয়েছে চেনা, জানা ও ভাবনার রসদ। প্রচ্ছদ করেছেন হামিদুল ইসলাম, প্রকাশ করছে আবুল মনসুর আহমদ স্মৃতি পরিষদ। জীবনশিল্পী আবুল মনসুর আহমদ সংখ্যাটি পাঠকের কাছে একটি অবশ্যপাঠ্য ও বিরল সংগ্রহ হিসেবে সমাদৃত হবে বলেই আমার বিশ্বাস।



মন্তব্য